রাজশাহী পলিটেকনিট ইনস্টিটিউট উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের উপাধ্যক্ষ আলী আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটা ও মেরামতে মোট অংকের আর্থিক অনিয়ম করেছেন তিনি। গোপনে কেটে নিয়েছেন ক্যাম্পাসের ৩০টির বেশি বড় বড় গাছ।

বিধি লঙ্ঘন করে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন ক্যাম্পাসে। দীর্ধদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আলী আকবর এসব অনিয়ম করেছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২১ জুলাই আলী আকবর উপাধ্যক্ষ হিসেবে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন। তবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দুই দফা দুই বছর ৬ মাস ২৭ দিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সর্বশেষ গত ২৭ মার্চ নতুন অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্বভার নেন। এর মাঝে প্রকৌশলী সামসুল আলম ও আব্দুর রেজ্জাক অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সল্প সময়ের জন্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফা অধ্যক্ষের দায়িত্বপালনের শেষ দিকে এসে মোটা অংকের আর্থিক অনিয়ম করেছেন অধ্যাপক্ষ আলী আকবর। এর মধ্যে আইজিডি-২ এর মাধ্যমে খেলার সামগ্রী কেনার নামে ৯৯ হাজার ৭১০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। খেলার সামগ্রী না কিনেই হিসাব শাখায় ওই বিল জমা দেয়া হয়েছে এ বছরের ৭ মার্চ। একই দিনই আরএফকিউ/ডিজি-৪ এর আওতায় কম্পিউটার সামগ্রী কেনার এক লাখ ৯৬ হাজার ৫৩০ টাকার বিল জমা দেয়া হয়।

এর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি জমা দেয়া হয় বিভিন্ন রাসায়নিক সামগ্রি কেনার ৯৪ হাজার ২০০ টাকার আরেকটি বিল। মালামাল না কিনেই জমা দেয়া হয়েছে এসব বিল। এছাড়া কম্পিউটার মেরামত না করেই মেরামতসহ ও অন্যান্য বিল বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৯৯ হাজার ২২৭ টাকা। এ বিল জমা দেয়া হয়েছে ২০১৬ সালের ৬ জুন।

অনিয়ম হয়েছে বিভিন্ন টেন্ডার কাজেও। টেন্ডারের একটি অংশ ঠিকাদারদের কাছ থেকে আদায় করতেন আলী আকবর। দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়ায় তাকে সহায়তা করতেন স্টোর ইনচার্জ আবু তারেক সিদ্দিকী। প্রতি অর্থ বছরেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

টেন্ডার ছাড়াও নগদ কেনাকাটায় হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের স্কীলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহেন্সন্টে প্রকল্পের (এসটিইপি) আওতায় কেনা হয়েছে বিপুল সংখ্যক টোনার। তবে সাড়ে ৪০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা দামের ভিসা টোনার কিনে দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা।

rajshahi

এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের কাছ থেকে ফাঁকা ভাউচার নিয়ে পরে সেগুলোয় নানান বিল তৈরি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে মোটা অর্থ। অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বিভিন্ন দিবস, সভা-সেমিনার আয়োজনের নামেও। এমনটি ঝোপঝাড় পরিষ্কারের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে বিপুল অর্থ।

অভিযোগ রয়েছে, ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বিভিন্ন সাইজের ৩০টি গাছ কেটে নিয়েছেন আলী আকবর। এর মধ্যে গত মাস দুয়েক আগে ইলেকট্রনিক পাওয়ার সপের সামনে ও পেছন থেকে কেটে নেয়া হয় পাঁচটি মেহগনি গাছ।

এছাড়া বিভিন্ন সময় মেশিন সপের সামনে, উড সপের সামনে, শহীদ মোনায়েম ছাত্রাবাসের পশ্চিম পাশে, অধ্যক্ষের বাস ভবনের সামনে, ছাত্রী নিবাসের ভেতর থেকে এবং ডরমেটরির সামনে থেকে কেটে নেয়া হয়েছে আরো ২৫টি গাছ।বিশেষ করে ইনস্টিটিউট ছুটির সময় কারা হয়েছে এসব গাছ। অধিকাংশ গাছ কাটা হয়েছে রাতে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে। সম্প্রতি গাছের গোড়া বালি দিয়ে ঢেকে দেয়ার সত্যতা মিলছে সরেজমিনে গিয়ে।

আর উপাধ্যক্ষের এ কাজে সহায়তা দিয়েছেন ক্যাম্পাসে পরিবার নিয়ে বসবাস করা শিক্ষক-কর্মচারীরা। বিভিন্ন সময় এদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে আলী আকবরের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টর (সপ) জাকির হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম, ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টর (টিআর) শাহারা আক্তার ও আফজাল হোসেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী চামেলী খাতুন, অফিস সহায়ক ওয়াহিদ সাদিক, বিদুভূষন সরকার, ওয়ার্কশপ খালাসী কামাল হোসেন রয়েছে আলী আকবরের সিন্ডিকেটে। এরা একক বাসা বরাদ্দ নিয়ে পরিবারসহ থাকছেন ক্যাম্পাসে। এদের কেউ কেউ আবার নিজেদের মত করে বাসায়ও বানিয়ে নিয়েছেন।

