রাজশাহীতে নৈসর্গিক পরিবেশে ঈদ আনন্দ বাড়িয়েছে পশু-পাখি

রাজশাহী

ঈদের ছুটিতে রাজশাহী শহর এখন প্রায় ফাঁকা। যারা রাজশাহী এসেছেন আর যারা বরাবরই এই শহরে থাকেন, তারা প্রাণ খুলে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সকাল, বিকেল বা সন্ধ্যা নেই। সব সময়ই তাই বিনোদনপিপাসুদের ভিড়ে কোলাহলমুখর হয়ে থাকছে চিত্তবিনোদনের কেন্দ্রগুলো।

ছুটিতে থাকা নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। ঈদের দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই চিড়িয়াখানায় ভিড় উপচেপড়া।

মেঘ, বৃষ্টি ও ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ সপরিবারে যাচ্ছেন চিড়িয়াখানার নৈসর্গিক পরিবেশে কিছুটা আনন্দঘন সময় কাটাতে। মানুষের আনন্দ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে চিড়িয়াখানার পশু-পাখি। তবে তাদের নিরাশ করেছে বাঘ ও সিংহের না থাকা। দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণ বাঘ ও সিংহ হলেও তারা নেই। প্রায় এক যুগ থেকে তাদের খাঁচা খালি। ফলে হতাশ হচ্ছেন অনেকেই।

এরপরও ঈদের ছুটিতে রাজশাহীর কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থী অন্য সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। মানুষের ভিড় সামলাতে লোকবল না বাড়ানো গেলেও উদ্যান ও চিড়িয়াখানাজুড়ে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।

এই চিড়িয়াখানায় বর্তমানে রয়েছে ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২২ প্রজাতির পাখি, তিন প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী। ঈদের দিন থেকে বিপুল দর্শনার্থীর আকর্ষণও ছিল তারা। ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন বাধাগ্রস্ত হয়েছে হাজারো মানুষের সরব উপস্থিতিতে। সচেতনতার অভাবে অনেকের আচরণ উৎপীড়নের পর্যায়েও গেছে।

ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আবদ্ধ এসব প্রাণী দেখে, তাদের সঙ্গে নানা রকম মিথষ্ক্রিয়া করে আনন্দ পেলেও প্রাণীদের জন্য তা সব সময় সুখকর ছিল না।

অনেক প্রাণী দিনের বেলায় নির্দিষ্ট সময় ঘুমায়। বেশি মানুষের উপস্থিতিতে যেমন তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটেছে; আবার অনেককে দেখা গেছে ঢিল ছুড়েছে বা নানা হাঁকডাক করে ঘুমন্ত প্রাণীকে জাগানোর চেষ্টা করছেন। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোনো কোনো প্রাণীকে খাবার দিয়েছেন কেউ কেউ। সেলফি তুলতে গিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনীও পার হয়েছেন অনেকে। ঝুঁকির বিষয়টিও উপেক্ষা করছেন।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব মতে, ঈদের প্রথম দিন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় এসেছে। আজ দ্বিতীয় দিনের ভিড় তারচেয়ে বেশি।

সজীব, খোরশেদ, হৃদয়রা নয় বন্ধু চিড়িয়াখানায় এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে। বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত থেকেও পুরোটা ঘুরে দেখতে পারেনি। নবম শ্রেণি পড়ুয়া এই ছেলেরা একই রকম পাঞ্জাবি গায়ে দাঁড়িয়ে ছিল বানরের বেষ্টনীর সামনে।

শুধু তারা নয়, অনেকেই পরিবার নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে। তবে দর্শনার্থীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বেশির ভাগ অভিভাবককেই শিশুদের প্রাণী চেনাতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে অজগর বেষ্টনীর সামনে। খাঁচার মধ্যে গাছের সঙ্গে পেঁচিয়ে থাকা প্রাণীটি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মনেই আনন্দ খোরাক জুগিয়েছে। বাবাদের কাঁধে ছিল সন্তান। অনেকে ব্যস্ত ছিলেন সেলফি তুলতে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে প্রধান ফটকের সামনেই থাকা সুদৃশ্য লেকে বিনোদনপ্রেমীরা নেমে বোট চালাচ্ছেন। নয়নাভিরাম পুকুর ও লেকের পাড় ও এর ওপর পরী সুদৃশ্য ভেনাস দ্বীপের পাশে নির্মিত দু’টি কার্ভ সেতুতে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে কেউ বা ছবি তুলছেন, কেউ তুলছেন সেলফি।

মনোরম ওয়াকওয়েগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। দক্ষিণের সবুজ পাহাড় ও তার ওপর ফোয়ারার পাশেও মানুষ ছবি তুলছেন। ছোট-বড় সবার জন্য বিনোদনের একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুদের চিত্তকে প্রফুল্লকরণের উদ্দেশে নির্মিত ফেরিজ হুইল ও চিলড্রেন কর্নারও ছোটদের হৈ-হুল্লোরে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে এখন। পার্কের মনোরম পরিবেশে সবুজের কারুকার্য দেখে সাবই মনের খোরাক মেটাচ্ছেন।

পরিবারের সঙ্গে ঢাকা থেকে ঈদ করতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ছুটিতে কোথায় যাওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে ছুটির দু’দিন চলে গেছে। তাই আজ উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে এসেছেন। পাশাপাশি বাচ্চাদের চিড়িয়াখানাও ঘুরে দেখাচ্ছেন। ঘুরে বেড়ানোর জন্য উদ্যানটি উপযোগী। তবে চিড়িয়াখারা মূল আকর্ষণ বাঘ ও সিংহ নিয়ে আসার দাবির কথা বলেন, বেড়াতে আসা দর্শনার্থী রফিকুল।

রাজশাহী শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার তত্ত্বাবধায়ক ও ভ্যাটেনরি সার্জন ডা. ফরহাদ হোসেন বাংলানিউজকে জানান, ঈদের দিন থেকে পরবর্তী সাতদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এখানে।

এজন্য নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। ভেতরে ও বাইরে পুলিশ টহলের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বাইরে র‍্যাবের টহল রয়েছে। সব মিলিয়ে সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে ঈদের দিন থেকে উদ্যান ও চিড়িয়াখানার সবুজ পরিবেশে ঈদ আনন্দ উপভোগ করছেন।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর