রাজশাহীতে জমছে পশুর হাট, ছোট-মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি

রাজশাহী

দোরগোড়ায় ঈদুল আজহা। হাতে আর মাত্র তিন দিন। কোরবানির সময় ঘনিয়ে আসায় রাজশাহীতে জমে উঠতে শুরু করেছে গবাদি পশুর হাট। তবে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়লেও হাটে কেনাবেচা তুলনামূলক কম। ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার হাটে গবাদি পশুর দাম বেশি হাঁকা হচ্ছে।

রাজশাহী মহানগরীর সিটি হাট ছাড়াও উপকণ্ঠের পবার নওহাটা, দামকুড়া ও কাঁটাখালীতেও রয়েছে পশুহাট। এছাড়াও জেলার পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাট, ঝলমলিয়া হাট, গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট ও মহিষালবাড়ি হাট, বাগমারার ভবানীগঞ্জ ও তাহেরপুর হাট, দুর্গাপুর হাট, মোহনপুরের কেশর হাট ও সাবাই হাট এবং তানোরের চৌবাড়িয়া ও মুণ্ডুমালা হাট উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর হয়ে উঠেছে এসব হাটগুলো। এতদিন যাচাই-বাছাই চললেও এখন শুরু হয়েছে বেচাকেনা। ফলে প্রায় এক মাস পর জমে উঠতে শুরু করেছে পশুর হাটগুলো।

রাজশাহী মহানগরীর সিটি হাট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও পবা উপজেলা প্রশাসন। আর বিভিন্ন উপজেলার হাটগুলো দেখাশোনা করছে জেলা প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) রাজশাহীর সিটি হাটসহ বেশ কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন আকারের গরু, মহিষ, ছাগল রয়েছে। এরমধ্যে দেশি গবাদি পশুর সংখ্যাই বেশি। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে এবার সেভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশের সুযোগ পায়নি। হাটে ওঠা বেশিরভাগ গরুই এসেছে রাজশাহীসহ আশেপাশের জেলা-উপজেলাগুলো থেকে।

কোরবানির জন্য পশুহাটে যে গরুগুলো নিয়ে আসা হয়েছে, এগুলোর অধিকাংশই বাড়িতে বা খামারে লালন-পালন করা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে খামারিরা বাড়িতে গরু পালন করে থাকেন। যা কোরবানির মৌসুমে হাটে বিক্রি করে থাকেন। স্থানীয় খামারিদের পাশাপাশি কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের ব্যাপারীরাও পশু নিয়ে এখানে এসেছেন বিক্রির জন্য।

এ বছর ভারতীয় গরু কম থাকায় হাটগুলোতে দেশি গরুর দাম চড়া বলছেন খামারিরা। এছাড়া গোখাদ্যের দামও বেশি। তাই লালন-পালনে খরচ বেড়েছে। ফলে দাম বেশি না বলে উপায় নেই তাদেরও। বছরজুড়ে পোষার পর হাটে গরু তোলা হয়। তা বিক্রি করে বেশি লাভ হলে আগামীতে পশু পালনের আগ্রহ আরও বাড়বে। আর তা না হলে পশু পালনে খামারিরা নিরুৎসাহিত হবে। এতে ভারতীয় গরুর ওপরে আবারও নির্ভরশীলতা বাড়বে। এতে গরু আনতে গিয়ে সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রাণহানির ঘটনাও ফের বাড়বে বলে উল্লেখ করেন খামারিরা।

এদিকে পশুহাটে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, গতবারের তুলনায় এবার দাম অনেক বেশি। বিভিন্ন হাটে কোরবানির পশু কিনতে আসা ক্রেতারা জানান, ছোট সাইজের গরুর দাম ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের গরু ৭০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ও বড় সাইজের গরু ৯০ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকানো হচ্ছে।

