রাজশাহীর ইফতার সামগ্রীতে মেশানো হচ্ছে বিষ!

রাজশাহী

ইফতার আয়োজনে অনেকটাই অপরিহার্য ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি ও জিলাপি। এর পাশপাশি থাকছে বিভিন্ন পদের ভাজা-পোড়া খাবার।

রাজশাহীর হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতে এসব ইফতার সামগ্রীতে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রঙ। এতে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন ধর্মপ্রাণ রোজাদাররা। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এই অঞ্চলে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি ও জিলাপিতে নানাভাবে ভেজাল মেশাচ্ছে। মুড়ি আকারে বড় ও সাদা করতে ব্যবহার করছে ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। এই রাসায়নিক পদার্থটি কাপড়ের মিলে সাদা রং করতে ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ ও জিলাপিতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে ব্যবহৃত রং বা ট্রেটাইল কালার। কম খরচে বেশি লাভ করতে অসাধু বিক্রেতারা কাপড়ে ব্যবহারের রঙ ইফতারসামগ্রীতে ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এক কেজি ট্রেটাইল কালারের বর্তমান বাজার মূল্য ৩০০ টাকা। সেখানে এক কেজি ফুড কালারের মূল্য প্রায় দুই হাজার টাকা। মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ভেজাল চিনি। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম সাইক্লামেট।

মিষ্টিজাতীয় দ্রব্যকে অধিকতর মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, সুকরালেস ইত্যাদি। মিষ্টিকে বিভিন্ন রঙ দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রেটাইল কালার। মসলায় ভেজাল আরো বেশি। বেসনের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে আটা। আটায় হলুদ রং ব্যবহার করায় তা বেসনের রং ধারণ করছে। হালিমে মেশানো হচ্ছে আগের দিনের অবিক্রীত ডাল ও গোশতের উচ্ছিষ্ট। এদিকে ভেজালসামগ্রী থেকে রোজাদারদের উদ্ধার করতে ঘোষণা দিয়ে নগরীতে নেমেছে চেম্বার অব কমার্স অব ইন্ডাস্ট্রিজ। ভেজাল ঠেকাতে সংস্থাটি রমজান শুরুর আগেই ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করেছে। এছাড়া হোটেল-রেঁস্তরা মালিক সমিতি নগরীর হোটেল রেস্তোরাঁগুলো ভেজালমুক্ত ঘোষণা দিয়ে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করছে।

এদিকে, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ইফতারসামগ্রী পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, হালিম, চপ, জিলাপি, খেজুর, মৌসুমি ফল, এমনকি মুড়িতেও কোনো না কোনোভাবে ভেজাল সামগ্রী ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব খাবারে উপস্থিত ক্ষতিকর কার্সিনোজেনিক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ স্বল্পমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সৃষ্টি করছে রোগ, তাছাড়া বিষক্রিয়াসহ লিভার ও অন্ত্রে প্রদাহ এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারও হচ্ছে।

জানা গেছে, রমজানের শুরু থেকেই ভেজালবিরোধী অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত, পুলিশের অভিযান চলছে। সীমিত আকারে জব্দকৃত ভেজাল খাদ্য ও মালিকদের জরিমানাও করা হচ্ছে। কিন্তু বাজার মনিটরিং কর্তৃপক্ষের এ জরিমানা কম ও অনিয়মিত হওয়ায় ভেজাল ইফতারসামগ্রীর বিক্রেতারা কাউকেই গা করছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি জেলা ও উপজেলায় স্যানিটারি ইনস্পপেক্টর থাকলেও তারা হোটেল রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে মোটা টাকার বিনিময়ে আঁতাত করায় মাঠে ভেজালবিরোধী অভিযান তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। বারবার অভিযোগ দেয়ার পর ভেজালবিরোধী অভিযানে নামলে হালকা জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করায় দোকানিরা এ বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামান না। ফলে ভেজাল ইফতারসামগ্রীতে ছেয়ে গেছে এ অঞ্চলের অলিগলি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক অপূর্ব অধিকারী, কোনো ভেজাল খাদ্যসমাগ্রী যাতে ইফতারে সরবরাহ না করা হয়, সেজন্য কড়া দৃষ্টি আছে প্রশাসনের। নিয়মিত ভেজাল বিরোধী অভিযানও চলছে।

অন্যদিকে, রাজশাহী বিএসটিআইয়ের পরিচালক এবিএম মর্ত্তজা হোসেন শাহ বলেন, রোজা শুরুর আগে থেকেই নগরীতে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে বিএসটিআই। অভিযানে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য যেমন, মুড়ি, ছোলা, ফল, ভোজ্যতেল, সেমাই, মাছ ও গোশতের বিষাক্ত কেমিক্যালের মিশ্রণ না ঘটে সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও ওজনে কারচুপিকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে। পুরো রোজার মাস জুড়েই এ অভিযান অব্যহত থাকবে বলেও জানান তিনি।