সর্বশেষ জীবনানন্দের সেই নারী

সাহিত্য

শুরুতেই বলে রাখি, এই আলেখ্যটি একটি কাহিনি মাত্র। এটি কোনো গল্প, উপন্যাসের বানানো কাহিনি নয়। একজন অসাধারণ কর্মী মানুষের জীবনচর্যার বৃত্তান্ত এটি।

গোপালকে সবাই ডাকত ‘ছোডো গোপাল’ বলে। কারণ, গ্রামে অন্য আরেকজন গোপাল নামধারী ব্যক্তি ছিল এবং বয়সে সে বড়। স্থান মাহাত্ম্যে তাই সে ছিল ছোডো গোপাল। সেখানেই বিষয়টার ইতি নয়। আঞ্চলিক বিশ্বাস, শুধু নামটাকে একটা জুতসই বিশেষণ যুক্ত করলেই তা যথেষ্ট হয় না। অন্তত সেখানে আদর-আহ্লাদের বেশ খানিকটা খামতি থেকেই যায়। নামের সঙ্গে একটি প্রত্যয়ও যুক্ত হওয়া চাই। সুতরাং, ছোডো গোপালইয়া। এ অঞ্চলে এমন কারও নামই পাওয়া যাবে না, যার সঙ্গে ‘ইয়া’ প্রত্যয় যুক্ত না করে তার নিকটজনেরা তার সম্বোধন অথবা উল্লেখ করবে। এই ব্যাখ্যানে অনেকেই নিশ্চয় অনুমান করে নিয়েছেন, অঞ্চলটি বরিশালের অন্তর্গত। কাহিনিটি বলার একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত কারণ আছে। ছোডো গোপাল এবং জীবনানন্দ একই বছরে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু কবির সঙ্গে জীবনের বেশির ভাগ সময়টা ছোডো গোপালের কোনো যোগ ছিল না। যোগটা হলো, অনেককাল পরে।

বড় গোপালকে নিয়ে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। সুতরাং, ছোডো গোপালকে আমরা গোপাল বলেই শুধু উল্লেখ করব। আপাতত তার বাল্যশিক্ষা পর্ব নিয়ে আমাদের পরিক্রমা। ঊনবিংশ শতকটি শেষ হবার মাত্র চার মাস আগে, এই অঞ্চলের রায়পাশা গ্রামে তার মামাবাড়িতে গোপালের জন্ম। তাদের বসত গ্রাম ছিল কাশীপুর। রায়পাশার অবস্থান কাশীপুরের দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর কালীজিরা নদীর পূর্বে এবং কীর্তনখোলার উত্তরে।

তার পাঁচ বছর বয়ঃক্রমকালে, দিদিমার উদ্যোগে গোপাল হরিচরণ মাস্টারের পাঠশালায় ভর্তি হয়। পরবর্তীকালে গোপাল বলত, সে আর জীবনানন্দ একই পাঠশালায় কিছুকাল পড়েছিল। কিন্তু আমরা তার তথ্যতত্ত্ব জানি না। এটুকুই শুধু তার কথন মোতাবেক আমরা জানি। পাঠশালাটি বসতের কাছাকাছিই জনৈক গৃহস্থের চণ্ডীমন্পেড। গোপাল মেধার দিক থেকে যে আদৌ সিকি, আধা বা নিম্নমানের ছিল, তা নয়। তবে ‘পোলাপান অসতের ভাণ্ড’। এ কথা দিদিমার। অবশ্য দিদিমার এ কথা বলার হক আছে। কারণ, ওই যুগের নিতান্ত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম হলেও বুড়ি বাংলা গীতা, আপদ নাশিনী, বিপদ নাশিনী, লক্ষ্মীর পাঁচালি এমনকি কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত তথা পদ্য রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি পাঠে বড় দাড়া ছিল। ‘গোপালইয়া’র ‘ল্যাহাপড়ায়’ কিছুমাত্র আগ্রহ ছিল না। পাঠশালা বস্তুটা তার দুই চোক্ষের বিষ। অথচ দিদিমার পাঠের বিষয়বস্তু প্রায় অধিকাংশই তার অধিগত হয়ে গিয়েছিল ‘ফলা’, ‘বানান’, ‘যুক্তাক্ষর’ লেখার আগেই।

হরিমাস্টারের পাঠশালার প্রতি ভক্তি ভাব কম থাকার কারণটা দিদিমা বুড়ির বিলক্ষণ জানা ছিল। পড়ুয়ারা তার বিদ্যাবত্তা ও বিদ্যাদানের ক্ষমতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানবার সুযোগ পায়নি বটে, তবে বুড়ি জানতেন যে গুরুমশাই যদি শিক্ষাদান অপেক্ষা পোড়োদের চরিত্রশুদ্ধির বিষয়েই বেশি মনোযোগী হন এবং নিজের দোষারোপ করে লাভ নেই। তথাপি, নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। একটা শৃঙ্খলার মধ্যে তো আছে-এরকমই বুড়ির বিশ্বাস। তবে পল্লিগ্রাম জায়গা, সময়টা বিংশ যুগের সকাল। অভিভাবক শ্রেণি সবাই কিন্তু দিদিমার মানসিকতার অংশীদার ছিল না। তারা তাদের ‘অসতের ভাণ্ডদের’ এনে কোনো রকমে হরিমাস্টারের জিম্মা করে বলত, ‘মাস্টের মশায়, এই রইল। হাড়, মাংস, চামড়া ব্যাক আপনের, খালি রুহুডুক মোগো লইগ্যা রাইখ্যেন।’ সঙ্গে মাস্টারের জন্য একখানা বৃহৎ বারকোষে ‘সিধা’ ও এক ধামা মুড়ি বা চিড়ে।

সেকালে মাইনে বলে মাসকাবারি কিছু ছিল না। তবে ‘সিধে’ ব্যাপারটা মাঝেমধ্যে সামান্য মনে পড়িয়ে দিলেই পাঠানো হতো। নগদ পয়সা দু’আনা চার আনা। কিন্তু সিধে বস্তুটা খুব সহজ ছিল না। খুব কম হলেও একটি সিধে মানে কমপক্ষে পাঁচ সের চাল, আড়াই সের ডাল, সোয়া সের সরষের তেল, কিছু মসলাপাতি এবং লাউ, কুমড়ো, কাঁচকলা-জাতীয় কিছু তরিতরকারি। আমিষ বাদ। হ্যাঁ, সের কয়েক গুড়ও অবশ্যই থাকত। সুতরাং, জনা পঁচিশ-তিরিশেকের মতো ছাত্র নিয়ে এক একজন গুরুমশায়ের আমদানি একুনে নেহাত খারাপ হতো না। অন্তত, এমন বলা যাবে না যে, গুরুমশায় সামান্য ‘তণ্ডুল’ ও ‘তিন্তিরি’ পত্রের ঝোল আহার করে শুধু অধ্যাপনাকে আদর্শজ্ঞানে জীবনপাত করছেন।

আবার এ কথাও বলা যাবে না যে, তৎপূর্বকালের বা তদানীন্তন বঙ্গের সর্বত্র এরকম ব্যবস্থাপনা আকছার ছিল। রায়পাশা, কাশীপুর, করাপুর, মাধবপাশা, দেহের গতি ইত্যাদি যেসব গ্রাম চন্দ্রদ্বীপ-রাজের প্রত্যক্ষ প্রভাবাধীন ছিল, বহুকাল আগে থেকেই রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় এসব নিয়ম চলে আসছিল। সম্পন্ন গৃহস্থের এসব কর্তব্যকর্ম চন্দ্রদ্বীপ নরেশদের সুস্থিতকালে নির্ধারিত হয়েছিল, যা রাজাদের পতনের পরেও অনেক কাল অবধি চালু ছিল। চন্দ্রদ্বীপ পরগনার ব্যাপক অঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থার এই রীতি, পাঠশালা, টোল, চতুষ্পাঠী, মাদ্রাসা, মক্তব ইত্যাদির মাধ্যমে যেমন একদা সৃষ্ট ঐতিহ্যের, তেমনি পরবর্তীকালে, আধুনিক শিক্ষার প্রসারের জন্য এই ঐতিহ্যের বিবর্তন চলেছে ইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ফলে এ অঞ্চলটিতে বেশ কিছু স্বনামধন্যের আবির্ভাব ঘটেছে।

দিদিমা এবং গোপালের মা সেই ধারার অনেকটাই তাঁদের সংস্কারে বহন করতেন। কিন্তু গোপালকে হাজার বার ‘লেখা পড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই’ ইত্যাদি আপ্তবাক্যের উদ্ধৃতি শুনিয়েও পাঠশালায় মনোযোগী করা যায়নি। সে যুগে, বালক (বালিকারা তখনো পাঠশালাগামিনী উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল না) কেন পাঠশালায় যেতে অনীহাপরায়ণ, তা নিয়ে গবেষণার কথা অন্তত পল্লিগ্রামে কেউ ভাবেনি। দিদিমা কারণটা, অর্থাৎ গোপাল ইত্যাদিদের পাঠশালাভীতির প্রকৃত তাৎপর্য নিজ চোক্ষে একদিন দেখে ব্যবস্থা নিলেন।

‘হরিমাস্টার’ বড় কড়া ধাতের শিক্ষক। নিজের কর্তব্যকর্ম যা-ই করুন, ছাত্র পড়া না পারলে তাঁর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল বড় ভয়ানক এবং নিত্যনতুন। শীতকালে পুকুরে চুবিয়ে ভেজা জামাকাপড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, নিল ডাউন, নাড়– গোপাল তো ছিলই। তার ওপর আরও বীভৎস ছিল ঝাড় লন্ঠনের সঙ্গে ঝুলিয়ে উস্তমকুস্তম বেত্রাঘাত। অভিভাবকদের মধ্যে একটা বড় অংশই ছিলেন, যাঁরা শিক্ষাস্থলে প্রহার ব্যাপারটাকে অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করতেন। সে কারণেই বোধ করি ঠেঙানো ব্যাপারটাকে সামাজিক প্রেক্ষায় ‘সহবত শেখানো’ বা ‘শিক্ষা দেওয়া’ বলে আজও গণ্য করা হয়।

গোপালের দিদিমা মাস্টারের ‘সিধে’র ব্যাপারে বড় দরাজদিল ছিলেন। সে কারণে গোপাল এবং অনুরূপ ছাত্ররা নাকি কম শাস্তি পেত। কথাটা প্রহৃত ছাত্রদের মারফত অভিভাবকদের কানেও পৌঁছায়। কিন্তু তাতে যতটা সমালোচনা বা কানকথার সৃষ্টি হয়, সিধের ব্যাপারে, স্বাভাবিক কারণেই ততটা উন্নতি ঘটে না। সবার অবস্থাই তো দিদিমার তুল্য নয় বা সব ছাত্রই তাদের অভিভাবকদের কাছে মেয়ের ঘরের আহ্লাদের নাতি নয়। তাই একদিন দিদিমা এই প্রহারের বিষয়ে সরেজমিন করতে হঠাৎ পাঠশালায় হাজির। সেদিন দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত এক হতভাগ্যকে চণ্ডীমণ্ডপের ‘আড়ার’ সঙ্গে ঝুলিয়ে হরিমাস্টার কোনো একটি ছাত্রকে দিয়ে ঝোপ থেকে লাল পিঁপড়ের বাসা আনিয়ে তার গায়ে সেটি ছড়িয়ে দেবার আয়োজন করছিল। এমন সময় অকুস্থলে দিদিমা। বয়স এবং ব্যক্তিত্বে, তদুপরি তিন-তিনজন প্রতাপশালী পুত্রের জননী বিধায় বুড়ি সে যুগে, ওই অঞ্চলে প্রায় ‘ধইন্য পুরুষ’।

তিনি গিয়ে শুধু একবার হুংকার দিলেন, ওডা কী অইতাছে হরি-। হরি বলার চেষ্টা করল, ওডা মা ঠারেন এট্টা একছের গভ্ভোছেরাব। অর ল্যাহাপড়া কিছু হওনের না। দিদিমা সে কথার জবাব না দিয়ে ছেলেদের জিজ্ঞেস করলেন, ও কী করছে যে এই শাস্তি? কিন্তু ছেলেরা ভয়ে ভয়ে শুধু মাস্টারের দিকে আড়চোখে তাকায় আর তোতলায়, আইজ্ঞা, ও বেয়াদপি করছিল।

-কী বেয়াদপি করছিল?-এবার প্রশ্নটা সরাসরি হরিমাস্টারকে।

-আইজ্ঞা এ্যারগো বেয়াদপির কি শ্যাষ আছে? কয়ত কমু আপনেরে। আপনে যায়েন। অরে ক্ষমা করইয়া দিলাম।

দিদিমা দেখলেন মাস্টার ব্যাপারটা চাপা দিতে চাইছে। ছেলেরা ভয়ে সত্যটা বলতে পারছে না। তিনি জানেন, আর যা-ই হোক, গোপাল মিথ্যে বলবেন না। তিনি সে বিষয়ে পুরোটাই নিঃসন্দেহ। একেবারে শিশুকাল থেকে এই শিক্ষাটা তাঁকে তিনি উত্তমরূপেই দিতে পেরেছেন। এমনিতেও গোপাল নির্ভীক। চরিত্রগতভাবে এবং সত্যনিষ্ঠ। সুতরাং, এবার তাঁকেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী করছে ও ক’।

গোপাল নির্বিকারচিত্তে ঘটনার বিবরণ বলে গেল। সে এক অসাধারণ বৃত্তান্ত। হরিমাস্টারের তামাকের নেশা ছিল প্রবল। সে এমন কিছু দূষণীয় নেশা নয়। পাড়াগাঁয়ে সে যুগে তামাক আর কে-ইবা না খেত। আর যারা তামাকখোর, সবাই জানেন, তাদের অন্যতর একটি আয়েশ থাকে। তা হলো, তামাকটি যাতে অন্যের হাতে মাখানো এবং সাজানো পাওয়া যায়। তামাকের নেশার তরিবৎ অনেক। এ তো আর আজকের দিনের বিড়ি, সিগারেটের নেশা নয় যে প্যাকেট থেকে বের করে ফস করে দেশলাই বা লাইটার দিয়ে অগ্নিযোগ করে ফুঁকতে থাকবে। এই নেশার পরম্পরা অতি প্রাচীন এবং সামন্ত-ঐতিহ্যমণ্ডিত। সুতরাং, এর সঙ্গে যে অলসতা এবং আয়েশের একটা নিকট সম্বন্ধ থাকবে, সে তো স্বাভাবিক। হুঁকোরে, কলকেরে, নারকোল ছিবড়ের গুল্লিরে, টিক্কারে হাজার অনুষঙ্গ। তার আগে তামাক পাতা কুচোও, চিটেগুড় দিয়ে তাকে বেশ করে মাখাত-তবে তোমার দ্রব্যটি তয়ের হলো। এরপর কলকে সাজিয়ে, আগুন দিয়ে তবে না নেশা করা। তামাক কোনো স্বাধীনচেতা ব্যক্তির নেশা হওয়ার যোগ্য নয় বলেই বোধ হয় সমাজ থেকে তার অবলুপ্তি ঘটে, বিড়ি সিগ্রেটের চল হয়েছে। নেশার ব্যাপারটা এত পরনির্ভর হলে চলে? অথচ, চাকর নেই কিন্তু তামাকের নেশা আছে, এটা ভাবা যায় না। মনে হয়, এ কারণেই বরিশালের স্বাধীনচেতারা বলে থাকেন, ‘আমি কি ক্যাওর মাহা তামাক খাই?’

হরিমাস্টার জমিদার, তালুকদার ছিল না। তথাপি তার অন্যের হাতে সাজানো তামাক খাওয়ার শখ যে প্রবল ছিল তার কারণ তামাক চরিত্রের অন্তর্গত সামন্ত স্বভাব। কিন্তু তার তো আর চাকর ছিল না। তাতে কী? অতগুলি প্রহারযোগ্য ছাত্র তো ছিল। সুতরাং, ‘পটলা, নন্টে, বেন্দা, যা তো বাড়ির মইদ্যের থিকা এক ছিলিম আঙ্গাইয়া তামাক লইয়ায়। খালি আঙ্গাবি, খাবি না কৈলোম।’ ইত্যাকার আদেশ। যে বাড়ির চÐীমÐপে পাঠশালা, তামাকটা প্রধানত সেই বাড়ির পড়–য়াকেই আনতে হতো। কখনো আশপাশের বাড়ি থেকে। দূরের ছাত্রদের স্বাভাবিক কারণেই এই দায়িত্ব পালন করতে হতো না।

ক্ষিতিশ নামে গোপালের অতি অন্তরঙ্গ এক বন্ধুর পালা পড়েছিল সেদিন। তার বাড়িটিও কাছেই। ক্ষিতিশের বাবা বেশ শৌখিন মানুষ। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। তাঁর অভ্যাস অম্বুরি তামাক খাওয়ার। অম্বুরি তামাক তামাককুলে কুলীন। এ পাড়ায় কেউ খেলে ও পাড়া অবধি সুবাস পৌঁছায়। সম্ভবত হরিমাস্টারের সেদিন অম্বুরি তামাক খাওয়ার শখ চেপেছিল। কিন্তু তার বাবা দৈবাৎ বাড়ি থাকায় সে অম্বুরি তামাকটা আনতে পারেনি। বদলে তাদের হালিয়া গেদুর সাদামাটা তামাকের থেকে খানিকটা ব্যবস্থা করে এনেছিল। ফলে হরিমাস্টার ক্ষিপ্ত। তামাকটায় এক টান দিয়ে তার হুংকার : সারামজাদা, এই তামাক তোর বাপে খায়?

না আইজ্ঞা।

তয়? অর্থাৎ, তাহলে তুই এটা আনলি কেন এবং কোত্থেকেই বা, ইত্যার্থ। উত্তরে ক্ষিতিশ জানায় যে তার বাবা সেদিন কর্মস্থলে যাননি বলে তার পক্ষে তামাক চুরি করার অসুবিধে ছিল। তাই বাধ্য হয়ে সে হালিয়া গেদুর তামাক তাকে বলেকয়ে এনেছে। এই সংবাদে হরি পণ্ডিত আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার বক্তব্য-সারামজাদা, তুই শ্যাষ তামাইত মোরে মোছলমানের হাতে মাহা তামুক খাওয়াইলি? শুয়ার, আইজ তোরই একদিন, কি মোরই একদিন।

ক্ষিতিশ পাঠশালায় সবার চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ। হরিমাস্টারের গালাগালি এবং প্রহার মাত্রাতিরিক্ত হতে থাকায় তারও আত্মসম্মানে লাগে এবং সে একটু উগ্রভাবেই বলে, নিত্যদিন পরের তামাক চুরি করইয়া আনইয়া খাওয়াই তমোও মাইর খাইতে অইবে? আর শ্যাহের হাতে মাহা তামাক খাইলে যদি জাইত যায়, হেয়া তো আপনের কবেই গেছে। বাবার তামাকও তো গেদুই মাহে। ক্ষিতিশ রীতিমতো উঠতি জোয়ান ছেলে। চেহারা স্বাস্থ্য ভালো। শুধু লেখাপড়ায় মাথা নেই বলে এখনো পাঠশালার গণ্ডি পেরোতে পারেনি। যা হোক, ক্ষিতিশের বিদ্রোহে হরিমাস্টার ক্রোধে দিশেহারা হয়ে এই লাল পিঁপড়ের, যাকে বলে এখানে ‘লাসার বাসা’, সেই ব্যবস্থা দিয়েছে। ক্ষিতিশ সম-অত্যাচারিতদের সঙ্গে যদি বিদ্রোহটা সংগঠিত করে নিত, তাকে আড়ায় ঝোলানোর সুবিধে হতো না। সেটা করার কথা সে ভাবেনি। তার সম্যক কারণও আছে। সে নিজেও কখন যেন তামাকের অভ্যাসে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। মাস্টার তাকে কলকে ‘আঙ্গাতে’ই শুধু বলেছিল, তামাক খেতে বলেনি। আঙ্গানো অর্থ অগ্নিসংযোগ। অভিজ্ঞরা জানেন যে কলকেতে অগ্নিসংযোগ ব্যাপারটা কলকে ফোঁকারই অনুরূপ এবং তারও ফুঁকতে ফুঁকতেই অভ্যেসটি পাকা হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় একদিন তাদের ‘পাকের ঘর’ থেকে কলকে আঙ্গাবার সময় তার মা আচমকা অসময়ে সেখানে গিয়ে পড়ায় সে ধরা পড়ে। মা বাবাকে বলে দেন এবং বাবা কার্যকারণ না খোঁজ করেই তার পিঠে দুপাটি খড়ম ভাঙেন। তাতে অবশ্য ক্ষিতিশের তামাক খাওয়া বন্ধ হয়নি। শুধু সাবধানতাটা বেড়ে গিয়েছিল। পড়াশোনায় যা-ই হোক, এসব বিষয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা করার মতো বুদ্ধির অভাব তার ছিল না। সংগঠিত বিদ্রোহে ভবিষ্যৎ আপদবিহীন কালে তামাক খাওয়ার সুযোগটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে-এমন সে ভেবেছিল।

দিদিমা মোকদ্দমাটি হাতে নেওয়ায় এখন সে-ও গোপালের সঙ্গে সংগতি রেখে বিষয়টি সবার গোচরে আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বস্তুত, দিদিমার আবির্ভাবে হরিমাস্টার যে যারপরনাই ঘাবড়ে গিয়েছিল, সেটা পাঠশালার ছোট-বড় সব পড়–য়াই বুঝতে পেরে সাতিশয় আহ্লাদিত বোধ করছিল। কারণ, সবাই কমবেশি নির্যাতিত ছিল এবং তামাক খাওয়ার মতো একটা গর্হিত কাজে সবারই পাপবোধ কমবেশি ছিল। সেটা এমনকি গোপালেরও। দিদিমা মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন, হরি, সয়ত্য করি, তুই অরগো পড়াও না, চুরি করা, তামাক খাওয়া শেখাও? হরি জিব কেটে অত্যন্ত নির্লোপ ভাব নিয়ে বলে, আইজ্ঞা, পড়াই।

আর তামাক সাজইয়া আনোনডা?

ওয়া এক-আধদিন, যহন খুব কেলান্ত লাগে তহন। খাডনিডাতো কোম না।

তোর হুক্কা কলকি নাই? তোরে সিধায় তামাক দে না?

হ। হেয়া দে। তয়, হেসব পাঠশালায় আনলে যদি এহানে আইশ্যপইশ্য জোনের এট্টা নেশার আড্ডা বয় হে কারণে আনি না।’

‘যাউক। আইজ আমি বেশি কিছু কইলাম না। তয়, আর যদি দেহি বা শুনি, তুই পোলাপানেগো দিয়া তামাক সাজাও, বা ক্যাওরে এই রহম মাইরধইর, শাস্তি দেও, আমি কিন্তু মাজইয়া খোকারে কইয়া তোর ব্যবস্থা করমু।’ বলে দিদিমা সেদিনকার মতো চলে যান। তিনি দৃষ্টির বাইরে যেতেই হরিমাস্টার সবার উদ্দেশেই বলে ওঠে, ‘সারামজাদা’ অর্থাৎ হারামজাদা। এই জিলার মানুষেরা সাধারণত শ, ষ, স কে ‘হ’ উচ্চারণ করে। কিন্তু সময় বিশেষে অতিরিক্ত শুদ্ধ উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘হ’কে ‘স’ বলে থাকে। তাই হারামজাদা স্থলে ‘সারামজাদা’।

দুই

প্রাথমিকভাবে দিদিমার এবং পরবর্তীকালে মায়ের প্রভাব ও শিক্ষায় গোপালের স্বভাবটি গড়ে উঠছিল এমনভাবে সংসারের কোনো জটিলতা, কুশ্রীতা, অকারণ অলসতা বা মিথ্যাচার তাঁকে যেন স্পর্শই করত না। ব্যবহারিক জগতে ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক বলে বোধ হবে না হয়তো অনেকেরই। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে এটা এতই সত্য যে আজ আশি অতিক্রান্ত বেলায়, যখন তাঁর একমাত্র কাজ পেছনের দিনগুলির রোমন্থন করা, তখনো তিনি বোধ করেন না যে কোনো দিন তাঁর চরিত্রে এর অন্যথা ঘটেছে। কলকাতার বাসার দোতলার দক্ষিণ দিকের বারান্দাঅলা একটি ঘর এখন তাঁর প্রত্যক্ষ ভুবন। বারান্দাটি দক্ষিণমুখী, পুব-পশ্চিমে টানা লম্বা। তার পুব প্রান্তে একটি ডেক চেয়ারে বসে বেশির ভাগ সময় কাটে তাঁর। সমবয়সী এক-আধজন যাঁরা এখনো বেঁচে আছেন এবং চলনক্ষম কিছুটাও, কদাচিৎ আসেন। দুদণ্ড কথা আলাপ হয়, সবই অতীতচারিতা। একাই বেশির ভাগ সময়টা কাটে, কখনো এক-আধখানা ধর্মগ্রন্থ জাতীয়, বেশিটাই তাঁর আজীবনের আকাক্সক্ষার বিষয় শিশুসাহিত্যের বইপুস্তক পাঠ করে।

বিকেলে চারটে থেকে পাঁচটা কাটে প্রলম্বিত বারান্দার এপ্রান্ত ওপ্রান্ত পায়চারি করে। এই সময়টা মনটা তাঁর চলে যায় শৈশবের দিনগুলোতে, কৈশোরে। তখন রায়পাশা, করাপুর, কাশীপুর, বরিশাল সদর শহর, সেখানের সব খাল, বিল, নদী, শহরের রাস্তাঘাট সাধারণ এবং অসাধারণ মানুষজন যাঁদের তিনি দেখেছেন বা পরিচিত হয়েছেন, সেইসব স্মৃতি মন্থন করে। বয়সের ক্লান্তি এ কারণে তাঁকে বিষণ্ন খুব একটা করে না। শুধু আকাক্ষা একটা থাকে, আর অন্তত একবার, একটি মাত্র বার যদি সেই জীবনের দিনগুলি পাওয়া যায়।

না মিথ্যে বলাটা তাঁর অভ্যাসে আশ্রয় করেনি কোনো দিনই। হরিমাস্টার তার অসম্ভব ধূর্তামির দৌলতে দিদিমার সতর্কবাণী কাটিয়ে তামাক-কাণ্ড পুনরায় চালু করতে সক্ষম হয়েছিল। সেদিন এ কাজের ভার পড়েছিল গোপালের ওপর। তামাকের ওপর তার আসক্তি স্বাভাবিকভাবে আসেনি। তবে মাস্টার আজ্ঞা দিয়েছেন, সেটা পালন না করাটাও সে সঠিক মনে করেনি। তখন তার বয়স ছয় কি সাত। সে ইতিপূর্বে কলকেয় অগ্নিসংযোগের কৌশল হিসেবে ফোঁকার চেষ্টা দু-একবার করে কেশেমেশে একাকার। মাস্টারকে বলায়, সে বলেছিল, ফুঁকতে হবে না। ফুঁ দিতে দিতে আনবি। সেদিনও তা-ই করছিল। এমন সময় এক সতীর্থ এসে খবর দিল, তামাক আনতে মাস্টার বারণ করেছেন। কারণ, ইন্সপেক্টর বাবু পরিদর্শনে এসেছেন।

পাঠশালায় এলে ইন্সপেক্টর শুধোলেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে?’

‘পণ্ডিত মশায়ের জন্য তামাক আনতে।’ তার সরল সত্য উত্তর। এ নিয়ে ইন্সপেক্টর কিছু উচ্চবাচ্য করলেন না। শুধু গোপালকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্বর্ণ’ বানান কী?

গোপাল পারল না।

ইন্সপেক্টর চলে গেলে হরিপণ্ডিত গোপালকে নিয়ে পড়লেন। গালাগাল ছাড়া তো মাস্টারের শাস্তি প্রদান আবার সম্পূর্ণ হয় না। বললেন, এই যে দিদিমার আহ্লাদের নাতি, ঘরজামাই কুলীনের পোলা। সারামজাদা বলদের বাইহ্য, তোমারে ওই কথাডা ইন্সপেক্টররে কইতে কইছেলে কেডা অ্যাঁ? কেডা তোমারে এরহম সয়ত্যবাদী হইতে শিখাইছে, হুনি?

গোপালের বয়স তখন ছয় কি সাত। সে বলল, দিদিমায় কইছে, সদা সত্য কথা কহিবা। মিথ্যা বলা পাপ। প্রায় মুখস্থ করা পড়ার ভঙ্গিতে কথা কয়টি বলার সঙ্গে সঙ্গেই হরিপণ্ডিত যা প্রহার বর্ষণ করল, গোপাল এখনো তা ভোলেননি। অথচ আজও এই আশি অতিক্রমী বয়সেও তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না, তাঁর প্রকৃত অপরাধটা কী ছিল? তবে জীবনপথে সত্যনিষ্ঠ থাকতে গিয়ে একটা বিষয় তিনি হাড়ে-মজ্জায় উপলব্ধি করেছেন যে সত্যের পথ বড়ই উপলক্ষুব্ধ, তাকে অবলম্বন করে যারা চলতে চায়, তাদের ভাগ্যে মসৃণ সমতল ভূমির সরল-সোজা রাস্তা দুর্বলতা। তিনি উপলব্ধি করেছেন, সত্যের বিনিময়ে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না, অন্তত যেসব প্রাপ্তির জন্য মানুষ আকাক্ষিত ক্ষত থাকে। লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই নিত্য উপহার, কিন্তু তথাপি যে ব্যক্তি সত্যের অনুগামী, তাকে সেই ধারায় চলতেই হয়। জীবন যেন তাকে সেভাবেই গড়ে নেয়। তবে এখন এই শেষবেলায় গোপাল একটা প্রগাঢ় শান্ততায় যে আছেন, তাকেই তিনি তাঁর এইরূপ যাপিত জীবনের পরম প্রাপ্তি বলে মনে করেন।

দিদিমা চাইতেন তাঁর নাতি যেন সত্যপথ পরিহার কখনো না করে। পণ্ডিত কখনো কখনো চাইত যে তার রীতিবিরুদ্ধ, অশিক্ষকমূলক অপকর্ম ঢাকবার জন্য ছাত্ররা মিথ্যার আশ্রয় নিতেও যেন পশ্চাৎপদ না হয়। গোপাল তার অন্তরের প্রেরণায় দিদিমার শিক্ষাটাকেই গ্রহণ করেছিল। দিদিমা লালন সাঁইয়ের একটি গান প্রায়ই তাঁর নাতিকে শোনাতেন :

‘সত্য বল সুপথে চল, ও রে আমার মন।

সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দরশন ’

এইসব স্মৃতি এতকাল পরেও গোপালের চোখের সামনে যেন ছায়াছবির দৃশ্যের মতো ভেসে বেড়ায়। এরই সঙ্গে থাকে কিছু ভিন্ন ছবিও, যা এরকম গুরুগম্ভীর নয়, কিন্তু যথেষ্ট কৌতুকের। হরিপণ্ডিতের অধ্যাপনা যতই নীরস হতো, ছাত্রদের অমনোযোগ ততই বেড়ে যেত এবং ফল অধিকতর শাস্তি। গোপাল যতই সত্যসন্ধি এবং অনুগত ছাত্র হোক, পড়াশোনা এবং পাঠশালা ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল-এ কথা বলা যাবে না। তবে সে এবং তার অনুচর কিছু সতীর্থ হরিমাস্টারকে ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে নিত্যনতুন উপায় উদ্ভাবনে ছিল পরম ওস্তাদ। সে হিসেবে বলতে গেলে, তারা গুরু মারা বিদ্যেটা ভালোই রপ্ত করেছিল। তা ছাড়া এই নিরন্তর একঘেয়েমির হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায়ও ছিল না। গোপালের সত্যপরায়ণতায় হরিপণ্ডিত আস্থাবান ছিল, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তার এই স্বভাবটির জন্য পণ্ডিতের বিলক্ষণ সমস্যা হতো। কোনো পলাতক ছাত্রকে খুঁজে আনার জন্য পণ্ডিত মাঝে মাঝেই ছাত্রদের দুচারজনকে নিয়োগ করতেন। ‘যা, সারামজাদারে যাহানে পাবি হেহান দিয়া চ্যাংদোলা করইয়া লইয়া আয়। গোপাল্ইয়া লগে যা।’ অর্থাৎ সে সঙ্গে থাকলে অন্যরা ফিরে এসে মিথ্যে বলতে পারবে না-এ মতো বিশ্বাস।

এসব ক্ষেত্রে গোপাল পণ্ডিতমশায়ের তার প্রতি বিশ্বাসটাকে পোক্ত করার জন্য বলত : ও নিবারণইয়া, হ্যারে তো আওয়ার কালে দ্যাখলাম যেন বইপত্তর গাছের গোড়ায় রাইখ্যা কাডাবুহরি গাছটায় উড্ইয়া কাডাবুহরি খাইতে আছে। কাডাবুহরি বলতে বৈঁচি।

সয়ত্যই দেখলি? কোন্হানে?

ওই পাঠশালায় আওনের পথে যেহানে দাশের বাড়ির ঝোরা খালডা বড় খালে পড়ছে, হেহানে যে বড় কাডাবুহরির গাছটা হেইহানে। মনে তো বাসলাম যেন নিবারণইয়াই অইবে।

তারপর সদলে গোপালের গমন এবং মোটামুটি বৈঁচিকুল নির্মূল করে ঘণ্টা দুতিন বাদে ফিরে এসে পণ্ডিত কাছে সমস্বরে ঘোষণা-পলাইছে। আমাগো দেইখ্যাই গাছের থিহা ছ্যারছ্যারইয়া নামইয়া যে দৌড় লাগাইলে-আর লাগড় পাই? হেয়াও পাইতাম, আধমাইল দৌড়াইয়া হে যাইয়া লাফাইয়া পড়লে বড় খালডায়। এর ওপর আর কথা কী?

