রাজশাহীতে থামছেনা পুকুরখনন

পবা রাজশাহী

রাজশাহীর পবায় অভিযোগ-আবেদন তো বটেই ১৪৪ জারি করেও অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন প্রশাসন রুখতে পারছে না। রাজশাহী জেলায় সবচেয়ে বেশী কৃষি জমি হারিয়েছে পবা উপজেলার ভূ-খন্ড। আর এটা বর্তমান সময়ে আরো ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। এ খনন সিন্ডিকেটের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

হাজার হাজার অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন হলেও একটিও বন্ধ করতে পারেনি পবা উপজেলা প্রশাসন। দৃশ্যত: অলিখিতভাবে পুকুরখনন সিন্ডিকেটের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। পবার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে কমপক্ষে দু’শোটি এস্কেভেটর দিয়ে চলছে এ খননকাজ। প্রশাসন জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন। এ ঘুম ভাঙ্গানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যদি না তাঁরা দায়িত্ববোধ, কর্তব্য, চেয়ারের মর্যাদা, ভাল-মন্দ বিচার এবং আন্তরিকতার সাথে সোচ্চার হন-কথাগুলো এভাবেই বলেন উপজেলার একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

উপজেলার বড়গাছি মন্ডলপাড়ার মৃত নুর মোহাম্মাদের ছেলে সুহিতুল রফিক ওরফে নিতু দিগরগণের আদালতে মামলাকৃত জমিতে পুকুর খনন করছে প্রতিপক্ষের লোকজন। যা নিতু দিগরের পৈত্রিক সম্পত্তি। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রথমে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ড অফিসে অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলেন বড়গাছি মন্ডলপাড়ার মৃত আব্দুস সাত্তারের ছেলে আব্দুর রউফ ওরফে দুলাল, ফিরোজ আহমেদ, ফেরদৌস আহমেদ ও ফারুক আহমেদ জোরপূর্বক তাদের পৈত্রিক জমিতে পুকুরখনন করছেন। তারা বাদিকে খুন জখম করার হুমকি দিয়ে আসছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পুকুরখনন বন্ধে কোন উদ্যোগ না নেয়ায় তিনি আদালতের আশ্রয় নেন। আদালত আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির আশংকায় সেখানে ১৪৪ ধারা বাস্তবায়নে পবা থানাকে নির্দেশ দেয়। পবা থানা পুলিশ বিবাদমাল জমিতে পুকুরখনন বন্ধে ১৪৪ ধারা জারি করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ধারা চলছে। চলছে পুকুরখনন।

ওই এলাকার এক প্রবীন শিক্ষক এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি কেন? খুন-খারাপি হলেও তাদের কিছু যায় আসেনা। বাঘের কাছে মাংসের ডালি রেখে বাঘকে খেতে দিবনা বললে কি চলে? আদালত আইন শৃংখলার অবনতির আশংকায় ১৪৪ জারি করেছে। অথচ এস্কেভেটর মেশিন জমিতে রেখেই নিষেধাজ্ঞা চলছে। আর সুযোগ পেলেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খনন হচ্ছে পুকুর। সাধারণ জনগণের আর কি করার আছে?

এদিকে প্রশাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে উপজেলার পুরো এলাকাজুড়ে চলছে অপরিকল্পিত পুকুর খননের হিড়িক। সরকারি নিয়ননীতি উপেক্ষা করে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে চলছে এই খননকাজ। সম্প্রতি চোখের সামনেই উপজেলার বড়বড়িয়া এবং তেঘর-বসন্তপুর বিলসহ উপজেলার প্রায় ২০টি স্থানে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা চলছে খননের কাজ। কিন্তু প্রশাসন নীরব রয়েছে।

