রাজশাহী মহানগরীর বিষাক্ত তরল বর্জ্যের প্রতিক্রিয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বারনই নদী পাড়ের লাখ লাখ মানুষ

পবা রাজশাহী

রাজশাহী মহানগরীর বিষাক্ত তরল বর্জ্যের প্রতিক্রিয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন নওহাটা থেকে পুঠিয়া পর্যন্ত  বারনই নদী পাড়ের লাখ লাখ মানুষ। নদীর পানিতে নেমে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন চর্মরোগে।

জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর তরল বর্জ্য বর্তমানে সিটি পশু হাটের পাশের ড্রেন দিয়ে দুয়ারী খালে এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপৰ ভবনের পেছনে পবা গাঙ্গপাড়ার গাঙ্গদিয়ে বায়া বাজারের পাশের খালে ফেলা হচ্ছে। যা পরবর্তীতে নওহাটায় বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই বিষাক্ত পানির মধ্যে রয়েছে শহরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য, বিসিকসহ অন্যান্য মিল-কারখানার কেমিক্যাল বর্জ্য, নগরীর পয়ঃনিষ্কাশনের বিষাক্ত বর্জ্য। এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থযুক্ত পানি প্রতিনিয়তই পবা উপজেলার কুজকাই খাল, পাকুড়িয়া, দুয়ারী ক্যানেল, বায়া-মহনন্দখালী খাল হয়ে বারানই নদীতে এসে পড়ছে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার বিষাক্ত পানিতে ৰতিতে পড়েছে পবা উপজেলার কয়েকটি নদী-খাল-বিল। পবার নওহাটা থেকে শুর্ব করে ভাটিতে মোহনপুর, দুর্গাপুর, বাগমারা, পুঠিয়া উপজেলার বারনই নদী পাড়ের গ্রামগুলোর লাখ লাখ মানুষ পানিতে নেমে বা  নদীতে গোসল করে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন ডায়রিয়া, দাদ, চুলকানী, পাঁচড়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগে। জর্বরি ভিত্তিতে এই বিষাক্ত তরল বর্জ্যের প্রবাহ রোধে যুতসই পদৰেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশবিদসহ সকলেই।

নওহাটার বারনই নদীপাড়ের মধুসুদনপুর গ্রামের ইব্রাহিম আলী (৫৫) জানালেন, বারনই নদী ছাড়া তাদের গোসল করার বিকল্প জায়গা নাই। আগে নদীর পানি ভালো ছিল। এখন কয়েক বছর থেকে নদীর পানিতে শহরের ময়লা পানি এসে পড়ছে। এতে নদীতে গোসল করলে গায়ে চুলকানি বের হচ্ছে। যা সহজে ভালো হচ্ছে না। নওহাটার বারনই নদীপাড়ের পূর্ব পুঠিয়াপাড়ার সাইদুর রহমানের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (১৮) ও পশ্চিম পুঠিয়াপাড়ার মিনহাজের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন (৩২) জানান, তারা নিয়মিত বারনই নদীতে গোসল করেন। এখন তাদের সর্ব শরীরে চুলকানি বের হয়েছে। নওহাটা হলদার পাড়ার জেলে সমপ্রদায়ের যুবরাজ হলদার জানান, বারনই নদীসহ উন্মুক্ত খালবিলে মাছ মারা আমাদের পৈত্রিক পেশা। আগে শুধু বর্ষার সময়ে বারনই নদী ও সংযোগ খালে মাছ ধরে গোটা বছরের রোজগার হয়ে যেত। কিন্তু কয়েকবছর ধরে শহরের বিষাক্ত পানি নদী-নালা, খাল-বিলে ঢুকে পড়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। সরকারিভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেও বিষাক্ত পানির কারণে তা সাথে সাথে মরে যায়। এই বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে ভরা মৌসুমেই নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি দুয়ারী ও মহনন্দখালী খালের পানি শরীরে লাগলেই সেখানে ঘা-চুলকানি হয়ে যায়। অথচ ৮/১০ বছর আগে এই খাল দু’টিতে ধরা মাছ বিক্রি করে তাদের সংসার চলতো। শরীর সুস্থও থাকতো।

মধুসুদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে কথা হয় সেখানকার সি এইচ সি পি নুর আলমের সাথে। তিনি জানালেন, নদীপাড়ের গ্রামগুলোর অনেকেই তার ক্লিনিকে ডায়রিয়া, দাদ, চুলকানি, পঁচড়ার চিকিৎসা নিতে আসে। নদীতে গোসলের কারণে তারা এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে তারা জানায়।

পবা উপজেলার সেনেটারী ইন্সপেক্টর জালাল আহম্মেদ বলেন, নগরীর তরল বর্জ্যের কারণে পবার বায়া ও দুয়ারি দু’টি খালসহ বারনই নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। এই দুষিত পানির কারণে নদীপাড়ের মানুষজন আক্রান্ত হচ্ছেন ডায়রিয়া-চুলকানিসহ বিভিন্ন অসুখে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপৰকে জানিয়েছেন বলে জানান।

হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, সিটি কর্পোরেশন নগরীর তরল বর্জ্য পবার যে দুটি খালে ফেলছে সে দুটির মধ্যে বায়া এলাকাটির নাম বারাহী নদী এবং দুয়ারীটির নাম বিলুপ্ত নবগঙ্গা নদী। এই দুটি নদী বেয়ে নগরীর তরল বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নওহাটার বারনই নদীতে। এই দুষিত বর্জ্যে মারা যাচ্ছে মাছ, মানুষজন আক্রান্ত হচ্ছেন নানা অসুখে, সেই সাথে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশের ভারসাম্য রৰায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার উচিত নগরীর তরল বর্জ্য পরিশোধন করে নদীতে ফেলা। তা না হলে আগামীতে আরো বড় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল জানান, ২০১৬ সালে শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের জগদিশপুর নামক স্থানে বারনই নদীতে খরা মৌসুমে পানি ধরে রাখার জন্য বি.এম.ডি.এ. একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে। রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে খরা মৌসুমে বারনই ও ফকিরনি নদীর প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উজানে পর্যাপ্ত পানি থাকে। এই পানি ব্যবহার করে নদী পাড়ের মানুষ চাষাবাদসহ সকল কর্মকান্ড করে উপকৃত হচ্ছে। সিটি কর্পারেশানের তরল বর্জ্য নদীতে পানির সাথে মিশ্রিত হওয়ায় পানি দূষিত হচ্ছে। রাজশাহী সিটি কর্পারেশন এলাকার তরল বর্জ্য সরাসরি বারনই নদীতে ফেলার কারণে বারনই নদীর প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাটির দিকে দূষিত হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশের পানি নষ্ট হয়ে মাছ মারা যাচ্ছে, নদীর তলদেশে বর্জ্য জমে তলদেশ ভরাট হচ্ছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে। পানি ব্যবহারের অনুপোযোগী হওয়ায় মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারছে না। নদীর পানি ব্যবহার করে নানা ধরনের চর্ম রোগসহ ডায়রিয়া, কলেরার মত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নদী পাড়ের মানুষ। নদীর উপর নির্ভরশীল প্রায় ৩ লৰাধিক মানুষ ৰতির শিকার হচ্ছে। পুঠিয়া, নলডাঙ্গা, দূর্গাপুর, বাগমারা ও পবা উপজেলার নদী পাড়ের লৰ্য লৰ্য মানুষকে ৰতির হাত থেকে রৰাসহ বারনই নদী রৰার্থে রাজশাহী সিটি কর্পারেশানের তরল বর্জ্য সরাসরি বারনই নদীতে না ফেলার জন্য এবং এ বিষয়ে সকলকে এগিয়ে আসার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।

এ ব্যাপারে ওয়াসা রাজশাহীর সচিব সাদেকুল ইসলাম এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, নগরীর তরল বর্জ্য শোধনের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। তবে তারা নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন। এটি হলে তরল বর্জের সমস্যা অনেকটাই কমবে।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের জন্য প্রস্তাবনা করা আছে। ২/৩ বছরের মধ্যে এটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটি হলে আর সমস্যা থাকবে না।

খবরঃ sonali sangbad