কিন্তু নিবারণের বাড়ির ‘সিধা’টা নিয়মিত এবং লোভনীয়। সুতরাং, তাকে এভাবে ছেড়ে দেওয়ার কথাও পণ্ডিত ভাবতে পারে না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে গোপালবাহিনীর একটা সমস্যার ব্যাপার থাকে। নিবারণকে আজ না হয় ধরা গেল না, পরে সে যদি হঠাৎ হাজির হয়ে নিজের থেকেই অন্য কোনো গল্প বলে, তাহলে তো বিপদ। সুতরাং, ছুটির পর তাকে খুঁজে নিয়ে ব্যাপারটা সামলে নেবার ব্যবস্থা করতে হয়।

আধা ঘুম আধা জাগরণে, ডেকচেয়ারে বিশ্রামরত বৃদ্ধ হঠাৎ হাঃ হাঃ করে একা একাই হেসে ওঠেন। না, তিনি বাল্য-কৈশোরে যে নিপাট সত্যনিষ্ঠ ছিলেন, এমন বলা যাবে না। নাম মনে পড়ছে না। কে যেন এক ইংরাজ কবি লিখেছিলেন, “…ওহ বধৎসবংঃ ড়ৎ ঢ়ধষু, যিধঃবাবৎ ুড়ঁ ংধু ষবঃ ঃযব ঃৎঁঃয ৎবসধরহ ধষধিুং ঁহনৎড়শবহ.”

তাঁর সত্য কি অভগ্ন থেকেছে?

তবে সেটা এমন একটা বয়সের ঘটনা যে এরকম সত্যভঙ্গের অপরাধে, সেই বয়সের শিশু-কিশোরদের তেমন কোনো শাস্তি দেওয়া যায় না। বরং কিছু রঙ্গরসের কথাগল্প বলে, উপসংহারে খানিকটা মিথ্যাচারবিরোধী নৈতিক উপদেশ দেওয়া চলে।

নইলে, গোপাল ভাবেন, কোনো পাকাবুদ্ধির ছেলেপুলে সরস্বতী ঠাকুরের পায়ের মাটি খায়?

পাঠশালায় নিয়ম ছিল সকালে লেখার কাজ এবং বিকেলে পড়া দেওয়ার কাজ। প্রতিবছর সরস্বতী পুজোর পর ঠাকুর বিসর্জন না দিয়ে পাঠশালার এক কোণে রেখে দেওয়া হতো। সকালে লেখার কাজটা কোনোমতে হয়ে যেত। কিন্তু বিকেলে পড়া দিতে এসে প্রথম কাজ ছিল ভক্তিসহকারে মা সরস্বতীকে প্রণাম করে, তাঁর পা থেকে ভেঙে খানিকটা মাটি খেয়ে মনে মনে বলা, মাগো আজ যেন পড়া পারি। পরীক্ষা-টরীক্ষা থাকলে মৃত্তিকা আহারটা একটু বেশিই হতো। শেষ রক্ষা তাতে যে খুব একটা হতো তা নয়, তবে বছরের শেষে দেবীকে জলে ফেলার সময় হলে দেখা যেত, দেবী দুপায়েই খোড়া। ভক্তির প্রাবল্যে ভক্তরা দুটি পায়ের পাতাই খেয়ে বসে আছে।

তো এসব যে বয়সে ঘটে, সে বয়সের ছাত্রদের প্রহাররূপ শাস্তি যারা দেয়, তাদের কাছে সত্যের আর মর্যাদা কী? কিন্তু তথাপি গোপাল পরবর্তী জীবনে সত্য এবং ধর্মকে অভিন্ন মেনেছেন এবং একটা নির্দিষ্ট জীবনযাপন প্রণালিকে সেই বিশ্বাসে গ্রথিত করেই রেখেছেন।

আজও তাঁর মনে আছে দিদিমার অপরিসীম স্নেহ-মমতার কথা। জন্মের পর থেকে সাত-আট বছর বয়স অবধি গোপাল রায়পাশায় দিদিমার তত্ত¡তালাশে-অর্থাৎ মামাবাড়িতে। মা-ও সেখানেই থাকতেন। বাবার পিতৃপুরুষ কোনো এককালে অবস্থাপন্ন ছিলেন, কিন্তু বাবা রাজকুমার দত্ত প্রকৃত অর্থেই নিঃসম্বল, দরিদ্রাতি দরিদ্র ছিলেন। শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারেও একেবারেই সাধারণ। শুধু কয়েকজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের সাহচর্যে কিছুটা চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন। সম্পদের মধ্যে ছিল বংশ-কৌলীন্য। তখনো কৌলীন্যের বড় জাঁক। সুতরাং, অপেক্ষাকৃত নীচকুলে বিবাহ করে শ্বশুরালয়ে পত্নী এবং সন্তানদের রেখে তিনি ময়মনসিংহে কবিরাজি করতেন, যদিও তাতে তাঁর নিজের সংকুলান হওয়াই কষ্টসাধ্য ছিল। দিদিমা না থাকলে বা মামাবাড়ির সার্বিক সহায়তা না পেলে ওই হরিমাস্টারের পাঠশালার বিদ্যেও গোপালের কপালে জুটত কি না সন্দেহ। এর চাইতে ভালো শিক্ষালাভের সুযোগ পৃথিবীর আর যেখানেই থাকুক, বিংশ শতকের উষালগ্নে অন্তত বরিশালের কোনো গণ্ডগ্রামে ছিল না। এরই মধ্যে দিদিমার এই নাতিটিকে ‘ল্যাখাপড়া’ শেখাবার অদম্য বাসনা কীভাবে অতটা বলবতী হয়েছিল এবং পাঠশালায় গমন ও পাঠ্য বিষয়ে চ‚ড়ান্ত অনীহা থাকা সত্তে¡ও, অন্যবিধভাবে গোপাল কীভাবে পাঠমনস্ক হয়েছিলেন, তার কার্যকারণ বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে।

বরিশালের ক্ষেত্রে বলতে গেলে যুগটা অশ্বিনীকুমার দত্তের। একদিকে তাঁর স্বদেশ হিতৈষণা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, অপরদিকে জিলা শহর এবং গ্রামাঞ্চলেও শিক্ষা বিস্তারের ব্যাপক কর্মকাণ্ডের যুগ ছিল এটা। আর এ কথা তো বলাই বাহুল্য, এই যুগের জাতকেরা যুগনির্বন্ধেই যেন দেশপ্রেম এবং ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রটি সহই ভ‚মিষ্ঠ হচ্ছিল। মনে রাখতে হবে, বন্দে মাতরম্ তখন প্রকৃতই মাতৃবন্দনামন্ত্র এবং দেশপ্রেমের ধ্বনি। তখনো প্রতিবেশী ভিন্ন সম্প্রদায়ের, ভিন্ন বিশ্বাসে অন্তত মানুষকে নিপাত বা নির্মূল করার জন্য তা ‘যবন-নিধন’ ধ্বনিতে পরিণত হয়নি, অথবা দেশপ্রেম বলতে কেউ ভিন্ন দল বা মতাবলম্বীদের দলন বুঝত না। অবশ্য সেই সুদিন এবং সুবিবেচনা খুব দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়নি। তবে অশ্বিনীকুমার বরিশালে অন্তত সেই কদাচারকে বহুকালই প্রতিহত করে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন এবং তাঁর প্রভাবে সামান্যভাবেও যাঁরা এসেছেন, তাঁরা অশ্বিনীকুমারের দেশপ্রেমের ব্যাপকতা নিজেদের জীবনে পালন করতে সচেষ্ট থেকেছেন। গোপালের আন্তরিক বিশ্বাস, তিনি এই সত্যকে আজ পর্যন্ত অন্তরে ধারণ করে আছেন, যদিও অশ্বিনীকুমারকে যখন তিনি সাক্ষাৎ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত গোপাল অশ্বিনীদত্তের সান্নিধ্য পান।

দিদিমা অশ্বিনীবাবুর বড় জয়গান করতেন। গোপালকে প্রায়ই তিনি তাঁর বিষয়ে গল্প করতেন। মানুষের কর্মসাধনার বিষয়ে দিদিমা অশ্বিনীদত্তের মতামত কতটা অবগত ছিলেন, অর্থাৎ তাঁর ‘কর্মযোগ’ এর লেখা দিদিমা পড়েছিলেন কি না গোপালের জানা নেই। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন কর্মযোগ কলকাতার ‘মানসী’ ও ‘মর্মবাণী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরোয়, তখন পড়ে গোপালের মনে হয়েছে, দিদিমা কোনো-না-কোনো সময় অশ্বিনীদত্তের সংস্পর্শে এসেছেন এবং তাঁর বক্তৃতা শুনেছেন। নচেৎ ওই মহাত্মার কথার নির্যাস কীভাবে দিদিমার চিন্তায় আশ্রয় পেয়েছিল? দুঃখের বিষয়, গোপাল দিদিমার বিষয়ে বিশেষ কোনো তথ্যই সংগ্রহ করে রাখার কথা ভাবেননি। এই বয়সে এসেও এ জন্য তাঁর খেদ বড় প্রকট। এখন একটি চরিত্র, আহা!

তবে লোকজ নায়ক অশ্বিনীকুমারের কর্মকেন্দ্র বরিশাল শহরের অতটা নিকটস্থ গ্রামে বসবাস করে, সেই যুগেও সাধারণ নারী, পুরুষ অশ্বিনীদত্তের প্রভায় কোনো-না-কোনোভাবে যে প্রভান্বিত হবেন, তা কিছু বিচিত্র নয়। ‘ভক্তিযোগ’ তাঁর সর্বাঙ্গসুন্দর, সম্পূর্ণ ও বহুল প্রচারিত তাত্তি¡ক গ্রন্থ হলেও প্রায় অসমাপ্ত কর্মযোগ নারী-পুরুষনির্বিশেষে বরিশালবাসী ব্যাপক জনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল বলেই গোপাল আজ মনে করেন। তাঁর এই ধারণা মূলত দিদিমা ও মায়ের কর্মের প্রতি নিষ্ঠা ও সেই বিষয়ে সন্তানকে শিক্ষাদানের পদ্ধতি দেখেই হয়েছে। মায়ের প্রসঙ্গ আরও ব্যাপক। সব কথা যদি তিনি গুছিয়ে লিখে রেখে যেতে পারতেন, একখানা মূল্যবান পুস্তক হতে পারত। আধা তন্দ্রাগ্রস্ত অবস্থায় মনের পর্দার ওপর কত স্মৃতি আর ছবিই না ভেসে আসে, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু গোপালের একটা বড় আড়ষ্টতা এই যে তিনি নিজের কথা বলতে বা লিখতে ভীষণ সংকুচিত হয়ে পড়েন। ভাবেন, পাছে আত্মপ্রচার ঘটে। জীবনের বৃহৎ কর্মের দিনগুলোতে কত অসাধারণ মানুষের চিন্তা ও মনন-সমন্বিত কত পুস্তকই না তিনি প্রকাশ করেছেন। শিশু-কিশোরদের কথা মাথায় রেখে যখন তিনি তাদের পাঠের এবং পাঠবহির্ভূত নিছক আনন্দের কথা মাথায় রেখে, উপযুক্ত লেখক, ছড়াকার, চিত্রকরদের দিয়ে শিশুসাহিত্য নির্মাণের সম্ভার উপস্থিত করতেন, তখন তাঁর স্মৃতিতে হরিচরণ পণ্ডিতের নিষ্করুণ, নীরস পাঠশালা-জীবন কি উঁকি মারত না? কিন্তু তার ইতিহাস তিনি রচনা করার প্রয়োজনীয়তাকে আত্মপ্রচার বোধেই পরিত্যাগ করলেন।

এখন ঘোর ঘোর তন্দ্রায়, ডেকচেয়ারে অর্ধশায়িত গোপাল দিদিমার সুরেলা কণ্ঠে যেন শুনতে পান :

‘সীতাদেবী রাখিয়া ল²ণ বীর নড়ে।

কান্দিতে কান্দিতে বীর নায়ে গিয়া চড়ে

নৌকায় হইয়া পার চড়িলেন রথে।

কোথা রাম বলি সীতা লাগিল কান্দিতে ’

পাঠশালার পাঠাভ্যাস শুরু করার আগেই গোপালের কৃত্তিবাসের রামায়ণের বিভিন্ন অংশবিশেষ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। দিদিমাই আসলে তাঁর জীবনে ছন্দের পত্তন এবং গল্প শোনার আকাক্সক্ষার শুরুয়াৎ করে দিয়েছিলেন। রামের সীতা পরিত্যাগ, ল²ণ বর্জন ইত্যাদি অংশ দিদিমা ও নাতি উভয়েরই প্রিয় ছিল বলে বারবার সেগুলিই পঠিত হতো। এই গোটা অংশই গোপালের আজও কণ্ঠস্থ। কৃত্তিবাসী রামায়ণখানি গোপালের নিজের আর আলাদা করে পড়ার প্রয়োজন হয়নি। কর্মজীবনে ছন্দের প্রতি তার পক্ষপাত নানা কারণেই অবশ্য ঘটেছে, তবে দিদিমার অবদান সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও সর্বাধিক। হরিচরণের পাঠশালায় একমাত্র ধারাপাত এবং নামতার বিন্বিনানি ছাড়া কোনো ছন্দ ছিল না। ছন্দ ছাড়া কি শিশুর শিক্ষা হয়, না মন মজে? এ কথা এই তন্দ্রাবস্থায় আজও গোপাল ভাবেন।

তিন

হরিচরণের পাঠশালায় গোপালের জীবন ক্রমে দুর্বিষহ হয়ে উঠছিল। পড়া না পারার শাস্তি কিছু ধর্তব্য নয়। গোপাল মুখচোরা, চাপা স্বভাবের এবং স্বভাবভদ্র ছেলে। গ্রাম্য পাঠশালার পড়ুয়ারা প্রায় সবাই যদিও তথাকথিত ভদ্র পরিবারের সন্তান, কিন্তু তাদের আচার-আচরণে, কথ্য-বাচনে যে ভদ্রোচিত ভাষা ব্যবহৃত হতো এমন নয়। পারিবারিক কুশিক্ষা, অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ, ইত্যাদির ব্যাপকতার সঙ্গে হরিপণ্ডিতের কুৎসিত নানান মন্তব্য গোপালকে বিশেষ পীড়া দিত।

গোপালের বাবা রাজকুমার দত্ত কুলীন বংশীয় ছিলেন। তাঁর পূর্বজগণ বরিশাল কাশীপুরের একদা ধনেজনে বর্ধিষ্ণু নামী পরিবার। কিন্তু গোপালের প্রপিতামহের সময় থেকে এই পরিবারের প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। ভূইয়া কন্দর্প নারায়ণের পুত্র রামচন্দ্র রায় তাঁদের রাজধানী কচুয়া থেকে মাধবপাশায় স্থানান্তরের প্রাক্কালে কাশীপুর গ্রামে কিছুকাল ছিলেন বলে কথিত আছে। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে কচুয়া, প্রাকৃতিক উপপ্লব এবং মগ পর্তুগিজ দস্যুদের অত্যাচারের কারণে নিরাপদ ছিল না। মাধবপাশার গড় নির্মাণকালে সম্ভবত রামচন্দ্র কাশীপুর গ্রাম নিবাসী এবং এরই উপকণ্ঠের নথুল্লাবাদ গ্রামে তাঁর সদর কাছারি। এই কাহিনি স্থানীয় জনশ্রুতিমূলক হলেও মনে হয় এর পেছনে সত্যতা আছে। চন্দ্রদ্বীপরাজ কায়স্থ বংশীয় এবং কুলীন। ফলত, কাশীপুর গ্রামে বেশ কিছুসংখ্যক কায়স্থ ও ব্রাহ্মণ পরিবারকে এনে রাজকীয় কর্ম এবং ব্রহ্মত্র ও বৃত্তি প্রদান করে বসতি করানো হয়।

রাজা রামচন্দ্র রায় এই সময়ে কৃষ্ণানন্দ দত্তকে এই কাশীপুরেই জমি ও জায়গির প্রদান করে বসতি করান। প্রায় আড়াই শ বছর ধরে কৃষ্ণানন্দের বংশধরেরা এখানে বসবাস করে গিয়েছেন। গোপাল কৃষ্ণানন্দের অধস্তন দশম পুরুষ। ‘দত্ত’ উপাধিধারীরা কায়স্থ সমাজে যথার্থ কুলীন কি না তা নিয়ে বিতণ্ডা তোলা আজকের দিনে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক হলেও, তদানীন্তনকালে, এমনকি বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত নিতান্ত কম ছিল না। ঘোষ, বোস, গুহ, মিত্র এবং দত্ত, কায়স্থ কুলের কুলীন বলে খ্যাত। তার মধ্যে দত্তদের নিয়ে বিতণ্ডা এই যে তারা প্রথমোক্ত চার পদবিধারীদের ভৃত্য হিসেবে অথবা সঙ্গী হিসেবে এসেছিল, তাই নিয়ে সমস্যা। কিন্তু চন্দ্রদ্বীপ রাজ যখন সমাজ এবং কুলপতি, তখন তাঁদের অনুগৃহীত ভ‚ম্যাধিকারীকে তুচ্ছ করে কার সাধ্য? অবশ্য তুচ্ছ তখনই করা যায়, যখন রাজাও গত এবং তার প্রদত্ত জমিন জারদাদ, জায়গিরও গল্প কথা হয়ে অধস্তন তথা অধঃপতিত কেউ শ্বশুরনির্ভর জীবন নির্বাহ করে। রাজকুমার দত্ত, কপাল দোষে সেই রকম এক হতভাগ্য ছিলেন। সুতরাং, হরিমাস্টারের মতো চামচিকে তাঁকে নিয়ে টিপ্পনী কাটবে, তাতে আর বিচিত্র কী?

কুল হিসেবে গোপালের মামারা গোপালদের অপেক্ষা নিচু ছিলেন। তাঁর মাতামহ উঁচু কুলে উঠবার তৎকালীন রীতি অনুযায়ী তাঁর কনিষ্ঠা কন্যাকে গোপালের বাবার সঙ্গে বিয়ে দেন। তখন রাজকুমার দত্ত নিতান্তই সহায়-সম্বলহীন। এদিকে তাঁর পিতামাতা উভয়েই গত। স্ত্রী-পুত্র ইত্যাদিকে নিয়ে ময়মনসিংহে তাঁর কবিরাজির সামান্য আয়ে স্বাধীন সংসার পাতা রাজকুমারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখনকার দিনে বাঙালি সমাজে এটা এমন কিছু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা ছিল না। তবে এসব ক্ষেত্রে ‘ঘরজামাই’ থাকা নিয়ে সামাজিক কাটব্যও কিছুমাত্র কম ছিল না। আঞ্চলিক প্রবচনে একটি কথা খুবই চালু ছিল, ‘বুদ্ধি থাকলে ঘরজামাইয়া খায় না।’ অর্থাৎ বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো ঘরজামাই থাকে না। তবে সে অর্থে রাজকুমার দত্তকে ঘরজামাই বলা বোধ হয় যায় না। রায়পাশায় শ্বশুরগৃহে তিনি খুব কমই থাকতেন। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার রক্ষণাবেক্ষণ শ্যালক ও শ্মশ্রুমাতার ওপর সাময়িকভাবে রেখে, নিজে একটা ব্যবস্থা করে তাদের নিয়ে যাবেন-এরকমই চিন্তা ছিল তাঁর। কিন্তু কোনোভাবেই সেটা হয়ে উঠছিল না।

গোপালের মা জ্ঞানদা স্বভাবগতভাবে ভীষণ স্বাধীনচেতা ও আত্মাভিমানী ছিলেন। যখনই তাঁর স্বামীকে কাছাকাছি পেতেন, তিনি পীড়াপীড়ি করতেন তাঁদের নিজের কাছে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না।

হরিপণ্ডিত এবং পাঠশালার ছাত্রদের গোপালকে নিয়ে রঙ্গরসের কথা তাঁর কানে গেলে, তিনি অসম্ভব রকমেই অপমানাহত হয়েছিলেন এবং যথাশিগগির এর একটা প্রতিবিধান করার কথা ভাবছিলেন। গোপালের দিদিমা অবশ্য তাঁর কন্যার সঙ্গে সহমত ছিলেন না। গোপালকে তিনি প্রাণতুল্য ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসা এতটাই যে তা গোপালের গোল্লায় যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল এবং এ কারণেও মা জ্ঞানদা রায়পাশা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন।

সেইসব দিনের কথা গোপাল এখনো মনে করতে গিয়ে দিদিমার সেই দিনের অসম্ভব বাৎসল্যের মাধুর্যে যেন টইটম্বুর হয়ে ওঠেন। দিদিমার ভালোবাসার সাম্রাজ্যে তিনিই যেন ছিলেন একমাত্র রাজা ও প্রজা। যদিও সংসারে মামাতো ভাইবোনদের সংখ্যা বিন্দুমাত্র অপ্রতুল ছিল না।

একের প্রতি ভালোবাসার এই পক্ষপাতে পরিবারের অন্যদের, বিশেষ করে জ্ঞানদার যথেষ্ট বিব্রত হতে হতো। এই সব অঞ্চলে সে যুগে ইস্কুল পাঠশালায় যাবার জন্য কোনো বিশেষ পোশাক বিধি বা জুতো ব্যবহারের রীতি ছিল না। এমনকি এই সময়ের প্রায় আশি বছর পরেও জুতো পায়ে কোনো পড়ুয়াকে ইস্কুল পাঠশালায় যেতে দেখা গিয়েছে কি, গোপালের ধারণা নেই। কিন্তু নাতির পাঠশালায় যেতে ঘোর অনীহা দেখা বুড়ির মনে হয়েছিল-তার মনস্তুষ্টির জন্য উপযুক্ত পোশাক এবং জুতো দরকার। বড় মামাকে ডেকে, অতএব তাঁর হুকুম : নসু কই কি?

কী কও?

কই বলে, ভাইধনেরে তো পাঠশালায় পাডান দরকার।

দরকার তো গেলেই অয়, মানা করছে কেডা?

না কই বলে, পাঠশালায় যাইতে তো হে চায় না। বয়স তো পাঁচ ছাড়াইয়া ছয় অইলে।

তয় তো পাডাইতেই অয়। কুলীন কায়েত বংশের পোলা। ল্যাহাপড়া না শেখলে কী হাল চাইবে? এট্টু বুজাইয়া কও।

না, বোজোনের বয়স অয় নায়। তুই অরে এট্টু ভালো পোশাক-আসাক আর একজোড়া জোতা আন্ইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা কর।

আচ্ছা।

বড় মামাও ভাগগেকে যথেষ্টই ভালোবাসেন। কিন্তু যেহেতু জুতো ব্যাপারটা স্থানীয় সংস্কৃতিতে ব্যবহারে নেই, অথবা ভুলেই গিয়েছিলেন বা, বুড়ি ক্ষিপ্ত। পণ ধরলেন, জুতো চাইই, নচেৎ তিনি অন্নজল গ্রহণ করবেন না। অগত্যা বড় মামা বেচারিকে সাইকেল করে বরিশাল শহরে গিয়ে তক্ষুণি জুতো কিনে আনতে হয়, তবে বুড়ির অন্নজল গ্রহণ।

গোপাল এখন ভাবেন, তেহিনো দিবসা গতা। কিন্তু সেসব দিনেও সংসারে বিষয়টি কি খুব সহজ ছিল? একটি যৌথ পরিবারের পোষ্য প্রায় ভাগগের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। অন্যদের বঞ্চিত করে, সংসারে কি কোনো কথাই ওঠেনি, অথবা জ্ঞানদার মতো আত্মাভিমানিনী নারীও কি ঘটনাটি সহজে মানতে পেরেছিলেন? কিন্তু গোপাল সারা জীবন যেমন, আজও তেমনি, সেদিনের কথার মধ্যের কুটিলতার অংশ নিয়ে কিছু ভাবতেও পারেন না, কাউকে গল্পচ্ছলে কিছু বলতেও পারেননি। সেসব দিনের কোনো বন্ধু বা আত্মজন, যাঁরা এক-আধজন এখনো বেঁচে আছেন এবং দেখাও হয় কদাচিৎ। বলেন, এইসব পেরিয়ে তুমি জীবনে কৃতী হয়েছিলে, সমাজে বটবৃক্ষবৎ বিরাজ করেছ। একখানা আত্মকথার পুস্তক তো লিখলে পারতে। গোপাল ভাবেন, সেসব কিছু নয়। আমার অন্তরস্থ হৃষিকেশ আমাকে যখন যেভাবে, যে কাজে নিযুক্ত করেছেন আমি সেভাবেই চলেছি এবং কর্ম করেছি। আমার জীবনে বোধোদয়ের শুরু থেকেই মহামন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম এই পঙ্ক্তিটি ‘যথঅ নিযুক্তা-হস্মি’। আমার নিজস্ব ইচ্ছায় কোনো কর্ম যে আমি করেছি, সেইমত ভাবনা থেকে মুক্ত থাকার প্রচেষ্টা আমার স্বভাবগত হয়ে উঠেছে একসময়। এই বোধ বা বিশ্বাসের সত্যতা বা বাস্তবতা নিয়ে কোনো বিতর্কে আমি কোনো দিন যাইনি, যাবও না। আমার মানসজগৎ এভাবেই গড়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের কথায়-

‘অদৃষ্টেরে শুধালেম, চিরদিন পিছে

অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?

সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি,

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।’

গোপাল ভাবেন, আত্মকথা কীর্তন করে কি এই উপলব্ধ সত্যকে তিনি প্রকাশ করতে পারবেন? সেখানে কোন ‘আমি’র কথা তিনি বলবেন? না তিনি তা পারেননি, পারবেন না। কোথা দিয়ে, কীভাবে যে আজকের ‘আমি’তে এসে পৌঁছেছেন, তা চিন্তা করলে বড় বিস্ময় জাগে। তার চাইতে এই ভালো। এই আধো ঘুম, আধো জাগরণে, ফিরে দেখা। পশ্চাতের ‘আমি’রা কীভাবে সামনের দিকে তাঁকে ঠেলে নিয়ে যায়-তার ছায়াছবি দেখে যাওয়া। এভাবেই হয়তো একদিন সব ছবি মিলিয়ে গিয়ে একটা অমোঘ কালো পর্দা নেমে আসবে। তারপর আর কী?

মামাবাড়িতে সাত বছর কাটল। মামাদের তরফে অযত্ন ছিল না। দিদিমার তো কথাই নেই। কিন্তু মা ভীষণভাবে বিদ্রোহ করলেন। তিনি কিছুতেই আর ভাইদের গলগ্রহ হয়ে থাকবেন না। অথচ বাবা যে মৈমনসিংযের পাট তুলে দিয়ে চলে এসে পৈতৃক ভিটেয় সংসার পাতবেন, তা সম্ভব নয়। সেখানে নিয়ে গিয়েও খরচ কুলোতে পারবেন না। মহা সমস্যায় পড়ে তিনি জ্ঞানদাকে বললেন, তোমার কষ্ট যে আমি বুজি না, তা না। তয় মৈমনসিংয়ে নিয়া খাওয়ামু কী? রাখমু কোথায়?

তয় কাশীপুরে ব্যবস্থা করো।

হেহানে তোমারে দ্যাখফে কেডা? থাকপা ক্যামনে?

দ্যাখফে গোপাল। থাকতে আমি ঠিক পারমু, তুমি দেইখ্য।

কিন্তু গোপালের তো এই মাত্তর সাত-আষ্ট বছর বয়স, ও কী দ্যাখফে?

ওথেই অইবে। আমি পারমু। ওহানে মায়ের আল্লাদে গোপাল নষ্ট অইয়া যাইতে আছে।

হেনায় অরে ছাড়া থাকতে পারবেন?

দ্যাহ, ক্যাওর লইগ্যা কিছু আটকায় না। আইজ যদি আমি মরি বা তুমি মরো, কিছুই কি সোংসারে আটকাইয়া থাকপে?

বাহ্যদৃষ্টিতে মাকে খুবই নীরস কঠিন মনে হলেও, গোপাল ক্রমশ বুঝেছেন, মা বাস্তবজ্ঞান-বিবর্জিত নন। তাঁর জেদের কাছে এবং যুক্তির তীক্ষতা রাজকুমার দত্তকে হার স্বীকার করতে হয়েছিল। কাশীপুরে ছোট্ট একখানা খড়ের ছাউনি, বাঁশের খুঁটি এবং দড়মার বেড়ার ঘর, পাশে একটু রান্নার জায়গা এবং সামনে একফালি দাওয়া-এই নিয়ে মা গোপাল আর তাঁর ছোট দুই ভাইকে নিয়ে সংসার পাতলেন। সংসারে পুরুষ অভিভাবক বলতে গোপাল, যার বয়স তখন সাত পেরিয়ে সবে আট হয়তো-বা। বাকি একজন স্ত্রীলোক, যাঁরা সংসারের অভিভাবকত্বে সে যুগে, এমনকি আজও স্বীকৃত নন। আর দুটি তো শিশু। তন্দ্রার ঘোরে গোপাল ভাবলেন, সেইদিন থেকে আমি বড় হয়ে গেলাম। শুধু বড়ই নয়, উপার্জনের কথাও ভাবতে হলো। অবশ্য পেছনে মহাশক্তির অধিকারিণী মা রইলেন। অভিভাবকত্ব কথাটা এ ক্ষেত্রে শুধু লোকাচার।

অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারতেন জ্ঞানদা। এইভাবে সংসার পেতে বসে কি একটা দিনও নিশ্চিন্ত অন্ন বরাদ্দ ছিল তাদের? জ্ঞানদা নিজে যেমন পরিশ্রম করতেন, গোপালকেও খাটাতেন তেমনি। এখানে তো আর আদুরে নাতির ‘আহা বাছা’কারিণী দিদিমা নেই। গোপাল অচিরেই বুঝেছিলেন যে তাঁকে দিদিমার আওতাচ্যুত করাটা তাঁকে মানুষ করার জন্যই। তবে সে কথা বুঝতে সময় লেগেছিল ঢের। মামাবাড়ির আরাম, আয়েশ এবং বিশেষ করে দিদিমার আহ্লাদে পুষ্ট সাত-আট বছরের অভ্যস্ততা ভেঙে কি সহজে কঠোর পরিশ্রমের জীবনে পদার্পণ করা যায়। প্রথম প্রথম বেশ কিছুকাল গোপালের কান্না পেত বুক ভেঙে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হতো, মনে হতো, যাই একছুটে দিদিমার কাছে। কিন্তু মায়ের এই অসম্ভব জীবনযুদ্ধের স্বরূপটা বোঝার সহজাত বুদ্ধি এবং বিবেক ছিল গোপালের, আজ তিনি নিজেই তা স্বীকার করেন নিজের কাছে। অথবা, এভাবেই কি তিনি অন্তরস্থ হৃষিকেশের নির্দেশ অনুভব করতে শুরু করেননি?

এই হৃষিকেশের অনুধ্যানের মধ্যে কোনো বিশেষ অতিলৌকিক আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ তিনি কোনো দিন খোঁজেননি। তাঁর চৈতন্য এবং বিবেকের বিকাশকে এভাবেই তিনি কর্মে ও চিন্তনে জাগরিত করার প্রয়াস করেছেন, এভাবেই গঠন করতে চেয়েছেন তাঁর জীবনদর্শন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর অনেক বস্তুবাদী সহযোদ্ধা ও তার্কিক বন্ধুরা তাঁদের বিশেষ বিশেষ তত্ত্বের আলোয় তাঁর দার্শনিক অবস্থানকে অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক বা আধ্যাত্মিকতায় আচ্ছন্ন বলে প্রমাণ করতে চাইতেন। কিন্তু গোপাল নীরব থেকেই যেন সব সমালোচনাকে উপেক্ষা করতেন। বস্তুত গীতার ‘কর্মযোগ’ অধ্যায়টি শুধু তাঁর নয়, যাঁদের নিয়ে তাঁর কর্মময় বিশ্বটি গড়ে উঠেছিল, তাঁদের সবার জীবনেই বড় প্রভাবী ছিল। সেখানে দিদিমা ও মায়ের ভ‚মিকা বড় ব্যাপক। দিদিমার নিয়মিত বাংলা পদ্যানুবাদে গীতা পাঠ শোনা গোপালের নিত্যকর্মের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এখনো প্রতি ভোরেই নিদ্রাভঙ্গের মুহ‚র্তে দিদিমার কণ্ঠ তিনি শুনতে পান :

‘তং তথা কৃপয়াবিষ্টমশ্রুপূর্ণা কুলেক্ষণ ম।

বিষীদন্তমিদং বাক্যসুবাচ মধুসূদনঃ ’

শুধু এই শ্লোকটিই সংস্কৃতে পড়তেন তিনি। তার পরই গোটা দ্বিতীয় অধ্যায় বাংলা পদ্যানুবাদে পুরোটা পড়ে যেতেন। ‘সঞ্জয় কহিলেন’-

‘শোকাকুল, কৃপাবিষ্ট, অশ্রুপূর্ণ আকুল লোচন।

হেরি ধনঞ্জয়ে তবে, বাসুদেব কহিলা তখন

……………………………………………

শ্রীভগবান কহিলেন-

‘অশোচ্য জনের তরে করি শোকতাপ,

কথা কহিতেছ পুনঃ বিজ্ঞের মতন।

“জীবিত কি মৃত তরে”, শুন পরস্তপ,

সুপণ্ডিত জনে কভু না করে চরাদন

……………………………………..

