রামেক শিক্ষার্থীর শেষ কথা ’ঝড়েই যদি যাবি তবে ফুটেছিলি কেন’

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ

‘প্রিয় মনি প্রস্ফুটিত ফুলে পরিনত হবার আগেই তুই ঝরে গেলি। আর ঝড়েই যদি যাবি তবে ফুটেছিলি কেন? আর ফুটেইছিলি যদি তবে সৌরভ বিলিয়ে চলে গেলি কেন? আজকে আমার দেখা সবকিছুই আগের মত আছে…। শুধু মাত্র একটা জিনিস আগের মত নেই। সেটা তুই।

এমন একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে দিয়েই ওপারে চলে গেল রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী মিল্টন। আত্মহত্যার ৩ দিন আগে তিনি তার এই স্ট্যাটাস দিয়ে পোস্ট করেন।

তার শিক্ষক ও সহপাঠিরা ক্যম্পাসলাইভকে জানান, আহসান হাবীব মিল্টন হতে পারতো একজন বিখ্যাত ডেন্টিস্ট। দেশে বিদেশে তার নাম ছড়িয়ে যেত হয়তো একসময়। ডা. মিল্টন নামেই হয়তো চিনতো তাকে সবাই। কিন্তু না… এর কোন কিছুই ঘটবেনা আর তার জীবনে।

তার নাম, ডাক, খ্যাতি ও যশের উর্ধে চলে গেছেন মিল্টন। প্রেমের বলি হয়ে গত শনিবার দুপুরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। চলে গেছে ভালবাসাহীন অনন্ত এক সময়ের গহব্বরে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া সেই ছেলেটি একরাশ স্বপ্ন নিয়ে মাত্র তিন মাস আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২৭ তম বিডিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। আহসান হাবীব মিল্টন নামের সেই শিক্ষার্থী থাকতেন রামেক এর শহীদ পিংকু হোস্টেলের ১২২ নং রুমে।

status

গত শনিবার হোস্টেলের নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে জাগতিক যন্ত্রনা থেকে মুক্তি খুঁজে নিয়েছেন তিনি। মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে ফেসবুকে ছিল তার শেষ স্ট্যাটাস। তার প্রেমিকা রিমিকে নিয়ে ছিল তার প্রাণভরা স্বপ্ন। তাকে নিয়ে ঘর বাধার ছিল মিল্টনের। কিন্তু রিমির বাবা তাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ায় সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে গেছে। সব কিছু যেন হয়ে গেল এলামেলো।

এ কারণেই মিল্টন ওই প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন,”প্রিয় মনি, প্রস্ফুটিত ফুলে পরিনত হবার আগেই তুই ঝরে গেলি, আর ঝড়েই যদি যাবি তবে ফুটেছিলি কেন??? আর ফুটেইছিলি যদি তবে সৌরভ বিলিয়ে চলে গেলি কেন?? আজকে আমার দেখা সবকিছুই আগের মত আছে, শুধু মাত্র একটা জিনিস আগের মত নেই্‌, তুই।

তোকে নিয়ে সেই হাতিরঝিলে হাতেহাত রেখে হাটার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তা আজ আর হলো কোথায়!!! শেষবারের মত তোকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে,’তুই কি সত্যি ই সুখে আছিস??’ আমার জীবনের সব যোগফল শুণ্য হয়ে গেল। ভাল থাকিস।”

মিল্টনের সহপাঠীরা জানায়, একসাথে পড়ালেখা সূত্রে ‘রিমি’ নামে এক মেয়ের সাথে ভালোবাসা আদান প্রদান হয়েছিল মিল্টনের। পারিবারিক ভাবে বিয়ের কথাও হয়েছিল। কিন্তু গত ২৫ মার্চ হঠাৎ করে মেয়ের পরিবার মেয়েটিকে জোড় করে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয়। খবর পেয়ে কুড়িগ্রামে তার গ্রামের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল মিল্টন। হোস্টেলে ফিরে আসে গত শুক্রবার সন্ধায়। হোস্টেলে এসে কান্নাকাটি করছিল। রুমে মন মরা হয়ে বসে থাকতো। তারপর শনিবার সকালে বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

সহপাঠী বন্ধুর এ মৃত্যুর শোক কিছুতেই যেন ভুলতে পারছেনা তার সাথে ভর্তি হওয়া একসাথে থাকা শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার পাশের রুমের একজন বলছিল, “সেদিন ক্লাসে যায়নি মিল্টন। আমি একটা ক্লাস করে আর ক্লাস না থাকায় রুমে ফিরে আসি তখন ও রুমেই ছিল।

‘অমি’ নামের আরেকজন বন্ধুর সাথে। আমি আসার পরও ‘অমি’কে বলে আমিতো বোনের বাড়ি যাবো। তাই ড্রেস চেঞ্জ করবো তুই একটু পাশের রুমে যা। ‘অমি’ আমার সাথে আমার রুমে বসে গল্প করছিল। ৩০ মিনিট পরেও রুম থেকে বের না হওয়ায় আমরা গিয়ে মিল্টনের রুমে ধাক্কা দেই। অনেক ডাকাডাকির পরেও সারা না পেয়ে জানালার কাচ দিয়ে উকি দিয়ে তাকে ঝুলতে দেখি। পড়ে দরজা ভেঙ্গে বের করা হয়।

রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মির্জা কামাল হোসেন ক্যম্পাসলাইভকে বলেন,দরজা ভাঙার আওয়াজ পেয়ে আমি নিচে যাই। ততক্ষনে দরজা ভাঙ্গা হয়ে গেছে। আমরা মিল্টনকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাই। পরবর্তীতে তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩২ নং ওয়ার্ডে নিয়ে যাই। সেখান থেকে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। কিন্তু সম্ভবত সে আগেই মারা গিয়েছিল।

মিল্টনের আরেক সহপাঠী শুভ ক্যম্পাসলাইভকে বলেন, খুব হাসিখুশি আর চঞ্চল ছিল সে। তার মনে যে এত কষ্ট ছিল তা দেখে কখনো বুঝতে পরিনি। আমরা ওর রিলেশনের কথা জানতাম কিন্তু ওর কষ্ট বাড়বে তাই কিছু জিজ্ঞেস করিনি। যদি সব শেয়ার করতাম ও হয়তো এত কষ্ট পেয়ে এই পথ বেছে নিতোনা।

রাশেদ নামে তার আরো একজন সহপাঠী ক্যম্পাসলাইভকে বলেন, অসম্ভব ভাল একজন বন্ধু ছিল। আগে যদি জানতাম হয়তো তাকে চোখে চোখে রাখতাম।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ডা. নওশাদ আলী ক্যম্পাসলাইভকে বলেন, এমন ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। আমরা স্পেশাল মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু সফল হইনি। তারপর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে জানাজার নামাজ শেষে মেডিকেলের নিজস্ব মাইক্রোবাসে মিল্টনের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। তার পরিবার থেকে ঘনিষ্ট কেউ মরদেহ নিতে আসেনি। শুনেছি সম্পর্কের জেরে সে আত্মহত্যা করেছে। তবে তদন্ত রিপোর্ট বের হলে নির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।”

ক্যাম্পাসলাইভ-http://www.campuslive24.com/campus.158420.live24/