রাজশাহী সিটি: অভিভাবকহীন সিটি করপোরেশন, মেয়র সরাতে মামলা, বসাতেও মামলা

রাজশাহী

রাজশাহীর নির্বাচিত মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সরানো হয় পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ চন্দ্র সরকার হত্যা মামলার রেশ ধরে। এরপর তিন প্যানেল মেয়রও দায়িত্ব হারান মামলার অভিযোগপত্র সূত্রে। শেষে দায়িত্ব পান সরকারদলীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিযাম উল আযীম। মেয়র প্যানেলের বাইরে থাকা নিযামকে বসাতেও ভূমিকা রাখে মামলা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোসাদ্দেক হোসেনসহ সিটি করপোরেশনের ২১ জন কাউন্সিলর অসংখ্য ফৌজদারি মামলার আসামি। তাঁরা এখন ব্যস্ত এসব মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশনের প্রত্যাশিত উন্নয়ন তো হচ্ছেই না, উল্টো নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়েছে নয় শ থেকে হাজার গুণ।

ইতিমধ্যে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান প্রথম আলোকে বলেন, বর্ধিত ট্যাক্স, নাজুক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও মশার যন্ত্রণায় মধ্যে নগরবাসী হাবুডুবু খাচ্ছে। নির্বাচিত মেয়র না থাকায় এসব বিষয়ে কারও তেমন খেয়াল নেই।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত নারী ও পুরুষ মিলে ৪০ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। এর মধ্যে বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-সমর্থক কাউন্সিলরের সংখ্যা ২২। একজন ছাড়া সবার নামেই কম-বেশি মামলা আছে।
২০১৫ সালের ৭ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ মেয়র মোসাদ্দেক হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ সরকার হত্যা ও বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহরিয়ার আলমের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাসহ পাঁচটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার পর মন্ত্রণালয় তাঁর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচিত মেয়রকে বরখাস্ত করা এবং তাঁর জায়গায় আওয়ামী লীগদলীয় কাউন্সিলরকে দায়িত্ব দেওয়ার নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। এতে স্থানীয় ক্ষমতাসীন মহলের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা আছে। মেয়রকে বরখাস্ত করার পরের পদক্ষেপগুলোয় তা দৃশ্যমান হয়।

মেয়র বরখাস্ত হওয়ার পর নিয়মানুযায়ী দায়িত্ব পাওয়ার কথা মেয়র প্যানেলে থাকা তিন কাউন্সিলরের যে কেউ। কিন্তু তাঁরা কেউই দায়িত্ব পাননি। তাঁরা তিনজনই বিএনপি-সমর্থক। এর মধ্যে আনোয়ারুল আমিন আযম ও নুরুজ্জামান বাদ পড়েন নিয়মমাফিক। কারণ, তাঁরাও বরখাস্ত মেয়রের সঙ্গে একই মামলার আসামি। মেয়র প্যানেলের ৩ নম্বরে থাকা কাউন্সিলর নুরুন্নাহার বেগমের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তাঁকেও দূরে রাখা হয় মামলার ফাঁদে ফেলে। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হওয়া ঠেকাতে তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো বিস্ফোরক ও গাড়ি ভাঙচুরের তিনটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অথচ এ তিন মামলার কোনোটির এজাহারেই নুরুন্নাহারের নাম ছিল না।

শহরের বোয়ালিয়া থানার এ রকম দুটি মামলার এজাহার ও আদালতে দাখিল করা নথিপত্রে দেখা যায়, কাদিরগঞ্জ মহিলা কলেজ এলাকায় ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ছাত্রদলের একটি মিছিল থেকে কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। এ ঘটনায় পুলিশ সে দিনই ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি মামলা করে। তাতে নুরুন্নাহারের নাম নেই। ঘটনার সাড়ে চার মাস পর পুলিশ নুরুন্নাহারের নাম যুক্ত করে ১৬ মে এ মামলার অভিযোগপত্র দেয়, যখন নুরুন্নাহার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে আলোচনায় আসেন। পুলিশের অভিযোগপত্রে নুরুন্নাহারের পরিচয় হিসেবে ৯ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ‘প্যানেল মেয়র-৩’ বলে উল্লেখ আছে।