‘কর্মে অধিকার তব, নহে কর্মফলে কদাচন।

ত্যজ কর্মফল আশা, কর্মত্যাগে নাহি দিবে মন

কর কর্ম ধনঞ্জয় সিদ্ধি ও অসিদ্ধি ভাবি সম।

যোগস্থ আসক্ত চিত্তে, সমত্ত¡ই যোগ অরিন্দম ’

এই অনুবাদ যাঁর, তাঁর স্মৃতি গোপালের আজও অমলিন। তিনি ছিলেন তাঁদের রায়পাশাকে বেশ কিছু দূরে অবস্থিত গৈলা গ্রামের অধিবাসী। নাম লক্ষীচরণ দাশগুপ্ত। ওখানেই একটি গ্রাম্য ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন তিনি। অসাধারণ পণ্ডিত এবং আত্মত্যাগী হেডমাস্টার। কথিত আছে, তিনি অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা বিএ পাস করেন। তদানীন্তন সরকার লক্ষীচরণকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁকে পিরোজপুর গভ. হাই ইস্কুলের হেডমাস্টারের পদও দেওয়ার কথা হয়েছিল, কিন্তু তা-ও তিনি গ্রহণ না করে সরকারকে জানিয়ে দেন যে তাঁর উদ্দেশ্য গ্রামে গ্রামে শিক্ষা প্রসার করা। এই কর্মেই তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

এই সময়ে রায়পাশায় কর্মোপলক্ষে এলে গোপালের মামাবাড়িতে গীতা পাঠ ও আলোচনার আসর বসালেন তিনি। তাঁর গীতা অনুবাদের গ্রন্থ তখনো প্রকাশিত হয়নি। খাতা থেকে পাঠ করেই তিনি শ্রোতাদের তা শোনাতেন। দিদিমা বোধ হয় কারুর সহায়তায় কর্মযোগ অধ্যায়ের অংশটি নকল করে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে গোপাল ওই অনুবাদটির খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে তা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।

লক্ষীচরণ দাশগুপ্ত মশাই অশ্বিনীদত্তের খুবই নিকটজন ছিলেন এবং রাজনৈতিক মতাদর্শেও কাছাকাছি ছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন অশ্বিনীকুমারের পরামর্শ অনুযায়ী অতিবাহিত হয়েছিল। গোপালের মনে সেই স্মৃতির খণ্ড খণ্ড চিত্র আজও ভাসে। গোপাল ধর্মপিপাসু হয়ে যে কর্মযোগকে আশ্রয় করেছিলেন এমন নয় বলেই তাঁর নিজের অন্তরে আজও দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি ভেবে দেখেছেন, নিরাসক্ত কর্ম যত অসম্ভব তা অর্থহীন বলেই আপাত-শ্রবণে মনে হোক না কেন, তা নিতান্তই অসম্ভব এমন তিনি মনে করেন না। এ কথা তো তাঁর উপলব্ধ সত্য যে ফল লাভাকাক্সক্ষা ব্যতিরেকে কর্ম অন্তত ব্যক্তির জীবনে অকারণ হতাশা আনয়ন করে না। ফল লাভের আকাক্সক্ষাই যদি না থাকে, তবে অপ্রাপ্তির দুঃখ বা নৈরাশ্যের উৎস আর থাকবে কী করে?

চার

মাকে গোপাল এবং তাঁর কনিষ্ঠরা খুব অল্প বয়সেই হারায়। কাশীপুরের পর্ণকুটিরে জ্ঞানদা খুব বেশি দিন সংসারজীবন নির্বাহ করতে পারেননি। কিন্তু সেই স্বল্প স্থায়িত্বের সংসারে থাকাকালেই গোপাল জেনেছিলেন, সংসার বস্তুটা কতখানি বাস্তব এবং জীবনে দারিদ্র্য জিনিসটা কতখানি দাহশীল। বা স্বাবলম্বী হতে হলে কতটা পরিশ্রম করা প্রয়োজন। বস্তুত, এসবই মা তাঁকে নিজে উদাহরণ হয়ে ওই কয় বছরে শিক্ষা দিয়েছিলেন।

বাড়ির চারদিকেই ঝোপঝাড়, জঙ্গল, অঢেল শটির বন। গরিব-গুর্বাদের কাছে শটি একটি অতি সাধারণ হলেও, আর্থ ব্যবস্থাপনার উৎস। কিন্তু শটি থেকে পালো নামের শিশু ও রোগী পথ্য প্রস্তুতকরণের পদ্ধতিটি যে কত দূর শ্রমসাধ্য, তা যাঁরা নিজের হাতে কর্মটি সম্পাদন না করেছেন, তাঁদের পক্ষে ধারণা করাও অসম্ভব। অথচ বস্তুটির অর্থমূল্য এতই নগণ্য যে তার কোনো হিসাব হয় না। আজকের দিনে কেউ হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে ওই অপরিসীম শ্রমের মূল্য অত সামান্য হতে পারে।

কাশীপুরে এসেও জ্ঞানদা গোপালকে, শত অনটন সত্তে¡ও পাঠশালায় দিয়ে ছিলেন। শীতের দিনে পাঠশালা থেকে এসে কিছু মুখে গুঁজতে না-গুঁজতে মা একখানা কোদাল আর একটি সাজি এনে গোপালের পাশে রাখতেন। গোপাল জানতেন মা এক্ষুনি বলবেন, যা, সীতানামের দিঘির উত্তর পারের বন থিকা শটি উডাইয়া লইয়া আয়। মাকে তাঁর বড় নিষ্ঠুর বলে মনে হতো তখন। কিন্তু তাঁর তো জানা ছিল, বাবা মৈমনসিং থেকে যে টাকা পাঠান, তাতে সংসার চলে না। পরিস্থিতি গোপালকে সেই কাণ্ডজ্ঞান তো দিয়েছিল। সুতরাং, শটি তুলতে তাঁকে যেতে হতোই। শুধু এটুকুই তো নয়, তিনি তো জানতেন, এরপর এই শটির মুখাগুলো নিয়ে মাকে কী পরিশ্রমই না করতে হবে। প্রথমে সেগুলোকে ধুইয়ে মাটিমুক্ত করতে হবে। তারপর বটিতে ছলে খোসা ফেলতে হবে। কেনেস্তারার টিনের পাত পেরেকের সাহায্যে ফুটো ফুটো করে, তার ধারালো উল্টো দিকে শটির মুখা ঘষে বড় পাতিলে বারবার ছলে খলে ছিবড়ে আর পালো পৃথক করতে হবে। যখন ছিবড়েতে আর পালো থাকবে না, তখন চলবে থিতান আর দ্রবণ। ক্রমান্বয়ে এই কাজ চালিয়ে পালো যখন তিক্ত স্বাদ মুক্ত হবে, তখন দলা দলা করে, রোদে শুকিয়ে বিস্কুটের টিনের পাত্রে ভরে তুলে রাখতে হবে। বর্ষাকালে ছুটির দিনে সেই পালো নিয়ে যেতে হবে বরিশালের শহরের বাজারে। দাম? দু’পয়সা কি চার পয়সা সের। জংলা জিনিস, বিনি পয়সার। জঙ্গল থেকে আলো, পালো বানাও, বেচো। কোনো খরচা তো নেই, খুচরো ক্রেতা বা পাইকার দোকানির সাফ কথা। গোপাল ভাবতেন, তাঁদের গোটা পরিবারের অতটা সময় ধরে মেহনতের এই দাম? কিন্তু তার বিনিময়েই তো আসবে সংসারের তেল, নুন, কেরোসিন। কত দিন যে শটির গোড়ায় কোদালের কোপ দিতে গিয়ে, সেই কোপ সাপের লেজে পড়েছে! পরের ভাইটিকে তো একবার প্রায় ছোবল মেরেছিল আর কি। দৌড়ে পালিয়ে বাঁচে দুজনই। কিন্তু কাজ কি বন্ধ করতে পেরেছিলেন?

বরিশাল জিলার গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত এবং গরিব মানুষদের রোজগারের অন্য আর একটা উপায় ছিল সুপারির ব্যবসা। ধনী-দরিদ্র সবার বাড়িরই চৌহদ্দিতে সুপারিগাছের ছোট-বড় বাগিচা থাকতই। গোটা পূর্ব ভারতেই পান খাওয়াটার প্রচলন অতি প্রাচীনকাল থেকেই। সুপারি পানের অনুষঙ্গ। কিন্তু তার উৎপাদন সবচাইতে বেশি হয় পূর্ব বাংলায়। এখান থেকেই তার রপ্তানি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এবং বার্মা প্রভৃতি দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রেও। সুপারির ব্যবসাটা এ অঞ্চলে এতই প্রচলিত যে জ্ঞানদার মতো মহিলারা পর্যন্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবসায়ের আশ্রয় নিতেন, সাধারণ দরিদ্র পরিবারের তো কথাই নেই।

গোপালদের তৎকালীন গৃহস্থালিতে বাড়ির যতটুকু অংশ তাঁদের ছিল, তাতে বাড়ির উপজ দ্রব্য তেমন কিছুই তাঁদের ভাগে পড়ত না। তথাপি সেই বার্ষিক উপজ দ্রব্যাদি জ্ঞানদা বিক্রির জন্য সঞ্চয় করে রাখতেন। রাজকুমার দত্ত যে সামান্য অর্থ তাঁদের পাঠাতেন, তাতে কোনোক্রমে খাবার চালের সংস্থানটা হতো। বাকি যাবতীয় সামগ্রীর ব্যবস্থার জন্য জ্ঞানদাকে অনলস পরিশ্রম করতে হতো। গোপাল স্মরণে আনতে পারেন না যে মা একটা দিনও বৃথা ব্যয় করতে পেরেছেন। সর্বদাই তিনি কিছু না কিছু কাজে ব্যাপৃত থাকতেন এবং বলা বাহুল্য সেই কাজ তাঁর সংসার প্রতিপালনের স্বার্থেই। সুপারি শুকিয়ে, রাখি করে সংগ্রহে রাখা তেমনই একটি কাজ।

আশ্বিন কার্তিক মাসে বাড়ির গাছের সুপারি পাড়া হতো এবং রোদে শুকিয়ে তিনি সেগুলিকে ডোলে ঢুলে রাখতেন। এখনো গোপাল মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙে জেগে উঠে যেন বোধ করেন, এটা একটা শারদী উষা। খানিকক্ষণের মধ্যেই জ্ঞানদা উঠেপড়ে তাঁকে ডেকে বলবেন, ‘গোপাল, ওডো না এহনো? ওঠ, ভাইডিরে ওডা, আর শিগগির করইয়া শুয়া বাগানগুলা, তালতলাগুলা ঘোরোন দিয়া আয়। ব্যালা অইলে অইন্য পোলাপানেরা আগেভাগে হ্যানে এলে, শুয়া বেয়াক টোকাইয়া লইয়া যাইবে। ওঠ্ বাবা।

গোপাল বলবেন, এহনো অন্ধকার মা। তালতলায় পাতিশিয়ালেরা বড় চইঠ্য করে। এট্টা পাতিশিয়ালের চাইরডা ‘ছাও’ অইছে, হেয়ার লইগ্যা হে পাহারায় থাকে। বড় ভয় লাগে।

মা বলবেন, ল্যাজাহান লইয়া যা। দ্যাখলে হ্যানে পলাইয়া যাইবে। তয়, ছাওগুলারে য্যান খোঁচাখাচা মারিস না। আর সুপারি, তাল লইয়া আশপাশ পোলাপানেগো লগে ঝগড়া কাজইয়া য্যান করিস না, বোজজো?

মা বলে দিতেন, যদি অন্য ছেলেরাও একসঙ্গে সুপারি, তাল, শাপলা, হোগোল গুঁড়ি ইত্যাদি কুড়োতে বা তুলতে যায়, সবাই যেন একটা দল হয়ে, একসঙ্গে কুড়িয়ে একটা জায়গায় জড়ো করে এবং কাজ হয়ে গেলে সবাই মিলে সমানভাবে ভাগ করে নেয়। গোপাল ভাবেন, মা বড় সমাজমনস্ক ছিলেন। অথচ কী-ইবা তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা। কতটুকুই বা মহৎ সাহচর্য তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু তথাপি মাকে তাঁর অতি অসাধারণ মনে হয়।

এই সময় সুপারির বাগিচায় বাদুড়েরা ছিল গোপালদের উপকারী বান্ধব। তারা সারা রাত ধরে পাকা সুপারির খোসার রস খেত। তাদের হুটোপুটিতে সুপারিগুলো তলায় পড়ত। বাদুড়ে চোষা সুপারি শুকনো হলে তার দাম ভালো পাওয়া যেত। এখন গোপালের মনে হয়, কী আশ্চর্য সুন্দরই না ছিল সেই যূথবদ্ধ দরিদ্র জীবনে আদিম জনগোষ্ঠীর মতো খাদ্য সংগ্রহের অভিযান। বনবাদাড়ে এই অর্থকষ্টের বাধ্যতা শ্রমসাপেক্ষ ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এর মধ্যে কোনো গ্লানি তাদের স্পর্শ করেনি। সব চাইতে উচ্ছ্বাসময়তা ছিল এই যে তারা ছিল একই বয়সী সব এবং সবাই সমভাবেই অভাবী। সমবেতভাবে কাজ করার জন্য এবং সমবণ্টনের সুবিধে ঘুরেফিরে প্রত্যেকেই ভোগ করতে পারায় ঝগড়া, কলহ বা কোনো প্রকার মালিন্যের কারণ ঘটত না। মায়ের এই শিক্ষার প্রসাদ গোপাল আজীবন ভোগ করবেন, এরকম একটা মানসিকতার পত্তন কি তাঁর তখনই ঘটেনি?

প্রথম প্রথম, দিদিমার আদরচ্যুত গোপাল যখন তাঁর মায়ের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় কঠোর পরিশ্রমের জগতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন তাঁর নিতান্ত অসহায় এবং বিড়ম্বিত বোধ হয়েছিল নিজের জীবনকে। স্বাভাবিকভাবেই অপরিণত বয়সের সেই বালকটি মায়ের প্রতি কিছুকাল অন্তত বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু গভীর অভিনিবেশসহকারে কিছুদিন মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে গোপাল অচিরে নিজেদের সাংসারিক পরিবস্থার করুণ অবস্থাটা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। বুঝেছিলেন, মা চান, গোপাল পরিশ্রমী হোক। পরিশ্রমের ব্যাপারে ছেলের ক্লেশের কথা তিনি যথেষ্টই বুঝতেন, কিন্তু তা নিয়ে তাঁর আহা, উঁহু ভাব আদৌ ছিল না।

নারকেল, সুপারি, তাল ইত্যাদি কুড়োনোর কাজ তেমন কষ্টকর ছিল না। সে কাজে সমবেতভাবে তাঁরা একটা ভিন্ন ধরনের খেলার আস্বাদও পেতেন। বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে এ সময় অন্য ধরনের একটা স্বাধীনতার শিক্ষাও লাভ হয়েছিল তাঁর। তা ছাড়া বিচিত্র ধরনের বন্য ফলের আস্বাদ লাভ করাও কম আনন্দ বা লাভের ব্যাপার ছিল না।

গ্রীষ্মের দিনে পাঠশালা থেকে ফিরে কিছু খেয়ে নিলেই মা একখানা কাটারি হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঝাড়্ থেকে বাঁশ কেটে আনতে বলতেন। বাঁশ কাটা ব্যাপারটা খুব কষ্টসাধ্য না হলেও, ঝাড়্ থেকে তাঁকে টেনে নামিয়ে নিয়ে আসা সহজ ছিল। প্রতিবেশী এক আত্মীয় দাদা এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করতেন। কাটা বাঁশকে টুকরো করে গোপাল মাকে এনে দিতেন। মা তা দিয়ে ডালা, চালুনি, ঝাঁকা বানাতেন। এই ঝাঁকা করেই, কখনো পালো, কখনো সুপারি ইত্যাদি নিয়ে গোপালকে বরিশাল গিয়ে বিক্রি করতে হতো। এসব ছাড়াও হাটবাজার করা, মায়ের নানান ফরমাশ খাটা ইত্যাদি নানা কাজ ছিল তাঁর। বর্ষাকালে বাড়ির উঠোনের জমি কুপিয়ে নানান কৃষিকাজও করতে হতো তাঁকে। এইসব কাজ করে তবে তাঁকে ইস্কুলে যেতে হতো।

জ্ঞানদা নানা কাজে খুবই দক্ষ ছিলেন। আলপনা দেওয়া, নকশি কাঁথা তৈরি, পিকে বোনা, রকমারি ডালের বড়ি তৈরি, খই, চিড়ে, ঘাসের দানা, শাপলা বা শালুক, জলপদ্ম ইত্যাদির বীজের সাহায্যে হালকা মিষ্টি খাবার, বনের কাঠবাদামের তক্তি ইত্যাদি এবং আমের সময় আমসি, আমসত্ত¡ বা চালতের সময় শুকনো চালতে গুঁড়োর পিঠে এসবও পরম যত্ন ও পরিশ্রমে তিনি বানাতেন। এর সবই বাজারে বিক্রি করে সংসারের নানান সামগ্রী আনতে হতো গোপালকে।

অসাধারণ রান্নাও করতেন তিনি। প্রতিবেশীর ক্রিয়াকর্মে ব্যাপক রান্নাবান্নার দরকার হলে, জ্ঞানদার ডাক পড়ত। বিপদে-আপদে, উৎসব-ব্যসনে সবার পাশে দাঁড়ানোটা ছিল তাঁর স্বভাব-ধর্ম।

এসবের যখন শুরু, তখন গোপালের বয়স কত? সাত-আট। আজও গোপাল অবাক হয়ে ভাবেন, প্রায় এককভাবে এরকম একটি বালকের ওপর নির্ভর করে, কিছু ‘না’ থেকে একটি সংসার পাতা যে কতটা আশ্চর্যের, তা গোপালকে এখনো চমৎকৃত করে।

এরই মধ্যে আবার জ্ঞানদার গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল অদম্য। গোপালকে এনে দিতে হতো বইপত্তর। তখনকার দিনে কাশীপুরের মতো গ্রামেও লাইব্রেরি ব্যাপারটা আদৌ আকছার ছিল না। বই সংগ্রহ করতে হতো বিভিন্ন লোকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। ধর্ম বিষয়-সংক্রান্ত বইপুস্তক ছাড়াও, গোপাল দেখেছেন, মা নানান গল্প-উপন্যাসও পড়তেন। তার মধ্যে হরিদাসের গুপ্তকথা, মডেল ভগিমী, শ্রীশ্রী রাজলক্ষী, অমর গ্রন্থাবলি, নারায়ণচন্দ্রের গ্রন্থাবলি ইত্যাদি বইও থাকত। জ্ঞানদার ইস্কুল, বিদ্যালয়ের শিক্ষা সামান্য হলেও, তাঁর পাঠস্পৃহা খুব সামান্য ছিল না। ওই অঞ্চলে সেই যুগে উত্তম সাহিত্যগ্রন্থ খুব সহজলভ্য ছিল না। তথাপি, ভালো-মন্দ যা সংগ্রহ করা সম্ভব হতো, জ্ঞানদা তার সবই পড়তেন। আজও গোপাল তাঁর মায়ের পাঠস্পৃহাকে খুবই সম্ভ্রমের সঙ্গে স্মরণ করেন। ভাবেন, উপযুক্ত ক্ষেত্র এবং সহযোগিতা পেলে এইসব মায়েরা কত কিছুই না করতে পারতেন!

মায়ের সবচাইতে বড় গুণ ছিল তাঁর আত্মসম্মানবোধ। এই বোধের কারণেই গোপালের মতো একটি বালকের ভরসায় তিনটি শিশুকে নিয়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সংসার নির্মাণ করলেন এবং শত অভাব-কষ্টেও সেখান থেকে অন্য কোথাও যেতে রাজি হননি। এই মায়ের সঙ্গে গোপালের সম্পর্ক অতি নিবিড় এবং তাঁকেই তিনি চিরকাল অনুসরণযোগ্য মনে করেছেন।

পক্ষান্তরে বাবা রাজকুমার দত্তের সঙ্গে গোপালের প্রায় কোনো সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি। কদিনই বা দেখেছেন তাঁকে? থাকতেন মৈমনসিংয়ে তাঁর কোবরজি নিয়ে। বছরে দু-চারবার যাও আসতেন, এসেই পড়া ধরতেন। আর গোপালের যত অনিচ্ছা তা ওই ইস্কুল পাঠশালার পড়ার ব্যাপারে।

সেবার পুজোর সময় আসবেন। মা তখন অসুস্থ। মানে, গোপালের ছোট বোনটার তখন জন্ম। মাকে বিশ্রাম দেবার জন্য দিদিমা চেয়েছিলেন মাকে রায়পাশা নিয়ে যেতে। কিন্তু মা যাননি। বাবা তখন এলেন। মায়ের প্রসূতিজনিত সমস্যা ছিল। কিন্তু বাবা, সে যুগের আর দশজন পুরুষের মতোই স্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ে নির্বিকার। স্ত্রীর সন্তান হবে, হবে। তার জন্য ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কী আছে? গাঁয়ে হাঁড়ি, ডোম, ধোপাদের মধ্যে কেউ না কেউ দাই আছে। যা করণীয় সে-ই করবে, এটাই তখনকার দিনের বিধি। ক্ষেত্রবিশেষে যে ব্যাপারটা সমস্যাসংকুল হতে পারে, ডাক্তার, হাসপাতালের দরকার হতে পারে, এ বোধ শুধু পুরুষ কেন, মহিলাদেরও ছিল না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ অবস্থায় মহিলাদের জন্য বাপের বাড়ি যাওয়া বিধি। যা কিছু হ্যাপা, সব তাদের। প্রসূতি এবং প্রসূত একটু সাব্যস্ত হলে, তখন তাদের নিয়ে আসা। কিন্তু জ্ঞানদা এবার প্রসবের পর অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেপটিক হয়ে যাওয়ায় অশক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অগত্যা পিত্রালয়ে যেতেই হয়েছিল তাঁকে।

না গিয়ে উপায়ও ছিল না। বাবা মৈমনসিং থেকে যথাসময়ে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে কারোরই কিছু উপকার হয়নি। মায়ের ব্যাপারে তাঁর কোনো উৎকণ্ঠাই দেখা গেল না। উপরন্তু, তিনি গোপালকে পড়া ধরে চললেন। গোপালের মনে আছে, যেদিন তিনি এলেন, সেদিন সন্ধ্যায়ই তিনি গোপালকে শক্ত শক্ত সব বানান আর শব্দার্থ জিজ্ঞেস করেছিলেন। যেমন প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, গার্হস্থ্য ইত্যাদি এবং ওষধি ফলের অর্থ, বনস্পতি বলতে কী বোঝায়Ñএ রকম ডজন খানেক প্রশ্ন। গোপাল এসব ক্ষেত্রে চাইতেন, এর বদলে বাবা যদি আদৌ বাড়ি না আসেন তো ভালো হয়।

বস্তুত, বাবার সঙ্গ-সাহচর্য, স্নেহ-ভালোবাসা কী বস্তু, সে বিষয়ে গোপালের প্রত্যক্ষ জ্ঞান, পুত্র হিসেবে কোনো দিন লাভ হয়নি। উপরন্তু, কাশীপুরে তিনি এসে যখন একটু বেশি দিন থাকতেন, তখন বেশ কিছু ধারদেনা করে যেতেন। মা তাঁর একমাত্র অলংকার একগাছা বাজুবন্ধ গ্রাম্য এক তেজারতি কারবারির কাছে বাঁধা রেখে বাবাকে দিয়ে টাকা আনাতেন। অবশ্য মৈমনসিংয়ে গিয়ে বাবা টাকা পাঠালে আবার তা ছাড়িয়ে নিয়ে আসতেন। সে কাজটা অবশ্য গোপালকেই করতে হতো। মহাজন বলত, ‘তোর বাবায় আছে ভালোই। ঘর-সোংসার বউর ওপর রাইখ্যা বি-দ্যাশে রোজগারের নামে পড়ইয়া থাহে। তোর মায় না থাকলে তোর বাপে যে কী করতে!’ এই সব কথা শুনতে হতো বলে গোপাল বাবার প্রতি আরও যেন বিদ্বিষ্ট থাকতেন। কিন্তু সেই বিদ্বিষ্টতা বা বিদ্বেষ তাঁর মধ্যে অশ্রদ্ধা বা ক্রোধের জন্ম দেয়নি। গোপাল জানেন, সেটা তাঁর মায়ের সহিষ্ণুতা এবং বিবেচনার জন্যই তাঁর স্বভাবে এসেছে।

রাজকুমার দত্ত আর্থিক দিক দিয়ে বা যশ-খ্যাতিতে আদৌ প্রতিষ্ঠা পাননি বলে যে জ্ঞানদা তাঁকে অশ্রদ্ধা করতেন এমন কোনো স্মৃতি গোপালের নেই। জ্ঞানদার স্বামীর কাছে একটিই চাহিদা ছিল, নিজের স্বেচ্ছাধীন একটি গার্হস্থ্য, যেখানে অভাব, অনটন, অপ্রাপ্তি যতই থাকুক না কেন, তা যেন পরমুখাপেক্ষী না হয়, কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অসম্মান যেন সেখানে উঁকি না মারে। রাজকুমার সে বিষয়ে পত্নীর ইচ্ছাকে কোনো দিন অমর্যাদা দেখাননি। তবে তাঁর সাংসারিক বাস্তব বুদ্ধি তীক্ষ্ণ ছিল না, আর আদৌ উদ্যোগী পুরুষ ছিলেন না তিনি। জ্ঞানদা জানতেন এবং বুঝতেনও যেকোনো বনেদি বংশের ক্ষয়িষ্ণু উত্তর পুরুষদের স্বভাবে উদ্যোগহীনতা একটা ব্যাধিবিশেষ। অবশ্য সেই উদ্যোগহীনতারও যে একটা পরিসমাপ্তি আছে, মেধাবিনী এবং সমাজ ও লোকচরিত্রে অভিজ্ঞা জ্ঞানদার বিচারে তা-ও ছিল। সে কারণেই গোপালের শিক্ষা এবং অনলস কর্মশীলতার প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। তিনি যেন জানতেন গোপাল থেকে বংশের অধঃপতনের গতি উন্নতির পথে বাঁক নেবে। তাঁর ধারণা ভ্রান্ত ছিল না।

মায়েরও স্বভাবে স্নেহের প্রকাশ, আদর, ভালোবাসা ইত্যাদির প্রকাশ্যতা ছিল না। গোপাল তা ভালোভাবেই জানতেন। মায়ের স্নেহ ছিল অন্তঃসলিলা। সন্তানদের প্রতি তাঁর শাসন ছিল ভীষণ কড়া। বেফাঁস কথা, অশিষ্ট আচরণ দেখলে তিনি নির্মম প্রহার করতেন। তখনকার সমাজে ছোটদের চরিত্রশুদ্ধির সেটাই ছিল একমাত্র পদ্ধতি। কিন্তু তার মধ্যেই যখন কদাচিৎ স্নেহের প্রকাশ ঘটেছে, গোপাল আজও মনে করেন যে তা যেন পৃথিবীর তাবৎ সুখ দিয়ে মোড়া। শিশু, এমনকি কৈশোরের প্রাক্কালেও। যদি কখনো কোনো ভয়ের কারণ ঘটত, মা কোলে জড়িয়ে, মাথায়-গায়ে হাত বুলিয়ে বলতেন, ভয় কী, আমি তো আছি।

ছোট বোনটির জš§াবার পর পরই মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চিকিৎসার ব্যবস্থা উপযুক্তভাবে করার সংগতি রাজকুমারের ছিল না। মায়ের সেপটিক হয়ে গিয়েছিল। দিদিমা তখনো বেঁচে। বোনের জন্মের আগে থেকেই মায়ের বিশ্রামের জন্য তিনি কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু মা তাঁর সংসার ছেড়ে যেতে যথারীতি অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু জামাইকে ডেকে দিদিমা এবার প্রায় কুরুক্ষেত্তর করলেন। বড় মামাও বাবাকে বললেন, রাজকুমার বাবু, জ্ঞানদাকে আপনি যেভাবে পারেন নিয়া আসেন। অতগুলা পোলাপান লইয়া এই অসুস্থ শরীলে খাডাখাডি করলে তো ও মরবে। বাবা বললেন, দেহি। তয় জানেন তো আপনেগো বুইনের জেদ, তয়, রোগটাও তো মারাত্মক। আমার শাস্তরে এর চিকিৎসা থাকলেও, আমার জানা নাই।

ঠিক হয়েছিল বরিশালের সাহেব ডাক্তার দিয়া চিকিৎসা করানোর। মাকে শেষ পর্যন্ত যেতেই হয়েছিল।

দিদিমা অনেক দিন পরে গোপালকে কাছে পেয়ে আনন্দে আটখানা। গোপালও তা-ই। কিন্তু এ আনন্দ টিকল না। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিদিমা হঠাৎ একদিন অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সেই জ্ঞান আর ফিরল না। দিদিমা মারা গেলেন। গোপাল তাঁর পৃথিবীতে যেন নিঃস্ব হয়ে গেলেন।

মাকে বরিশালে সাহেব ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেপটিক তাঁকে চ‚ড়ান্তভাবেই জখম করেছিল। দিদিমা মারা যাওয়ার ছ’মাসের মধ্যেই সামান্য নোটিশে মা তিন ছেলেকে আর শিশু কন্যাটিকে রেখে তাঁর সাধের গৃহস্থালি চিরতরে পরিত্যাগ করে প্রয়াত হলেন। গোপালের জীবনের এই দুজন দিকনির্দেশকারিনী সামান্য দিনের ব্যবধানে চলে গেলেন তিনি, যেন পুরোপুরি রিক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

সেইসব দিনের কথা স্মরণ করে গোপাল আজ ভাবেন, তার পর তো কত ভাঙা কত গড়া তিনি দেখলেন। সময় তাঁকে একটি মহা সত্য শিক্ষা দিল, গ্রহণ এবং বর্জনের মহা সত্য। সংসার যখন যেভাবে তাঁর কাছে এসেছে, সেভাবেই তিনি তাকে গ্রহণ করেছেন। কারণ, সুখ, দুঃখ, শোক সন্তাপ, আনন্দ বেদনা-সবই গ্রহণ করতে হবে। আবার একটা সময় সব বর্জনও করতে হবে। এটাই নিয়ম। এই গ্রহণ-বর্জন যদি বিচারনির্ভর হয়, তবেই মানুষ পথ চলতে পারে, নচেৎ অনর্থক অস্থিরতার শিকার হতে হয় তাকে।

পাঁচ

কাশীপুর, রায়পাশা, করাপুর ইত্যাদি গ্রামের পারস্পরিক দূরত্ব মোটামুটি দু-তিন মাইলের মধ্যে। সদর শহর বরিশালও এইসব গ্রাম থেকে প্রায় সমদূরত্বেই বলা যায়। গোটা বরিশালকে অর্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টন করে যে নদীটি প্রবাহিতা, সেইটিই এই অঞ্চলের প্রধান নদী। নাম কীর্তনখোলা।

গোপালের স্মৃতির মানচিত্রে এই গ্রামগুলির যে প্রাকৃতিক চিত্র, তার কিছুমাত্র আজ আর পাওয়া যাবে না। কাশীপুর গ্রামটি বর্তমানে শহর বরিশালের সঙ্গে অভিন্ন। রায়পাশা, করাপুর ইত্যাদিও ঠিক গ্রাম হিসেবে এখন আর গণ্য হয় না।

একদা এই গ্রামটি ছিল অরণ্যাচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ একটি জনপদ। তার একদিকে ছিল বহু সমৃদ্ধিশালী পরিবার, আর একদিকে বাঘ, হায়েনা প্রভৃতি আরণ্য জন্তু-জানোয়ারের আবাস। বহু প্রাচীন মহামায়ার মন্দির এই গ্রামেই অবস্থিত ছিল একসময়ে। কে কবে সেটির নির্মাণ করেছিল, তার সঠিক খবর কেউ আজ আর দিতে পারে না। তবে এখনো শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে যে মেলা বসে, সেখানে দূরদূরান্ত থেকে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।

সেই সব অরণ্যাঞ্চল ক্রমশ আবাদ হয়ে কাশীপুর আজ শহর বরিশালের অন্তর্গত একটি পল্লি মাত্র। আজ আর তাকে কেউ গণ্ডগ্রাম বলতে পারবে না। পুরোনো বিশেষ স্থান বলতে এখন আছে সীতানাথের দিঘি। প্রাচীন আঞ্চলিক ইতিহাস কথায় কাশীপুরের ভ‚ম্যাধিকারী বসু বংশের নানান কীর্তির কথা আছে, যা আজও লোকমুখে শোনা যায়। সীতানাথের দিঘিটির কথা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মাধবপাশা রাজবাড়ি, সন্নিহিত দুর্গাসাগর ছাড়া সীতানাথের দিঘির তুল্য জলাশয় এ তল্লাটে আর একটিও নেই। এরকমই আরও কত দিঘি, জলাশয়ের স্মৃতি গোপাল রোমন্থন করেন, যেসব নিয়ে অজস্র গল্পকথা, কিংবদন্তি রয়েছে। আজ যদিও সীতানাথ বসুর দিঘিটি বাস্তবে রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন, কিন্তু শিবচন্দ্র দত্তের চহুতপুর কাশীনাথ বসুর, গণপাড়া, কন্দর্প রায়ের বা সূর্য নারায়ণ চক্রবর্তীর দিঘির খোঁজ বোধ হয় কেউই জানেন না আজ। সেরকমই বিস্মৃতিতে বিলীন তিলক, গৌরী রায়ের, মহেন্দ্র নারায়ণ রায়ের, রামরাজা চক্রবর্তীর বা বিহঙ্গল ভ‚তের দিঘির কাহিনি। গোপালের বেশ লাগে এইসব দিঘি বা জলাশয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে। ভ‚তের দিঘির গল্পটা ছিল ভীষণ রগড়ের। অবশ্য সেই গল্প যারা জানত না, তারা ভাবত এবং বলতও যে দিঘিটা ভ‚তেরা কাটিয়েছিল এবং তার আশপাশে তারা থাকত বলে নামটা ভ‚তের দিঘি। কিন্তু গল্পটা তা নয়।

বিহঙ্গল গ্রামের রত্নেশ্বর রায় খুব প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর বিয়ের দিন ইয়ার দোস্তরা বলল, তুমি তো খুব দাপুটে। আজ রাতে বউকে যদি কথা বলাতে পারো, বুঝব তোমার প্রতাপ। রায় দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালালেন। কিন্তু বউ কথা কয় না। ওদিকে বন্ধুরা আশপাশে আড়ি পেতে আছে। বউয়ের কথা তাদের কানে না পৌঁছালে তো বাজিতে হারা-জেতার ব্যাপারটা বোঝা যাবে না। রায় অবশেষে মরিয়া হয়ে উঠলেন। বউকে খেপিয়ে দিয়ে কথা বলাবার উদ্দেশ্যে বললেন, শুনেছি তোমার মা, অর্থাৎ আমার শাশুড়ি ঠাকুরনের নাকি একটি গোপন নাগর আছে? সত্য নাকি?

