রাজশাহীর রিতা কাঁপাচ্ছে জিমন্যাস্টিক্স দুনিয়া!

রাজশাহী

বিশ্ব গণমাধ্যমসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে জিমন্যাস্টিক্স কন্যা রিতার সাফল্যগাথা। রাশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বকাঁপানো এই জিমন্যাস্টিক কন্যার খেতাব দেয়া হয়েছে ‘বাংলার বাঘিনী’। খেতাবটি তাকে দিয়েছেন রুশ কোচ ইরিনা ভিন। এই বাংলার বাঘিনী রিতার বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায়। রাশিয়ার রিদমিক জিমন্যাস্টিক্সের ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে তার অবস্থান বর্তমানে ২ নম্বর।

২০১৩ সালে রিতার এমন গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যের কারণে তাকে নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল রাশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে। রাশিয়ার বিখ্যাত ক্রীড়া ম্যাগাজিন ইউরো স্পোর্টস এর মূল প্রচ্ছদে উঠে আসে রিতার সাফল্যের গল্প। রিতার বাবা প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন (গ্রামে ডাক নাম শিপার) রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ক্ষিদ্র কাশিপুর গ্রামের ছেলে। ১৯৮৩ সালে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে তিনি রাশিয়া যান। পরে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এই রিতাকে বিশ্ব গণমাধ্যম অন্য এক নামে চেনে। সেখানে তার নাম ‘মার্গারিতা মামুন’। ঠিক এই নামেই রিদমিক জিমন্যাস্টিক্স তারকাকে চেনে বিশ্ববাসীও। রিতার রক্তে বইছে জিমন্যাস্টিক্স। ১৯৯৫ সালের ১নভেম্বর রাশিয়ার মস্কোতে জন্ম নেয়া রিতার বাবা আবদুল্লাহ আল মামুন প্রকৌশলী হলেও তার মা রাশিয়ান বংশোদ্ভুত এ্যানা একজন পেশাদার রিদমিক জিমন্যাস্টিক্স ছিলেন।

তাই ছোট বেলাতেই মায়ের কাছে জিমন্যাস্টিক্সে হাতেখড়ি রিতার। তার একটি ছোট ভাইও আছে। নাম ফিলিপস। বর্তমানে তারা সপরিবারে রাশিয়ার মস্কোতে বসবাস করছেন।

rita 02

রিতার বাবা আব্দুল্লাহ আল মামুনের বড় ভাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এএসএম খসরু জানান, তাদের বাবা মৃত আব্দুল খালেক ছিলেন একজন নামকরা পোশাক ব্যবসায়ী। মা মেহেরুন নিসা ছিলেন গৃহিনী। ২০১২ সালে মাও মারা যান।

তাদের সাত ভাই বোনের মধ্যে রিতার বাবা আবদুল্লাহ আল মামুন সবার ছোট। মেঝ ভাই আব্দুল মোতালিব জনতা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার ছিলেন। সেজো ভাই ডা. আব্দুল মান্নান নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার। বড় বোন বিনা জহুরা খাতুন পরিবার পরিকল্পণা অধিদপ্তরের চাুরি করতেন। সেজো বোন জিনাত আরা গৃহিনী। তিনি স্বামী সংসার নিয়ে ঢাকার রূপনগরে বসবাস করছেন। ছোট বোন ফজিলা আলমও গৃহিনী। তিনিও স্বামী সংসার নিয়ে ঢাকার আরামবাগে বসবাস করছেন।

রীতার চাচা এএসএম খসরু আরো জানান, রাশিয়ার রিদমিক জিমন্যাস্ট দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রিতা। বেশ কয়েক দফা বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভাঙা ভাঙা বাংলাও বলতে পারেন। ১৯৯৫ সালের ১ নভেম্বর জন্ম নেয়া রিতা সাত বছর বয়স থেকেই রিদমিক জিমন্যাস্টিক্স চর্চা শুরু করেন।

