রেলওয়ের বিষফোড়া অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং

রাজশাহী

দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অন্তত এক হাজার ৯৮টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে। অনুমোদন থাকলেও গেটম্যান ছাড়াই চলছে ৭১৪টি লেভেল ক্রসিং। কেবল সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙিয়েই দায় সেরেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

কোনো ধরনের সতর্কবার্তা নেই ৩৩৯ লেভেল ক্রসিংয়ে। এগুলোর বৈধতাও নেই রেলওয়ের। গত ১৫ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এমন একটি লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বর-কনেসহ ১০ মাইক্রোবাসযাত্রী নিহত হন। আহত হন আরও তিনজন।

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে পড়া বিয়ের মাইক্রোবাসটিকে রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া পদ্মা এক্সপ্রেস ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এই দুর্ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পশ্চিমাঞ্চল রেল।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলীর দফতর জানিয়েছে, পশ্চিম রেলের আওতায় লেভেল ক্রসিং রয়েছে সব মিলিয়ে ২ হাজার ৩৬৫টি। এর মধ্যে ট্রাফিক বিভাগের আওতায় পরিচালিত লেভেল ক্রসিং সংখ্যা ২৯৮। এগুলোর সবগুলোই অনুমোদিত এবং গেটম্যান রয়েছে।

অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দেখভাল করছে এই অঞ্চলের ২ হাজার ৬৭ লেভেল ক্রসিং। এর মধ্যে এক হাজার ৩৪টি অনুমোদিত। যার মধ্যে গেটম্যান আছে মাত্র ৩১৯টিতে। আর গেটম্যান ছাড়াই চলছে ৭১৪টি লেভেল ক্রসিং। এগুলোতে কেবল সর্তকতামূলক সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে অবৈধভাবে খোলা হয়েছে ৩৩৯টি লেভেল ক্রসিং।

সূত্র আরও বলছে, অনুমোদিত এবং গেটম্যান রয়েছে এমন লেভেল ক্রসিংগুলোর সবগুলোই সুরক্ষিত। গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিংয়ে পর্যায়ক্রমে দেয়া হচ্ছে গেটম্যান। অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোর মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া চলমান।

ট্রাফিক বিভাগের ২৯৮ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান পদ রয়েছে ১৭৩টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত ১২৩ জন। আরও ২৮৭ জন অস্থায়ী কর্মী (টিএলআর) দায়িত্ব পালন করছেন এসব লেভেল ক্রসিংয়ে।

আর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৩১৯ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যানের মঞ্জুরীকৃত পদ ১৮৯টি। যেখানে কর্মরত রয়েছেন ৯৭ জন। বাকি ৯২ পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। এখানেও ২৯২ জন টিএলআর দায়িত্ব পালন করছেন।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (পিঅ্যান্ডডি) মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, অন্তত অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংগুলো সুরক্ষায় কাজ করছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে অবৈধ এবং গেটম্যান নেই এমন লেভেল ক্রসিংও আসছে সুরক্ষার আওতায়।

এরই অংশ হিসেবে লেভেল ক্রসিং গেট পুনর্বাসন ও মানোন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে ২০১৫ সাল থেকে। এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে ৩২৬টি লেভেল ক্রসিং। অনুমোদিত ৬২৯ পদের বিপরীতে এইখাতে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৮১৫ জন।

এই প্রকল্পে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৫৩টি অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের। এছাড়া ২০৪টি লেভেল ক্রসিংয়ে দেয়া হয়েছে গেটম্যান। প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রত্যেক লেভেল ক্রসিংয়ের মানোন্নয়ন করা হয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, সর্বশেষ সিরাজগঞ্জের ওই দুর্ঘটনার প্রতিবেদন এখনও তারা হাতে পাননি। তবে যতটুকু জানতে পেরেছেন ওই লেভেল ক্রসিংটি অবৈধ ছিল। তাছাড়া চারপাশ ফাঁকা হওয়ায় ট্রেন আসার বিষয়টি দূর থেকেই মাইক্রোবাস চালকের নজরে আসার কথা। কিন্তু তারপরও মাইক্রোবাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে।

তিনি বলেন, অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটে না বললেই চলে। দুর্ঘটনাগুলো ঘটে সাধারণত অবৈধ গেটগুলোতে। অসচেতনতা থেকেই এইসব দুর্ঘটনা ঘটে। এনিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই।

লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান টেনে পশ্চিমাঞ্চল রেলের এই কর্মকর্তা বলেন, উল্লাপাড়ার এই দুর্ঘটনার আগের ছয় মাসে মাত্র তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে লেভেল ক্রসিংয়ে। এর মধ্যে দুটি দুর্ঘটনা ঘটেছে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে।

তবে এসব দুর্ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ কিছুতেই নিজেদের দায় এড়াতে পারে না বলে জানিয়েছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। তিনি বলেন, রেলে লুটপাটের জন্য বড়বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু জানমাল রক্ষায় লেভেল ক্রসিং সুরক্ষায় প্রকল্প হয় না। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমন দুর্ঘটনায় অবশ্যই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে দায় নিতে হবে।

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঝুঁকি প্রসঙ্গে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খোন্দকার শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কিছু কিছু লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান নেই। অস্থায়ী লোকবল নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া লোকজন ইচ্ছেমতো লেভেল ক্রসিং খুলে চলাচল করছেন। অসচেতনতা থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে। এনিয়ে সবার সচেতন হওয়া জরুরি।

খবর কৃতজ্ঞতাঃ জাগোনিউজ২৪