বউ বললে, তুমি একটা ভ‚ত। কথাটি জোরেই বলেছিল, সুতরাং সবাই শুনতে পেল। বাজিতে রত্নেশ্বর রায় জিতেছিলেন ঠিকই, কারণ বউকে বিয়ের রাতে কথা কওয়াতে পেরেছিলেন, কিন্তু তদবধি তাঁর নাম হলো ভ‚ত, রতেœশ্বর ভ‚ত। পরবর্তীকালে কীর্তির জন্য একটি দিঘি কাটালে সেটির নাম হলো ভ‚তের দিঘি।

গোপালের জীবনের তেইশ-চব্বিশ বছর পর্যন্ত পর্বটা বরিশালকেন্দ্রিক। এই সময়কালের মধ্যে তিনি কখনো কাশীপুর, কখনো রায়পাশা, কখনো বরিশাল সদরে কাটিয়েছেন। এই সময়টার স্মৃতি তাঁর বৃহত্তর নাগরিক কর্মজীবনে কদাচ মনে আলোড়িত হয়েছে কি হয়নি, তা আজ তিনি মনে করতে পারছেন না। তবে কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকেই এই তেইশ-চব্বিশটা বছর যেন মস্তিষ্কের ওপরতলার পর্দার জাঁকিয়ে বসে আছে। স্মৃতি বলতে যেন এই সময়ের ঘটনাবলিই প্রধান। অথচ তাঁর জীবনের ব্যাপক কর্মকাণ্ড তো বরিশাল ছেড়ে কলকাতা আসার পর। তখন তিনি চব্বিশ-পঁচিশ বছরের যুবা, তাঁর জীবনযুদ্ধের ব্যূহ নির্মাণের মোক্ষমতম ক্ষণ এই সময়টি এবং তৎসহ বৃহত্তর কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণেরও। সেটা জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া, জেল, ডেটিনিউ হিসেবে থাকা এবং আরও কত কী। কিন্তু তার মধ্যে যতই বেঁচে থাকার তীব্র স্বাদ থাকুক না কেন, ওই বরিশালের সিকি শতাব্দীর স্মৃতি যেন তার তাবৎ তিক্ততা, কঠিনতা এবং দরিদ্রতার দাহ সত্তে¡ও কী এক অনুপম রত্নকে এক অলৌকিক প্রায় হিরন্নয় আঁধারে অপাবৃত হওয়ার অপেক্ষায় সংগুপ্ত রেখেছে। যেন অপাবৃত সেই রত্ন তাঁকে তাঁর জীবনের সারসত্যটি বুঝিয়ে দেবে। যেন তাঁর জীবনের তাবৎ কর্মোদ্যোগ এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, যেসব তিনি উপেক্ষা করতেই সচেষ্ট ছিলেন, সেসবের চূড়ান্ত সত্য তিনি জানতে পারবেন।

এই একটাই ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষা এখন অবশিষ্ট আছে তাঁর। অবশ্য তিনি এ-ও উপলব্ধি করেন যে এই আকাক্সক্ষাটুকু যত দিন, তাঁর জীবনও তত দিন। শরীর প্রাচীন হয়েছে। স্বাভাবিকক্রমে কোনো রিপুই আর তাঁকে চঞ্চল করে না। এখন যে মনসিজ কাম, তার উপস্থিতিও তাঁর মনোজগতের কোথাও ছায়া ফেলে না। অথচ শরীরের প্রাচীনতা নিবন্ধন মানসিক জড় এখনো তাঁর অনুভ‚তি বা ব্যবহারে নেই। তথাপি তিনি জানেন, আকাক্সক্ষা ব্যতিরেকে জীবন সম্ভব নয়।

মূলত সচল এবং সজীব থাকার কারণে তিনি মৃত্যুচিন্তা বিশেষ করেন না। সেও মূলত ওই হিরন্নয় পাত্রকে অপাবৃত করার আকাক্সক্ষাকে লালন করেন বলেই। সে কারণেই, এখনো প্রতি উষায় তাঁর বারান্দার পুব প্রান্তে ওই ডেকচেয়ারটিতে বসে তিনি জবাকুসুমসংকাশে দিবাকরের উত্থান দেখেন এবং বেলা শেষে পশ্চিম প্রান্তে বসে তার অস্তগমন। তাঁর আকাক্সক্ষা এভাবেই প্রয়োজনীয় কর্ম খুঁজে নেওয়া। তিনি জানেন, কর্মহীন জীবন সম্ভব নয়, তা প্রকৃতির নিয়মের বিরোধী। কেউ কেউ এসে হয়তো কখনো বলেন, ‘আপনার আর এখন কাজ কী? জীবনের সব কর্মই তো আপনি সমাধা করেছেন। সংসার এখন প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তী প্রজন্ম দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আপনার প্রতিষ্ঠিত বিষয়কর্ম এবং নির্দেশিত কর্তব্যাদি করছে। এখন আর আপনার চিন্তা কী?

উত্তরে তিনি বলেন, তাহলে কি আপনারা আমাকে এবার বিদায় নিতে বলেন?

প্রশ্নকর্তারা থতমত খেয়ে বলে ওঠেন, আজ্ঞে না, তা কেন? বলছিলাম, এখন তো আপনার আরাম আর সুখের সময়।

গোপাল এ জাতীয় বার্তালাপ পছন্দ করেন না। দীর্ঘজীবন নগরবাসী হওয়া সত্তে¡ও তাঁর স্বভাবে একটা বরিশালীয় ঠোঁটকাটা এবং আপাত-কঠোর বাক্য ব্যবহারের অভ্যাস আছে। তিনি বলে ওঠেন, আরাম, সুখ? আপনারা কি ওই বস্তুগুলো আমার মধ্যে খুব একটা কম দেখছেন নাকি?

আজ্ঞে সে কথা না। বলছিলাম যে, সারা জীবন তো ব্যাপক কর্মে জীবনপাত করলেন। নিজের জীবনটা তো কৃচ্ছ্রতায়ই কাটালেন। এখন তো ইচ্ছানুরূপ একটু ভোগবিলাস করতে পারেন।

এবার গোপালের মুখ থেকে আর নাগরিক শীলিত নিরুক্তি বের হয় না। খাঁটি কাশীপুরীয় প্রকৃতিতে তিনি বলে ফেলেন-ভোগবিলাস? মানে কইতে চায়েন যে আমি এহন গোডা কয় রাঢ়ি রাখুম এবং পেটি পেটি বিলিতি মদ আনাইয়া হেইয়া লইয়া থাকমু? জুয়ান বয়সে জমিদার, তালুকদার, উকিল, ব্যারিস্টার বাবুগো হেকালে যেমন দেখতাম হেইরহম?

গোপাল এরকম কথাবার্তায় কোনোকালে অভ্যস্ত ছিলেন না। বলতেনও না হয়তো এঁদের এমনভাবে। কিন্তু এঁদের কে বোঝাবে যে সব মানুষের ভোগবিলাসের ধরন একরকম নয়। এঁদের কথা শুনলে তাঁর মনে হয় যে এঁরা প্রকৃতই অব-মনুষ্য। তিনি তাঁর জীবনের যে ছকটা তৈরি করে নিয়ে জীবনের আশিটা বছর কাটালেন, আজকে তাঁকেই যদি বলা হয় ভোগবিলাস করতে, তিনি কী-ইবা জবাব দিতে পারেন? বিশেষত, যে জিনিসটা তার স্বভাবে নেই, কোনো দিন ছিল না, তাকে তিনি আজ কীভাবে রপ্ত করবেন? এবং কেনই বা? সুতরাং প্রশ্নকর্তারা অগত্যা আর এরকম আলগা খাতিরদারিতে যায় না। হয়তো ভাবে লোকটা কিপটে।

গোপাল আজকাল এভাবেই আপদ বিদায় করে নিজস্ব ভোগবিলাসে ডুব মারেন। তিনি চলে যান তাঁর মা-হারা দিনগুলোতে। এতকাল অভাব ছিল, দারিদ্র্য ছিল, বাপের উদাসীনতা এবং উপায়হীনতা ছিল। কিন্তু সেসব সত্তে¡ও মা ছিলেন, দিদিমা ছিলেন। মাথার ওপর প্রখর রোদ্দুরে ছায়া বিস্তারকারী বটবৃক্ষের মতো। সামান্য দিনের ব্যবধানে তাঁরা পাড়ি দিলেন পরপারের অনির্দিষ্ট ঠিকানায়। আশ্রয় হলো রায়পাশায়, ছোট মামা ছোট মামির সংসারে। কতগুলো জিনিস গোপাল এখনো তাঁর রোমন্থনে মাথায় আনেন না। কাউকে বলেন না সেসব কথা, এমনকি নিজেকেও না।

বস্তুত, ছোট মামার আশ্রয়টি হয়ে উঠেছিল একটি অনাথ আশ্রমের মতো। গোপালদের চার ভাইবোনের দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে না-নিতে তাঁর সেজো মাসিমা এলেন বিধবা হয়ে। সঙ্গে তাঁর এক পুত্র ও দুই কন্যা। সুতরাং, মামাবাড়ির নিজস্ব জনগণ ছাড়াই, অনাথ-অনাথিনী ভাগনে-ভাগনির সংখ্যাই দাঁড়াল সাত। সবচাইতে ছোট বোন, যাকে রেখে মা গত হয়েছেন, তাঁকে লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ল সেজো মাসিমার ওপর। কালে এইসব রীতি-আদর্শ পরিবর্তিত হয়েছে। এসব আর আজকাল দেখা যায় না।

আজও বাঙালি যৌথ পরিবারের প্রশংসা ও নিন্দা সমাজের হিতার্থীরা করে থাকেন। গোপাল জানেন, সংসারের অনেক ক্লেদ এবং কুশ্রীতার নমুনা। যৌথ পরিবারের ইতিহাস মন্থন করলে পাওয়া যায়। কার ছেলেকে আত্ম করা হলো, কার ছেলে আলালের দুলাল, এমনকি কার ভাগের মাছের টুকরো ছোট, কারটা বড় বা কার রোজগার বেশি, কার কম-এইসব নিয়ে নিত্য কোলাহল। বিষমন্থন। গোপাল এসব জানেন। কিন্তু তিনি এ-ও জানেন, ওই বিষমন্থনে অমৃতও উত্থিত হতো। নচেৎ, তাঁরা মাতৃহীন, কেউবা স্বামী বা পিতৃহীন অবস্থায় আশ্রয় পেলেন কীভাবে? বাঙালি যৌথ পরিবারের সমাজ ইতিহাস আলোচনায় এই অমৃত উত্থানের দিকটা কতটা সহৃদয়ভাবে বা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা হয়েছে, গোপালের তা জানা নেই। নীচতা, ক্ষুদ্রতা, কুটিলতা অবশ্যই যৌথ পরিবারে একটা দুষ্ট-ব্রণ। কিন্তু তার জন্য যৌথ পরিবারের আদর্শটাকে গোপাল দায়ী মনে করেন না। আদর্শ মানুষ এবং সমাজ সৃষ্টি করার জন্য এই আদর্শটা ঠিকই ছিল। কিন্তু ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার স্বার্থ-পন্থী বিকাশের মোহ কিছু অভিভোগবাদী পাশ্চাত্য সমাজের অন্ধ অনুসরণকারী তাত্তি¡কের বিচারে যৌথ পরিবারের আদর্শকে সমাজের অগ্রগতির পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। অবশ্য গোপাল মনে করেন না যে ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার প্রয়োজন নেই। যেটা দরকার ছিল, তা হলো প্রাচীন কৌম সামাজিক সম্পর্কটাকে শিক্ষা ও মননের সাহায্যে সুষ্ঠু বিকাশের পথে চালিত করা। রায়পাশায় মামাবাড়িতে সুদীর্ঘকাল কাটিয়ে যেমন, তেমনি শহর বরিশাল বা পরবর্তীকালে কলকাতায় তাঁর কর্মকেন্দ্রে বিভিন্ন যৌথ আবেষ্টনীতে থাকার সময়ে, গোপাল এই ব্যবস্থার ভালো-মন্দ বাস্তবভাবে উপলব্ধি করেছেন। আসল কথাটা হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার প্রসার থাকলে তুচ্ছতা, ক্ষুদ্রতা, কুটিলতা প্রভৃতি সব দোষ পরিহার করা সম্ভব।

করাপুরে যে পাঠশালাটিতে তিনি পরে ভর্তি হয়েছিলেন, সেটি তাঁর জীবনে দ্বিতীয় পাঠশালা। সেখানে হেডপণ্ডিত ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ ঘোষ। এই করাপুর পাঠশালাই গোপালের জীবনের গতি ফিরিয়ে দেয়। হেডপণ্ডিত মশাই এখানে পাটিগণিতের যে বুনিয়াদটি তৈরি করে দেন, তার জেরে ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত অঙ্কের ব্যাপারে তাঁর আর কোনো অসুবিধেই হয়নি। পাঠশালাটির স্থাপয়িতা ছিলেন করাপুরেরই বহুল সম্মানিত, অত্যন্ত সমাজমনস্ক কাশীশ্বর নাগ মশাই। কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে নিজের গ্রামে এই পাঠশালাটি তিনি স্থাপন করেন। তাঁর এক ছেলেকেও এখানেই শিক্ষকতায় নিযুক্ত করেন তিনি। কাশীশ্বর বাবু ছিলেন ইস্কুলের সেক্রেটারি। তাঁর তৃতীয় পুত্র বীরেশ্বর নাগ থাকতেন শান্তিনিকেতনে। বীরেশ্বর বাবু যখন বাড়ি আসতেন, তখন রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত, শান্তিনিকেতনের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে হেডপণ্ডিত মশাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করতেন। হেডপণ্ডিত মশাইও সেই পদ্ধতি অনুসরণের জন্য প্রাণপাত করতেন। গান, আবৃত্তি, অভিনয় ইত্যাদি শেখানোর ব্যবস্থাও যতটা সম্ভব করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই যুগে, প্রত্যন্ত এই গ্রামাঞ্চলে অভিনয়, গান ইত্যাদির চর্চা রক্ষণশীলেরা খুব সুনজরে দেখতেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, শিক্ষাস্থানে এসবের চর্চা করলে ছাত্রদের চরিত্র নষ্ট হবে।

এসবই এখন গল্পকথা বলে গোপালের মনে হয়। কতকাল আগের কথা সব! তথাপি মনে হয় যেন, এই তো সেদিনের কথা। স্মৃতির সায়রে সব স্মৃতি যেন শালুক-পদ্মের মতো জ্বলজ্বল করছে। হেডপণ্ডিত মশাইয়ের কথাই যেন বেশি করে স্মৃতি আলোড়িত করে তাঁর। বড় আলাভোলা। সরল মানুষ ছিলেন তিনি। ছাত্রদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তাঁর বসবাসের স্থান হয়েছিল নাগ মশাইয়ের যৌথ পরিবারে। বাড়ির ছোট-বড় সবাই তাঁকে গুরুঠাকুরের মতো ভক্তি করতেন। ইস্কুলের সময় বাদে। কাশীশ্বর বাবুর বৈঠকখানায় প্রায়ই, সুযোগমতো তিনি ছেলেদের বিশেষভাবে অধ্যয়ন করাতেন। প্রধান বিষয় ছিল বাংলা আর অঙ্ক। তখন পঠনপাঠনে প্রাইমারিতে ইংরেজি ছিল না। হেডপণ্ডিত মশাই বাড়ির ছেলেদের যেমন পাঠাভ্যাস করাতেন, তেমনি উদ্যোগী ছাত্রদের যে কেউ সেখানে গিয়ে তাঁর সাহায্য পেতে পারত। শুধু বিকেলে খেলার সময় ছাড়া। খেলার ব্যাপারটাকেও তিনি শিক্ষার অঙ্গীভ‚ত করে নিয়েছিলেন।

শরীর ও মনের যাতে যথাযথ উৎকর্ষ হয়, সেদিকে পণ্ডিত মশাইয়ের নজর ছিল তীক্ষ্ণ। ফুটবল খেলাটাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। আর দেশি খেলার মধ্যে হাডুডু। বলতেন, আমি বিদেশি শাসনের বিরোধী। কিন্তু ব্রিটিশ আমাদের যা যা ভালো জিনিস দিয়েছে, ফুটবল খেলাটা তার অন্যতম। এরকম সর্বাঙ্গের জন্য ব্যায়াম প্রযুক্ত খেলা আর একটা পাওয়া যাবে না। তবে আমাদের হাডুডু খেলাটাও ব্যায়াম হিসেবে চমৎকার। খুব খেলো, খুব খেলো। পড়া এবং খেলা দুটোকেই সমানভাবে দেখবে। পড়াশোনায় মনের পুষ্টি, আর খেলায় দেহের। দেহে-মনে শক্তি ও সাহস না বাড়লে জীবনে কিছুই করা যায় না।

প্রায় সময়েই ছেলেদের খেলায় তিনি রেফারি হতেন। সপ্তাহে অন্তত দুদিন প্রত্যুষে ড্রিল করানোটাও ছিল তাঁর কাজ। দেহ-মনের শক্তি ও সাহসের কথাটা খুব বললেও, গোপালের মনে পড়ে আজও হাসি পায়, কী অসম্ভব ভীতু মানুষই না তিনি ছিলেন। তাঁর ছিল অসম্ভব রকমের বাঘের ভয়। একবারের কথা গোপালের বেশ মনে আছে। হেডপণ্ডিত মশাই তাঁদের বাড়িতে এসেছেন, যেমন প্রায় প্রত্যেক ছাত্রের বাড়িতেই তিনি পালা করে খোঁজখবর নিতে যেতেন। কথায় কথায় রাত হয়ে গিয়েছিল সামান্য। নাগ মশাইয়ের বাড়িটা একটু দূরে। ছোট মামা তখনো ফেরেননি। পণ্ডিত মশাই বললেন, গোপাল, আমারে এট্টু আউগ্গাইয়া দে দেহি। পণ্ডিত মশাইয়ের বয়স তখন চল্লিশ পেরিয়েছে। গোপাল এগারো কী বারো বছরের। পণ্ডিত মশাই ভয়ে একা যেতে পারছিলেন না। ভয় গোপালের মনে এমনিতে তেমন ছিল না। কিন্তু মশাই বাঘের উল্লেখ করায় তাঁরও বুকটা একটু দুরু দুরু করে যে ওঠেনি, এমন নয়। কিন্তু পাছে তা প্রকাশ পেয়ে যায়, সেই লজ্জায় গোপাল সঙ্গী হলেন। হঠাৎ পেছন দিক থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল। ব্যাপারটা কী, না বুঝেই পণ্ডিত মশাই আর্তরব করে উঠলেন, ‘ওরে দৌড়া, বাঘ আইছে, বাঘ।’ গোপালের পায়ে চটি ছিল। তাতে দৌড়োবার অসুবিধে। মশাই বললেন, জোতা ফ্যালাইয়া দে, পাডাডা।

উল্টো দিক দিয়ে কিছু লোক আসছিল। তারা এঁদের ছুটতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী অইলে? দৌড়ায়েন কিয়া?’

‘বাঘ আইছে, বাঘ।’

তারা শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে বাঘ না। দূরে ওই দিকে কিছু ঘরে আগুন লাগছে। লয়েন আগুন নিভাইতে যাই।’

বস্তুত, তারা সেই কাজেই যাচ্ছিল। ঘরগুলো তখনো জ্বলছিল। শুকনো ঋতুতে গ্রামাঞ্চলে ঘরে আগুন লাগাটা বাঘ পড়ার চাইতে কম বিপদের নয়। কিন্তু মশাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হেয়াও ভালো। আমরা ভাবছিলাম বুঝি বাঘ।’

বাঘের উপদ্রব শীতকালে এসব অঞ্চলে ছিল। তার মধ্যে বেশির ভাগই গো-বাঘা। তবে জঙ্গলপথে কখনো কখনো দু-একটা রয়েল বেঙ্গলও যে আসত না, এমন নয়। গরু-ছাগল, এমনকি মানুষের ওপরও আক্রমণ হতো। গ্রামের লোকেরা অবশ্য এসব ক্ষেত্রে সজাগ-সতর্ক থাকত। খোঁয়াড় পেতে, বিষবাণের ফাঁদ পেতে বাঘকে ঘায়েল করত তারা। গোপাল নিজেই কয়েকবার খোঁয়াড়ে বন্দী বাঘ দেখতে কাশীপুরের জঙ্গলা এলাকায় দল বেঁধে গেছেন। ঘরে আগুন লাগার হাহাকারী দৃশ্যও তিনি দেখেছেন। খাঁচায় বন্দী বাঘকে তাঁর অবশ্যই ভয়াবহ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়া আগুনকে তাঁর মনে হয়েছে ভীষণতর। কিন্তু মশাইয়ের ব্যাঘ্রভীতি এমন যে তিনি যখন শুনলেন বাঘ নয়, ঘরে আগুন লেগেছে। তিনি আশ্বস্ত হয়ে কিনা বলে উঠলেন, ‘হেয়াও ভালো, আমরা ভাবছিলাম বুজি বাঘ।’ গোপাল অবশ্য জানেন যে মশাই আগুন লাগাটাকে তুচ্ছ বোধ করে কথাটা বলেননি, তাঁর বাঘের ভয়ের কথাটার তাৎক্ষণিক প্রকাশটাই এরকম একটা সরলভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু কথাটা আশপাশে বেশ ছড়িয়ে পড়ে। এর বহুদিন পরে যখন একসময় মশাই স্বদেশি মামলায় বহরমপুর ক্যাম্প জেলে বন্দী, তখন তাঁর সহবন্দীরা তাঁকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, এত ব্যাঘ্রভীতি নিয়ে আপনি ব্রিটিশ সিংহের বিরুদ্ধে লড়তে এলেন কী রকম?-মশাইয়ের সোজা-সরল উত্তর ছিল, ‘সিংগ তো আর বাঘ না, হেথে ভয়ের হেতু কী?’-অকাট্য যুক্তি।

এইসব স্মৃতি অমূল্য রঙের মতো গোপাল এখন নাড়াচাড়া করেন। এটাই তাঁর বিলাস, এটাই ব্যসন। এইসব স্মৃতির টুকরোটাকরা প্রাচীন দামি মদের মতো তাঁর কাছে উত্তেজক এবং স্বাদু বলে মনে হয়। অন্য কোনো এলিকজারের প্রয়োজন হয় না তাঁর। ব্যক্তিকে জীবনে চাওয়া-পাওয়ার যে কিছু আছে। এমন তাঁর কখনোই মনে হয় না। অতৃপ্তি অবশ্যই তাঁর আছে। তবে তার সঙ্গে ব্যক্তি হিসেবে চাওয়া-পাওয়ার ক্ষুদ্র চাহিদাগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।

একেক দিন একেকটি বিশেষ স্মৃতি যেন তাঁকে পেয়ে বসে। বিগত কয়েকটা দিন কেটেছে পাঠশালা-জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে। রায়পাশার হরি পণ্ডিতের পাঠশালা পর্বে, বা মা যখন কাশীপুরে সংসার পাতলেন, তখন সেখানকার পাঠশালা-জীবন তাঁর কেটেছিল নিতান্ত অমনোযোগ এবং অনিচ্ছায়। করাপুরের অপেক্ষাকৃত বড় পাঠশালায় এসে পরিবর্তন ঘটেছিল তাঁর। তার পেছনে রয়েছে হেডপণ্ডিত মশাই যোগেন্দ্র নাথ এবং কাশীশ্বর বাবুর ছেলে বীরেশ্বর বাবুর অপরিসীম প্রভাব। বীরেশ্বর বাবুকে অবশ্য কালেভদ্রে পাওয়া যেত। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ তাঁকে ঋদ্ধ করেছেন তাঁর নিরন্তর স্নেহশীল সাহচর্যে। একমাত্র তিনি সেই প্রথম শিক্ষক, যিনি লেখা এবং পড়া ব্যাপারটা গোপালের কাছে আকর্ষক করে তুলতে পেরেছিলেন। গোপালের হাতের লেখা ইতিপূর্বে অত্যন্ত কদর্য ছিল। হেডপণ্ডিত মশাই যেদিন তাঁকে প্রথম পরীক্ষা করলেন সেদিনের কথা গোপালের স্পষ্ট মনে পড়ে। অনেক কিছুই বলেছিলেন তাঁকে তিনি সেদিন। প্রথমেই তিনি বলেছিলেন, তুই তো ল্যাহাপড়ায় বেশ ভালোই। কবিতাডা পড়লি চমৎকার। ছন্দের কান ভালো, উচ্চারণ ভালো, অত্থও যে বোজতে পারছ, পড়া শোনলেই হেয়া বোজোন যায়। তয় ল্যাহার সোমায় এরহম হাইগ্যা রাখলি ক্যান সিলাট ভরইয়া?

ল্যাখথে আমার ভালো লাগে না।

সুন্দার করইয়া ল্যাখথে চেষ্টা কর, দেখফি তহন খালি ল্যাখথেই ইচ্ছা করবে। আর শোন, সবকিছু পেত্থম পেত্থম ভালো লাগে না। তয়, একবার যদি লাগাইয়া ফ্যালাইতে পারো, দেখফি হেয়াইয়া মজা আর কিচ্ছুতে নাই। ‘হস্তাক্ষর সুন্দর হওয়া আবশ্যক’। এই লাইনডা রোজ বিশবার করইয়া এক মাস ল্যাখ দেহি কষ্ট করইয়া অইলেও। কী পারবি না?

পারমু।

আমি জানি, তুই পারবি। না পারলে তোর নাম দিমু প্যাচ্ড়া বা পায়না।

এ-রাম। না হেরম নাম দিবেন না। পায়না প্যাচ্ড়ায় আমার ঘেন্না লাগে।

হেয়ার লইগ্যাই তো। য্যার হাতের ল্যাহা প্যাচ্ড়া, দাউদ, পায়নার ল্যাহান হের নাম প্যাচ্ড়া ছাড়া কী দিমু? তয় যদি পারো, হেলে আর ভয় নাই। হেলে সুন্দার একখান নাম, ভাবইয়া চিন্তইয়া দিমু হ্যানে।

গোপাল সেদিন থেকে যোগেন্দ্র নাথের পরামর্শমতো স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের অক্ষরগুলি নতুন করে লিখতে অভ্যাস করে তাঁর হস্তাক্ষর অপূর্ব সুন্দর করতে পেরেছিল এবং তা এক মাসের মধ্যেই। যোগেন্দ্রনাথ তাঁর অঙ্গীকারমতো গোপালের নাম দিয়েছিলেন মহেন্দ্রনাথ। নামটা বাড়ির সবার বেশ পছন্দ হওয়ায় সেটাই তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে গিয়েছিল।

ছয়

এর পর থেকে গোপালকে মহেন্দ্রনাথ নামে উল্লেখ করাটাই শোভন হবে। রত্নে শ্বর জানতে চেয়েছিল তাঁর বংশচরিত বিষয়ে কিছু তথ্য। তাতে মহেন্দ্রনাথ প্রথমে খুব উৎসাহ দেখাননি। তাঁর স্বভাবে বংশ পুরুষদের বিষয়ে গালগল্প করার প্রবণতা প্রায় নেই। আবাল্য তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে মানুষ। একমাত্র দিদিমা, মা এবং খানিকটা তাঁর মামাদের প্রযত্ন ছাড়া আর একজনের কথাই তাঁর মনে পড়ে, যাঁদের কাছে তিনি কিছু হয়ে ওঠার সহায়তা ইস্কুল-জীবন অবধি পেয়েছেন। তিনি তাঁর সেজো মাসিমা। কিন্তু এঁদের কেউই তাঁর বংশের কেউ নন। সবই মাতৃকুল।

পিতৃকুলে তিনি খানিকটা জানতেন তাঁর বাবাকে। কিন্তু তাঁর বিষয়ে বিতং বলার মতো কিছু আজও তিনি খুঁজে পান না। ভদ্রলোক তাঁর বংশ কৌলীন্যের কল্যাণে একটি মাত্র কাজই করতে পেরেছিলেন, সেটি তাঁর বিবাহ। তাও, তদীয় পিতৃদেবের সৌজন্যে। নচেৎ, একজন সাধারণ গৃহস্থের জীবন গড়ে তোলার ক্ষমতা বা উদ্যোগও তাঁর ছিল না। অথচ, মাঝে মাঝেই পিতৃপুরুষের জমিদারি, জায়গিরদারির কথা তাঁর মুখে শোনা যেত। সেসবের কতটা কিংবদন্তি এবং কতটা বাস্তব, মহেন্দ্র নাথের সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল ঢের। সবটা অবশ্যই বাতেল্লা ছিল না, কারণ স্থানীয় লোকশ্রুতি এবং অন্যান্য কিছু কিঞ্চিৎ প্রমাণও মজুদ ছিল। কিন্তু তাঁদের সব কীর্তি গৌরব লোপ পেতে থাকে মহেন্দ্রনাথের প্রপিতামহের সময় থেকে। পিতৃদেব তো নিজের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা শ্বশুরগোষ্ঠীর জিম্মা করে মৈমনসিংয়ে কোবরেজি ব্যবসার চেষ্টা করে করেই শেষতক মহেন্দ্রনাথের কাছে কলকাতায় এসে দেহরক্ষা করলেন। বস্তুত, মহেন্দ্রনাথ তাঁর পিতৃদেবকে ঠিকমতো চিনতেই পারলেন না জীবনভর।

তবে এ কথা ঠিক যে তাঁদের বংশটি প্রাচীন। সে কাহিনির কিছু কিঞ্চিৎ মহেন্দ্রনাথ শুনেছেন স্থানীয় প্রাচীনদের কাছে, কিছু বা স্থানীয় ইতিহাসগ্রন্থে। অবশ্য সে ইতিহাসও পুরোটা নির্ভরযোগ্য নয়। তথাপি তাঁর এ বিষয়ে যেটুকু খোঁজখবর যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়েছে, রত্নেশ্বরকে তা তিনি বলেছেন।

বাকলা চন্দ্রদ্বীপের শাসনকেন্দ্র আদিতে ছিল বর্তমান বাউফল থানার কচুয়া নামক স্থানে। তৎকালীন বাকলা চন্দ্রদ্বীপ পরগনার আয়তন অনেকটাই বিস্তৃত ছিল। এর উত্তর-পূর্ব দিকে বিশাল বিস্তার মেঘনা নদী। তারই একটি শাখা শাহবাজপুরকে দুভাগ করে ইলসা নামে প্রবাহিত হয়ে আরেকটি বিশাল নদী তেঁতুলিয়া মিশেছে। কচুয়ার অবস্থান এই ইলসা, তেঁতুলিয়ার নিকটবর্তী। পর্তুগিজ পর্যটক র‌্যাল্ফফিচ্ এইসব নদীপথেই চন্দ্রদ্বীপের তৎকালীন রাজা কন্দর্প নারায়ণের রাজসভায় পৌঁছেছিলেন। রাজধানী হিসেবে কচুয়া আদৌ নিরাপদ ছিল না। সে কথার আভাস আগেই কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। মগ, পর্তুগিজ জলদস্যু এবং সামুদ্রিক ঝড়, বন্যা তথা জলোচ্ছাস, এ অঞ্চলের ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা, সবার পক্ষেই বিভীষিকার কারণ ছিল। এ কারণে, কন্দর্প নারায়ণ নিরাপদ স্থানে রাজধানী স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন রামচন্দ্র যুবরাজ।

কচুয়ার অবস্থান মোটামুটি ইলসা আর তেঁতুলিয়ার মোহনা বরাবর। তখন মগ পর্তুগিজ দস্যুদের তাণ্ডবের মহেন্দ্রক্ষণ। মহেন্দ্রনাথের সময়ের বাখরগঞ্জের অধিকাংশ ভূমি তখন, অর্থাৎ কন্দর্প নারায়ণের সময়ে ‘সরকার বাকলা’ নামে পরিচিত। তৎকালীন ভূইয়া রাজা যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের পূর্ব সীমাব্যাপী ক্ষুদ্র স্রোতা যমুনা, মতান্তরে কপোতাক্ষ, দক্ষিণে সমুদ্র এবং উত্তরে ত্রিপুরা রাজ্য এবং ভাওয়ালের কিছু অংশ। এই অঞ্চলের অধীশ্বর ছিলেন কন্দর্প নারায়ণ, এরকমই স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়। অর্থাৎ একসময়ের বাখরগঞ্জের প্রায় দ্বিগুণ বা ততোধিক বিস্তৃত এই অঞ্চল। প্রবাদ আছে, বাকলার পূর্বনাম সরকারি দস্তাবেজে নাকি আছে ফতিয়াবাদ বলে। এসব কাহিনির বেশির ভাগ মহেন্দ্রনাথ বইপুস্তক পাঠ করে এবং বয়োপ্রবীণ শিক্ষকদের কাছে গল্পকথা শুনে জেনেছেন।

যদিও যোগেন পণ্ডিত মশাই ছিলেন অঙ্কের শিক্ষক। কিন্তু তাঁর স্থানীয় ইতিহাস বিষয়ে গল্প বলার ক্ষমতা এবং উৎসাহ ছিল অসাধারণ। তত দিনে, অর্থাৎ করাপুরের শিক্ষালয়ে পাঠকালে মহেন্দ্রনাথ আঞ্চলিক ইতিহাস বিষয়েও সন্ধিৎসু হয়ে উঠেছিলেন। কাশীপুর, রায়পাশা, করাপুর, নথুল্লাবাদ ইত্যাদি গ্রামগুলো চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের কেন্দ্র মাধবপাশা থেকে খুব দূরবর্তী ছিল না। তখনকার দিনে লোকেরা এটুকু পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিত। তাঁর নিজস্ব কৌত‚হল এবং যোগেন পণ্ডিত মশাইয়ের উৎসাহে একাধিকবার মহেন্দ্রনাথ যে মাধবপাশার গড় ও দুর্গাসাগর ইত্যাদি দেখে এসেছিলেন, সেসব আজও তাঁর স্মৃতিতে আহ্বান।

এই রকম এক বেড়ানোর দিনে দুর্গাসাগরের পারের এক গাছতলায় বসে তিনি মাধবপাশার গড়পত্তনের গল্প শুনছিলেন। পণ্ডিত মশাই বলেছিলেন, তোরগো বংশের যে একদিন উন্নতি অইছিল, হেয়ার লগে কৈলোম মাধবপাশার গড় তৈয়ারির এট্টা বড় যোগাযোগ আছে। হেই গল্পডা ভালো করইয়া শুনইয়া রাখ। পেত্যেক মানুষেরই উচিত নিজের বংশের ইতিহাস জানইয়া রাহা। আমি কেডা? আমার বংশপুরুষেরা কী রহম আছেলে, হ্যারগো কোনো কীর্তি-কাহিনি আছে কি না, হেসব জানোন লাগে না?

