শিক্ষকের ‘আত্মহত্যায়’ কাঁদছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাসের খবর রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

‘আপনি তো অনেক যত্ন করেই রিপোর্টিং শেখাতেন ম্যাম; তারপরও কেন আজ আপনার রিপোর্ট লিখতে গিয়ে হাতটা কাঁপছিল, কেন সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল? রিপোর্টিং শিখিয়ে কী আজ সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা নিলেন আপনি? … কেন শিখিয়ে গেলেন না ‘মানসিক চাপ’ কতটা হলে একজন মানুষ ‘আত্মহত্যা’ করতে পারে?’

এভাবেই নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখে নিজের মনের নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন অধ্যাপক আকতার জাহান জলির এক শিক্ষার্থী মাহবুব আলম। নিজেরদের ফেসবুক ওয়ালে ছবি পোস্ট করে লিখেছেন সাবেক, বর্তমান শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের অনেকে তাকে নিয়ে দিয়েছেন হৃদয় বিদারক লেখা।

আকতার জাহানের এক সহকর্মী সহযোগী অধ্যাপক আ. আল মামুন লিখেছেন, ‘জলি আপা কিছুদিন আগে আমাদেরকে লেবু গাছের কলম উপহার দিয়ে গেছেন, বারান্দায় রাখার জন্য। সে গাছে ফুল ফুটবে, ফল ধরবে। অথচ উনি চলে গেলেন!!’

ডি আরাফানিয়া নামের তার এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘চুউউউপ! কথা বলিস না !!! ম্যাম ঘুমুচ্ছে! এতদিন বাদে শান্তিতে ঘুমুচ্ছে আজ। আজ থেকে নেই কোন ফিজিক্যাল প্রেশার, নেই কোন মেন্টাল প্রেশার!’

আইয়ুব আল আমিন নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘ম্যাম, কোথায় চলে গেলেন আপনি!!!! কে আর ভালবাসবে আমাকে আপনার মত??????’

রাশেদ রিন্টু নামে তার বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘জানেন ম্যাম, আমি এর আগে কখনো সুইসাইড নোট দেখিনি। বেশ তো হলো, আপনি নিজে দেখায় দিয়ে গেলেন।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘জানেন? আাপনার ওই লেখাটা দিয়ে আমি নিউজ লিখেছি। লেখাটা বোধহয় খুব দামি ছিলো। সবাই ওই লেখার একটা কপি চায়। নিজেকে উৎসর্গ করে ক্যান, এমনি এরকম একটা লেখা লিখে নিউজ লেখা শেখালেই পারতেন। তাইলে কোশ্চেন গুলোর অ্যানসার জেনে নিতাম। অ্যানসার জানেন না বলে, পালিয়ে গেলেন?’

‘ব্যাচের পর ব্যাচে কতশত জনকে আপনি সংবাদের ‘ইনট্রো’ লেখা শিখিয়েছেন; যত্ন নিয়ে বোঝাতেন শিরোনামের গুরুত্ব। বুঝতে পারছেন কী ম্যামÑআপনার সেই ছাত্রদের আজ আপনাকে নিয়েই করুণ ‘ইনট্রো’ লিখতে হচ্ছে ? বার বার হাত কাঁপছে আপনাকে নিয়ে শিরোনাম করতে …?’ এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন দেবাশিষ রায় নামের আকতার জাহানের সাবেক এক শিক্ষার্থী।

শ্রেণিকক্ষে আকতার জাহানের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করে হাসান আদিব লিখেছেন ‘চার বছর ক্লাস করেছি উনার। শ্রেণীকক্ষে বসে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম! সব ছাত্রীদের তো বটেই, ছাত্রদেরও যে কারও ব্যক্তিগত সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ম্যাডাম। সমাধান করার চেষ্টা করতেন, মানসিকভাবে তাদেরকে সাহস যোগাতেন। মানসিক অশান্তির চূড়ান্ত রূপ ম্যাডাম মনে হয় দেখেছেন! তাই তো কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে, তার সহযোগীতায় এগিয়ে আসতেন।’

শিক্ষকের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে সহযোগী অধ্যাপক আ. আল মামুন লিখেছেন, ‘কোন আত্মনই যখন অপর সাপেক্ষ ছাড়া গড়ে উঠে নাÑসেলফ সবসময় গড়ে উঠে এবং টিকে থাকে ‘আদার’ সাপেক্ষেÑতখন আত্মনের হননাকাঙ্খার দায় অপরেরা এড়াবে কিভাবে?! ‘এই মৃত্যুর জন্য কেহ দায়ী নয়’ আত্মনের এই দাবিতেই কি অপরদের সকল দায় সাড়া হয়ে যাবে!? না। সকল আত্মহত্যাই ঘটে বস্তুত অপরদের বানিয়ে তোলা পরিস্থিতির ভিতরে। এ দায় ‘অপরেরা’ এড়াতে পারে না।’

তবে তার সাবেক স্বামী এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অদ্যাপক তানভীর আহমেদ তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘যে ছেলেকে ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের হাতে সিঙ্গেল পেরেন্টিং করে বড় করে তুললাম, নিজে রান্না করে বাচ্চাকে খাইয়েছি, একা একা ছেলের অভিভাবক, বন্ধু, শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি, আজকে সেই ছেলের প্রতি আমার ভালবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো।’
প্রসঙ্গত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আবাসিক ভবন থেকে শুক্রবার বিকালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ওই ঘরের টেবিলে একটি চিরকুটও পাওয়া গেছে, যেখানে ‘আত্মহত্যার’ কথা জানিয়ে ‘কেউ দায়ী নয়’ বলা হলেও নিজের সন্তানের গলায় ‘ছুরি ধরার’ অভিযোগ আনা হয়েছে সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে।

ডায়েরির সঙ্গে মিলিয়ে পুলিশ বলেছে, আকতার জাহানের হাতের লেখার সঙ্গে মিলে গেছে তা।

খবরঃ দৈনিক সানশাইন

1 thought on “শিক্ষকের ‘আত্মহত্যায়’ কাঁদছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comments are closed.