রাজশাহীর পদ্মায়ও মিলছে ইলিশ

রাজশাহী রাজশাহী বিভাগ

অধিকাংশের আক্ষেপ আমরা এখন আর আগের মতো পদ্মার ইলিশ পাচ্ছি না। স্বাদ থেকে বঞ্চিত। আক্ষেপ একেবারে অমূলকও নয়।

পদ্মায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ মেলেনি। তাই আগের মতো ইলিশের স্বাদ থেকে চরমভাবে বঞ্চিত রয়েছে বাঙালি।

একথা সত্য- পদ্মার ইলিশ মানে স্বাদের গ্যারান্টি শতভাগ। রান্নার সময় পদ্মার ইলিশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে পাড়াময়।

তবে পদ্মার ইলিশ না পাওয়া নিয়ে আগের মতো অতোটা আক্ষেপ করতে হবে না। সে ব্যবস্থায় অনেকটা মৎস্য অধিদফতর এগিয়েছে বলে বাংলানিউজকে জানালেন ইলিশ প্রকল্পের পরিচালক জাহিদ হাসান।

ফরিদপুর-পাবনা ছাড়িয়ে ইলিশ এখন সুদূর রাজশাহীর পদ্মায় মেলারও সুখবরটি জানান তিনি।

তিনি জানান, ২০০৯ সালে ইলিশ নিয়ে মৎস্য অধিদফতর যে কর্মসূচি চালু করেছিল, তা আজ অনেকটাই সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে।

ইলিশ শুধু হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষাই নয়- এর বংশ বৃদ্ধি করে দেশের মানুষের পাতে আরও বেশি বেশি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য অধিদফতর।

তিনি বলেন, বিশ্বে বাঙালির পরিচয় ঘটে ইলিশের উদাহরণ টেনে। ইলিশ দিয়েই পদ্মা পাড়ের বাঙালিকে চিনে নেয় বিশ্ববাসী। যে কারণে প্রচুর ইলিশ রফতানি হয় ভারতসহ বিদেশের বাজারগুলোতে।

তাই তো চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় ঢাকা সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ইলিশ রফতানির অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

জাহিদ হাসান জানান, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় ভোলার দৌলতখান উপজেলায়।

এরপর সাগর-নদী বিধৌত উপকূল চাঁদপুর, লক্ষীপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীর ২১ উপজেলার পদ্মা-মেঘনায় জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ রক্ষা ও ইলিশের বংশ বিস্তারের জন্য ব্যাপক প্রচার চালানো হয়।

পরবর্তীতে এ কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের ২৫ জেলার ১৩৬টি উপজেলায়। তার সুফল এখন আমাদের হাতে। ফরিদপুর-পাবনা ছাড়িয়ে ইলিশ এখন মিলছে সুদূর রাজশাহীর পদ্মায়ও।

গত এক সপ্তাহ ধরে সেখানকার পদ্মায় প্রতিদিন ২ টন (৫০ মণ) করে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি জানান, রাজশাহী থেকে ভোলা পর্যন্ত মার্চ ও এপ্রিল এবং পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদীতে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস অভয়াশ্রমের ঘোষণা দিয়ে জাটকাসহ (ইলিশের পোনা- ২৫ সে.মি. দৈর্ঘ্য পর্যন্ত) সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়।

এছাড়া ভরা প্রজনন মৌসুমে প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমার আগে ও পরে মোট ১৫ দিন মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। এসব কার্যক্রমের ফলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০০৯ সালে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ মেট্রিকটন। ২০১৪-১৫ সালে সে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিকটনে।

মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ সময়সহ কর্মহীন মৎস্যজীবীদের ক্ষতিপূরণ/প্রণোদনা হিসাবে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রতি মৎস্যজীবী পরিবারে প্রতি মাসে ৪০ কেজি হিসেবে ৪ মাস চাল প্রদান করার পাশাপাশি মৎস্য অধিদফতরের জাটকা সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে হতদরিদ্র মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান করা হচ্ছে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু বেসরকারি দেশি-বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাও ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ‘ডারউইন ইনেসিয়েটিভ’ এর আর্থিক সহায়তায় মৎস্য অধিদফতরের সহযোগিতায় ‘ইকোনমিক ইনসেটিভ টু কনসার্ভ হিলসা ফিস ইন বাংলাদেশ’ নামে প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছর ধরে গবেষণা/সমীক্ষা পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রণোদনামূলক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও টেকসই কারণসহ ইলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্যজীবীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করা এ সমীক্ষার উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের মুক্ত জলাশয়ে যে মাছের উৎপাদন হয় তা বিশ্বে চতুর্থ স্থান দখল করেছে।

বিশ্বে ইলিশের মোট উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ১৫ শতাংশ ভারতে, ১০ শতাংশ মায়ানমারে ও বাকি ১০ শতাংশ অন্যান্য দেশে উৎপাদিত হয়।

একক প্রজাতি হিসাবে দেশের মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১২ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ে ইলিশের অবদান ১ শতাংশ। দেশের প্রায় ৫ লাখ মৎস্যজীবী সার্বক্ষণিকভাবে এবং প্রায় ২৫ লাখ লোক জীবিকার জন্য খণ্ডকালীন ইলিশ আহরণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত।

‘ডারউইন হিলসা’ প্রকল্পের পাশাপাশি আরও কয়েকটি সংগঠন ইলিশের বংশ বিস্তারে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা ইলিশপ্রবণ নদীগুলোতে সমীক্ষাও করেছেন।

এতে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় ওয়ার্ল্ডফিশের উদ্যোগে ২০১৪ সাল থেকে শুরু হয়ে ৫ বছরের জন্য বাস্তবায়নাধীন ইকোফিশ প্রকল্প বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ প্রকল্পের পরিধি অনেক বেশি।

মৎস্যজীবীদের চাল দিয়ে তাদের কর্মবিমুখ না করে কাজের সংস্থান ও স্বাবলম্বী করে তোলাও এ সকল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

‘হিলশা কনজারভেশন ফাউন্ডেশন’ মৎস্য বিভাগের প্রাক্তন মহাপরিচালক ও বর্তমানে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’র ইকোনমিক ইনসেনটিভ টু কনজারভেশন হিলশা ইন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত লিয়াকত আলী জানান, যুক্তরাজ্যের ডারউইন ইনিশিয়েটিভ ইলিশ গবেষণার জন্য ২০১৩ সাল থেকে অর্থ সহায়তা করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ইকোফিস প্রকল্পও ইলিশের ওপর কাজ করছে।

ইলিশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের মিলিতভাবে কাজ করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। ‘ডারউইন হিলসা’ প্রকল্পের আওতায় যুক্তরাজ্যের আইআইইডি, বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএএস) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদ, মৎস্য অধিদফতর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ইলিশ সংরক্ষণে তিন দেশ উদ্যোগ নিয়েছে।

এটা বাস্তবায়িত হলে দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্যজীবীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।