মহেন্দ্রনাথ আগ্রহী হয়েছিলেন সেসব জানতে। পণ্ডিত আরও বলেছিলেন, ‘যদি জিগাও ক্যান্? হেয়া জানইয়া লাভ? তো আমি কমু, সব লাভ-লোকসানের হিসাব অত সোজা পথে অয় না। আইজ তোরা গরিব। তুই এহানে-ওহানে থাইক্যা ল্যাহাপড়ার চেষ্টা করতে আছ। ছাগুর পড়াইয়া খাওন জোডাও। যদি পিছের কথা জানা থাকে, তয় মনে উৎসাহ জাগবে, কী? না, আমার বংশের মানুষেরা অত বড় আছেলে, আমি কি মানুষ অইয়া একদিন হেই অবস্থার এটটুও কিছু ফিরাইতে পারমু না? জেদ চ্যাতপে মাথায়। ওই জেদই তোরে ঠেলইয়া উডাইবে একদিন।

মহেন্দ্রনাথের তখন যা অবস্থা এবং বয়স পণ্ডিত মশায়ের কথায় তাঁর একবার এমনও মনে হয়েছিল যে দাদা পরদাদারা করে ঘি খেয়েছিলেন আজ গল্পের মাধ্যমে তার গন্ধ শুঁকে কী লাভ? কিন্তু কৌত‚হল তথাপি বোধ করেছিলেন।

পণ্ডিত বলেছিলেন, ‘তহন কন্দর্পরায় রাজা। বংশপুরুষ রাজা রামনাথ ‘দনুজমর্দ্দন দে’র থিকা শুরু করইয়া তিনি নবম পুরুষ। দনুজমর্দ্দনের পূর্বপুরুষের কোনো খবর ইতিহাসে পাওয়া যায় না। যাউক, রাজা-মহারাজাগো উৎস খোঁজতে নাই। বেশি খোঁজলে দ্যাহা যাইবে হে ডাহাইত। আইজ-কাইলকার জমিদার-তালুকদারগো ল্যাহান। যাউক হে কথা। অবইশ্য কেউ কেউ কয়, তারা নাকি রাজা গণেশের বংশ। সয়ত্য-মিথ্যা জানি না।

কন্দর্পরায় হে সময় পেরায় বুড়া। পোলা রামচন্দ্ররায় যুবরাজ। কচুয়া জাগাডা এমন নদীখাল ঘেরা যে পর্তুগিজ আর মগ হামলাবাজেরা নিত্য তিরিশ হেহানে খালি লুটপাট আর খুনখারাপি করইয়া মাইনষের পেরান ওষ্ঠাগত করইয়া ফ্যালাইতে আছে। খালি কচুয়াই তো না, গোটা সরকার বাকলা, অর্থাৎ চন্দ্রদ্বীপ পরগনার অধিকাংশ অঞ্চলেই এই অবস্থা। মহেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেন, রাজার সৈন্যসামন্ত নাই। যুইদ্দ করইয়া হ্যারগো খেদাইতে পারতেন না?

আরে হেয়ার লইগ্যাই তো কন্দর্পরায়ের চিন্তা। তহন দিল্লির বাদশা আকবরের জমানা শ্যাষ, জাহাঙ্গীর বাদশা, অর্থাৎ সেলিমের জমানা সম্ভবত শুরু। ঢাকায় শাসনকত্তা মীর জুমলা বোধ হয়। যাউক, কন্দর্পরায় তো পেরায় সোমায়ই ব্যস্ত থাহেন রাজকাইজ্যে আর মগ পর্তুগিজ খেদাইতে। হ্যার মইদ্যে ঝড়, বইন্যায় দ্যাশ যায় উজাড় অইয়া। উদ্বাগ কি কোম? যাগগো একদিক দিয়া খ্যাদায়, অইন্য দিক দিয়া পর্তুগিজরা হামলা করে। শইস্যে সম্পদে সোনার দ্যাশ অইলে কি অইবে। লুটপাট তো হে কারণেই আরও বেশি।

আসল কথা হচ্ছে কচুয়ার ভৌগোলিক অবস্থান। রাজা শক্তিশালী নৌবলের অধিকারী। বাগদি, বুনো ইত্যাদি সৈন্যসামন্ত সংখ্যা ও শক্তিতে কম নয়। কিন্তু দস্যুরা আক্রমণ চালায় চোরাগোপ্তা। এরই মধ্যে আবার প্রতিবেশী ভূইয়া রাজাদের মধ্যে পারস্পরিক খেয়োখেয়ি। তার মধ্যে প্রধান শত্রু ভুলুয়ার লক্ষণ মাণিক্য। শেলি তখন যুবরাজ। আকবর তখনো জীবিত, সুতরাং সেলিম জাহাঙ্গীর হননি। মোগল প্রতিনিধি। যিনি ঢাকাতে শাসনকর্তা, তিনি সরকার বাকলার কর আদায়ে যত দৃঢ়, মগ পর্তুগিজ শাসনে তার সিকিভাগ ক্ষমতা ধরেন না। সুতরাং, সে দায়িত্ব মূলত ভূইয়াদের। এ অবস্থায় কন্দর্পরায় সাব্যস্ত করলেন, কচুয়া থেকে রাজধানী স্থানান্তর করবেন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অঞ্চলে। ইতিহাস সাক্ষী, মগ পর্তুগিজদের এই অমানুষিক অত্যাচারে সমুদ্রতীর এবং ছোট-বড় নদীতীরস্থ বহু জনপদ এই সময়ে জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। দস্যুদের এই অত্যাচারের শুরুয়াৎ সম্ভবত কন্দর্প রায়ের বাবার আমল থেকে। সম্ভবত তাঁর নাম জগদানন্দ রায় (বসু)।

রাজধানীর স্থানান্তর একদিনে ঘটেনি। প্রথমে স্থান নির্ধারণ হয় বর্তমান বরিশালের উত্তর-পূর্বে বাসুরিকাঠি নামক গ্রামে। সেখান থেকে হোসেনপুর, পরে ক্ষুদ্রকাঠি। কিন্তু বসবাস এবং রাজধানী স্থাপনের জন্য এইসব গ্রামের পরিবেশ অনুক‚লে ছিল না। তাই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হলো মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন। এই কাজে তাঁদের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। মাধবপাশায় সেই সময়ে গাজি উপাধিধারী একজন ক্ষমতাশালী মুসলমান বসবাস করতেন। কন্দর্প রায় মাধবপাশায় রাজধানী করতে উদ্যোগী হওয়ায় গাজির সঙ্গে তাঁর বিরোধ হয়। তখনকার বিরোধের নিষ্পত্তি হতো এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষের নিধনে। কন্দর্প রায়ের ক্ষমতা তখন অধিক ছিল। সুতরাং, গাজি তাঁর হাতে নিহত হন এবং কন্দর্প মাধবপাশার নিরঙ্কুশ অধিকার লাভ করেন।

মাধবপাশাকে রাজধানী রূপে নির্মাণে রামচন্দ্র রায়ের ভ‚মিকা ছিল ব্যাপক। কন্দর্প রায় সম্ভবত ওই সময় যুবরাজ রামচন্দ্র রায়কে তাঁদের নথুল্লাবাদ কাছারিতে অবস্থান করার অনুজ্ঞা দেন। অবশ্য রামচন্দ্র তখন নিতান্তই অল্পবয়সী। তথাপি রাজপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেখানে উপযুক্ত পাত্রমিত্রসহকারে মাধবপাশার নির্মাণকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। তাঁর অভিভাবিকা হিসেবে মহারানি, অর্থাৎ কন্দর্প নারায়ণের মহিষী প্রকৃতরূপে কার্য নির্বাহ করতেন বলে জনশ্রুতি। তাঁরই পরামর্শে এবং কন্দর্প রায়ের অনুমোদনক্রমে রামচন্দ্র নথুল্লাবাদ সন্নিহিত গ্রামগুলিতে বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ইত্যাদি জাতীয় বিশেষ বিশেষ পরিবারের বসতি করান। তাঁদের অনেককেই উপযুক্ত জায়গির, ভূ-সম্পত্তি, রাজকার্যে উচ্চ পদ প্রদান করে, অঞ্চলের উন্নতি বিধান এবং রাজধানী নির্মাণে সহায়তা লাভের ব্যবস্থা করেন। মহেন্দ্র নাথের বংশপুরুষ কৃষ্ণানন্দ দত্ত এবং বিখ্যাত বসু বংশীয় সীতানাথ বসু ইত্যাদি উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাশীপুর গ্রামে রামচন্দ্র রায়ই প্রতিষ্ঠা দেন।

মোটামুটি এই হচ্ছে কাশীপুরের বিষয়ে ইতিহাসগ্রাহ্য তথ্য, অন্তত মাধবপাশার উত্থান-পর্বে, তৎকালীন রাজপুরুষদের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের প্রাক্তন পুরুষদের যোগাযোগের সূত্র। এর সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে হাজার একটা কিংবদন্তি। যোগেন পন্ডিতমশাই সেসব কাহিনি ও বড় সরস আখ্যায় মহেন্দ্রনাথকে বলতেন। যেমন রামচন্দ্র রায়কে নথুল্লাবাদ কাছারিতে পাঠানো উপলক্ষে পণ্ডিতমশাই যে গল্পটি ফাঁদতেন, মহেন্দ্রনাথের কাছে সে বড় মজাদার লাগত। রত্নেশ্বরকে এখন সে কাহিনি বলতে গিয়ে তাঁর মনে এক অদ্ভুত ভাব জেগে ওঠে। কী রকম যেন বিষণ্নতায় এক সুখ বোধ, যেন সেই দিনগুলো, যোগেন পণ্ডিতমশাইয়ের গল্প বলার সরস ভঙ্গি। মাধবপাশার দিঘিরপারের গাছতলার মৃদুমন্দ বাতাস বা সীতানাথ বসুর দিঘির ধারের নারকেল বাগিচায় ছুটির দিনের বৈকালিক সময় কাটানো এবং প্রাচীন কাহিনি শোনার দিনগুলো যদি আবার ফিরে পেতেন, আহা!

পণ্ডিত মশাই বলেছিলেন রামচন্দ্র রায়কে নথুল্লাবাদ পাঠানোর গল্প। সে গল্প নেহাতই আন্দাজি জল্পনা। নচেৎ কে আর বাপ-বেটা আর মায়ের সেই সময়ের বার্তালাপ কানে শুনেছে। কেইবা তা নিয়ে বা সেসব নিয়ে কাহিনি লিখে রেখেছে। কিন্তু যোগেন পণ্ডিতমশাইয়ের বর্ণনা আর কল্পকথা বিন্যাসে শ্রোতাদের কখনোই মনে হতো না যে ঘটনাটা ঠিক ওরকমই ঘটেনি।

‘কন্দর্প রায় পোলারে আল্লাদ করইয়া ডাকতেন রাম্উয়া।’ পণ্ডিতমশাইয়ের এরকম এক প্রকৃতি নান্দীমুখ মহেন্দ্রনাথের খুবই অ-কাব্যিক, অ-রহস্যময় বোধ হয়েছিল। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকথার গল্প বা রূপকথার কাহিনি তাঁর মোটামুটি ভালোই পড়া ছিল। সেসব লেখায় রাজপুত্র, রাজকন্যা, রাজা এবং রানিদের নাম এবং তাদের ব্যবহৃত সংলাপের ভাষার ধরনই আলাদা। কী সুন্দর সেই চরিত্রগুলোর ভাষা, কী চমৎকার সব নাম তাদের। এক অপার রহস্যময়তায় ডুবে যেতে হয় সেইসব গল্পকথা পড়তে গেলে। সুতরাং, মহেন্দ্রনাথ পণ্ডিত মশাইকে প্রথমেই বলেছিলেন, ‘রাজপুত্রের নাম রামউয়া? এয়া কেমন কথা?’

‘ক্যান? অইতে পারে না বুজি?’

‘হ্যারা এরহম ভাষায় কথা কইতেন? রাজারা এরহম কয়?’

পণ্ডিত বলেছিলেন, ‘রাজাডা কোন্ দ্যাশের হেয়া বোজতে অইবে না? রাজার আমলে কি ছাপার অক্ষরে আইজকের কইলকাতইয়া ওই রহম ভাষা আছেলে নাকি? আর হ্যারগো ল্যাহা পড়াইবা কদ্দূর আছেলে জানে কেডা?’

তবে পণ্ডিত ভাষাবিষয়ক কৌত‚হল তাঁর মোটামুটি মিটিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রাজারা হেকালে যে ‘কদ্দরলোকী’ ভাষা ব্যবহার করতেন, তা ছিল হয় সংস্কৃত, নয় ফারসি। নবাব-বাদশার দরবারে কথাবার্তার আদান-প্রদান, চিঠিপত্র বা দলিল-দস্তাবেজের কাজের মাধ্যমে ফারসি বা সময় বিশেষে হিন্দুস্তানি। আঞ্চলিক পণ্ডিতমহলে সংস্কৃত এবং সাধারণ্যে স্থানীয় সংলাপ। ‘বাকলা চন্দ্রদ্বীপ অথবা বাখরাগঞ্জে অথবা বইশ্যাল-যা কও, হেহানে পোলার লগে, বউর লগে, পেরজাপত্তনের লগে কি রাজায় বঙ্কিমি, বিদ্যাসাগরী ভাষায় কথা কইবে? সুতরাং, তোরে যেমন বেয়াকে, এমনকি তোর বাপ-মা, মামা-মামিরা গোপালইয়া ডাহে, কন্দর্প রায়ও রামচন্দররে বামউয়া ডাকতে, এয়া একচের হাছাইও কথা। থাউক, এহন গপ্পোডা শোন।’ বলে, পণ্ডিতমশাই তাঁর গল্পে গতি নিয়েছিলেন। রাজা নাকি রামচন্দ্রকে তাঁর মায়ের সামনে ডেকে বলেছিলেন, ‘অ্যাই হারামজাদা, দিনে দিনে তো দামড়া অইতে আছ। বয়স তো বারো-তেরো অইচে। আমি এহন আর একলা পারি না। মাধবপাশার গড় তৈরির কাম দেহা দরকার। ইদিকে মগ হালারপো হালারা দশমিনা গেরামে রোজ হানা দিতে আছে। হিদিক সামাল দিতে যাইতে অইবে আমার। রাজার কর্তৃত্বে এটটা লস্করের দল নতুন করইয়া বানাইতে আছি। হেহানে লস্কর বাড়াইতে অইবে। তুই এক কাম কর, কুলধ্বজ মহলানবিশ মশায় নথুল্লাবাদের কাছারিতে কত্তা। হেনায় কাশীপুর গেরামে একখান গৃহ নির্মাণ করছেন আমাগো দরকারে ব্যবহারের লইগ্যা। তুই এহন থিহা হেইহানে থাকপি।’

রাজার কথা শুনে মহারানি নাকি বলেছিলেন, দুধের শিশু, ও ওহানে যাইয়া ক্যামনে থাকপে? অর দেহন, শোনোন তত্ত্ব-তালাশ কেডা লইবে?

রাজা বলেছিলেন, ওসব নসু নসু ভাব লইয়া রাজত্ব চলে না। তেমন বোজো তো নিজে লগে যাও। ওহানে আমি কৃষ্ণানন্দ দত্ত নামে এক কায়স্থ মহাশয় ব্যক্তিরে বসত করাইছি। আরও অনেক ঘর কায়স্থ নামডাকওলাও হেহানে কেউ আগের থিহা আছে, কেউ পরে গেছে। বেশির ভাগই আমার চেনা এবং গুণগ্রাহী। অসুবিধা অইবে না। বাওনও কয়েক ঘর ভালোই বওয়াইছি বেম্মোত্তর দিয়া।

‘রামুর বয়সটাও তো দ্যাখফেন।’ রানির উক্তি। কন্দর্প রায় বললেন, ‘অরতো হেহানে করনের কিছু নাই। হেহানে কাছাকাছির মইদ্যে রডা আছে, কীত্তনখোলায় নৌবহর লইয়া টহলদারিতে। রামউয়ারে হে কামান-বন্দুক চালান শেখাইবে, সময়-অসময়। অসুবিদা কী?’

সুতরাং, স-জননী রামচন্দ্র রায় তদবধি কাশীপুর, নথুল্লাবাদ, মাধবপাশায় কাজকর্ম দেখতে ও শিখতে তৎপর হলেন। এই সময় তাঁর প্রকৃত পরিচালকম লীর মধ্যে, অন্যান্যদের সঙ্গে কৃষ্ণানন্দ দত্ত ছিলেন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তারই কনে, পরবর্তী সময়ে রামচন্দ্র রায় তাঁকে বিপুল সম্পত্তির মালিক করেন। মাধবপাশা গড় নির্মাণে কৃষ্ণানন্দকে রামচন্দ্র সবচাইতে মূল্যবান ব্যক্তি মনে করতেন।

যা-ই হোক, যোগেন্দ্র ঘোষ মশায়ের শিক্ষায় নিম্ন প্রাইমারি ও উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষায় মহেন্দ্রনাথ, অর্থাৎ গোপাল ভালোই ফল করেছিলেন। কিন্তু এ জন্য তাঁর পিতৃদেবের যে আদৌ কোনো উৎসাহ বা অবদান ছিল, এমন স্মৃতি তাঁর নেই। সেই মানুষটি এমনিতেই বাস্তবজ্ঞান-রহিত ছিলেন। স্ত্রী গত হলে ছেলেমেয়েদের দায়দায়িত্ব শ্যালকদের ওপর চাপিয়ে তিনি আরও উদাসীন হয়ে গেলেন এবং মৈমনসিংয়ের কোবরেজি নিয়ে দিন গুজরান করতে লাগলেন। উচ্চ প্রাইমারি পাস করার পর তাই কেউই আর তাঁর পড়াশোনার ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করছে না, দেখে, বছর খানেক তাঁকে গ্রামেই বসে থাকতে হলো। বছর দুয়েকের মাথায় বড় মামা তাঁকে বরিশালে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন একজন কনট্রাক্টর। তাঁর বরিশালের বাসার দেখাশোনা, সংসারের কাজে তাঁকে সাহায্য করার জন্যই প্রধানত মহেন্দ্রনাথের সেখানে যাওয়া। মামার একমাত্র ছেলে, অতিরিক্ত আদরে নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, সংশোধনের জন্য তাকে তার মামাবাড়ি বানারীপাড়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার মামা সেখানে স্কুলের পণ্ডিত ছিলেন। সে সেখানেই পড়াশোনা করতে থাকল।

মহেন্দ্রনাথের এখন মনে হয়, সে যুগটা যেন বাঙালি সমাজের মাতুল-তন্ত্রের যুগ। পিতৃকুল কোনো রকম সমস্যায় পড়লে বা না পড়লেও ভাগনেদের, ভাগনিদেরে দায়িত্ব যেন মাতুলদেরই পালন করতে হবে, এরকমই একটা অলিখিত নিয়ম মহেন্দ্রনাথের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত ব্যাপক চালু ছিল। অধুনাকালে তিনি এই ব্যাপকতা আর তেমন দেখতে পান না। মনে মনে হাসি চাপতে পারেন না তিনি। তাঁরা ভাইবোনেরা নিজেদের মামাবাড়ি আর মামাতো ভাই তার মামাবাড়ি। এ বড় চমৎকার ব্যবস্থা। এ নিয়ে যে মতান্তর, মনাক্তর হতো না, এমন নয়। তবে তার জন্য ভাগনে-ভাগনিদের খুব যে সমস্যায় পড়তে হতো এমনও নয়। ‘মামাবাড়ি ভারি মজা, কিল চড় নাই’ এরকম ব্যবস্থাও যেমন সর্বত্র ছিল না, আবার ‘মামি এল ঠেডা নিয়ে ফুরুৎ করে পালাই’ এমন অবস্থার উদ্ভবও যে কোথাও ঘটত না, তা-ও নয়। তবে মহেন্দ্রনাথ স্মৃতি হাতড়ে অসহনীয় কোনো পরিবস্থার কথাও মনে করতে পারেন না। ভালোয়-মন্দে মামাদের বাড়ির কাল তাঁর ভালোই কেটেছে।

বড় মামার কথায় ব্রজমোহন স্কুলে চেষ্টা করতে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হতে বললেন। বয়সে ছোট মামাতো ভাই তখন ক্লাস ফোরে। অভিমানে ঘা লাগল। ইংরাজিতে খারাপ ছিলেন তিনি। পাঠশালায় ইংরাজি শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং আরও এক বছর বাড়িতেই পড়াশোনা এবং থ্রি ও ফোরের ইংরাজি পাঠ্য শেষ করেন। পরের বছর ক্লাস ফাইভে ভর্তির জন্য ব্রজমোহন স্কুলে পরীক্ষা দিলেন। কিন্তু ইংরাজি সমস্যা। মনে আছে, অনুবাদ করতে বলা হয়েছিল ‘আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ দেখা যাইতেছে।’ পারলেন না। সবচাইতে মজার হলো, ‘আমার আছে’ কথাটির ইংরাজি কী হবে জিজ্ঞেস করায়। প্রথমে বলেছিলেন ও যধাব, কিন্তু পরে ভুল হয়েছে ভেবে সংশোধন করে বলেছিলেন গু যধাব, ক্লাসে হো হো হাসি। না, তিনি এসবে দমেননি। তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল এই যে অন্যান্য বিষয়ে তিনি কিছুমাত্র পিছিয়ে ছিলেন না এবং ইংরাজি পড়তে তাঁর কোনো ক্লেশ হতো না। অন্য একজন শিক্ষক তাঁকে কিছু পড়তে দিয়েছিলেন ইংরাজি বই থেকে। ভালোই পড়েছিলেন তিনি এবং তাঁকে ফাইভে ভর্তি করে নেওয়া হয়েছিল।

যখন ক্লাস সেভেনে, তখন বরিশালের বাসায় মামার তিন বোনের বোনের তিন ছেলে। অর্থাৎ মাতুলতান্ত্রিক শিক্ষা ও পরিপালন ব্যবস্থা। মামা ভাবলেন, এই পরিবেশে থাকলে, অন্যদের সাহচর্যে হয়তো তাঁর শালার ভাগনেও ভালোভাবে পড়াশোনা করবে। কিন্তু তা হবার ছিল না। ওই বয়সেই ছেলে যথেষ্ট কাপ্তেন তৈরি হয়েছিল এবং সবচাইতে বড় কথা, পড়াশোনায় তার আদৌ মন ছিল না। সুতরাং, তাকে পুনরায় তার মাতুলালয়ে পাঠাতে হলো। বড় মামা বোধ হয় খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তাই ভাগনেদেরও অতঃপর অন্যত্র ব্যবস্থা করতে বললেন। সুতরাং, অন্যতর সন্ধান এর পর থেকে মহেন্দ্রনাথ, শিক্ষার ব্যাপারে প্রায় পুরোটাই স্বনির্ভর।

এক মাসতুতো দাদা পড়তেন কলেজে। তাঁর উদ্যোগে কলসকাঠির জমিদারের দ্বার পÐিতের বাড়িতে সাময়িকভাবে থেকে সেখানকার স্কুলে পড়াশোনা। এরপর নিজেই উদ্যোগ নিয়ে, জমিদার বাবুর সহায়তায় সেখানকার বাজারের এক দোকানদারের বাড়িতে জায়গির থেকে থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন মহেন্দ্রনাথ। বরিশালের গ্রাম এলাকার স্কুলে, দূরবর্তী গ্রাম থেকে আগত শিক্ষার্থীদের জায়গির থেকে পড়া একটা পুরোনো পদ্ধতি। জায়গির থাকা মানে, কোনো গৃহস্থ বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে গৃহকর্তার ছেলেমেয়েদের পড়ানো। মহেন্দ্রনাথও সেরকম একটি ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মুশকিল ছিল এই যে তাঁর ছাত্রটি তাঁর চাইতে এক ক্লাস নিচে পড়ত। যদিও বয়সে সে ছিল মহেন্দ্রনাথের চাইতে বেশ কিছুটা বড়। মহেন্দ্রনাথকে তার সঙ্গে ‘আপনি আজ্ঞে’ করে কথা বলতে হতো। মুশকিল অবশ্য সেটা নয়। তাঁর কাছে পড়া আরম্ভ করার কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্রের বিবাহকর্মটি সমাধা হয়। এর পর থেকে পাঠাভ্যাস কালে, পড়ার চাইতে বেশি মাত্রায় ছাত্রের দাম্পত্য লীলা ও অভিজ্ঞতার গল্প শোনা মাস্টারের ক্ষেত্রে প্রায় বাধ্যতামূলক হয়। ব্যাপারটা মহেন্দ্রনাথের ক্রমশ স্বাভাবিক রুচির বাইরে চলে যায়।

একদিকে ছাত্র পড়াশোনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। এমনও শোনা যাচ্ছিল যে, সে তার স্ত্রীকে প্রহার পর্যন্ত করে। ফলে তিনি ওই বাড়ি ছেড়ে দোকানদারের এক শরিকের বাড়িতে স্থান করে নেন। ওই সময়ে মহেন্দ্রনাথের এমন কিছু অভিজ্ঞতা হয়, যেসব কথা স্মরণ করলে আজকে, এই বয়সেও তাঁর লজ্জা এবং বিরক্তির পরিসীমা থাকে না। এখনো সেসব স্মৃতির গল্প তিনি কারোর কাছেই খোলাখুলি বলতে পারবেন না। রত্নেশ্বর একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, কথাটা কী বিষয়ক? মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সেসব সামাজিক ব্যভিচার। বলার মতো রুচি হয় না আমার।

রত্নেশ্বর চেয়েছিল, জেঠাবাবু (মহেন্দ্রনাথ) সবকিছু পরিষ্কার করে বলুন। তৎকালীন সামাজিক আচার, বিচার, ব্যভিচার সবটা জানলেই তো যুগটা সম্বন্ধে ধারণা হবে। তার ইচ্ছার কথাটা মহেন্দ্রনাথকে জানাতে সে পীড়াপীড়ি কররে, তিনি তখনকার মতো রত্নেশ্বর কে এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন, পরে একদিন বলব। রত্নেশ্বর বুঝেছিল, জেঠাবাবু সেই সময়ের তথাকথিত ভদ্রলোক মধ্যবিত্তদের যৌন নৈতিকতার বিষয়ে কোনো কথা বলতে গিয়েও বলতে পারছেন না। সে লক্ষ করেছে মহেন্দ্রনাথ এসব ব্যাপারে অসম্ভব নৈতিকতাবাদী এবং সেই নৈতিকতা পারিবারিক এবং সামাজিক বিশ্লেষণে পর্যন্ত একধরনের ‘ট্যাবু’র সৃষ্টি করে তাঁর বক্তব্যকে অস্বচ্ছ রাখে। অথচ, মহেন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোরের সময়কার সমাজকে বুঝতে গেলে এসব প্রসঙ্গ অবশ্যই জরুরি।

পরে এক লঘু মুহ‚র্তে একদিন রত্নেশ্বর তার খাতা লেখা প্রসঙ্গে বিষয়টি উত্থাপন করে। মহেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুই কি আমারে লইয়া নাটক, নভেল ল্যাখথে চাও নাকি?’

‘আমিই লেখমু এত বড় কথাডা কইথে পারি না, তয় আমার ইচ্ছা আপনের শিক্ষা, কর্মজীবন এবং গোটা জীবনযাপন লইয়া একখান জীবনীমূলক নভেল ল্যাহা হউক।’

‘ও। তার অত্থ, তুমি এহন আমারে খোচাইয়া জানতে চাবা আমি কী কী অপকম্ম করছি, বা দেখছি, এই তো?’

‘আইজ্ঞা হেয়া না। আপনের সোমায়ের সমাজটার পরিচয় তো পাওন লাগে। আপনে সোমাজটারে কীভাবে দ্যাখছেন, হে কথাডাও বোজোন দরকার।’

‘হুঁ। বোজলাম। তয়, আমার লগে যা যা প্যানাপোডো হেইসব এ্যদ্দিন তোর খাতায় ল্যাখছ, না?’