২০০৫ সাল থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচরণ তার। রিতা জুনিয়র হিসেবে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন। জুনিয়র পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। তবে এক পর্যায়ে রাশিয়ার হয়েই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রিতা।

rita 01

২০১১ সাল থেকেই রিতার খেলোয়াড়ি জীবনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসতে শুরু করে। ওই বছর মন্ট্রিল ওয়ার্ল্ডকাপে অংশ নিয়ে ১০৬.৯২৫ পয়েন্ট অর্জন করে অল-অ্যারাউন্ডে ব্রোঞ্জ পদক পান রিতা। আর বল ফাইনালে ২৭.০২৫ পয়েন্ট নিয়ে স্বর্ণ জিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

ওই বছর রাশিয়ার চ্যাম্পিয়নশিপে হুপ ও বলে অল-অ্যারাউন্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় দলে ডাক পড়ে যায় তার। উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী রিতা রিদমিক জিমন্যাটিক্সের ২০১৪ সালের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে সবমিলিয়ে রৌপ্য পদকজয়ী এবং ২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ডকাপ ফাইনালে ‘অল অ্যারাউন্ড’ চ্যাম্পিয়ন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রিতাকে। শুরু হয়ে যায় তার জয়যাত্রা। ২০১১ সালে তার ওয়াল্ড র‌্যাংকিং ছিল ২২। যা কিনা ২০১২ সালে হয়ে যায় ১৭।

কিন্তু ২০১৩ সালে এক লাফে ওয়াল্ড র‌্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে চলে আসেন তিনি। মস্কো গ্রাঁ প্রিঁতে স্বর্ন জয়ের মধ্য দিয়ে মৌসুম শুরু করেন। এরপর কাজান ইউনিভার্সিয়াড, সেন্ট পিটার্সবার্গ ওয়ার্ল্ডকাপ ফাইনাল, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে রিতা যোগ্যতার পরিচয় দেয়।

বর্তমানে রিতা রয়েছেন ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ের ২ নম্বরে। রিতার এগিয়ে চলার শানিত ফলা ঠিক একই রকম আছে। চলতি বছর জার্মানির স্টুটগার্টে আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় রিতা তিনটি স্বর্ণপদক, একটি সিলভার এবং একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।

বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আহমেদুর রহমান বাবলু রিতা সম্পর্কে জানান, ‘রিতাকে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল; কিন্তু সকল দিক বিবেচনা করে তিনি রাশিয়ার হয়েই খেলেছেন। আর এ ধরনের একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়কে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া দরকার তা আমাদের পক্ষে আসলেই সম্ভব ছিল না। তবে খুব সম্প্রতি রিতার সঙ্গে আর যোগাযোগও হয়নি আমাদের।’

ফেসবুকে, ইন্সটাগ্রামে সরব রিতা। তার সাফল্যের খবর নিয়মিত পাওয়া যাবে ফেসবুকে। ‘মার্গারিতা মামুন ফ্যানস’ নামক একটি পাতা রয়েছে তার। এছাড়া ইন্সটাগ্রাম এবং ভিকন্টাক্টিয়াতেও পাওয়া যাবে তাকে।

রাশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে কোন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশ নাগরিকের এটাই বড় সাফল্য। তাই রিতার এই অর্জনে সে দেশের বাংলাদেশ কমিউনিটির মানুষ খুবই খুশী। এমনকি ফেসবুক ও ইন্সটাগ্রামেও তারা রিতার প্রতিযোগিতার ছবি প্রকাশ করেছেন। একই সাথে রিতার বাবা প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুনের জন্ম স্থান রাজশাহীর দুর্গাপুরের ক্ষিদ্র কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দারাও ভাসছেন আনন্দের বন্যায়।

এদিকে, চলতি বছর ১৫ মে বাবা আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল রিতার। বাংলাদেশে আসার পর দুর্গাপুরের গ্রামের বাড়িতেও যাওয়ার কথা ছিল তার। তবে নানান ব্যস্ততার কারণে দেশে আসতে পারেনি রিতা। তবে খুব শিগগিরই বাংলাদেশে আসবে বলে জানিয়েছেন তার চাচা এএসএম খসরু।

এবার দেখুন মার্গারিতার কয়েকটি পারফরম্যান্সের ভিডিও

সূত্র এবং কৃতজ্ঞতাঃ বাংলামেইল