রাজশাহী কলেজ পড়ালেখায় এগিয়ে, সংকট ছাত্রাবাসের

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী কলেজ

উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সেরা কলেজের একটি রাজশাহী কলেজ। গত বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যা ঙ্কিংয়েও কলেজটি দেশসেরা হয়। শতভাগ ক্লাসে উপস্থিতির জন্য এই কলেজে রয়েছে পুরস্কারের ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। কারণ, রয়েছে ‘ডিজিটাল অ্যালার্ট সিস্টেম’।
কিন্তু লেখাপড়ায় এগিয়ে থাকলেও কলেজে ছাত্রছাত্রীদের আবাসন-সংকট প্রকট। কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। এর বিপরীতে ছাত্রদের জন্য ৫৬৫ সিটের দুটি ছাত্রাবাস এবং ছাত্রীদের জন্য ৫২৭ সিটের দুটি ছাত্রীনিবাস রয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা রয়েছে। বাকি শিক্ষার্থীদের অনেকে মেসে থাকেন, কেউবা বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া করেন।

আবাসিক এই সংকটের মধ্যে আবার মুসলিম ছাত্রাবাসে নিরাপত্তাহীনতায় ছাত্ররা থাকতে চান না। তবে উল্টো চিত্র হিন্দু ছাত্রাবাস ও দুটি ছাত্রীনিবাসে। সেখানে সিট পাওয়াই কঠিন। আবাসন-সংকট ছাড়াও রয়েছে গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সংকট।

প্রায় দেড় শ বছর আগে ১৮৭৩ সালে ছয়জন ছাত্র নিয়ে এই কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সরকারি এই কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক ছাড়াও ২৪টি বিভাগে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও স্নাতক (পাস) কোর্সে পড়ানো হয়। শিক্ষকের পদ রয়েছে ২৪৯টি। তবে সংযুক্তসহ বর্তমানে আছেন ২৬১ জন। এই হিসাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১: ১০৩।
মুসলিম ছাত্রাবাসের মূল সমস্যা নিরাপত্তাহীনতা

মুসলিম ছাত্রাবাসে সব মিলিয়ে ৫১২ জন ছাত্রের আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে। এই হলে বেশ কিছু বহিরাগতও থাকেন। গত এক বছরে বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হওয়ায় এখন সিট খালি থাকছে।
ছাত্রাবাসের বি-ব্লকে গিয়ে দেখা যায়, ৪ নম্বর কক্ষে তালা ঝুলছে। কক্ষটিতে কোনো ছাত্র থাকেন না। কয়েকজন ছাত্র বললেন, এই কক্ষে রাজনৈতিক সহিংসতার জেরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এরপর আর মেরামত করা হয়নি। ছাত্রও ওঠানো হয়নি। ছয় মাস ধরে তালা ঝুলছে।

পরে জানা গেল, ছাত্রাবাসের প্রায় ৩০ সিটের ‘গণরুমে’ কেউ থাকেন না। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ সিট খালি পড়ে আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কয়েক দিন আগে নিউ ব্লকের একজন ছাত্রকে ‘এফ ব্লকে’ ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁর ক্রেডিট কার্ড কেড়ে নিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়। এই অভিযোগে ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে দলীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
গত বছরের এপ্রিলে ছাত্রাবাসের ডি ব্লকের ১২ নম্বর কক্ষে ঢুকে একদল হামলাকারী ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সোহেলের ল্যাপটপ, মুঠোফোন, টাকা ও বিভিন্ন পরীক্ষার সনদ লুট করে। তারা একইভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শেষ বর্ষের ছাত্র সোলাইমানের মুঠোফোন, পরীক্ষার সনদ ও টাকা জোর করে নিয়ে চলে যায়। অভিযোগ উঠেছিল, এ ঘটনার পেছনেও ছাত্রলীগের নেতারা জড়িত ছিলেন।

ছাত্ররা জানান, নিরাপত্তা সমস্যার পাশাপাশি ছাত্রলীগের সব কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের কারণে তাঁরা বিড়ম্বনার শিকার হন। ক্লাস বাদ দিয়ে তাঁদের এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়। মিছিলে নেওয়ার জন্য সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি বেলা সাড়ে তিনটায় মুসলিম ছাত্রাবাস ও হিন্দু ছাত্রাবাসের গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ছাত্রলীগের রাজশাহী কলেজ শাখার আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ সিয়াম সংগঠনের তিন কর্মীকে বহিষ্কারের ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। মিছিলে যেতে বাধ্য করা, ছাত্রাবাসে তালা দেওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা তাঁর উপস্থিতিতে ঘটেনি।

কয়েকজন ছাত্র জানালেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণেই অনেকে এই ছাত্রাবাসে থাকতে চান না। খরচ বেশি হলেও বাইরে থাকেন।
ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কদের একজন প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা একাধিকবার নোটিশ দিয়েও ছাত্র পাচ্ছেন না।
নিরাপত্তা ছাড়াও মুসলিম ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের খাওয়া-দাওয়ার সমস্যাও প্রকট। আগে চলত পাঁচটি ডাইনিং, এখন চলে তিনটি। অনেক সময় খাবার না পেয়ে বাইরে খেতে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের।

তবে কলেজের অধ্যক্ষ হবিবুর রহমান গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, মুসলিম ছাত্রাবাস থেকে বহিরাগত লোকজনকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন নতুন ছাত্ররা উঠতে উৎসাহিত হবে। তাদের নিরাপত্তার আর কোনো সমস্যা হবে না।

উল্টো চিত্র অন্য ছাত্রাবাসে
মহারাণী হেমন্ত কুমারী হিন্দু ছাত্রাবাস ও দুটি ছাত্রীনিবাসে ঠিক উল্টো চিত্র। ৫৩ সিটের হিন্দু ছাত্রাবাসে ওঠার জন্য আসন বরাদ্দের পর ছাত্রদের ৮ থেকে ১০ মাস অপেক্ষা করতে হয়। হিন্দু ছাত্রাবাসের একজন ছাত্র বলেন, ছয় হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে ছাত্রাবাসের সিট বরাদ্দ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১০ মাস পরে সিটে উঠতে পারেন। ছাত্রীদের ৫২৭ সিটের দুটি ছাত্রীনিবাসে ৮৯৪ জন থাকেন। তার মধ্যে মাত্র ১৬০ জন শিক্ষার্থীর একক সিট রয়েছে। বাকি সিটগুলোর প্রতিটিতে দুজন করে থাকেন। রহমতুন্নেছা ছাত্রীনিবাসের একজন ছাত্রী বলেন, দুই সিটের একটি কক্ষে তাঁরা চারজন থাকেন।

গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির সংকট
শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, গবেষণাকাজ নিয়ে তাঁদের বসার মতো কোনো জায়গা নেই। সেই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও নেই। তাঁরা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও ৪৮ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এটি দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ। এখানে শিক্ষকতা করেছেন বিজ্ঞানী কুদরাত-ই-খুদা, আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক এনামুল হক, অধ্যাপক সুনীতি কুমার ভট্টাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ইতরাত হোসেন জুবেরীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। কিন্তু গবেষণার সুযোগ নেই।

খবরঃ প্রথম-আলো