‘আইজ্ঞা। কিন্তু আপনের তো হেইরহমই আদেশ আছিল।’

‘ভালো। তয় এয়া লেইখ্যা কোনো ফয়দা অইবে হ্যামন বাসি না। আমার কর্মজীবন তো জানোই, আমি পরিচিত একজন প্রকাশক হিসেবে। বইয়ের প্রকাশক এবং প্রেস-সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক কাজকর্ম। আমার অন্য কথা, অর্থাৎ শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনকালের, যা যা মনে পড়বে, আমি যেমন যেমন পারি কইয়া যামু। দ্যাখ, হেয়া লইয়া কোনো বই অয় কি না। তয় আষাঢ়ইয়া পাদা-গপ্প কিন্তু আমার ধাতে সয় না। আর এ্যদ্দিন যা যেডুক ল্যাখছ, হেয়া আগে আমারে শুনা। হ্যারপর, যা জানতে চাও কমু হ্যানে।

সাত

রত্নেশ্বর, যতটুকু লিখেছিল, তার জেঠাবাবুকে শোনালে তিনি বলেছিলেন, ‘তথ্যাদিতে ভুল নাই। আমি নিজে ল্যাখলে পারি না সয়ত্য, তয় মোছথে পারি ভালো। ওই কামডাই আমার আসল কাম আছেলে কি না। যাউক, আউগ্গাইয়া যা, যেমন যেমন কই। বাইল্যকালের আরও কিছু কথা কওনের আছে। আগে মন দিয়া শোন, পরে গুছাইয়া লেখফি।’ সেদিনও রত্নেশ্বর তাঁর ছাত্রটির বিষয় জানতে উৎসুক হয়েছিল। মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পরে-এহন না।’

রত্নেশ্বর সেভাবেই খসড়া করেছে। এখন আমি লেখক হিসেবে রত্নেশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মহেন্দ্রনাথের পরিক্রমায় ঢুকে পড়েছি।

মহেন্দ্রনাথের প্রথম পছন্দের শিক্ষক এবং মানুষ যোগেন্দ্র ঘোষ মশাই। উচ্চ প্রাইমারি পর্যন্ত তাঁর কাছে মহেন্দ্রনাথ অঙ্কের বিষয়ে পাঠ নিয়ে, সেই পদ্ধতিতে চলে, মেট্রিকে যে অঙ্কে লেটার পেয়েছিলেন, সে জন্য আজও তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। যোগেন পণ্ডিতমশাই যে তাঁকে শুধু অঙ্কেই পারদর্শী করেছিলেন এমন নয়। তাঁরই শিক্ষা এবং সাহচর্যে অভিনয়, গান, সাহিত্য, শিল্প বিষয়ে চর্চার অভ্যাসটিও রপ্ত করেছিলেন তিনি।

বাড়িতে লক্ষ্ণীর পাঁচালি, মনসামঙ্গল, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির পাঠ শুনে সেসবের ছন্দ মনে গেঁথে গিয়েছিল। করাপুরের পাঠশালায় পরীক্ষার ফল ভালো হলে একখানি শিশু উপযোগী পদ্য রামায়ণ উপহার পেয়েছিলেন। আজও তার কিছু কিছু অংশ, এই আশি অতিক্রান্ত কালেও মনে ছন্দের আলোড়ন জাগায়। ‘সুন্দর সরুয তটে/ চিত্রসম চিত্রপটে/ মনোহর অযোধ্যানগর।’ পরবর্তীকালে এই ছন্দপ্রীতি এবং শিশু উপযোগী গ্রন্থ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তথা নির্মাণ তাঁর জীবনের এবং জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠাটা কি সেদিনের এই ব্যাপারগুলির মধ্যে নিহিত ছিল? এরকম ভাবনা আজও তাঁর মনে জাগে।

এই কবিতা, ছড়া তথা সামগ্রিকভাবে বললে ছন্দপ্রীতি বেশি করে প্রস্ফুটিত হয়েছিল বরিশালে ব্রজমোহন স্কুলে পড়ার সময়। ওই সময় থেকেই শিশুদের জন্য পত্রিকা ‘সন্দেশ’ বের হচ্ছিল। সুকুমার রায়ের কালজয়ী সব ছড়া এবং কবিতা তখন প্রকাশ পাচ্ছে। মহেন্দ্রনাথ সেসব ক্লাসে পড়ে শোনাতেন সবাইকে। শিক্ষকেরা অনেক সময় ভেবেছেন অনুষ্ঠান করে সেসব সবাইকে শোনাবেন তাঁরা। বিভিন্ন ক্লাসে তাঁকে নিয়ে কবিতা, ছড়া আবৃত্তি করাতেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তাঁর পক্ষে হয়ে ওঠেনি। কারণ, মামাবাড়ির আশ্রয় তখন আর ছিল না। বড় মামা সেখানে তাঁর বাসার পড়–য়াদের ভিন্ন ব্যবস্থা করতে আদেশ দেওয়ায়, মাসতুতো দাদার ব্যবস্থামতো কলসকাঠির স্কুলে যেতে হলে ব্রজমোহন স্কুলের সেই আবেষ্টনীর বাইরে গিয়ে পড়তে হয়। ব্যাপারটা সাময়িকভাবে মানসিক অস্থিরতার কারণ হয়েছিল। ব্রজমোহন ইস্কুলে থাকতে দুজন আশ্চর্য মানুষের সংসর্গ কখনো কখনো পাওয়া যেত। একজন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অশ্বিনীকুমার এবং আর একজন জগদীশ ভট্টাচার্য মশাই, ইস্কুলের হেডমাস্টার।

মহেন্দ্রনাথ বিশ্বাস করেন, অশ্বিনীকুমার প্রকৃতই মহাত্মা ছিলেন। অন্তত বরিশালবাসীর কাছে তো বটেই। ধর্মীয় মত বা সাম্প্রদায়িক কোনো স্বার্থে নয়, রাজনীতিকে ভক্তিবাদী আধ্যাত্মিকতার আদর্শে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সেই আধ্যাত্মিকতার স্বরূপ আলাদা। সাধারণ মানুষ সেখানে অধিকর্তা, ক্ষুদ্র জাত, পাত, সম্প্রদায়ের বিতণ্ডার সেখানে স্থান ছিল না। মহেন্দ্রনাথ জানেন, তাঁর এই মানসিকতার পেছনে ছিল স্বামী বিবেকানন্দের তথা রামকৃষ্ণের শিক্ষা। তাঁর রাজনীতির অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক ছিলেন স্বামীজি।

মহেন্দ্রনাথ তখন ছাত্র। তাঁর মনে আছে, তিনি যেদিন ভর্তি হন, স্কুল থেকে তাঁকে একখানি ছাপা পুস্তিকা দেওয়া হয়েছিল। তাতে বিশটি উপদেশ মুদ্রিত ছিল। মুখবন্ধে লেখা ছিল : ‘আমরা বিদ্যালয়ে ও গৃহে উভয় স্থলেই তোমার ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করিব। তোমার প্রতি আমাদের তত্ত্বাবধান বিদ্যালয়ের ছুটি হওয়ার সঙ্গে শেষ হইবে না।’ কথাটি অশ্বিনীকুমারের ভক্তিযোগেও আছে। (ভক্তিযোগ ১৫ সংস্করণ, পরিশিষ্ট দ্র.)। অশ্বিনীকুমার বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎভাবে পরিচিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। কিছু কথাবার্তাও তাঁদের হয়েছিল। অশ্বিনীকুমারের সঙ্গে নরেন্দ্রর আলাপ-পরিচয় থাকুক, রামকৃষ্ণদেবের এরকম একটা ইচ্ছে ছিল বলে মহেন্দ্রনাথ শুনেছিলেন। কিন্তু প্রথম দর্শনে আলাপের সুযোগ ঘটেনি। প্রথম দর্শনটি ঘটেছিল রামকৃষ্ণভক্ত রামদত্তের বাড়িতে। পরবর্তী দর্শন এবং আলাপ ঘটেছিল এর প্রায় বারো বছর বাদে আলমোড়ায়। দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল তখন দুজনে। মহেন্দ্রনাথের মনে আছে, তাঁর ছাত্রজীবনে অশ্বিনীকুমারের বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি এর উল্লেখ পেয়েছিলেন। তদানীন্তন কংগ্রেসের তেজহীনতা এবং আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি বিষয়ে বিরক্ত বিবেকানন্দ অনেক কথাই অশ্বিনীকুমারকে বলেছিলেন। তবে কংগ্রেস যেখানে জনসাধারণের জন্য কিছু করেছে, সেখানে তাঁর সহানুভ‚তির কথাও তিনি বলেছিলেন। তিনি একটি কথার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেছিলেন যে সব রকম সংস্কারই ধর্মের ভেতর থেকে করতে হবে। যে ধর্ম হৃদয়ে বল দেয় না, তাকে তিনি মানেন না। অশ্বিনীকুমার স্বামীজির কথা অক্ষরে অক্ষরে নিজে পালন করতেন এবং তাঁর অনুগামীদেরও পালন করার নির্দেশ দিতেন।

মহেন্দ্রনাথ অশ্বিনীদত্তের যতটুকু শিক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পেয়েছিলেন তারই প্রভাবে তাঁর রাজনৈতিক এবং কর্মজীবনের আদর্শে নিজেকে যে তৈরি করতে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন। আজ এই জীবনযাত্রার অন্তিমে এসেও তা অস্বীকার করেন না। হ্যাঁ, সেই প্রচেষ্টায় যে তিনি কোনো শৈথিল্য রাখেননি। তা বিনয়ের সঙ্গেও তিনি বলেন না। এটা তাঁর অহংকার।

বাক্যালাপ হয়নি, অথচ প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছেন, এরকম আরেক ব্যক্তিত্বের কথা মনে পড়ে মহেন্দ্রনাথের। তিনি এক সন্ন্যাসী। মহেন্দ্রনাথ তাঁকে দূর থেকেই দেখেছেন। তখনো তিনি সন্ন্যাসী নন, ব্রহ্মচারী। ব্রহ্মচারী সতীশচন্দ্র। পরবর্তীকালে সন্ন্যাসাশ্রমে প্রবেশ করে যাঁর নাম হয়েছিল স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী। বরিশাল শহরের বিখ্যাত শঙ্কর মঠের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি, যে মঠ বরিশালের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল।

স্বামীজি যখন ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার স্বনামখ্যাত জগদীশ মুখোপাধ্যায় মশাইয়ের বাড়ির পুব দিকে একটি আশ্রম করে তাঁর ব্রহ্মচর্য জীবন অতিবাহিত করছিলেন, তখন মহেন্দ্রনাথ প্রায় প্রত্যহই একটু দূর থেকে, আশ্রমের বিষ্ণুমূর্তির সামনে তাঁর উদাত্ত মন্ত্রপাঠ শুনতেন। তখন মহেন্দ্রনাথ নয়-দশ বছরের বালক। সেসব দিনে তাঁর মনে হয়নি যে পরবর্তীকালে প্রজ্ঞানানন্দের জীবনাদর্শে তিনি প্রভাবিত হবেন। হয়তো তখন বালক মহেন্দ্রনাথকে কখনো তিনি কাছে ডেকেছেন, কিছু উপদেশ দিয়েছেন, কথাবার্তাও বলেছেন। কিন্তু তার কিছুই আজ আর স্মরণে নেই। শুধু মনে আছে, কবে যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে যায়। এর প্রায় বছর নয়েক বাদে, তিনি তাঁকে জানলেন, যখন তাঁর মরদেহ শঙ্কর মঠে সমাধিস্থ করার জন্য নিয়ে আসা হলো। গোটা শহর সেদিন সেই মঠে উপস্থিত হয়েছিল। সেখানে মহেন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন।

কিন্তু সে অনেক পরের কথা। একটা মাত্র ঘটনার কথাই মনে পড়ে তাঁর এই স্বামীজির বিষয়ে। তখন বাল্যের সেই কঠিন সময়ের দিন। কিশোর মহেন্দ্রর ওপর নির্ভর করে মা সংসারটা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। সেই দিনগুলোকে এখন নাম দিতে ইচ্ছে করে, ‘মাটির পালোর’ দিন। বরিশালের রাস্তার হেন অলিগলি ছিল না, যেখানে তিনি তাঁর সামগ্রী নিয়ে বিক্রির জন্য বসতেন না। একদিন শঙ্কর মঠের খানিক দূরে একটা গলির মুখে ‘পালো’ আর সুপারি নিয়ে বসেছেন। তখন তেমন বেলা হয়নি। খদ্দের পাতি আসাও শুরু হয়নি। জায়গাটা ঠিক বাজার নয়, তবে কাশীপুর ইত্যাদি স্থান থেকে গ্রাম্য লোকেরা সামান্য সাধারণ জিনিস নিয়ে বেচার জন্য বসে। ঘটনাটা সেই রকম সময়ের একটা দিনের।

সম্ভবত প্রাতর্ভ্রমণ শেষ করে ব্রহ্মচারী সতীশচন্দ্র তাঁর আশ্রমের দিকে যাচ্ছিলেন। উন্মুক্ত উজ্জ্বল গৌরবর্ণ দেহ। পরিধানে সাদা বহির্বাস। শরীর থেকে যেন জ্যোতি ঠিকরে পড়ছে। মহেন্দ্রর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি কৌত‚হলী হয়ে তাঁর বিক্রেয় দ্রব্যগুলি দেখলেন। পালো বস্তুটা বোধ হয় তাঁর পরিচিতির মধ্যে ছিল না। সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এগুলো কী হে?’

‘আইজ্ঞা শড়ির পালো।’ সতীশচন্দ্র বস্তুটির বিষয়ে তাঁর কাছে নানান প্রশ্ন করতে, মহেন্দ্রনাথ কথা প্রসঙ্গে অনেক কিছুই তাঁকে বললেন। তখন বিদেশি দ্রব্য বর্জনের যুগ। স্বদেশিকেরা ব্রহ্মচারী বোধ হয় বার্লি, অ্যারারুটের পরিবর্তন হিসেবে দেশীয় রোগী ও শিশুপথ্য পালোর উপযোগিতার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু মহেন্দ্রনাথের মুখে পালো উৎপাদনের প্রায় অমানুষিক শ্রম এবং তার অকিঞ্চিৎকর বিক্রয়মূল্য বিষয়ে তথ্যাদি জেনে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। মহেন্দ্রনাথ তখন সাত-আট বছরের বালক। তিনি মহেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাবা কোথায়?’

‘আইজ্ঞা, তিনি তো ময়মনসিং থাকেন, কবিরাজি নাকি করেন, আমি ঠিক জানি না।’

‘সংসারে টাকাপয়সা পাঠান না?’

‘রোজগার ভালো না। মাজে মইদ্যে যা পাডায়েন হেতে সংসার চলে না। মায়ের খুব কষ্ট।’

‘তোমার এই কাজ করতে ভালো লাগে?’

‘না করলে যে মায়ের কষ্ট অইবে।’

সতীশচন্দ্র বললেন, ‘শোনো, একটা কথা মনে রেখো, সব কাজই কাজ। তুমি এখন ছো। হয়তো কথাটা বুঝবে না, তবু বলছি। আজ দেশ একটা বড়ো ওলোট-পালটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমাকে নানান কাজকর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কোনো কাজকেই ছোট ভাববে না। তোমার ভেতরে থেকে যিনি তোমাকে দিয়ে এই পরিশ্রমের কাজ করান, সেই হৃষিকেশ তোমাকে যখন যে কাজে নিযুক্ত করবেন, সেই কাজকেই নিজের কাজ এবং দেশের কাজ মনে করে করবে। গীতার নাম শুনেছ?’

‘মা, দিদিমার ধারে শুনছি। দিদিমা রোজ গীতা পড়েন।’

‘তুমি লেখাপড়া করো?’

‘কাশীপুরের পাঠশালায় মাজে মইদ্যে যাই।’

‘কোন ক্লাস?’

‘ফাইভ। আমি দিদিমার বাংলা গীতা পড়তে পারি।’

‘এরপর সংস্কৃত গীতা পড়বে। আরও একখানি গীতা নামধারী গ্রন্থ আছে,-প্রপন্ন গীতা। দেখবে সেখানে লেখা আছে, “কেনাপি দেবেন হৃদিস্থিতেন-যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।” শ্লোকটা মনে রাখবে। তোমার এই জিনিসগুলি স্বদেশি ভান্ডারে দিয়ে ওখান থেকে পয়সা নিয়ে যাও। বোলো, ব্রহ্মচারী সতীশচন্দ্র বলেছেন। এর পর থেকে তোমার বা তোমার পরিচিত আর আর যারা পালো বিক্রির ব্যবসা করে, তারা সবাই স্বদেশি ভান্ডারে সব দিয়ে আসবে। উপযুক্ত মূল্য পাবে, আমি বলে দেব।’ ব্রহ্মচারীর সঙ্গে মহেন্দ্রর তাঁর জীবিতাবস্থায় আর দেখা হয়নি।

তথ্যসমৃদ্ধ হলেও, রত্নেশ্বরের খাতাটি বড় অ-গোছালো। মুশকিল হয়েছে তার মধ্যে ধারাবাহিকতার অভাবটা বড় প্রকট। কিন্তু সেটা তার ত্রুটি নয়। মহেন্দ্রনাথ যখন তার সঙ্গে অতীত জীবনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন, তখন তাঁর বয়স আশি অতিক্রম করেছে। এই বয়সে মানুষের স্মৃতির ধারাবাহিকতা প্রায় থাকে না। তথাপি অসামান্য শরীর এবং মনের অধিকারী মহেন্দ্রনাথ তাঁর প্রায় অধিকাংশ কর্মকাণ্ডের স্মৃতিই রত্নেশ্বরের জিম্মায় রেখে যেতে পেরেছেন। রত্নেশ্বরের খাতাটি পড়তে গিয়ে বুঝতে পারছি, কী অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী তিনি ছিলেন। তবে এক একদিন এক একটা সময়ের বিশেষ বিশেষ কথা বা ঘটনা তাঁর মনজুড়ে বসত, যা একটা ধারাবাহিক শৃঙ্খলায় বাঁধা খুবই কঠিন।

সতীশচন্দ্র পরবর্তীকালে বরিশালে শঙ্কর মঠ স্থাপন করেন। তখন তিনি আর ব্রহ্মচারী সতীশচন্দ্র নেই, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী। ১৯১৩ সালের কথা। সতীশচন্দ্র ওই বছরে গয়াতে গিয়ে স্বামী শঙ্করানন্দ সরস্বতীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন। তদবধি তাঁর নাম প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী। শঙ্করানন্দ সরস্বতী দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী ছিলেন এবং তাঁর সন্ন্যাস ঘরানা বিশুদ্ধানন্দ সরস্বতীর ধারায়। সন্ন্যাসী হয়েও প্রজ্ঞানানন্দ যে তাঁর পূর্বাশ্রমের অভ্যস্ত বিপ্লববাদী কাজকর্ম পরিত্যাগ করেননি, সেই বিষয়টি মহেন্দ্রনাথ বড় গভীর সন্ধিৎসার সঙ্গে গোটা জীবন স্মরণে রেখেছেন। রত্নেশ্বর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘জেঠাবাবু, আপনে তো কইলেন, স্বামীজি নাকি একজন অসামাইন্য আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ আছিলেন, বৈদান্তিক পণ্ডিত মানুষ। তয় হেই ব্যক্তি বিপ্লববাদী কাজকম্মে লিপ্ত অইলেন কেমন করইয়া?’ মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘দ্যাহ, হেয়া অনেক কথা। মুহে কইতে পারমু না। একখান জীবনী লেখছিলাম স্বামীজির। হেহানে সব কথা না অইলেও, মোটামুটি উত্তর পাবা। পড়ইয়া দেইখ্য। তয় এইডুক কই, বিবেকানন্দও কিন্তু বৈদান্তিক সন্ন্যাসী আছিলেন। আমি বিশ্বাস করি, তিনিও একজন বিপ্লববাদী। এঁরা যে যুগের মানুষ তহন, যেকোনো যুক্তিবাদীই বৈদান্তিক প্রভাব এড়াইতে পারেন নায়। মার্ক্সবাদী দর্শন তহন এ দ্যাশে বিস্তৃতি পায় নায়। পাইলে কী অইতে হেয়া জানি না।’ রত্নেশ্বরের মনে হয়েছিল, জেঠাবাবু বিপ্লববাদ বা তাতে তাঁর অংশগ্রহণ বিষয়টা নিয়ে খুব খোলাসা করে বেশি কিছু বলতে চান না। অথবা সেই যুগে তাঁদের গুপ্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকালে যে মন্ত্রগুপ্তির অভ্যাসটা তাঁরা রপ্ত করেছিলেন, সেটা তাঁর অভ্যাসে রয়েই গেছে। একদল বিপ্লবী নামধারী যেমন পরবর্তীকালে অসম্ভব সব বাতেল্লাবাজি করে শ্রোতাদের কাছে বাহাদুরি নিতেন, জেঠাবাবু সেই ধরনের মানুষ ছিলেন না। সব কাজেই তাঁর নিজস্ব একটা ধরন তৈরি হয়েছিল, যেটা স্বামীজির শিক্ষাতেই হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। স্বদেশি আন্দোলন মানেই যাঁরা বোমা, পিস্তল, সাহেব খুন, দারোগা খুন মনে করেন, তিনি সে দলের নন। স্বামীজির সেই শ্লোকটি তাঁর কাছে সারা জীবন বিপ্লবের মূলমন্ত্র হয়েই থেকেছিল। ‘যথা নিযুক্তোহস্মি’। স্বামীজির বিষয়ের ওপর খোঁজখবর করতে গিয়েও তাঁর মনে হয়েছে, তিনি বোমা-পিস্তলের ব্যবহারকেই বিপ্লবের একমাত্র কাজ মনে করতেন না। তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি বটে, তবে অশ্বিনীদত্ত প্রবর্তিত ‘স্বদেশবান্ধবে’র কার্য নির্বাহ করা এবং সাধারণের সেবা তথা তাদের মধ্যে মেলামেশা করাটাকেই অধিক প্রাধান্য দিতেন। সেখানে আগুনখেকো বিপ্লবীরই প্রাধান্য ছিল না।

মহেন্দ্রনাথের মনে পড়ে স্বদেশি আন্দোলনের সময়ের কথা। তখন থেকেই বরিশালের ঘরে ঘরে শোনা যেত ছোট-বড় নেতাদের নাম। ক্রমানুসারে তাঁরা হলেন, অশ্বিনীকুমার, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতা প্রমুখ। বঙ্গভঙ্গের সঙ্গে স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার তখন। মহেন্দ্রনাথ তখন ওই সাত-আট বছরের হবেন। কাশীপুরের কাছাকাছি থেকে দেখেছেন স্বদেশি নেতা নিশিকান্ত বসুকে। মানুষকে উজ্জীবিত করতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন, বক্তৃতা করতেন। তখন থেকেই কি তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এই আন্দোলনের প্রতি? কিন্তু তাঁর এ-ও মনে আছে যে এর মর্ম তখন তিনি হৃদয়ঙ্গম করতে পারতেন না। তখন অরন্ধন, রাখিবন্ধন ইত্যাদি ব্যাপারস্যাপার অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন বটে, তবে সেসব বিষয়ে তাঁর কিছু করণীয় আছে কি না ভেবে দেখেননি। তাঁদের বয়সীদের এই আন্দোলনের মধ্যে টেনে আনাও হয়নি তখন। এই আন্দোলনের জন্য শাসক সম্প্রদায় যে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করত, তা-ও দেখেছেন তিনি। গুর্খা পুলিশের ক্যাম্প বসানো, তাদের প্রতিহতকরণের জন্য লোকদের লাঠিসোঁটা নিয়ে তৈরি হয়ে থাকা-সবই স্মৃতিতে আছে। এ জন্য যে বিচলিত বোধ করতেন, তা-ও মনে আছে। সেসব অনেক আগের কথা।

স্বদেশি আন্দোলনের দিকে তখনো তিনি আকৃষ্ট হননি। রত্নেশ্বর এদিন সরাসরি কিছু প্রশ্ন করেছিল। তার খাতা দেখে তেমনই মনে হয়েছিল আমার। বোধ হয়, তার মনে হয়েছিল, জেঠাবাবু শুধু আশপাশ কথাই বলে যাচ্ছেন। তাঁর নিজের বৃত্তান্ত কিছুই বলছেন না। আসলে সে কৌত‚হলী ছিল মহেন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ড বিষয়ে। অশ্বিনীদত্ত, স্বামীজি, অমুক, তমুক, এঁদের বিষয়ে অনেক বৃত্তান্তই তো বইপুস্তকেই আছে। মহেন্দ্রনাথ কী করলেন? রত্নেশ্বর প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি ঠিক কবে এই আন্দোলনের ব্যাপারে ওই যারে কয় আলোড়িত অইলেন?’

‘কলসকাডি ইস্কুলে পড়ার সোমায়।’

‘কীরহম ভাবে?’ ‘আমাগো হেডমাস্টার মশায় খবরের কাগজ থিকা যতীন মুহইজ্জা অর্থাৎ বাঘা যতীনের বালেশ্বরের যুইদ্দ কাহিনি পড়ইয়া শুনাইছিলেন। হেই দিন থিকা আমি, আর আমাগো ক্লাসের কেউ কেউ প্রতিজ্ঞা করছিলাম, আমরা স্বদেশি কাজকাম করমু। তয় বিএম কলেজে পড়থে যাওয়ার আগে সক্রিয় কাম কিছু করি নাই।’

‘আপনার রাজনৈতিক জীবনের কথা শোনতে বড়ো ইচ্ছা করে।’

‘কমু। তয় তুই যদি ভাবইয়া থাকো যে আমি একজন মারাত্মক বিপ্লবী আছিলাম বা বিখ্যাত অহিংস গান্ধীবাদী-হেলে ভুল করবি। যা কই শোন। আমারে বড়ো করার লইগ্যা বাহাদুরি মার্কা কথা গল্প বানাইয়া যেন লেহিস না, হেয়া আমার পছন্দ না।’ তারপর মহেন্দ্রনাথ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কর্মকাণ্ড, তাঁর মতাদর্শ সবিস্তারে বলেছিলেন।

প্রবল নাড়া খেয়েছিলেন তিনি বালেশ্বর যুদ্ধের আত্মদানের কাহিনি শুনে। খবরের কাগজে সেসব বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছিল। সেটা ১৯১৫ সালের ঘটনা। তখন মহেন্দ্রনাথ কলসকাঠি ইস্কুলের ছাত্র। যদিও তখন তাঁর বয়স প্রায় ষোলো অতিক্রান্ত, কিন্তু অনিয়মিতভাবে স্কুলজীবন যাপনের কারণে তিনি তখন মাত্র ক্লাস সেভেন কি এইটের ছাত্র। ১৯২০-তে তিনি মেট্রিক বা এন্ট্রান্স পাস করেন এবং ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেই বছরই নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ, গান্ধীর নেতৃত্বে। বরিশালও পিছিয়ে থাকল না। চলল-পিকেটিং, সভা, মিছিল। জাতীয় নেতারা ছাত্রদের উদ্দেশে আবেদন জানালেন, ‘গোলাম তৈরির কারখানা ইস্কুল-কলেজ বর্জন করো।’ প্রবল আবেগে অনেকের মতোই মহেন্দ্রও ভেসে গেলেন। গোপাল মুখোপাধ্যায়, নরেন সেন প্রভৃতি ছাত্রনেতারা সেই সময়ে বিখ্যাত। তাঁদের জোরালো বক্তৃতায় উদ্দীপিত হয়ে মহেন্দ্রনাথ কলেজ ছেড়ে দিলেন।

‘বেবাকে ভাবল এডা এ্যাট্টা হেই বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের ল্যাহানই আরেকটা হুজুগ। কামেও দ্যাহা গেল যে কিছুদিন পর যারা যারা কলেজ ছাড়ইয়া দিছিল, হ্যারা আবার কেলাশে ফেরতে আছে।’-বলেছিলেন মহেন্দ্রনাথ। কেউ আবার ‘জাতীয় পরিষদ’ পরিচালিত টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি অইয়া গেল। আমি আর ফেরলাম না। একজন শিক্ষক ছিলেন, শরৎচন্দ্র ঘোষ। তাঁর বক্তৃতা মহেন্দ্রর কাছে বড় মর্মস্পর্শী হয়েছিল। অসামান্য আত্মত্যাগী এবং দেশসেবায় উৎসর্গীকৃত প্রাণ মানুষ। অসম্ভব বাগ্মিতার সঙ্গে তিনি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। তাঁর সংসার পরিচালনার জন্য স্বরাজ অফিস থেকে টাকা পাঠানো হতো। মহেন্দ্রনাথই সেই টাকা পৌঁছে দিতেন তার বাড়ি। তখন তিনি ভলান্টিয়ার এবং শরৎবাবু চাকরিহীন, রোজগারহীন। পরবর্তীকালে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। আশ্রমজীবন যাপন করেন। ‘তহন তৈরি হইতে আছিলাম যাতে পুরোপুরি দ্যাশের কামের লইগ্যা আত্মনিয়োগ করতে পারি।’

রত্নেশ্বর মহেন্দ্রনাথের এ কথা শুনে জিজ্ঞেস করল, ‘হয়তো আপনে অহিংস গান্ধীপন্থী রাজনীতিতেই ভিড়ইয়া পড়লেন। সশস্ত্র বিপ্লবের পথ কি ছাড়ইয়া দিচ্ছিলেন?’

‘দ্যাহ, আমি সশস্ত্র বিপ্লববাদী, না অহিংস গান্ধীবাদী, না পরবর্তীকালের কমিউনিস্ট মতবাদী-হে কথা আইজ তামাইত আমি নিজেই বোজতে পারলাম না। তোমারে বুজামু কী? তয়, আমার কথাগুলো যদি মোডামুডিও তোমারে কইথে পারি, তয় বোজবা যে আমি আসলে নির্বিবাদী। কিন্তু হেয়ার অত্থ এই না যে আমি সুবিদাবাদী। যাউক, এই কথাডা আমি বেশি কমু না। নিজে বুজইয়া লবা। সব কথা নিজের মুহে কইলে বাহাদুরির মতো শোনায়। এইডা আমি ঘোর অপছন্দ করি।’ এইসব কথার সময় মহেন্দ্রনাথের মেজাজটা এদিন বেশ খোল ছিল। অন্যথায় তিনি খুব একটা প্রফুল্ল থাকেন না। আসলে বয়সটা তাঁর অনেকই হয়েছে কো, এরকম রত্নেশ্বরের মনে হয়েছিল। তবে রত্নেশ্বর বুঝেছিল মহেন্দ্রনাথ একজন স্বদেশপ্রেমী এবং দলমত-নির্বিশেষে সব প্রকৃত দেশহিতৈষীর জন্য তিনি অকাতরে স্বার্থত্যাগ করতে পারতেন। দলীয় কোন্দলে তাঁর কোনো দিনই রুচি ছিল না।

‘আসলে’ মহেন্দ্রনাথ বলছিলেন, ‘আসলে আইজকে তোমরা কংগ্রেস ব্যাপারডা যেমন বোজো, আমাগো সোমায়তো হেরহম আছিল না। তহন সব দলমতই কংগ্রেসের মইদ্যে। গান্ধীপন্থীরাও কংগ্রেস, সশস্ত্র বিপ্লবপন্থীরাও কংগ্রেস। হ্যারগো মইদ্যে বিরোদ বিসংবাদ য্যামন আছিল, একের লগে অইন্যের ব্যক্তিগত নানান সাত্থের কারণে নষ্ট অইয়া গ্যালে। আমার মতো কিছু কোম বুদ্দির মানুষ এহনো বোধ হয় আছে হ্যারগো হেডা নষ্ট অয় নায়। হেয়ার কারণ মুনে অয় এই যে আমরা একটা সোমায়ের পর দলীয় রাজনীতিতে থাকি নাই।’

সুদীর্ঘ জীবনের প্রায় সবটাই কর্মময়তা। প্রথম জীবনে প্রথম সারির বিপ্লবীদের সংসর্গ। সহজ সাধারণ কর্মের মধ্য দিয়েই তাঁদের সঙ্গে পরিচয়। স্বদেশসেবার বিবিধ কর্মের কোন ধারায় তিনি চলবেন-তা তাঁরাই ঠিক করে দিয়েছিলেন। এই বিপ্লবীদের সবাই তৎকালীন বরিশালের ‘যুগান্তর পার্টি’র নেতৃবৃন্দ-অরুণ গুহ, মনোরঞ্জন গুপ্ত, তারকেশ্বর সেন, দেবেন ঘোষ, নলিনী কুমার বসু প্রমুখ এবং মূলাধারে প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী ওরফে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করে তো ছিলেনই। পরবর্তীকালে, কমিউনিস্ট মতাবলম্বী মুজফ্ফর আহমেদ, ভবানী সেন, প্রমোদ দাশগুপ্ত ইত্যাদি প্রখ্যাত নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মুজফ্ফর আহমেদের দোষ অসুস্থতার সময় যখন তিনি এমপি জ্যোতির্ময় বসুর বাড়িতে ছিলেন, মহেন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন। ১৯৬৭’র পর প্রমোদ দাশগুপ্তের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তিনি এবং মহেন্দ্রনাথ একত্রে ১৯৩৫-এ দেউলি বন্দিশালায় একই ঘরে পাশাপাশি খাটে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন। মহেন্দ্রনাথের অনুরোধে প্রমোদ বাবু ভবানী সেনকে দিয়ে মার্ক্সীয় দর্শনের ওপর বক্তৃতার ব্যবস্থা করেছিলেন ক্যাম্পে। এখন আশির দশকের এই শুরুতে সেইসব দিনের গল্প মহেন্দ্রনাথ রত্নেশ্বরের কাছে বলেন এবং এই সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

সেদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো মহেন্দ্রনাথের কথা শুনে যাচ্ছিল রতেœশ্বর। জিজ্ঞেস করেছিল, ‘জেঠাবাবু, আপনে তো জেলেও গেছিলেন? না?’

‘ওয়া তেমন কিছু না। ওয়া লইয়া কিছু কওনের নাই। প্রথমবার গ্রেফতার হওনের ব্যাপারডা একছের পোলাপানইয়া ব্যাপার।’

‘এ্যাট্টু কয়েন না শুনি।’

‘হেয়াও শুনবি? তয় শোন। বিলাতের যুবরাজ আইবে, অত্থাৎ প্রিন্স অব ওয়েলস। বোম্বাই শহরে নামবে। হেডা ওই যে বচ্ছর কলেজ ছাড়লাম। ১৯২১ সাল। সারা ভারত হরতাল। বইশ্লালতো যায় হগলতির আগে। আমি তহন ভলান্টিয়ার। হরতাল মোকাবেলা করার লইগ্যা আলেকান্দা পাড়ায় সরকারি অফিসাররা এ্যাট্টা বাজার বওয়াইলে। আমাগো উপার নেতাগো পরামশশো, পিকেটিং করতে অইবে।

পিকেটিং করতে আছি। এক সরকারি এজেন্ট, বোজতে পারি নায়, আমাগো কয় কীÑ“ইউনিয়ন জ্যাক পোড়াও, বিটিশ অপদস্থ হউক।” কথাডা আমাগো খুব পছন্দ অইলে। হেই ব্যাডাই কয়েকখান পতাকা এ্যাট্টা লাডিতে বান্ধইয়া আন্ইয়া দিল। হেথে আগুন দিয়া জাক্কৈর দিলাম, “বন্ধে মাতরম”। এ কারণে গুর্খা পুলিশ ধাওয়া দিল। আমরা আইজও দৌড়, কাইলও দৌড়।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী। পতাকা পোড়াবার সোমায় পুলিশ আমাগো নাম লেইখ্যা নিছিল, কিন্তু ঠিকানা আছিল না। ঠিকানা জানার লইগ্যা গেল স্বরাজ অফিসের ইনচার্জ দুগ্গা বাবুর ধারে। দুগ্গা মোহন স্যান, “বরিশাল হিতৈষীর” সম্পাদক। হেনায় কইলেন, “কাইল ওগো খবর পাডামু, এইহানে আইয়া গ্রেফতার করইও।” তো খবর শুনইয়া গেলাম, সব কয়জোনেরে হাতকড়া পরাইয়া জেলে ঢুকাইয়া দিল। আমরা বইশ্শালের হিরো অইলাম।’

‘সাজা কী অইল?’

‘দুই মাস ধরইয়া বিচার চলল। বিচারক আছিলে একজন আইরিশ ম্যাজিস্ট্রেট। জিগাইলে, “তোমরা পতাকা পোড়াইছ?” কইলাম, “হ।” আবার প্রশ্ন, “তোমরা জানো এয়ার মানে কী, এথে কী অইতে পারে?” কইলাম, “না। ব্যাপারডা আমরা ভাবইয়া দেহি নাই।” বিচারে সাজা অইল এক বচ্ছর সশ্রম কারাদÐ। আমরা বরিশাল জেলে বন্দী থাকলাম। এই অইল আমার প্রথম বন্দিজীবন। খারাপ আছিলাম না। মাইরধইর অয়নায় কিছু। একলগে পাঁচজোন আছিলাম। খাওনদাওনের চিন্তা নাই। খারাপ থাকমু ক্যান?’