ওই বছরের ১ মার্চ শহরের শিরোইল বাসস্ট্যান্ডে হানিফ পরিবহনের বাস ভাঙচুরের ঘটনার মামলায়ও নুরুন্নাহারের নাম ছিল না। আড়াই মাস পর অভিযোগপত্রে তাঁর নাম যুক্ত করা হয়। এই অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের ১৫ দিন পর নিযাম উল আযীমকে মেয়রের দায়িত্ব দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
নুরুন্নাহারের আইনজীবী রইসুল ইসলাম বলেন, মেয়র মোসাদ্দেক হোসেনকে বরখাস্ত করার পর নুরুন্নাহারের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তিনি যাতে দায়িত্ব নিতে না পারেন, সে জন্য তাঁর বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

অবশ্য ভারপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম উল আযীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনে আছে বরখাস্ত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে মেয়রকে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে। বুলবুল সে কাজটি করেননি। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় আমাকে দায়িত্ব দেয়।’
বরখাস্ত মেয়র মোসাদ্দেক সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একটি প্রশাসনিক ক্যুর মাধ্যমে তাদের এক নেতাকে মেয়রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান প্রকৌশলী জড়িত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনি কথাটি ঠিক বলেননি। আমার মতো ৫০ জন প্রধান প্রকৌশলী এক হলেও সরকারি আইনের বাইরে কাউকে কেউ মেয়র পদে বসাতে পারবেন না।’

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ফৌজদারি অপরাধের মামলায় অভিযোগ থাকায় মোসাদ্দেক হোসেনের সময়ে করা মেয়র প্যানেল বাতিল হয়। এরপর জেলা প্রশাসন নতুন করে তিনজনের নাম পাঠায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। এ তালিকায় ছিলেন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর কামরুজ্জামান, নিযাম উল আযীম ও মুসলিমা বেগম। দায়িত্ব পান প্যানেলের দ্বিতীয়জন নিযাম উল আযীম।

ভারপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের নিকটাত্মীয়। কথা বলে জানা গেছে, নিযাম একসময় ছাত্রদল করতেন। মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর সময় তিনি বিএনপির সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। খায়রুজ্জামান মেয়র হওয়ার পর দল বদলে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুজ্জামান লিটন প্রথম আলোকে বলেন, আত্মীয়তার বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই তার রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের কাউকে ভাববে না, এখানে সেটাই হয়েছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনকে ৪৭ হাজার ৩৩২ ভোটে হারিয়ে মেয়র হন মোসাদ্দেক হোসেন। এর তিন মাস পর ১৭ সেপ্টেম্বর মোসাদ্দেক দায়িত্ব নেন। কাগজে-কলমে তিনি মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন ২০ মাসের মতো। এর মধ্যে পুলিশ হত্যা মামলার পর আত্মগোপনে কাটিয়েছেন তিন মাসের বেশি। দুই মেয়াদে জেলে কাটান সাড়ে তিন মাস। এরপর ২০১৫ সালের ৭ মে থেকে বরখাস্ত হয়ে আছেন ২১ মাস।

মোসাদ্দেক হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ২৩। এর মধ্যে দ্রুত বিচার আইনের এক মামলায় খালাস পেয়েছেন। বাকি ২২টি মামলার সব কটিতেই আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বিস্ফোরক আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটটি মামলা আছে। এ ছাড়া পুলিশ হত্যা, পুলিশের ওপর হামলা, আইনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং জানমালের ক্ষতিসাধনের মামলা আছে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ সরকার হত্যা মামলায় আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের তারিখ ধার্য আছে। অন্যগুলোরও বিচারকাজ চলছে। মামলাগুলোর অধিকাংশ ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে বিএনপির নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবিতে সহিংস আন্দোলনের সময়কার।

সব মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে গত ১ জুন মোসাদ্দেক হোসেন কারামুক্ত হয়েছেন। এখনো দায়িত্ব পাননি। এর নেপথ্যে রাজশাহীর আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার হাত আছে বলে জানান তিনি। অবশ্য বরখাস্ত আদেশের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, মেয়রকে বরখাস্তের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় চেম্বার আদালত স্থগিত করেননি। এরপরও মেয়রকে দায়িত্ব দিচ্ছে না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

খবরঃ প্রথম-আলো