তবে পাওয়ার বিভাগের ইনস্ট্রাক্টর ও স্টোর ইনচার্জ আবু তারেক সিদ্দিকী এবং স্টোর কিপার তাপসি রাবেয়া এ সিন্ডিকেটের হোতা। উপাধ্যক্ষ আলী আকবর ওই দুজনকে নিয়েই পুরো চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে আবু তারেক সিদ্দিকী কেনাকাটা ও টেন্ডারের যাবতীয় দেখভাল করেন। কাগজপত্র তিনিই তৈরি করেন। হিসাবরক্ষককে না দিয়ে হিসাবও সংরক্ষণ করেন তিনি। কিছু হিসাব সংরক্ষণ করেন ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টর আমিনুল ইসলাম।

এছাড়া মালামাল স্টোরে জমা না হয়েও তাপসি রাবেয়া দেখান সেগুলো দেখান জমার খাতায়। পরে ব্যবহার হয়েছে মর্মে হিসেব দেয়া হয়। এ চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকাকালীন আলী আকবর অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেন পুরো ক্যাম্পাস। ফলে নতুন অধ্যক্ষ্য যোগদানের পর তাকে সরাতে নানান কৌশলে মাঠে নামের আলী আকবর। বিশেষ করে নানান অজুহাতে ক্ষমতাশীন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের দিয়ে চর্তুমুখী চাপ সৃষ্টি করেন অধ্যক্ষের উপর। প্রকৌশলী সামসুল আলম ও আব্দুর রেজ্জাক অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের পর এমন চাপেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

rajshahi

নয়া অধ্যক্ষ যোগদানের পর থেকে এমন চাপ আসতে শুরু করেছে বলে ক্যাম্পাসের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরই মধ্যে পহেলা বৈশাখ, শিক্ষার্থীদের ফরম পুরণ এবং পরীক্ষায় নকলে বাধা দেয়া নিয়ে অধ্যক্ষের মুখোমুখি ছাত্রলীগ। আর এর পেছনে উপাধ্যক্ষ আলী আকবরের হাত রয়েছে বলে জানা গেছে অনুসন্ধানে।

এদিকে, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ে গত ৬ এপ্রিল তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয় অধ্যক্ষ বরাবর। চাওয়া হয় ২০১২-২০১৩ অর্থ বছর থেকে ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছর পর্যন্ত যাবতীয় মালামাল ক্রয়, মেরামত, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং সভা-সেমিনার আয়োজনের ব্যয়। ওই দিনই অধ্যক্ষ তথ্য প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ভারপ্রাপ্ত তথ্যপ্রদানকারী কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জ আবু তারেক সিদ্দিকীকে দায়িত্বভার দেন। কিন্তু আবেদনের এক মাসেও মেলেনি তথ্য। মাঝে কয়েক দফা গিয়েও সাড়া মেলেনি।

অভিযুক্তদের তালিকায় থাকায় তথ্য প্রদানে গড়িমসি কিনা জানতে চাইলে বিষয়টি অস্বীকার করেন ভারপ্রাপ্ত তথ্যপ্রদানকারী কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জ আবু তারেক সিদ্দিকী।

তিনি দাবি করেন, আবেদন গ্রহণের পরদিন থেকে সাত দিনের প্রশিক্ষণে ঢাকায় ছিলেন তিনি। এখন তারা অধিদফতরের অনুমতির জন্য চিঠি দেয়ার প্রস্ততি নিচ্ছেন। ওই চিঠির জবাব পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন তিনি। তবে তার মাধ্যমে কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে সব কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে বলে জানান।

যোগাযোগ করা হলে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন স্টোর কিপার তাপসি রাবেনা। এমনটি হয়ে থাকলে তা উপাধ্যক্ষ আলী আকবর বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।

তবে সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেন উপাধ্যক্ষ আলী আকবর। তিনি বলেন, বিধি মেনেই ক্রয়, টেন্ডার ও মেরামত কাজ হয়েছে। আলাদা কমিটি রয়েছে বিষয়গুলো দেখভালে। এনিয়ে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্বপালন করছেন।

তবে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন অধ্যক্ষ প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিষয়টি তারা অধিদফতরে জানাবেন। প্রয়োজনে তদন্ত হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তথ্য দিতে গড়িমসি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তথ্য দেয়ার আগে অধিদফতরের অনুমতি নিতে হবে। চিঠি পাঠিয়ে অনুমতি নেয়ার জন্য ভারপ্রাপ্ত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার গাফেলতি থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

খবরঃ জাগোনিউজ২৪

7 thoughts on “রাজশাহী পলিটেকনিট ইনস্টিটিউট উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

Comments are closed.