সিটি হাট ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছাগলের দাম ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের ছাগলের দাম ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা ও বড় সাইজের ছাগলের দাম ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

নওগাঁর মান্দা থেকে রাজশাহীর সিটি হাটে গরু বিক্রি করতে এসেছেন আবদুল লতিফ। তিনি বলেন, এবার রাজশাহীর হাটগুলোতে তুলনামূলকভাবে ভারতীয় গরু আসেনি। এরপর বছরব্যাপী ধানের গুঁড়া, ভুষি, নালিসহ বিভিন্ন উপাদান ক্রয় ও শ্রমিক দিয়ে গরুর পরিচর্যা করতে গিয়েই প্রায় এক লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তাই লাভের আশায় দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে।

রাজশাহীর সিটি হাটে গরু কিনতে আসা আবদুর রশিদ নামে এক ব্যক্তি বলেন, হাটজুড়ে দেশি গরুর দাপট বেশি। তাই দামও চড়া। বিক্রেতারা দামে ছাড় দিচ্ছে না। তিন থেকে চার মণ গরুর দামই লাখ টাকার বেশি চাওয়া হচ্ছে। হাটে বড় গরুর চাহিদা কম। ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি। অনেকেই নিজেসহ তিনজন মিলে কোরবানি দেবেন, তারা ছোট গরু কিনছেন। আবার অনেকে সাতভাগে কোরবানি দেওয়ার জন্য মাঝারি সাইজের গরু খুঁজছেন। এ অবস্থায় বেশি গরু আমদানি না হলে দাম কমবে না।

সাইফুল ইসলাম নামে এক বিক্রেতা আটটি গরু নিয়ে এসেছেন রাজশাহীর সিটি হাটে। তিনি বলেন, ক্রেতারা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে এক থেকে দেড় মণ ওজনের গরু কিনতে চাইছে। দামে সুবিধা না হওয়ায় অনেকেই কিনছেন না। এছাড়া কোরবানির আরও কয়েকদিন সময় থাকায় এখনও ঘুরে দেখছেন অনেক ক্রেতাই। আবার দামে হলে কেউ কেউ কিনেও ফেলছেন।

তিনি আরও বলেন, অনেক মানুষের কোরবানির পশু রাখার মতো জায়গা নেই। তারা ঈদের দুই-একদিন আগে কোরবানির পশু কিনবেন। এছাড়া অনেকেই গৃহস্থবাড়ির পশু কিনছে। যেনো ঈদের আগের দিন নিয়ে কোরবানি দিতে পারেন।

শামসুল আলম নামে এক ক্রেতা বলেন, গরুর দাম যাচাই করার সুযোগ প্রায় শেষ। হাতে আর অল্প সময়ই বাকি আছে। তাই কোরবানির পশু কিনতে এসেছি। তবে ব্যবসায়ীরা দাম অনেক বেশি বলছেন। মাঝারি সাইজের দেশি গরুর দাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকারও বেশি চাচ্ছেন। মাংস হয়তো চার মণের বেশি হবে না। তবে অন্যবারের চেয়ে এবার হাটে গরু বেশি এসেছে মনে হচ্ছে। হাতে এখনও সময় আছে, দেখা যাক কি হয়!

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অন্তিম কুমার সরকার জানান, রাজশাহীতে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় তিন লাখ ৮২৪টি। এরমধ্যে গরু ৫৮ হাজার ৬১৩টি, ছাগল দুই লাখ ২৭ হাজার ৬৮০টি, ভেড়া ১২ হাজার পাঁচশটি ও মহিষ দুই হাজারটি।

এখানে পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬৬ হাজার ৭৫০টি। ফলে এখানে কোরবানির জন্য বাইরের পশুর প্রয়োজন হবে না। গত বছর এখানে তিন লাখের কিছু কম পশু কোরবানি হয়েছে। এবারও এখানে স্থানীয় খামারের পশু দিয়েই তা করা যাবে বলে জানান এই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর