রাজশাহীতে ভুয়া ডিবি পুলিশ নিয়ে উৎকণ্ঠা

রাজশাহী

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিচয়দানকারী ভুয়া সদস্যদের নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় পড়েছে রাজশাহীর মানুষ। দিনদুপুরে তলৱাশির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে এসব ভুয়া ডিবি সদস্য। নগরীতে একের পর এক ছিনতায়ের ঘটনা ঘটলেও এসব ভুয়া পুলিশের নাগাল পাচ্ছে না আসল পুলিশ। এতে নগরবাসীর উৎকণ্ঠা আরও বাড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর ছিঁচকে ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কিছু সন্তানও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এদের বাবাদের মধ্যে কেউ শিক্ষক, কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কেউ বড় ব্যবসায়ী অথবা কেউ সরকারি চাকরিজীবী। এসব ছিনতাইকারী নিজেরাও শিৰিত। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা। মূলত তারাই ডিবি পুলিশের পরিচয়ে ছিনতাই করছে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটক করতে না পারায় থামছে না ছিনতাইয়ের ঘটনা। ফলে প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে ছোট-বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আবার ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করছেন, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে থানায় গেলেও তারা খুব একটা সুফল পাচ্ছেন না। ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি কিংবা মামলা নিতেও গড়িমশি রয়েছে পুলিশের। ফলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহে রাজশাহীতে গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয়ে তিনদিনের ব্যবধানে একটি মোটরসাইকেলসহ ২২ লাখ ১০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পর পর একই কায়দায় তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় স’ানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ডিবি পুলিশ আতঙ্ক। তাছাড়া পাড়া-মহলৱার ছিঁচকে ছিনতাইকারীদের আতঙ্ক তো রয়েছেই।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর মতিহার থানার বাইপাস সড়কে মাহেন্দ্রা এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ডিবি পুলিশের পোশাক পরে এবং আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে তলৱাশির নামে গাড়ি থামিয়ে একটি মিলের সাড়ে ১৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার থানায় মামলা হয়েছে।
এর আগে গত সোমবার দুপুরে একই কায়দায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তলৱাশির নামে নগরীর রাণীবাজার এলাকায় এক নারীর ভ্যানেটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী। ওই ব্যাগে ছিল ফেরদৌসি বেগম নামে ওই নারীর ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। টাকা নিয়ে পায়ে হেঁটেই ব্যাংকে যাচ্ছিলেন ওই নারী। স’ানীয় একটি দোকানের বাইরে লাগানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এক ছিনতাইকারীকে ফেরদৌসি বেগমের টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেলেও এখনও পর্যন্ত তাকে ধরতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনার দু’দিন আগে গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে পবা উপজেলার কসবা এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে শরিফুল ইসলাম রাজিব নামে এক ব্যবসায়ীর মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এদের হাতেও ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। ছিনতাইকারীরা মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে রাজিবের কাছে কাগজপত্র দেখতে চায়। এছাড়া শরীর তলৱাশি করবে বলে ওই ব্যবসায়ীকে মোটরসাইকেল থেকে নামতে বলে। তিনি নামলেই অস্ত্র দেখিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

এদিকে গত বুধবার রাতে নগরীর ভেড়িপাড়া মোড়ে সাদ ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল সেট ছিনতাই করা হয়। এ ঘটনায় সাদ ইসলাম রাজপাড়া থানায় মামলা করতে গেলেও তা নেওয়া হয়নি। সাদ জানান, পুলিশ মামলা না নিয়ে শুধু একটি জিডি করেছে। সে জিডিতে ছিনতাইয়ের কথাও উলেৱখ নেই, উলেৱখ নেই টাকার কথাও। শুধু একটি মোবাইল হারানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এমন বিষয় জানা নেই বলে দাবি করেছেন রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান।

এর আগে নগরীর সিপাইপাড়া এলাকায় এক নারীর পথরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। রত্না দে ভট্টাচার্য নামের ওই নারীর কাছ থেকে ছিনতাইকারীরা ১০ হাজার টাকাসহ স্বর্ণের গহনা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রত্মা সিপাইপাড়া এলাকায় অবসি’ত মাদার বখস কেজি স্কুলের শিক্ষিকা। এ ঘটনায় রত্মা দে থানায় মামলা করলেও তার টাকা ও গহনা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

এছাড়া গত জুলাইয়ে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে নগরীর ডাবতলা এলাকায় র্বহুল আমিন নয়ন নামে গোদাগাড়ীর এক গর্ব ব্যবসায়ীর মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেয়া হয় ২০ লাখ টাকা। এর আগে গত ফেব্র্বয়ারিতে একই কায়দায় নগরীর দুই সতীনের মোড় এলাকায় আবদুল হালিম নামে এক মোটরসাইকেল চালকের মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করা হয়। এসব টাকা ও মোবাইলও উদ্ধার হয়নি।

অস্ত্র হাতে অভিনব কৌশলে এসব ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন রাজশাহীর মানুষ। উদ্বিগ্ন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। তারা বলছেন, এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে নেমে প্রায় ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়েও ছিনতাই করে থাকে। এদের কয়েকজন কারাগারে আছে। বাকিরা বাইরে। তাদের নজরদারি করা হচ্ছে। অভিনব পন’ায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নগরীতে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলেও বাহিনীটির পৰ থেকে দাবি করা হয়েছে।

রাজশাহী মহানগর ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার আল-আমিন হোসাইন বলেন, ‘এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই করছে। ডিবি পুলিশের কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে কিনা, সে বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়ের আলম বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো এখন মহানগর পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের দাপট র্বখতে নগরীতে স’ায়ী চেকপোস্টের পাশাপাশি আরও অস’ায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এছাড়া নগরীর সব থানা পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

খবরঃ দৈনিক সোনালী সংবাদ

4 thoughts on “রাজশাহীতে ভুয়া ডিবি পুলিশ নিয়ে উৎকণ্ঠা

Comments are closed.