প্রশাসনের নাকের ডোগায় পুকুর খননের কাজ এগিয়ে চলছে। একশ্রেণির মুনাফালোভীরা রাজনৈতিক লেবাসে ও স্থানীয় পবা থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে তিন ফসলি ধানি জমিকে পুকুরে রুপান্তর করছে। জানা গেছে গত বৃহস্পতিবার পবা সহকারি কমিশনার ভুমি আলমগীর তেঘর-বসন্তপুর পুকুরখনন বন্ধ করে দেন। যার স্থায়ীত্বকাল হচ্ছে মাত্র ১০ মিনিট। এখনো বীর দর্পে চলছে খনন। এছাড়াও বড় বড়িয়া বিলেও চলছে পুকুর খননের হিড়িক।

অপরদিকে শুধু যে ক্ষেতের ক্ষতি হচ্ছে তাই নয়। পুকুরখননের কাজে ব্যবহৃত এক্সেভেটর ও মাটি পরিবহনে ট্রাক্টরে গ্রামীণ সংযোগ সড়কগুলো মরণফাদে পরিনত হচ্ছে। যে কারণে রাস্তাগুলো বছরখানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যদের প্রতি জনগনের কমছে আস্থা, বাড়ছে বিদ্বেষ।

কয়েক বছর থেকেই রাজশাহীর অন্যান্য উপজেলার মতই পবা উপজেলাজুড়ে চলছে পুকুর খননের কাজ। ভুমির শ্রেণি পরিবর্তন হলেও প্রশাসন নীরব ভুমিকা পালন করছেন। আবার কোন ক্ষেত্রে প্রশাসনের সাথে অবৈধ চুক্তি করে মুনাফালোভীরা চালিয়ে যাচ্ছে খননের কাজ। এতে শুধু ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে না-ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। দেখা গেছে যেসব এলাকায় পুকুর খনন বেশী হয়েছে-সেসব এলাকায় গৃহপালিত পশু অনেক কমে গেছে। চারণভুমি না থাকায় পশু কমে যাচ্ছে বলে ভূক্তভোগিরা জানান। আবার কৃষি শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রকৃতি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকীতে পড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদিরা।
পবা থানা ওসি পরিমল কুমার চক্রবর্তী বলেন, পুকুর কাটা রোধে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে উৎকোচের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

পারিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল বারি ভুলু জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন ব্যাপক বৃষ্টিতেও এ এলাকা ডুবতো না। পানি নেমে যেত। এখন বেশী লাভের আশায় এলাকায় পানি নিস্কাশন মুখে পুকুর খননের জন্য জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানি নিস্কাশনের রাস্তা না থাকায় আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনে বার বার অভিযোগ দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুরখনন রোধে লোক দেখানো কমিটি গঠন করলেও বাস্তবে কোন কাজ হচ্ছে না বলে জানান। কমিটি আতুর ঘরেই রয়ে গেছে।
বড়গাছি মন্ডলপাড়ায় ১৪৪ ধারা জারির পরেও পুকুরখনন হচ্ছে এ বিষয়ে ১৪৪ ধারা ইস্যুকারি কর্মকর্তা এ এস আই আসাদুজ্জামান বলেন ঘটনা সত্য। তবে ঘটনা শুনার পরেই আমি এবং থানা অফিসার্স ইনচার্জ পরিমল কুমার চক্রবর্তী যেয়ে খনন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

পবা সহকারি কমিশনার (ভুমি) আলমগীর কবীর বলেন, পুকুর খনন বন্ধে কমিটি গঠন করা হয়েছে। খনন বন্ধের অভিযান অব্যহত আছে। কয়েকদিনের মধ্যেই এই উপজেলায় পুকুর খনন বন্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, আইনমতে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এমনকি ফসলি জমি অধিগ্রহণেও বাধা আছে। তিনি সমস্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বার বার এমন আশ^াস দিলেও পদক্ষেপের সুফল একেবারে তলানিতে বলে জানা গেছে।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

8 thoughts on “রাজশাহীতে থামছেনা পুকুরখনন

Comments are closed.