আট

এবারে কাহিনির সামঞ্জস্যতা এবং বিন্যাসের খাতিরে আমার নিজের এবং রতেœশ্বরের বিষয় কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। আমার নিজের বিষয়ে অবশ্য বর্তমান বিষয়বস্তুর প্রেক্ষিতে তেমন কিছু বলার নেই। শুধু এইটুকু বলি যে মহেন্দ্রনাথ দত্ত নামক ব্যক্তিটির পরিচয় আমি বরিশাল শহরের এক অতিবৃদ্ধ ব্যক্তির বৈঠকখানায়, পুরোনো দিনের গপ্পো বলিয়েদের আড্ডায় পাই। বৃদ্ধের নামটি বলা যাবে না, বিশেষ কারণ আছে। পদবি মুখার্জি। বাসাটি ঝাউতলার প্রথম গলিতে। তাঁর বৈঠকখানা ঘরটিতে প্রতিদিন বিকেলে একটি মনোরম আড্ডা বসত। বরিশাল অশ্বিনী দত্তের শহর। মহাত্মা স্বয়ং আড্ডাবাজ ছিলেন। এই মুখার্জি বাবুর আড্ডাটিও অশ্বিনী কুমারের মতোই উদার এবং খোলাখুলি ভাষা সংলাপ ব্যবহার, গান এবং পুরাতনী চর্চার আসর ছিল। সেখানে বয়স, জাত-পাত এবং শ্রেণি-নির্বিশেষে শ্রোতা ও বক্তাদের সমাবেশ হতো। আড্ডাটি নিয়ে এত বিস্তারিত বলার কারণ এই যে এখানের উপস্থিত ব্যক্তিদের অনেকেই অশ্বিনী দত্ত, জগদীশ বাবু, প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী ইত্যাদিদের দেখেছেন। আমি যে সময়টার আড্ডার বিষয়ে বলছি সেটার সময়কাল গত শতকের একষট্টি-বাষট্টি সাল হবে। কিন্তু সে যাক।

মোদ্দা কথাটা হলো, মহেন্দ্রনাথের নামটা এবং তাঁর কিছু বাল্যকীর্তি সেই আসরে আমি প্রথম শুনি। তখনকার দিনে ওই বয়সী লোকদের অলস আড্ডায় স্বদেশি আন্দোলন এবং বিপ্লববাদী বা অহিংস অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে এন্তের বাতেল্লাবাজি হতো। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমি স্বয়ং বরিশালি ভাটিপুত্র এবং ওই সময়ে বিএম কলেজে অধ্যয়নরত। ওই আড্ডায় আমার গতায়াতের দুটি গূঢ় প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমি স্বয়ং বরিশালি ভাটিপুত্র এবং ওই সময়ে বিএম কলেজে অধ্যয়নরত। ওই আড্ডায় আমার গতায়াতের দুটি গূঢ় কারণ ছিল। মুখার্জি মশাইয়ের গুটি তিনেক ডাঙর হয়ে ওঠটা কন্যা ছিল। ওই আড্ডাধারী একজন গায়ক তাদের গান শেখাতেন। মহাশয়ের নাম নারায়ণ সাহা। বরিশালবাসী তৎকালীন সব বয়সী মানুষই তখন অত্যন্ত মধুর কণ্ঠের অধিকারী এই গানের মাস্টার মশাইকে চিনতেন। তাঁর গান শোনা এবং মুখার্জি কন্যাদের কনিস্টাটিকে দেখাটা আমার সেখানে গতায়াতের গূঢ় আড্ডার বিবিধ গল্প গেলা।

মহেন্দ্র দত্তের প্রসঙ্গ উঠেছিল ১৯৪৭ থেকে ’৫২-৫৩ পর্যন্ত বরিশাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দেওয়া উদ্বাস্তুদের নিয়ে আলোচনা সূত্রে। হারানচন্দ্র কর্মকার নামক একজন বয়স্ক ব্যক্তি বলছিলেন বরিশাল সেবা সমিতির ত্রাণশিবিরের গল্প। মুখার্জি মশাই বলেছিলেন, ‘ওডাতো আমাগো মহেন্দ্রর কীত্তি। মহেন্দ্র আমাগো ছোডোকালের বন্ধু।’ আড্ডার গল্পের সমস্যার এই যে তাতে বিষয়বস্তুর শৃঙ্খলা থাকে না। আলোচনাটা যখন হারান কর্মকারের উদ্বাস্তু ত্রাণশিবিরের খিচুড়ি খাওয়ার বিষয়ে নিবদ্ধ, তখন মুখার্জি মশাই সেটা টাল খাইয়ে দিলেন মহেন্দ্র দত্তের ‘ছোডো কালের গপ্পে’। অবশ্য সে গল্পও বেশ রোচক বলেই সবার মনে হলো। কারণ তার মধ্যে ছিল স্বদেশি যুগের পরাণকথার ছোঁয়া। মুখার্জি বাবু ১৯২০-২১-এর অসহযোগ আন্দোলনের সময়ের কাহিনিতে চলে গেলেন। তার কারণও ছিল। তিনি নিজে ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মহেন্দ্রনাথ, তিনি এবং আরও অনেকেই কলেজকে ‘গোলামখানা’ জ্ঞানে, কলেজ ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কেন গান্ধীজির অহিংসতা এঁদের মনে তেমন শিকড় গাড়েনি। মহেন্দ্র তাঁর সহপাঠী ছিলেন, উভয়েই একসঙ্গে কলসকাঠি বিদ্যালয় থেকেই এন্ট্রান্স পাস করেছিলেন। পরিচয় ইস্কুল-জীবন থেকেই।

‘হেই আন্দোলনে বোজ্লা’, মুখার্জি মশাই তাঁর পাশে বসা নারায়ণ মাস্টার মশাইয়ের উরুতে একটি প্রকাÐ চাপড় মেরে বললেন, ‘হেয়া তোমাগো কমু কি, শারামজাদা গুর্খা পুলিশরা একদিন এমন ধাওয়া আমাগো দিলে, যে আমরা যে যেদিগে পারলাম দৌড়াইয়া পলাইলাম। ঘডনাডা, বোজলানি নারায়ণ, ঘডনাডা আছিল ওই প্রিন্স অব ওয়েলস। ওই ব্যাডা ইন্ডিয়ায় আইবে। আমাগো স্বদেশিগো হেইয়ার লইগ্যা রাগ। তো ভিড়ের মইদ্যে চেচাইয়া কইয়া দেলাম, প্রিন্স অব ওয়েলস-হালারপো হালাÑগো ব্যাক।’ নারায়ণ সাহা বললেন, ‘শোনলে কেডা?’

‘শোনোনের মাইনষের অভাব? ঘডনাডা অইলে আলেকান্দায়, যেহানে সরকারি অফিসাররা হরতাল বানচাল করনের লইগ্যা বাজার বওয়াইছেলে। হেহানে দেশি ফেউরা তো কোম আছিলে না। হ্যারগো মইদ্যেই কেডা যেন অফিসারের কানে উডাইলে কথাডা। পরে শুনছি, হেই সাহেব পুলিশ দুগ্গা বাবুরে জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইজ আলার পো আলা? দুগ্গাবাবুর নীতি আছিল জানোই তো, তোমার কাম তুমি করো, হ্যারগো কাম হ্যারা করুক। কিন্তু উড়হ’ঃ ঃবষষ ধ ষরব. খবঃ ঃযব ঃৎঁঃয ৎবসধরহ ধষধিুং ঁহনৎড়শবহ. সুতরাং তিনি কইলেন, হালার পো হালা সবধহং, ংড়হ ড়ভ ঃযব নৎড়ঃযবৎ রহ ষধ,ি যিড় রং ধ নৎড়ঃযবৎ রহ ষধি ঃড়ড়. ওঃ রং ধহ ধফারংব ংষধহম।

সব শ্রোতা সমস্বরে বললেন, ‘তারপর?’

‘তারপর আর কী। এক মাসের জেল। কিন্তু হেডা তো গপ্পো না। গপ্পোডা অইলে মহেন্দ্রর কাÐ। হে আর হ্যার লগে আরো চাইর জোনÑবেয়াকের এক বছরের সশ্রম মেয়াদ। হ্যারা এ্যাট্টা বড়ো কাÐ ঘডাইছেলে। ইউনিয়ন জ্যাকে আগুন দিয়া জাক্কৈর দিছিলে, “বন্দে মাতরম। ব্রিটিশ সাম্রাইজ্যবাদ নিপাত যাউক।”’

নারায়ণ সাহা সম্ভবত ‘বোজনা কিনা’র চাপড়টাতে ব্যথা পেয়ে থাকবেন। এট্টা অবশ্য মুখুজ্জে বাবুর বিখ্যাত মুদ্রাদোষ। এই কারণে আমরা তাঁর পাশে বসতে চাইতাম না। অবশ্য তাঁর স্বভাব ছিল আড্ডার মধ্যে কেউ সেখানে উপস্থিত হলে, কাছে ডেকে বসাতেন। যাহোক, নারায়ণ বাবু বললেন, বোধ হয় একটু তাঁতাবার জন্যই, ‘মোডে এক মাস হাজত?’

‘না। পরে আবার ধরছিল একটা অন্য কেসে।’

‘হেডা কী?’

‘স্বদেশি বন্দীগো ভাঙ্কের লাড়– দেওয়া। হেডা ঠিক সিডিশাস কি না কওন যায় না। তয় কেসটা পড়ছিলে এক আইরিশ ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে। ভাঙের ব্যাপারডা ঠিক আবগারি আইনের আওতায় পড়ে না। আবার স্বদেশিগো লগে যে রাজদ্রোহ বিষয় সহযোগিতা করছি হেডাও না। তো ঠিক মনে নাই, কী যেন একটা ধারায় ছ’মাসের মেয়াদ অইলে।’

‘জামিন দিলে না?’

‘না। বাবায় উকিলরে কইলেন, জামিন মুভ করইও না। থাহুক কিছুদিন জেলে। নিশ্চিন্ত থাকুম।’

‘মহেন্দ্র দত্ত কি ভাত খাইতেন?’

‘না। লগে আর যে চাইরজোন, হ্যারগো কেউ কেউ খাইতে। হ্যারা মুকুন্দ দাসের চ্যালা আছিলে, যাত্রাটাত্রা করতে। সুতরাং, অনেক গুণেই গুণী আছিলে।’

মুখার্জি মশাইয়ের কথা গল্পে মহেন্দ্র মহেন্দ্রনাথ সম্পর্কে অনেক কথা জানা গিয়েছিল। মহেন্দ্রনাথ মুখার্জি মশাইয়ের সহপাঠী ছিলেন ঠিকই, তবে সমবয়সী বন্ধু ছিলেন না। মুখার্জি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, পড়ালেখা যথাবয়সে করতে পেরেছেন, এন্ট্রান্স পাসও। কিন্তু মহেন্দ্রনাথ আলাভোলা, অকর্মা বাপের ছেলে। শৈশব, কৈশোরের বেশির ভাগটাই কেটেছে মামাদের সাহচর্যে, মামাবাড়িতে। ধারাবাহিকভাবে লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। মুখুজ্জের চাইতে অন্তত বছর চারেকের বড়ই ছিলেন তিনি। মুখুজ্জে যখন বিএম কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন, তখন তাঁর বয়স পনেরো পেরিয়ে ষোলো, আর মহেন্দ্রনাথ প্রায় কুড়ি-একুশ। আইনত, মুখার্জির বিচারটা হওয়া উচিত ছিল জুভেনটিল নিয়মে। কিন্তু তখন ডামাডোলের ব্যাপার। ঝাঁকের মধ্যে পড়ে তিনি স্বদেশি কয়েদি। নারায়ণ বাবু বললেন, ‘আপনার ব্যাপারডা বেশ যেন “না বিয়াইয়া কানাইয়ের মা”Ñহেই রহম, নাকি কয়েন?’

মুখার্জি বাবুর একটা সুবিধে এই যে, তিনি কানে বেশ কম শোনেন। সেই সুযোগ নিয়ে আড্ডায় অংশগ্রহণকারীরা সমানে টিপ্পনী কাটেন। হারান কম্মকার বললেন, ‘আমি কইথে আছিলাম ত্রাণশিবির চালানোর কথা।’ নারায়ণ সাহা বললেন, ‘হারানদা তোমার গপ্পোডা স্বদেশি গপ্পো না। ওডা জোমবে না। মুহইজ্জাদা যা কইথে আছেন হেডা কিন্তু বোমা, বন্দুক, জেলের গপ্পো। তুমি তো জানোই যে হেই যুগে “স্বদেশিগো” দুই হস্ত হইতে অগ্নি উদ্গিরণ হইত।’ ‘দ্যাহ মাস্টের আমারে চ্যাতাইও না। এই আড্ডায় কৈলোম আমিই সবার থিকা বয়োজ্যেষ্ঠ। আমি কিন্তু ওই সব গপ্পো খুব কোম জানি না। অনেকেই আইজ কাইল শুনি গপ্পো দে, আমার বাপ বা খুড়ায় স্বদেশি আছিলে। যদি জিগাও কী করছেলে? কইবে হ্যানে, পুলিশরে কেউ ঢিলা মারছেলে, কেউ দুই-একবার বন্দে মাতরম কইছেলে, কেউবা গান্ধীর কথায় বালতি হাতে পায়খানা পরিষ্কার করতে গেছেলে।’

‘তার মানে তুমি কইতে চাও যে হেনারা কিছু বড়ো কাম করেন নায়?’

‘হেয়া কমু ক্যান? অনেকেই অনেক কিছুই করছেন। তবে সব কাম তো একরহম না। এই যে মহেন্দ্রনাথ দত্তের কথা মুহইজ্জা মশায় উডাইলেন, হেনার মাহাইত্য কৈলোম ওই কিছুদিন জেল খাডা বা বিলাতের পতাকা পোড়ানো না। হেনায় আছিলেন আলাদা কেসেমের স্বদেশি, হেনার কাম আমি দেখছি। কিন্তু তোমাগো হে গল্প ভালো লাগবে না এহন।’

হারান কর্মকার যেন একটু অসন্তুষ্টই হয়েছিলেন। কারণ, তিনি যে মহেন্দ্রনাথকে কলকাতায় ত্রাণশিবির সংগঠনের কাজে দেখেছিলেন, তাঁর কর্মোদ্দীপনাকে তিনি কিছুতেই কম স্বদেশি মাহাত্ম্যযুক্ত মনে করতে পারছিলেন না যেন। সেই জন্যই, কম বয়সের চঞ্চলতার কথা গল্পকে বিষয় করতে যেন সায় পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে হারান কর্মকারের কাছ থেকে শুনেছি যে বরিশাল থেকে যারা উদ্বাস্তু হিসেবে ওখানে গিয়েছিল, তারা অনেকেই মহেন্দ্রনাথকে চিনত। বরিশাল সেবা সমিতির তরফ থেকে শিয়ালদহে উদ্বাস্তু ত্রাণশিবির খোলা হয়েছিল। মহেন্দ্রনাথ তখন শ্রীসরস্বতী প্রেসে কর্মরত। বরিশালিদের বলে দেওয়া হয়েছিল সরস্বতী প্রেসে সাহায্যের জন্য যেতে। মহেন্দ্রনাথ নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিটি পরিবার থেকে এক একজনকে ডেকে তাদের ট্রেনিং দিতে আরম্ভ করলেন। কাউকে দপ্তরির, কাউকে বাইন্ডারের, কাউকে কম্পোজিটর বা লাইনো অপারেটরের ট্রেনিং দিয়ে কাজের বন্দোবস্ত করে দিছিলেন। হারান কর্মকার এই সব গল্পকথা বিস্তারিত বলার পরে আমাকে বলেছিলেন, ‘আয়চ্ছা তুমিই কও, ওই দুইডা পাদের গুড়ার বোমা ফাডানইয়া বা পিস্তল ফুডানইয়া কাম, আর এই অসহায় মানুষগুলার লইগ্যা দিনের পর দিন হ্যারগো পুনর্বাসনের কামÑএই দুইডার মইদ্যে তুলনা অয়?’

নারায়ণ সাহা একদিন বলেছিলেন, ‘হারানদা মানুষটা নিজেও আছিলেন একজন বিপ্লবী। হেয়া আমি জানি, আর মনোরমা মাসিমায় জানেন। একদিন মাতৃকুটিরে যাইয়া জিগাইয়া দেইখ্য। হেই কারণেই, হারানদা মহেন্দ্রদত্তের ওহান দিয়া আবার ফিরইয়া আইছেলেন।’ হারান কর্মকারকে আমি হারান কাকা ডাকতাম। তাঁকে এবং নারায়ণ সাহা নামক এই ব্যক্তিকে আমি একষট্টি-বাষট্টির সময় থেকে চিনতাম খুব ঘনিষ্ঠভাবেই। খুব কম কথার মানুষ ছিলেন। আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। হারান কর্মকার ছিলেন তাঁর প্রতিবেশী। আমার তখনকার বাসস্থান তাঁদের অবস্থানের কাছাকাছি ছিল। আমি যে বাসায় ছাত্রছাত্রী পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকতাম, সেই বাসার কর্ত্রী নারায়ণ বাবুর ছাত্রী ছিলেন। তাঁর গানের তালিম শেষ হলে কোনো দিন সেখানে, কোনো দিন-বা মাস্টার মশাইয়ের বাসায় গল্প করতে যেতাম। হারান কর্মকারও আসতেন। বিপ্লবী যুগের গল্প শুনতে আমার খুব রোমাঞ্চকর লাগত। একদিন, সেদিন কলেজ ছুটি ছিল, দুপুরে হারান কর্মকারের বাসায় উদ্দেশ্যহীনভাবেই গিয়েছি। হারান কাকা বসে কিছু পুরোনো খবরের কাগজ আর বইপত্তর পড়ছিলেন। আমাকে দেখে ডাকলেন, ‘যাও কই দুফইরডার কালে? আয়ো আয়ো। বয়ো।’

হারান কাকার নিজ স্বজন বলতে কেউ ছিল না।

তাঁর রোজগার ছিল প্রাইভেট ছাত্র পড়িয়ে। নিজেই রান্নাবান্না করে খেতেন। সকাল এবং সন্ধ্যে ছাত্র পড়ানো। দুপুরটা পড়াশোনা, বিশ্রাম। ছুটিছাটা থাকলে মুখার্জি বাবুর বাসায় আড্ডা অথবা নারায়ণ সাহার সঙ্গে। নারায়ণ সাহার মতো হারান কাকাও আমাকে ভালোবাসতেন অপরিমিত স্নেহে। কারণটা বোধ হয় আমার তৎকালীন চ‚ড়ান্ত দরিদ্রাবস্থার কারণে। হারান কাকা এবং নারায়ণ সাহা দুজনই যথেষ্ট দরিদ্র এবং সংগ্রামী মানুষ। বোধ হয় সে কারণেই আমার অবস্থা দেখে তাঁদের আমার প্রতি সহানুভ‚তি ছিল।

আমি বসতে হারান কাকা বললেন, ‘তোমার অবস্থার লগে মহেন্দ্র দত্তের ছোডোকালের খুব মিল আছে। ওই যে মুহইজ্জা মশায় হেদিন যার কথা কইথে আছিলেন।’

‘ওই যে জেলে গেছিলেন, ব্রিটিশ পতাকা পোড়াইয়া? আসলে মুহইজ্জা কাকার বকবকানিতে পুরা ব্যাপারডা বোজতে পারলাম না। আপনে হেনারে চেনতেন?’

‘খুব না অইলেও মোডামুডি। আমার বাড়ি আছিলে নথুল্লাবাদ। মহেন্দ্রদত্তের বাড়ি কাশীপুর, হ্যার কাছাকাছি। বয়সে মহেন্দ্রদত্ত আমার পেরায় সোমান সোমান, কি এক-আধ বছরের বড়োও অইতে পারে। তয় অসহযোগ আন্দোলনের সোমায় হ্যারগো দলে আমিও আছেলাম।’

‘মানে আপনেও স্বদেশি বিপ্লবী আছিলেন নাকি?’

‘হেরহম কিছু না। গপ্পো করণের মতো কিছু নাই। কিন্তু তুমি এসব শোনতে চাও কিয়া?’

‘ওই মুহইজ্জা মশায়ের বাসায় হেদিন গপ্পো অইতে আছিল হেইসব শোনতে আমার খুব কৌত‚হল হয়। বাবার ধারেও কিছু শুনছি। আপনে এ্যাটটু শুনায়েন না শুনি। এহানে তো এই বিষয়ে বইপত্তর কিছু পাই না। কিছুই জানি না।’

‘বইপত্তর এহানে, এই পাকিস্তানে পাবা কই? ইন্ডিয়ায় হয়তো কিছু আছে।’

‘আপনে সি মহেন্দ্র দত্তের লগে পড়তেন?’

‘না। আসলে মহেন্দ্রদা যহন কাশীপুরের হ্যার মা-ভাইরে লইয়া থাকতে, হেই সোমায় হ্যার লগে আলাপ। আগে হ্যারা আছিলে হ্যার মামাবাড়ি রায়পাশা গ্রামে। আমি তহন ইস্কুল পাঠশালায় তেমন পড়ি নাই। এহানে-ওহানে কিছুকাল যাইয়া শ্যাষ তামাইত শহরে আইয়া বিএম ইস্কুলে ভর্তি হই। এইহান দিয়াই এন্ট্রান্স পাস করইয়া বাইর অই। এরই মইদ্যে মা-বাবা মারা যায়, আমিও ঝাড়া হাত পাও।’

‘স্বদেশি আন্দোলনে ক্যামনে আইলেন? বোমা-পিস্তলের কারবার কিছু করছেন, না অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, গান্ধীর পথে?’

‘তহন হিংসা-অহিংসা অত ব্যাপার বোজতামও না, হেসব অত আলাদা আলাদা হয়ও নায়। সব পন্থীরাই কংগ্রেস। গান্ধীর তত মাইন্যতা এহানে হয়ও নায়।’

‘হেয়া জানি। কিন্তু বোমা-পিস্তলের ব্যাপারও তো আছিল, হেইসব এ্যাটটু শোনায়ে না। আপনে কি নিজে বিপ্লববাদী কোনো দলে ভিড়ছিলেন?’

‘শোনো, একলগে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারমু না। আস্তে আস্তে কই। কথায় কথায় সব কথাই আইয়া পড়বে হ্যানে। প্রথমে মহেন্দ্রদার কথা শোনো।’

মহেন্দ্র দত্তের সঙ্গে হারান কাকার পরিচয় হয় কাশীপুরে। সেখানে যাত্রা, রয়ানি, মালসি ইত্যাদির অনুষ্ঠান তখনকার দিনে খুবই হতো। যাত্রা বলতে তখন রামযাত্রা, কেষ্টযাত্রা ইত্যাদিই বেশি হতো। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে নতুন ধরনের এক যাত্রার উদ্ভব হয়, যা দেব-দেবীদের লীলাকাহিনির ওপর ভিত্তি করে নয়। এর নাম হলো স্বদেশি যাত্রাপালা। মুকুন্দ দাস তত দিনে চারণকবি আখ্যা পেয়ে গেছেন। মহেন্দ্রনাথ গান এবং যাত্রাপাগল। নিজেও কখনো কখনো পছন্দের গানগুলো করেন। মুকুন্দ দাস তাঁর যাত্রার মহড়া দেবার আখড়া করেছিলেন কাশীপুরে। প্রায়শই সন্ধ্যায় কাশীপুর এবং আশপাশ গাঁয়ের ছেলে ছোকড়ারা, মহড়া থাকলে, পড়াশোনা ডকে তুলে দিয়ে ছুটত মুকুন্দ দাসের আখড়ায়। সেখানেই হারান কাকার সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা।

যদিও এ অধ্যায়ের শুরুতে বলেছি যে আমার নিজের বিষয়ে এই রচনার প্রেক্ষাপটে তেমন কিছু বলার নেই। কিন্তু বরিশালিয়া লেখক আমি, আর লিখছিও এক বরিশালিয়া মানুষের কথা, সুতরাং সংক্ষেপ হবে কী করে? সুতরাং, কথা কথা ডেকে আনবে, আমার কিছু করার নেই। আমরা বরিশালিয়ারা একে অন্যের খুব ‘ঘোনো আত্মীয়’। সুতরাং পাঠক বিবেচনা করুন, আমার নিরুপায়তা কতটা।

হারান কাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা মুকুন্দ দাসের কোনো স্বদেশি পালা তাঁর অভিনয়ে দ্যাখছেন কহনো?’

হারান কাকা বললেন, ‘এই একটা সৌভাগ্য আমার অন্তত হয় নায়। মহেন্দ্রদার অইছে কি না জানি না। ওই সমাডায় আমাগো বয়সটা তো কোম। আসলে মুকুন্দ দাসের পালা বরিশাল শহরে অভিনীত হইছে এমন স্মৃতি আমার নাই। তয়, হেনার গান শুনছি। মুকুন্দ দাসের যাত্রা হইত সাধারণত পল্লিগ্রামের বিভিন্ন জাগায়। অশ্বিনীবাবু সম্ভবত, সঠিক জানি না, তাঁর এই শিষ্যতিরে শহর-নগরে যাত্রা অনুষ্ঠান না করইয়া দ্যাশের সাধারণ মানুষের জাগারণের লইগ্যা গেরাম গা, হাডে-বাজারে পালা গাওয়াইতেন। কারণ, শহরের বেশির ভাগ মানুষই বড়ো বড়ো নেতাদের বক্তৃতা ইত্যাদি শুনইয়া অনেকটাই সচেতন। পল্লি গেরামের মানুষেগো জাগায় কেডা? অশ্বিনী দত্ত মশায় ব্যাপারটা বুজ্জিলেন এবং হে কারণেই তিনি মুকুন্দ দাসের উপার দায়িত্ব দিতে চাইছিলেন, যাতে আসল দ্যাশ গাওয়ের মানুষ জাগে।’

হারানকাকা অবশ্য পুলিশি তৎপরতার উল্লেখও এই প্রসঙ্গে করেছিলেন। গ্রামে-গঞ্জেও মুকুন্দদাস প্রায় পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি করেই অভিনয়ের কাজটা করতেন। তবে কাশীপুর গ্রামে তাঁর অনেক যাত্রাপালার মহড়াই তাঁরা শুনেছেন এবং দেখেছেন। বিশেষভাবে মনে আছে তাঁর ‘মাতৃপূজা’ পালাটির মহড়া। ১৯০৫ সালের আগেই মুকুন্দদাস রচনা করেছিলেন এই যাত্রাপালাটি এবং এটির মাধ্যমেই তাঁর স্বদেশি প্রচার শুরু হয়। এই পালার একটি স্বদেশি গান হারানকাকা মুখস্থ বলেছিলেন সেদিন, বলেছিলেন, ‘মহেন্দ্রদা গানটা খুব গাইথেন। তার গলাডা খারাপ আছিল না। আমি গাইথে পারতাম না। গলা নাই।’ বলেছিলাম, ‘গানটা কী?’ ‘গানটা অইল’Ñ

‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম।

তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি

অতল জলে ডুবিয়ে দিতাম

শোন সব ভাই স্বদেশি

হিন্দু মোছলেম ভারতবাসী

পারি কিনা ধরতে অসি,

জগৎকে তা দেখাইতাম।

কথা শুনে প্রাণ যদি মজে

সেজে আয় বীর সাজে।

দাস মুকুন্দ আছে সেজে

দাঁড়ি পেলে তরী ভাসাইতাম।’

‘গানই আমরা বেশি শোনতাম। মহেন্দ্রদা তো গানের পাগল। আমার অবশ্য পালার বক্তিতাগুলা বেশি ভালো লাগত।’ মুকুন্দ দাসের স্বদেশি গানকে বলা হতো বরিশালের স্বদেশি গান। হারানকাকা বলেছিলেন, ‘মুকুন্দ দাস কইথেন, আমার স্বদেশ বরিশাল। জন্মসূত্রে কিন্তু হেনায় ঢাকাইয়া, বইরাশালইয়া না।’

মুকুন্দ দাস বরিশালকে তাঁর আসল মাতৃভ‚মি হিসেবে গণ্য করতেন এবং ভালোবাসতেন। এ ব্যাপারে তিনি অশ্বিনীকুমার দত্তের সুযোগ্য শিষ্য ছিলেনÑএমনটাই হারানকাকার বিশ্বাস। হারানকাকা সেদিন নানা কথা, গল্পের মধ্যে এ-ও বলেছিলেন যে মহেন্দ্রদার মধ্যেও যে বরিশাল-প্রেম এহনও দেহি, হেয়াও যেন মুকুন্দ দাসেরই ল্যাহান, বোজজো?’

জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হেডা ক্যামন করইয়া জানলেন?’

‘হ্যার এতকালের কায্যকলাপ দেইখ্যা। উনি যহন যে কাজই করেন বা করতেন, হেয়ার মইদ্যে বইশ্শালের ব্যাপারডা যেন সব সময়ই এ্যাট্টা বড়ো জাগা দখল করইয়া থাহে। মুকুন্দ দাসের মতো রাজনৈতিক ব্যাপারস্যাপারের থিকা দ্যাশ গাঁওয়ের সামাজিক সমস্যার ব্যাপারডা বেশি মাত্রায় থাকত হেনার মইদ্যে। এহনো হেইভাবেই তেনায় কাজ করইয়া যাইতে আছেন। আমার স্বভাবটাও পেরায় হেরহমই। তয় আমিতো কিছুই আর করি না।’

‘তার অত্থ আপনেরা স্বদেশি কামকাজ তেমন কিছু করেন নায়। সমাজসেবাডাই করছেন।’

‘আমাগো নেতারা যে কাজ আমাগো করতে কইতেন, আমরা হেইডাই স্বদেশি কাজ হিসাবে করতাম। মুকুন্দদাস যাত্রাপালা করতেন, গান গাইতেন, মানুষের চেতনা বাড়াইতেন হেইভাবে। অশ্বিনীদত্ত একটা কথা কইছিলেন, পড়ছিলাম। কইছিলেন, “আমরা যেসব বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছি, তা যদি কেউ যাত্রার আকারে গ্রামে গ্রামে প্রচার করে তাহলে তা আমাদের এই সভা বা বক্তৃতার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়।” এই কথাডায়ই মুকুন্দ দাস চারণ হইছিলেন।’ হারানকাকা, মহেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের সাক্ষাৎ নেতা মনোরঞ্জন গুপ্ত, অরুণ গুহ তাঁদের কখনো রাজনৈতিক দলের গুপ্ত কাজে টানার চেষ্টা করেননি মহেন্দ্রনাথকে, বিশেষ করে এক ভিন্ন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োগ করে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যা বোমা, বন্দুকের রাজনীতির চাইতে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং বাস্তব। হারানকাকা দাঙ্গার সময় তাঁর মহেন্দ্রদার সঙ্গে বছর খানেক কাটিয়ে এবং কার্যকলাপ দেখে তাঁর স্বরূপ সম্যক বুঝেছিলেন। হারানকাকাকে তিনি বলেছিলেন, ‘দ্যাহ, এহানে আমার এই যা কাজকম্ম দ্যাখলা, এই আমার সশস্ত্র বিপ্লব, এইই আমার স্বদেশি। এই কাজ আমারে করইয়া যাইতে অইবে। তুমি যদি পারো, দ্যাশে যাইয়া এই জাতীয় কাজকাম করইও। চাইলে এহানে থাইক্যাও এসব করতে পারো। তয়, তোমার জাগায় আমি অইলে দ্যাশেই যাইতাম। আমার উপায় নাই। নাইলে বইশ্শালের লইগ্যা আমার বড়ো পেরান পোড়ে।’ হারানকাকা চলে এসেছিলেন। সেটা ১৯৫৩ সাল।

নয়

অনেককাল আগের কথা সব। বস্তুত তখন মহেন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব কথা প্রসঙ্গক্রমে শুনেছি, তা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল বা মনে কোনো আলোড়ন তুলেছিল, এমন নয়। সুতরাং সেসব কথা মনে থাকার কোনো কারণ ছিল না। একেবারে হালে স্বদেশি আন্দোলনের ওপর কিছু ইতিহাসধর্মী বইপুস্তক পড়তে গিয়ে এই ব্যক্তির একটি গোপন, নিঃশব্দ প্রায় অথচ অন্যথায় সোচ্চার উপস্থিতি লক্ষ করছিলাম। আমার নিজের জীবনের এখন মহাপ্রস্থান পর্ব। তাই ভাবলাম, এই রকম একজন বরিশাল-প্রাণ মানুষ। যাঁর ওপর তাঁর শৈশবকালে অশ্বিনীকুমার দত্ত, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় অর্থাৎ প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতীর মতো যুগন্ধর ব্যক্তিত্বের প্রত্যক্ষপ্রায় প্রভাব পড়েছিল, যিনি মনোরঞ্জন গুপ্ত, অরুণ গুহ, কিরণ মুখোপাধ্যায়, তারকেশ্বর সেন, গোপীনাথ সাহা, ভ‚পেন্দ্রকুমার দত্ত, অনুজা সেন প্রমুখের মতো ইতিহাস-প্রসিদ্ধ তৎকালীন বিপ্লবীদের সংসর্গে সরাসরি ছিলেন, তাঁর বিষয়ে বাঙালি চিন্তাবিদেরা এতটা মৌন কেন?

