রাজশাহীর পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ [পর্ব-৫]

পর্যটন রাজশাহীর পরিচিতি

রাজশাহী বড়কুঠি

রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে প্রাচীন দালান পদ্মা পাড়ের বড় কুঠি। এই কুঠিকে কেন্দ্র করে ঐ এলাকার নামকরণ হয়েছে বড়কুঠি। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউরোপীয়রা এ ধরনের কুঠি তৈরী করে ছিল।

রাজশাহী মহানগরীর বড় কুঠি তৈরী করেছিল ওলন্দাজরা বা ডাচরা। কুঠিটি নিমার্ণের তারিখ জানা যায় না। তবে অষ্টম শতকের প্রথমভাগে বড়কুঠি ওলন্দাজাদের এই অঞ্চলের বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখল করলে ওলন্দাজরা মিরজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ইংরেজদের ক্ষমতা খর্ব করতে চাইলে ইংরেজদের হাতে তাদের পরাজয় ঘটে। এরপরও তারা রাজশাহী অঞ্চলে কিছু দিন রেশম ব্যবসা করে ছিল। রাজশাহীতে ওলন্দাজদের বড়কুঠি ক্রয় করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। কোম্পানীর একজন প্রতিনিধি বসবাস করতে আরম্ভ করেন বড় কুঠিতে। ১৮৩৩ সালে ওলন্দাজরা পরিত্যাগ করলে বড়কুঠি ইংরেজদের মালিকানায় চলে আসে। ১৮৩৫ সালে বড়কুঠি মেসার্স রবার্ট ওয়াটশন কোম্পানীর হাতে যায়। রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানী রাজশাহী ও সরদহের কুঠিবাড়ি কিনে নেয়। রেশম ও নীল ব্যবসাকে নির্ভর করে রাজশাহী হয়ে ওঠে একটা সমৃদ্ধ নদী বন্দর। এখান থেকে প্রচুর রেশম ও নীল বিদেশে চালান হতে থাকে।

ইউরোপীয় বাজারে বাংলার রেশম বিদেশী রেশমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয় এবং ১৮৫৯-৬০ সালে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক শহর হিসাবে রাজশাহীর অবনতি ঘটে। ১৮৯০ সালে জার্মানীতে হিউম্যান (Heumann) খুব সস্তায় কয়লা থেকে নীল তৈরীর কৌশল আবিস্কার করে। এর ফলে নীল গাছের পাতা থেকে নীল রঙ তৈরী আর লাভজনক ছিল না।

রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানীর কাছ থেকে বড়কুঠি ও তার সংলগ্ন সম্পত্তি মেদিনীপুর জমিদারী কোম্পনী কিনে নেয়। এই জমিদারী কোম্পানীও ছিল ইংরেজদের। এই কোম্পানী রাজশাহী মহানগরীর যে স্থানে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর বাজার বসাত তা এখনও সাহেব বাজার হিসাবে খ্যাত। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশের থাবা মুক্ত হয়ে পাকিস্তানের জম্ম হওয়ার পর ১৯৫১ সালে তৎকালীন সরকার বড়কুঠি একোয়ার করে নেয়। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বড়কুঠি ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস ও বাসভবনে পরিণত হয়। নীচতলা অফিস ও ওপর তলা বাস ভবন। বতমার্ন বড়কুঠির নীচতলা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়ক কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস ও উপরতলা টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে বড়কুঠির বেশ ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে পুরনো দালান হয়েও অনেকবার সংস্কারের কারণে আজও টিকে আছে। এর মূলকুঠির দৈর্ঘ্য ৮২ফুট ও প্রস্থ ৬৭ ফুট, মোট কামরার সংখ্যা ১২টি, একটি সভা কক্ষসহ উপরে ৬টি কামরা আছে। বাড়িটির দুপাশে আছে দোতলার ছাদে যাবার ঘোরানো সিঁড়ি । সিঁড়ি ঘরের দেওয়ালে নিদির্ষ্ট দূরে দূরে ফোকর আছে । যার মধ্যে দিয়ে গুলি ছোড়ো সম্ভব।

সে সময় নীচের কামরাগুলো রেশমের গুদাম ও উপরের কামরাগুলো আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হতো। ওলন্দাজদের আমলে কুঠিটি ছিল বেশ সুরক্ষিত । ছাদের ওপরে বিশেষ ধরনের কামান স্থাপন করা ছিল নিরাপত্তার জন্য। নীচের ঘরগুলোই গোলাবারুদ রাখা হতো। আঙ্গিনাতেও বসানো ছিল ছোট ছোট কামান । পরে এগুলো এখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল । ওয়াটসন কোম্পানীর আমলে নীচের ঘরগুলোকে বন্দিশালা হিসাবে ব্যবহার করা হতো। বহু মানুষকে ধরে এনে এখানে খুন ও বহু নারীকে ধষর্ণ করা হয়েছে। নীল চাষে অবাধ্য কৃষকদের পিটানো হতো চামড়া মোড়ানো বেতের লাঠি শ্যামাচাঁদ দিয়ে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিল্পবের সময় বড়কুঠি ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর বিশেষ হেড কোয়ার্টার রূপে ব্যবহৃত হয়েছিল।