রাজশাহীতে এবার আমবাগান সাবাড় করে পুকুর খনন

রাজশাহী

রাজশাহী জেলাতে সরকারী নিয়ম-নীতিকে তোয়াক্কা না করে এক শ্রেণীর মুনাফা লোভী প্রভাবশালীদের ইন্ধনে চলছে অবৈধ পুকুর খননের মহোৎসব। বিভিন্ন উপজেলার ৩ ফসলী জমিতে চলছে অবৈধ পুকুর খনন। এমনকি ২০ বছর আগের ফলজ আমবাগান কেটে সাবাড় করেও চলছে পুকুর খননের কাজ।

ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাজশাহীর পবা উপজেলায় বাগান ও ফসলি জমি নষ্ট করে পুকুর খননের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এলাকার প্রভাবশালীরা এসব পুকুর খনন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে এলাকায় ফসলি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। এ বিষয় নিয়ে উপজেলাবাসীর মধ্যে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এলাকার সুধিসমাজ ফসলি জমিতে পুকুর খনন বন্ধে কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহনের জন্য প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছেন এবং তারা মনে করছেন এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে উপজেলায় ফসলি জমি থাকবে না।

গণমাধ্যম কর্মিরা পুকুর খননের সংবাদ সংগ্রহ করতে মাঠে গেলে নামপ্রকাশে অনেকে বলেন, ছবি তুলে, নিউজ করে লাভ নেই। কারন আমরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই পুকুর খনন করতে এসেছি। তবে উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের রনহাটে পুকুরখনন করছেন ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি রজব আলী। রজব আলী বলেন তিনি আটঘাট বেধেই পুকুরখননে নেমেছেন। আমার মেশিন চলবেই কেউ বন্ধ করতে পারবে না। আমি সব পথ বন্ধ করে দিয়েছি।

জেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের অভিযোগ, কোনো অনুমতি ছাড়া প্রভাবশালীরা জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের জমি পুকুরের জন্য দখল নিয়ে নিচ্ছে অনেকে। রাজশাহী কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় নতুন করে প্রায় ২ হাজার একর আবাদি জমিতে পুকুর খনন হয়েছে। যারমধ্যে শুধু পবা উপজেলাতেই ১৫’শ একর বাগান ও আবাদি জমিতে পুকুরখনন হয়েছে। এ ছাড়াও প্রায় ২শ’ একর জমির উপর পুকুর খনন অব্যহত রয়েছে। আর পুরো জেলাতে প্রায় হাজার একর জমিতে পুকুরখনন চলছে। আর দিনে-রাতে বিভিন্ন মহলকে খুশি করে চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ পুকুর খনন।

বিষয়টি নিয়ে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহীর বরেন্দ্রের এক প্রকৌশলী জানান, এভাবে পুকুর খনন চলতে থাকলে কৃষির উপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। এদিক থেকে জেলার পবা উপজেলা জুড়েই চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। চারঘাট, দূর্গাপুর, পুঠিয়া, মোহনপুর, বাগমারা, বাঘা তানোর, গোদাগাড়ী উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে চলছে অবৈধ পুকুর খননের মহোৎসব।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসককে লিখিত অবহিত করে গনমাধ্যম কর্মীরা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এর হাজারো সত্যতার চিত্র উঠে আসে। দূর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের ব্রম্মপুর ( ঝলমলিয়া পাড়া) বিলের তিন ফসলী আবাদী জমিতে স্থানীয় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চলছে অবাধে পুকুর খনন। এছাড়াও উপজেলার পৌর এলাকাসহ মাড়িয়া, পানানগর, কিশমত গনকৌড়সহ ইউনিয়নের আনাচে কানাচে চলছে অবৈধভাবে পুকুর খনন।

পুঠিয়ার তাহেরপুর সড়কের একাধিক স্থানে শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ফসলী জমিতে একই কায়দায় চলছে পুকুর খনন। চারঘাটের বালিদিয়াড়, ঝাড় পাড়া, হলিদাগাছি, নিমপাড়া ইউসুফপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খননের বিষয় নিয়ে এলাকাবাসির আইন শৃংখলা বাহিনীর উপর যথেষ্ট অভিযোগ উঠেছে। পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়ন থেকে শুরু করে এলাকার বিভিন্ন স্থানে মেতেছেন অবৈধভাবে পুকুর খননে। বাগমারা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের এলাকার অবৈধ পুকুর খননের অব্যহত চিত্র একই।

পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল বারী ভুলু বলেন, আমিসহ আমার এলাকার জনগণ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়েছে। যারা পুকুরখননে বাধা ও অভিযোগ দেয় তাদেরকে ওই পুকুরখননকারি চক্রের রোষানলে পড়তে হয়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে পুলিশের হয়রানির মধ্যে হয়। তাই যে যা করুক আমার মাথা নেই। পারলে আপনিও ওই চক্রের সাথে মিল দিন-লাভ হবে। তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নে আমাদি জমি অর্ধেক কমে গেছে। আবার পুকুরখননের কারণে একটু বৃষ্টি হলেও ফসল ডুবে যায়। উপজেলার পুরো এলাকায় পুকুরখননের মোড়ক ধরেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে জানা গেছে, ধানের দাম বেশী হওয়ার পরেও পুকুরখননে বোরোর আবাদ অনেক কমেছে। অব্যাহত পুকুর খননের জন্য রোবো চাষের জমি কমে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। এতে রাজশাহীতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে এমনটাও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দূর্গাপুর উপজেলার ভূমি কমিশনার রাজিবুল ইসলাম উপজেলার অবৈধ পুকুর খননের বিষয়গুলো দেখভাল করার নির্দেশনায় থাকলেও অনিবার্য কারণে তা সঠিক ভাবে মনিটরিং করছেন না বলে একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন।
পবা উপজেলা সহকারি কমিশনার ভুমি আলমগীর কবীর বলেন, এই উপজেলায় পুকুরখনন বন্ধে বারবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এই উপজেলা ৫টি থানার আওতাভুক্ত। একদিকে অভিযান চালালে অন্য দিকে বাকী থাকছে। পুকুরখনন বন্ধে সব মহলের সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রয়াস দরকার। তারপরেও পুকুরখনন বন্ধে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
রাজশাহীর জেলা প্রসাশক (সার্বিক) আতাউল গনি পূর্বেই জানিয়েছেন, পুকুর খননের বিষয়গুলো একেবারে অবৈধ। উপরের নির্দেশনা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আসলে তিনি নির্দেশনা দিতে পারেন। প্রকৃত পক্ষে কোন জমিটি পুকুর খননের উপযোগী। জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে পুকুর খননের বিষয়গুলো অবৈধ। এই পযর্ন্ত আমরা অনুমতির ব্যাপারে কিছু বলতে পারিনি। তবে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)দের পুকুর খনন বন্ধের ব্যাপারে আইনুনাগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

1 thought on “রাজশাহীতে এবার আমবাগান সাবাড় করে পুকুর খনন

Comments are closed.