রাজশাহীতে কৃষি ও মৎস্য খাত তছনছ

রাজশাহী

প্রায় এক সপ্তাহের বন্যায় রাজশাহীর কৃষি ও মৎস খাতে ক্ষতি অন্তত: সাড়ে ৫০০ কোটি টাকারমত। এছাড়া পানিবন্দি রয়েছে রাজশাহীর বাগমারা, মোহনপুর ও চারঘাট উপজেলার এক লাখ ৪২ হাজার ৬৮৫ জন। এছাড়া পদ্মায় প্রবাহ বাড়ায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন পদ্মা পাড়ের বাসিন্দারা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর বলছে পর্যপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। তালিকা তৈরী করে দুর্গতদের মাঝে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে সহায়তা। তবে তা প্রযোজনের তুলনায় অপ্রতুল। এরই মধ্যে বেসরকারী ও ব্যক্তি উদ্যোগেও শুরু হয়েছে ত্রাণ তৎপরতা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেয়া তথ্যমতে, জেলার বাগমারা উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন এবং এক পৌর এলাকা, মোহনপুরের ৬ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা এলাকা, চারঘাট, বাঘা এবং গোদাগাড়ী উপজেলার একটি করে ইউনিয়নের বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যায় বাগমারা, মোহনপুর ও বাঘা উপজেলার ২৮ হাজার ৫৩৭ পরিবারের এক লাখ ৪২ হাজার ৫৮৬ জন মানুষ পানিবন্দি।

এর মধ্যে মোহনপুরে শিবনদীর একটি পয়েন্টে এবং বাগমারায় ফকিন্নি নদীর দুটি বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে বিস্তৃর্ণ এলাকা। এখনো পুরোপুরি ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে উন্নতি হচ্ছেনা বন্যা পরিস্থিতির। পদ্মায় প্রবাহ বাগায় তলিয়ে গেছে বাঘার চকরাজাপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চল। প্রতিদিনই পদ্মায় প্রবাহ বাড়ায় তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। ¯্রােতের তোড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে চারঘাটের রাওথা এবং গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে।
এনিয়ে কথা হয় চকরাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুল আযম ও পাকুড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফকরুল ইসলাম বাবলুর সাথে। তারা বলেন, পদ্মার ৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাড় ভাঙছে। এতে চকরাজাপুর ও পাকুড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি চলে গেছে নদীতে। ভাঙন এখন পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর নাপিতের মোড় ও কিশোরপুর এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের মাত্র ৫০ গজ দূরে। এতে ওই এলাকার ৫০০ পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থায়ী সংরক্ষন না করায় প্রতিবছরই পদ্মায় সহায় সম্বল হারাচ্ছে বাসিন্দারা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার আমিনুল হক বলেন, এ পর্যন্ত তারা দুর্গতদের মাঝে ৮০ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করেছেন। অন্যান্য সহায়তা বাবদ প্রদান করেছেন এক লাখ টাকা। এখনো ত্রাণ তহবিলে রয়েছে ৫ লাখ টাকা এবং ১০০ মেট্রিকটন চাল। দুর্গতদের তালিকা তৈরী করে ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালি জানান, বানের পানিতে জেলার পবা, বাগমারা, মোহনপুর, তানোর, গোদাগাড়ী ও বাঘা উপজেলায় পুরোপুরি তলিয়ে গেছে ১৫ হাজার ৭৮২ হেক্টর ফসলি জমি। এতে পুরোপুরি নষ্ট হবার পথে ১২ হাজার ২৭৯ হেক্টর আউস, ২ হাজার ৪৭১ হেক্টর আমন, ৫৬০ হেক্টর সবজি, ১৯৮ হেক্টর পান, ১৮০ হেক্টর মরিচ এবং ৬৯ হেক্টর পেঁপে। সবমিলিয়ে ক্ষতি ছাড়িয়ে যাবে ৫০০ কোটি টাকা।

তিনি আরো বলেন, ভেঙে যাওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ পুরোপুরি মেরামত না হওয়ায় বাগমারা ও মোহনপুর উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এছাড়া কিছু কিছু এলাকা ‘বেসিক’ আকৃতির। একই অবস্থা তানোর ও গোদাগাড়ীরও। ফলে এসব এলাকার পানি নামতে একমাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর বাইরের এলাকাগুলোর পানি নেমে যাবে ১০ দিনের মধ্যেই। এরপরই ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে মাঠে নামবে কৃষি দপ্তর। কৃষি পূর্নবাসনের আওতায় তারা আগাম শীতকালীন ফসল চাষের বিষয়টি মাথায় রাখছেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সাহা জানান, বন্যায় ভেসে গেছে রাজশাহীর বাগমারা, মোহনপুর, তানোর ও পুঠিয়া উপজেলার ৪৪৬ জন চাষির ৬২০টি বাণিজ্যিক মাছের খামার। এতে ভেসে গেছে আনুমানিক ৯৪ মেট্রিক টন মাছ। পোনা মাছ ভেসেছে পৌনে ৩ লাখ। এতে সবমিলিয়ে ক্ষতি প্রায় ১৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

চাষিদের পূর্নবাসনে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়ে জেলা মৎস কর্মকর্ত বলেন, তারা যে পরিকল্পনা নিয়েছেন তাতে ব্যয় হবে ১৭ কোটি ৩৩ লাখ ৫ হাজার ১৮০ টাকা। ওই পরিকল্পনায় ক্ষতি কাটাতে চাষিদের মাঝে ৪৩ দশমিক ৬০২ মেট্রিক টন পোনা মাছ বিতরণ করা হবে। যার মূল্য এক কোটি ৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।

এছাড়া ৭ লাখ ৯৯ হাজার ৪০০ টাকার ৩৬ দশমিক ৩৩৫ মেট্রিক টন চুন, ৩ লাখ ৪৫ হাজার ১৮০ টাকার ১৮ দশমিক ১৬৮ মেট্রিক টন সার এবং ৫৮ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকার খাবার প্রদান করা হবে চাষিদের। এ পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পাঠানোর কথা জানিয়েছেন সুভাষ চন্দ্র সাহা।

এদিকে, বুধবার বেলা ৩টায় পদ্মা প্রবাহিত হচ্ছিলো ১৭ দশমিক ৫৩ মিটারে। আগের দিনের চেয়ে এক সেন্টিমিটার নেমে সকাল ৯টা থেকে একই উচ্চতায় বইছে পদ্মা। এর আগে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৩৬ ঘন্টায় রাজশাহীতে পদ্মা বইছে ১৭ দশমিক ৫৪ মিটারে। এর আগে সোমবার সকালে পদ্মায় প্রবাহ ছিলো ১৭ দশমিক ৫৪ মিটার। পদ্মায় বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার। গত মৌসুমে পদ্মায় প্রবাহ ঠেকেছিলো ১৮ দশমিক ৪৬ মিটার।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নগরীর বড়কুঠি ¯¬্যান্টিং গেজ পাঠক এনামুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাধারণত ১৫ সেপ্টেম্বর পদ্মায় প্রবল ঢল আসে। এর আগে প্রবাহ সামান্য ওঠানামা করে। ১৫ সেপ্টেম্বরের পরই প্রবাহের গতিপ্রকৃতি বোঝা যাবে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

1 thought on “রাজশাহীতে কৃষি ও মৎস্য খাত তছনছ

Comments are closed.