ভাবলাম, এঁকে নিয়ে কিছু লেখালেখি করা যায় কিনা। খোঁজখবর করতে করতে তাঁর নিজেরই দুটি পাতলা বই, ‘যথা নিযক্তোহস্মি’ এবং ‘ঞযব ষরভব ধহফ গরংংরড়হ ড়ভ ঝধিসর চৎধলহধহধহধহফধ ঝধৎধংধিঃর’ পড়লাম। কিন্তু হা হতোস্মি! মানুষটি প্রায় গন্ধর্ব জাতীয়দের মতো গোপনাচারী। বই দুটি অত্যন্ত সুলিখিত এবং সুসংবদ্ধ হলেও তাঁর চরিত্রটিকে প্রায় ছোঁয়াই যায় না এমন।

এই রকম একটা সময়ে পাকেচক্রে রতেœশ্বরের সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁর খাতাটির হদিস পাওয়া। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার বছর তিনেক আগেই মহেন্দ্রনাথ দেহ রেখেছেন। রতেœশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগটা হয়েছিল ডালহৌসির অফিসপাড়ায়। কর্মসূত্রে সমজাতীয় হলেও তাঁর এবং আমার অফিস আলাদা আলাদা ছিল। আমরা উভয়েই ব্যাংক কর্মী ছিলাম। ইউনিয়ন-বিষয়ক কাজকর্মে পরিচয় এবং একসময় তা ‘তুমি’র ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হলো। আমরা দুজনেই একটি বিশেষ বিপ্লবী দলের রাজনীতির সমর্থক ছিলাম। তথাকথিত ‘টেররিস্ট’দের রাজনীতি নিয়ে বিতর্কের আসরে একদিন সে মহেন্দ্রনাথের অদ্ভুত জীবন কথা আমাকে শোনায়। এরপর থেকেই সময়ে অসময়ে মহেন্দ্রনাথ আমাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন, যার পরিণতি আমার আজকের এই প্রচেষ্টা।

একটা বিষয়ে রতেœশ্বর এবং আমি আমাদের, বিশেষ করে আমার কৈশোরিক দারিদ্র্যময় জীবনসংগ্রামের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের জীবনের বেশ কিছু ঘটনাগত মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের তখনকার রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গেও মহেন্দ্রনাথের চিন্তার একটা প্রবল সাদৃশ্য ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের কেউই, অন্তত আমি তাঁর মতো অক্লান্ত কর্মী, বা দৃঢ় এবং স্বচ্ছ মানসিকতার অধিকারী ছিলাম না। একটা লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করে কর্মতৎপর হওয়ার মতো স্থিরবুদ্ধি আমাদের ছিল না। আমরা যৌবনসুলভ অস্থিরতায় যতটা চঞ্চল ছিলাম, ততটা বিচারবুদ্ধি এবং অধ্যয়ন, অধ্যবসায়-পরায়ণ ছিলাম না। বস্তুত, আমাদের এসব চিন্তার এবং মননের দারিদ্র্যই মহেন্দ্রনাথের প্রতি আমাদের আকৃষ্ট করেছিল।

তখন রতেœশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগটা কার্যকারণবশত আমাকে রাখতেই হচ্ছে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে সে-ই আমার এবং লোকান্তরিত মহেন্দ্রনাথের মধ্যে এখন যোগসূত্র। তার খাতার অসম্পূর্ণতা ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই পূরণ করে নিতে হচ্ছে। মাসে অন্তত একবার-দুবার তার সঙ্গে দেখা করতেই হয়। হয় সে আমার কাছে আসে অথবা আমি যাই।

লিখতে লিখতেই নানান স্মৃতি রোমন্থনের সূত্র ধরে, মুখার্জিবাবুর বরিশালের বাসার বৈঠকখানা, গানের মাস্টারমশাই নারায়ণ সাহা এবং হারানকাকার কথা মনে এল। রতেœশ্বরকে বলতে, সে বলল, ‘তা এসব লেখায় তো আসতেই পারে। মনে করে দেখ, হয়তো আরও এ রকম নানান স্মৃতি নিশ্চয় পাবে।’ বললাম, ‘কিন্তু তুমি তো বললে, লেখাটা উপন্যাসধর্মী হবে। এসব খাপ খাওয়ানো তো সমস্যার ব্যাপার। পাঠকেরা ভাববেন, স্মৃতিও নির্মাণ করছি।’

‘শোনো, স্মৃতি-নির্মাণ বলে কিছু হয় না। যে ঘটনা অতীতে ঘটেছিল সেটাই আসল স্মৃতি, অতীতের কিছু খÐ অনুষঙ্গ নিয়ে প্রয়োজনীয় বিবরণ তৈরি করাটা স্মৃতি নয়, এটা আজকালকার সাহিত্যতাত্তি¡কেরা বিশ্বাস করেন না। সাহিত্যের সত্যটা দৈনন্দিন বাস্তব সত্যের মতোই হবেÑএমন নয়।’ রতেœশ্বর খুব গভীর পাঠক মানুষ। দেশবিদেশের অঢেল সাহিত্য, ইতিহাস সে পড়ে। আমি বললাম, ‘তোমার জেঠাবাবুর’ যথা নিযুক্তোহস্মি’ বইটি তাঁর আত্মজীবনী। আমি চাইছিলাম সেটিকে অবলম্বন করে একটি তথ্যনিষ্ঠ আলেখ্য তৈরি করতে, যা উপন্যাস না হলেও উপন্যাসোপম হবে

‘ওই কাজটি করতে যেয়ো না। লেখায় তথ্য যতটুকু দরকার মনে করবে ততটুকুই ওখান থেকে নিতে পারো। আমার খাতার থেকেও তা-ই। বাকিটা নিজের।’

রত্নেশ্বর কোনো দিন বরিশাল যায়নি। তার পৈতৃক গ্রাম বরিশালে হলেও জন্ম এপারে। বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেকের ছোট। সুতরাং দেশ-স্মৃতি বলতে তার কিছু নেই। কথায় কথায় বলল, ‘তোমার ওপর এই দায়টা চাপানোর প্রধান কারণ হচ্ছে। তোমার এই ‘দেশ-স্মৃতি’র সম্পদটা আছে। আমার মনে হয় মহেন্দ্র দত্ত সম্পর্কে লেখার জন্য ওটা জরুরি।’ বললাম, ‘কিন্তু মুশকিল এই যে মহেন্দ্রনাথ বরিশালে নিয়মিত ছিলেন তাঁর জীবনের খুব কম সময়ই। পাকাপাকিভাবে বরিশাল ত্যাগ করেছিলেন ১৯৪৮ সালে সম্ভবত। আমি এখনো বরিশালে যাই। কিন্তু সেখানে তাঁর পরিচয় জানেন বা নামে অন্তত চেনেন, এমন মানুষ বোধ করি এখন কেউ বেঁচে নেই। তাঁর সময়কার ভ‚গোলটা পর্যন্ত পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এমনকি তাঁর পৈতৃক গ্রাম কাশীপুরের পর্যন্ত টপোগ্রাফিটা আদ্যন্ত বদলে গেছে। উনি কলকাতাতে কর্ম শুরু করেন যখন, তখন বোধ হয় তাঁর বয়স ২৩-২৪ হবে। এটা আমার কাছে একটা সমস্যা।’

রত্নেশ্বর বলল, ‘কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তথ্যসংগ্রহে প্রমাদ হবে না, এমন দেশে জন্মাওনি। এ কারণেই লেখাটাকে আমি উপন্যাসধর্মী করতে বলেছিলাম। দেখো, কতটা এগোনো যায়।’ আমি বললাম, ‘মহেন্দ্রনাথ বিপ্লবপন্থী ছিলেন, কিন্তু একটা ব্যাপার তুমি নিশ্চয় লক্ষ করেছ যে ভদ্রলোক তৎকালীন বিপ্লবীদের মতো আদৌ হঠকারিতার পথে যাননি। যাঁরা তাঁর পথপ্রদর্শক, গুরু এবং নেতৃস্থানীয়, তাঁরা তাঁদের কর্মপদ্ধতি এবং উদ্দেশ্য বিষয়ে, সেই সময়ে যে খুব মনের পরিচয় দিয়েছেন, এমন দেখা যায় না। ইংরেজকে তাড়াতে হবে। এটা একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মধ্যে যে পরিমাণ আবেগ ছিল, সেটায় অতিরিক্ত আর কিছু ছিল কী?’

‘এটা আমি জেঠাবাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বিষয়টা নিয়ে তিনি ভেবেছিলেন। ইংরেজকে ধরা যাক, তাড়ানো গেল-যদিও তার মধ্যেও সম্ভাবনা অসম্ভাবনা বিস্তর ছিল। কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে? শুধু ইংরেজ তাড়ানোর জন্য আত্মবলিদান করলেই সব হবে? এটা করলে একটা জিনিস হবে, সেটা অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, জাতির জীবনে একটা দাগ রেখে যাওয়া যাবে। ব্যস?’ ‘তারপর ধরো, জাতির জীবনে যে দাগের কথাটা বলা হলো, জাতিটা কই?’

‘জাতি’ ব্যাপারটা নিয়ে তাঁরা কী ভাবছিলেন তখন? তাঁদের পদ্ধতিমতো সাহেব বা তাদের এ দেশীয় অনুচরদের হত্যা করলেই কি একটা জাতি তৈরি হয়ে যাবে? যে সময়ের কথা, তখন গোটা ভারতীয় বা বঙ্গীয় সমাজে জাত আছে হাজার গন্ডা, কিন্তু জাতি বলতে কী বুঝতেন তাঁরা? হিন্দু জাতি? মুসলমান জাতি? বাঙালি, বিহারি, মারাঠি, তামিল, তেলেগু না, কী? আসলে তখনো তো জাতি তৈরি হতে শুরুই হয়নি।’

‘এগুলোই কথা। মহেন্দ্র দত্তের সৌভাগ্য যে যেকোনো কারণেই হোক না কেন। তাঁর দখলদার নেতারা তাঁকে রাজনৈতিক কার্যকলাপে অর্থাৎ বোমা, পিস্তলের কর্মকাণ্ডের টেনে আনেননি। মহেন্দ্রনাথ স্বভাবগতভাবে কর্মী মানুষ। সৎ। তিনি ব্রিটিশবিরোধী, কিন্তু গুপ্তহত্যা দ্বারা সন্ত্রাস সৃষ্টিতে তাঁর আস্থার মধ্যে দ্ব›দ্ব ছিল বলে মনে হয়। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে এর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছুই বলেননি, বরং অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর একটু একটু করে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের দিকেই তিনি ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে আবার প্রজ্ঞানানন্দের বিমিশ্র বৈদাম্ভিকতা এবং সমরবাদে তিনি আকৃষ্ট।’

‘কথাগুলো প্রায় ঠিক তা-ই।’ আমি বললাম, ‘মহেন্দ্রনাথ কোনো বিশেষ মতবাদীদের সঙ্গেই ছিলেন, এমন বলা যাবে না। কমিউনিস্টরাও তাঁর কাছে পরিত্যাজ্য ছিলেন না। তিনি তাঁদের স্বাধীনতা-পরবর্তী কালেও অন্য কংগ্রেসিদের মতো শত্রু ভাবতেন না। আমার মনে হয়, তিনি রাজনৈতিক চরিত্রগতভাবে উদার গণতন্ত্রীই ছিলেন, কিন্তু নিঃসন্দেহে দেশপ্রেমিক।’

রত্নেশ্বর বলল, ‘ভাই, আমাদের দেশে আমরা যারাই কোনো দলীয় রাজনীতির আবর্তে আসি, একটা অভ্যেস অত্যন্ত সহজভাবেই যেন রপ্ত করে ফেলি। সেটা হচ্ছে কোনো ব্যক্তির বিচার করতে গিয়ে আগেই তাকে একটা লেবেল দিয়ে ফেলি। তুমি আমি একসময় যে রাজনীতির প্রভাবে ছিলাম, সেখানেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।’

‘কথাটা সত্য এবং এর থেকে আজকের দিনেও কেউ মুক্ত নই, তা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি কেউ করি বা না করি। কিন্তু আমরা এখন যে মহেন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে চাইছি বা বলতে পারো বুঝতে চাইছি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্র তো আমাদের জানতে হবে। আমি কিন্তু তিনি অনুশীলন সমিতি বা যুগান্তর পার্টির, বা কংগ্রেসি না কমিউনিস্ট এই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। তিনি কট্টরপন্থী বিপ্লবী, না উদারপন্থী নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রী, অবশ্যই সেই যুগের এবং পরবর্তীকালীন তাঁর যাপিত জীবন এবং কর্মে-সেটাই আমার অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। তোমার কাছে কি আর কোনো খাতা নেই?’

রত্নেশ্বর খানিক চিন্তা করে বলল, ‘যেটা তোমাকে দিয়েছি সেই খাতাটিই পরিমার্জিত খাতা। অবশ্য তখন তো ভাবিনি, লেখাটা আমি না লিখে তোমাকে বা অন্য কাউকে দিয়ে লেখাব। কিছু আলগা নোটস ছিল। লেখাগুলো খুঁজে দেখতে হবে। আসলে অনেক দিনের ব্যাপার তো, যতদূর মনে হয় আছে। তোমার প্রশ্ন শুনে মনে হচ্ছে, তুমি জেঠাবাবুর মহেন্দ্রনাথ দত্ত হয়ে ওঠার পেছনের কারণগুলোর অনেক গভীরে যেতে চাও?’

‘অবশ্যই। তিনিই তো প্রধান চরিত্র বা বলতে পারো একমাত্র চরিত্র।’

‘সে ক্ষেত্রে তাঁর আশপাশের চরিত্রদের মধ্যে সন্ধান করো। ঐতিহাসিকভাবে ধারাবাহিকতা খোঁজো। সে রকম কোনো সূত্র কি খাতায় নেই? আমার তো মনে হয়, জেঠাবাবুর কাছ থেকে এ বিষয়ে একটা বড়সড় বক্তৃতার মতো যেন লিখে রেখেছিলাম, কী জানি কাগজগুলো দেখতে হবে।’

‘অবশ্যই দেখো। ওটা জরুরি।’

‘যতদূর স্মরণ আছে, ওটাই ছিল তাঁর চরিত্রের ঐতিহাসিক ধারার সূত্র। কিন্তু খাতায় কি এই ব্যাপারটা ধরা সত্যিই নেই?’

‘না। তবে এখন তোমার কথায় মনে হচ্ছে যে ধারাটার কথা তিনি ইঙ্গিত করছেন, সেটা বুঝতে গেলে অশ্বিনীকুমার দত্ত এবং স্বামী প্রজ্ঞানানন্দকে বিশেষভাবে বুঝতে হবে।’

‘কিংবা আরও পেছনে যেতে হবে।’

‘যেমন?’

‘যেমন রাজনারায়ণ বসু, অরবিন্দ ইত্যাদিকে মূলাধার হিসেবে ধরো।’

‘আমার বোধ হচ্ছে, এ নিয়ে তোমার একটা চিন্তা যেন তৈরি হয়েই আছে। তুমি একটু ঝেড়ে কাশবে কী?’

রত্নেশ্বর এরপর সুদীর্ঘ এক পরম্পরার কথা বলল। মোটামুটিভাবে কথাগুলো বর্ণনা করছি। পরে, সে যে নোটগুলোর কথা বলেছিল, তা খুঁজে পেয়ে আমাকে দিয়েছিল। আমার এই এখনকার আলোচনাটি সেসবের ওপর নির্ভর করেই করা হলো। কিন্তু আমি তো আমার ক্ষমতা জানি। হয়তো এসব পণ্ডশ্রমই হবে।

অশ্বিনীকুমারের জন্ম ১৮৫৬ সালে। যুগনির্বন্ধে তিনি তাঁর ছাত্রজীবনে অসামান্য কয়েকজন ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় রাজনারায়ণ বসুর নাম। বস্তুত তিনিই ছিলেন অশ্বিনীকুমারের রাজনৈতিক গুরু। অবশ্য রাজনারায়ণ, শ্রীঅরবিন্দ, বারীন্দ্র, হেমচন্দ্র দাস কানুনগোর মতো বিপ্লববাদীদেরও গুরু। ব্যাপারগুলো অবশ্যই অনুমানসাপেক্ষ। এসব ব্যক্তির কার্যকলাপ থেকেই অনুমান করে নিতে হয় কোন গুপ্ত বিপ্লবমন্ত্রে তিনি এঁদের দীক্ষা দিয়েছিলেন। অশ্বিনীকুমারের কর্মাবলি অনুসরণ করে মনে হয় রাজনারায়ণ তাঁর ক্ষেত্রে পৃথক মন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। অশ্বিনীকুমারের ক্ষেত্রে দীক্ষামন্ত্রটি কী ছিল, তার পরিষ্কার কোনো উল্লেখ কোথাও নেই। তবে তাঁকে তিনি বলেছিলেন, ‘অশ্বিনী, যদি নেতা হতে চাও তো শহরে এসে বোসো, আর যদি কাজ করতে চাও তো নিজের জায়গা ছেড়ো না।’ অশ্বিনীকুমার বরিশালকে আঁকড়ে ছিলেন এবং সেখানে থেকেই তিনি গোটা ভারতের জাতীয় সংগ্রাম সাধনার প্রকৃত পথের সন্ধান দিয়েছিলেন, যা দশ বছরকাল পরে গান্ধীকে তাঁর নতুন আন্দোলনের উপায় ও আদর্শ এনে দিয়েছিল, যদিও জাতীয় ইতিহাসে এ কথা কেউ লেখেনি।

অশ্বিনীকুমারের পরম্পরার প্রেক্ষাপট নিয়ে বলতে গেলে সেই হিন্দুমেলার যুগ থেকে শুরু করতে হয়। কিন্তু এই আলেখ্য অশ্বিনীকুমারের উদ্ভব নিয়ে নয়, মহেন্দ্রনাথের বিষয় নিয়েই আমাদের অনুসন্ধান। সেই কারণেই যা অশ্বিনীকুমারের বিষয় নিয়ে আলোচনা। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের রাস্তায় যাননি, তার বিরোধিতাও করেননি। তাঁর সংস্রবে এসে যাঁরা স্বদেশি করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বিপ্লবী কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন এবং পরে যুগান্তর পার্টি গঠন করেছিলেন। অশ্বিনীকুমার তাঁদের বিরোধিতা না করলেও, কখনো কখনো তাঁকে তাঁর কার্যকলাপ এবং সিদ্ধান্তের জন্য দুর্বল, কাপুরুষ ইত্যাদি অপবাদ শুনতে হয়েছে, তিনি গ্রাহ্য করেননি। এসব বিষয়ে ব্যাপক ইতিহাসচর্চা আছে, অপ্রয়োজন বোধে সেই বিস্তৃতিতে যাব না। ভূপেন্দ্রকুমার দত্তের একটি লেখা থেকে এ বিষয়ে কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে অশ্বিনীকুমারকে আপাতত বোঝার চেষ্টা করব। ‘মহাত্মা অশ্বিনীকুমার স্মরণিকা-১৯৭০’ থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। আবার বলছি, মহেন্দ্রনাথের কার্যকলাপ বোঝার জন্যই এই প্রচেষ্টা।

“ওই যুগে অশ্বিনীকুমারের হাতে দুটি যন্ত্র। একটি ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজ, অপরটি স্বদেশ বান্ধব সমিতি। একটিতে তিনি মানুষ গড়েন, অপরটি কর্মক্ষেত্রে সে মানুষকে ঢালাই করে ইস্পাতে পরিণত করেন।… স্বদেশ বান্ধব সমিতির ১৫৯টি শাখা বরিশাল জেলার পল্লিতে পল্লিতে প্রসার লাভ করে। ১৯০৬ সালে বরিশাল জেলায় এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষকে উপলক্ষ করে স্বদেশ বান্ধব সমিতির শাখাগুলোর সাহায্যে জেলায় সৎবদ্ধতা চ‚ড়ান্ত রূপ নেয়। এর প্রত্যেকটি কেন্দ্র ৬ থেকে ১২ খানি গ্রামের ভার নেয়। প্রতিটি কেন্দ্রে অন্যূন ৫০ জন কর্মী ছিল। ফলে সংঘবদ্ধ সেবাকার্য কী রকম দাঁড়িয়ে ছিল তার এক ছবি পাই আমরা ভগিনী নিবেদিতার লেখায়। তিনি বলেন, ‘সাহায্য ছাড়া দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাকৃত কাজ করে, তার কোনোটাই এত দ্রুত গড়ে ওঠে নাই। কোনো সমিতিতেই নেতার প্রতি এমন প্রগাঢ় শ্রদ্ধা অনুরাগ দেখা যায় না। কোনো সমিতিই এমন শৃঙ্খলার সাথে কাজ করে না। সত্যি কথা বলতে কি, কোনো দেশেই এমন সমিতি এর আগে দেখা যায় নাই। কাজের যোগ্য পুরস্কার দিয়েছিলেন নিবেদিতা- তিনি দধীচির অস্থি নির্মিত বজ্রাঙ্কিত এক পতাকা দিয়েছিলেন অশ্বিনীকুমারের হাতে স্বদেশ বান্ধব সমিতির জন্য। সুহৃদ, ডন, অনুশীলন, আত্মোব্রতি, সাধনা সমাজ, শক্তি, ব্রতীও যেমন, স্বদেশ বান্ধবও তেমনি ঐতিহাসিক যুগান্তর দলের ভিত্তিপ্রস্তর- যে দলের কর্মধারা বলে, আমরা মরব, জাত জাগবে, সে দলের প্রতীকই এই দধীচির বজ্রাঙ্কিত পতাকা।”

মহেন্দ্রনাথ দত্ত অশ্বিনীকুমারের সান্নিধ্য যেটুকু পেয়েছিলেন তা একেবারেই তাঁর প্রাথমিক জীবনে। প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আমার সুযোগ ঘটেছিল। তিনি নিজেই লিখে গেছেন যে ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত তিনি কাছ থেকে অশ্বিনীকুমারকে দেখেছিলেন। ব্রজমোহন স্কুলের ছাত্র হিসেবে তাঁর সুযোগ হয়েছে তাঁর বৈঠকখানায় অবাধ গতিবিধির। স্কুলের শিক্ষক মশাইয়েরা সবাই তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করে চলতেন। ছাত্রদের সামনে অশ্বিনীকুমারের মহান চরিত্রের কথা তাঁরা সব সময়ই তুলে ধরতেন। সুতরাং মহেন্দ্রনাথের চরিত্রে যে অশ্বিনীকুমারের ব্যাপক ছাপ থাকবে, তা কিছু আশ্চর্য নয়। সে যুগের অনেক কিশোর, যুবা ছাত্র বা অন্যদের ওপরও কমবেশি তাঁর শিক্ষার প্রভাব পড়েছিল। অশ্বিনীকুমার এবং সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, এই দুজনের জীবনাদর্শই যে তাঁকে সারা জীবন প্রভাবিত করে রাখবে, সেই সময় তিনি হয়তো তা ভাবেনইনি।

মনুষ্য চরিত্র নির্মাণ পায় শৈশব, কৈশোর থেকে প্রথম যুবাকাল পর্যন্ত। মহেন্দ্রনাথের জীবনের এই পর্বকাল নিয়ে রতেœশ্বরের সঙ্গে আমার বহুদিন আলাপ-আলোচনা হয়েছে। একদিন অফিস-ফেরত আমরা দুজনে প্রিন্সেস ঘাটে বসে নানান গল্প করছিলাম। রত্নেশ্বরই কথাটা তুলল। বলল, ‘জেঠাবাবুদের সময় ব্রহ্মচর্য বলে জিনিসটা বোধ হয় তাঁদের খুব জ্বালিয়েছে বুঝলে?’ বললাম, ‘সে ভাই শুধু জেঠাবাবু কেন, তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র যে আমরা, আমাদের কি কম জ্বালিয়েছে নাকি? আমি অবশ্য তোমার কথা জানি না, তবে ওটা নিয়ে আবাল্য আমি খুব কম ভুগিনি। কিন্তু তোমার জেঠাবাবু তো একেবারেই, ওই যাকে বলে পাকাল মাছ। তাঁর রূপমোহ-বিষয়ক তো কোনো তথ্যই পাই না।’

‘আসলে ব্যাপারটা কী জানো? ওই যুগটা ছিল আদ্যন্ত নানা রকমের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণায় মোড়া। একটা জিনিস বুঝি না, তাঁরা পারত্রিকতা নিয়ে অতটা ভাবিত ছিলেন কেন?’

‘কিন্তু কাজকর্ম যা করতেন, তার মধ্যে তো ইহজাগতিকতা কম ছিল না। আসলে যে যুগের যা দার্শনিক প্রভাব। ধর্ম ব্যাপারটা তো উনিশ শতকের ওই চ‚ড়ান্ত যুক্তিবাদী সময়েই ব্যাপকতা লাভ করেছিল এবং তার জের বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সমানে চলেছে।’

‘তার কারণ হচ্ছে, সমাজের একটা অংশে ইহজাগতিক স্থূল ভোগবাদের বাড়াবাড়ি। আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটাও ছিল এর অনুকূলে। এ কারণে শুদ্ধতাকামী যাঁরা তাঁরা হয়ে পড়েছিলেন অতিমাত্রায় নীতিবাগীশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই নীতিবাগীশতা ছিল যথেচ্ছাচারের ভন্ডামি ঢেকে রাখার মুখোশ, আবার কোথাও তা আদর্শবাদের বৈজ্ঞানিক যুক্তিহীনতা-প্রযুক্ত অন্ধতা। মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক যৌনতা যে তার তাবৎ সৃজনশীলতার মূলাধার, এই সত্যটা প্রায় কেউই স্বীকার করে নিতে পারেননি। অবশ্যই সেই সমাজ-মানসিকতার প্রভাব আজও এ দেশে কার্যকরী।’

রত্নেশ্বরের বিশ্লেষণ ক্রমশ বিস্তৃতির দিকে যাচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমি বললাম, ‘দেখো, তোমার জেঠাবাবুর বিষয়ে বিচার করতে গিয়ে, যেমন অশ্বিনীকুমারের কর্মযোগের, তেমনি প্রজ্ঞানানন্দের বৈদান্তিক “বিরাট পুরুষের” তত্তে¡র প্রভাব যে দেখা যায় তা অনস্বীকার্য। কিন্তু তথাপি, তাঁকে ইহজাগতিকতা বা নান্দনিক ভোগবিমুখ দেখি না। যদিও তার ব্যাপক উদাহরণ কিছু পাই না, তবু তাঁর যাত্রাপালা দেখার রাতব্যাপী অধ্যবসায়, গানে অসম্ভব প্রীতি, এমনকি পুলিশ লাইনে গিয়ে বাইজি নাচ দেখার সুখস্মৃতি সম্পূর্ণ নির্দোষ আমোদ হলেও এই ব্যাপারে তাঁকে তার ওই দুই গুরুর অভিমত বা শিক্ষা অনুসারী বলতে পারি না। এবং সেটাই একজন মানুষের চরিত্রে ওই বয়সে স্বাভাবিক।’

তথাকথিত ভালো এবং মন্দের সংমিশ্রণ না থাকলে একজন মানুষের চরিত্রকে কীভাবে পরিস্ফুট করা যায়? রত্নেশ্বর বলল, ‘আমার নিজের বিচারে জেঠাবাবু ছিলেন তৎকালীন ভাবধারা অনুযায়ী একজন সৎ এবং কর্মোদ্যগী মানুষ। তাঁর বিপ্লববাদে আকৃষ্ট হওয়াটা ছিল সেই সময়ে বরিশালে তিনি যে ব্যক্তিত্বদের সংস্রবে এসেছিলেন সেটা এবং সেই যুগের ব্রিটিশবিরোধী গণচেতনার ফল। বিপ্লবীরা সে যুগে কঠোর নৈতিক অনুশাসন এবং কর্মোদ্যোগের শপথ গ্রহণ তথা অভ্যাস করতেন। ব্যাপারটা বরিশালে ব্যাপকতা পেয়েছিল। সামান্য বিচ্যুতিকে তাঁরা ব্রতভঙ্গজনিত পাপ বলে মনে করতেন। বোধ হয়, বিপ্লবীদের ওপর বঙ্কিমের “আনন্দ মঠে”র সন্তানদের মতাদর্শগত প্রভাব এর কারণ। স্মরণ করো আনন্দ মঠে ভবানন্দ এবং কল্যাণীর প্রেম এবং তাঁর আত্মাহুতি।’

রত্নেশ্বরের বক্তব্য সঠিক। কিন্তু মহেন্দ্রনাথ যে কোন গুরুর অন্ধ অনুরক্ত ছিলেন, তা তাঁর জীবনব্যাপী কর্মকাণ্ড দেখে বলা যাবে না। প্রজ্ঞানানন্দ একাধারে বিপ্লববাদী এবং কর্মযোগী ছিলেন। যুগান্তর বিপ্লবীদের সংগঠন, শঙ্কর মঠ স্থাপনের জন্য প্রচেষ্টা এবং ব্যাপক অধ্যয়ন ছিল তাঁর নির্ধারিত কর্মকাণ্ড। শৈশবে মহেন্দ্রনাথ তাঁর এসব কাজকর্মের বিষয় অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। রত্নেশ্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমার জেঠাবাবু অতগুলো বাঘা বাঘা বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে ওইভাবে থেকেও নিজে একমাত্র ইউনিয়ন জ্যাক পোড়ানো আর প্রথমবারের সশ্রম কারাদণ্ডের সশ্রমতার বিরুদ্ধতা করা ছাড়া রোমাঞ্চকর কিছুর মধ্যে যাননি কেন, এ বিষয়ে তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলে কী?’

‘স্বাভাবিকভাবেই করেছিলাম। তিনি সংক্ষেপে বলেছিলেন যে সব কাজ সবার জন্য ছিল না।’

‘প্রয়োজনেও না?’

‘তা বলতে পারব না। তবে তাঁর কাছে অস্ত্র দীক্ষাবিষয়ক কোনো কথা শুনিনি। অথচ জানো, তিনি যখন কলকাতায় এসে কলেজ স্কোয়ারের কাছে ২৬/২ বেনিয়াটোলা লেনের মেসে থাকতেন, তখন গোপীনাথ সাহা ছিলেন তাঁর রুমমেট। গোপীনাথ সাহার সঙ্গে তিনি সরস্বতী লাইব্রেরির কাজ করতেন। আমি জেঠাবাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি ওরকম একজন মারাত্মক বিপ্লবীর সঙ্গ করেও কীভাবে সেই প্রভাব এড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনধারায় ঢুকলেন? অন্যদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।’ তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘প্রথমত আমার ওপর এই কাজটিরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারপর, দলের শীর্ষনেতারা নিশ্চয় অনুভব করেছিলেন যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী কার্যকলাপ করার মতো মানসিক গঠন আমার ছিল না। বস্তুতই, আমি নিজেও চিন্তা করে দেখেছি, আমার মধ্যে দ্রোহ উৎপাদন করা, সশস্ত্র কার্যে লিপ্ত হওয়া বা কোনো প্রকার ভয়ংকর হিংস্রতায় অংশগ্রহণ করার প্রবণতাটি প্রথম থেকেই ছিল না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার ওপর কোনো দায়িত্ব আরোপ করা হলে, আমি সেখানে পশ্চাৎপদ হতাম। আজকে যে শ্রীসরস্বতী প্রেস তোমরা দেখছ, তাকে গড়ে তোলার অনেকটা দায়িত্বই এই বিপ্লবীরা আমার ওপর ন্যস্ত করেছিলেন।’ রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘উনি বলেছিলেন বটে “অনেকটা দায়িত্ব”, কিন্তু আমি ভালোভাবেই জানি সেই অনেকটা কতটা। জেঠাবাবু, কোনো কৃতিত্বেরই পুরো কেন, সামান্য স্বল্পভাগটুকুও নিজে দাবি করেননি কোনো দিন। এ রকম অহংশূন্য ছিলেন বলেই ব্যক্তিক স্বার্থ তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি কদাপি।’

রত্নেশ্বরের কাছ থেকেই জেনেছিলাম, মহেন্দ্রনাথ কীভাবে শ্রীসরস্বতী প্রেসকে প্রথম থেকে বিভিন্ন সংকুল পরিবস্থার মধ্য থেকে একটা বিরাট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। বালক বয়সে মায়ের সঙ্গে শটির পালো উৎপাদন এবং তা বিক্রি করে সংসার প্রতিপালন করতে গিয়ে ব্যবসা বিষয়ে শিক্ষা শুরু হয়েছিল তাঁর। তাঁর দ্বিতীয় ব্যবসায়সংক্রান্ত শিক্ষা লাভ হয়, যখন তিনি করাপুরের উচ্চ প্রাইমারি পাঠশালায় পাঠরত। পেনসিলের প্রয়োজনে বরিশাল গিয়েছিলেন তা কিনতে। দোকানে একটি পেনসিলের দাম পড়ে দুপয়সা। দোকানি বলল, ‘আমরা খুচড়ো বেচি না, ডজন হিসাবে বেচি। এটা পাইকারি দোকান। এক ডজন নাও, দাম সাড়ে চার আনা।’ মহেন্দ্রনাথ চিন্তা করে দেখলেন, সহপাঠীদের পেনসিল দরকার হয়ই। বাড়তিগুলো তাদের কাছে বেচা যাবে। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছ থেকে বাড়তি পয়সা নিয়ে এক ডজন পেনসিল কিনলেন, যথা সময়ে বিক্রিও হয়ে গেল এবং মোট লাভ হলো ছ পয়সা, অর্থাৎ দেড় আনা।

ব্যাপারটা সেখানেই শেষ নয়। রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘জেঠাবাবুর বোধ হয় শিশুকালেই ওই পালো, সুপারি ইত্যাদি বিক্রি করার সময়েই ব্যবসায়ের বীজ মনের মধ্যে উপ্ত হয়েছিল। তার ক্রমবিকাশ ঘটে স্বদেশি আন্দোলনের সময়। স্বরাজ অফিসে রাজনৈতিক এবং দেশাত্মবোধক বই ছিল কিছু। যারা স্কুল কলেজ ত্যাগ করে স্বদেশের কাজ করত, তাদের পড়ার জন্য এসব বই। জেঠাবাবু যেসব মিটিংয়ে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতেন, সেখানে এসব বই বিক্রি কিছু কিছু হতো। তিনি স্থির করলেন, এ রকম সব বই কিনে এনে বিক্রি করলে দেশের কাজ এবং সামান্য কিছু রোজগার দুটোই হয়। তাঁর সাংসারিক অবস্থাটা ঠিক ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর পর্যায়ে ছিল না। নিজের সংস্থান তাঁকে নিজেরই করতে হতো। তখন আবার মাও নেই, বাপের দায়িত্বজ্ঞান উল্লেখ করার মতো নয়। তবে এসব বইয়ের প্রাপ্তিস্থান কোথায় তা জানা ছিল না।’

প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতীর প্রধান মন্ত্র ছিল ‘যথা নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি’। স্বামীজি সোহংবাদি বৈদান্তিক। মন্ত্রটি মহেন্দ্রনাথ তাঁর সারা জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছিলেন। যুগটা ভাববাদী প্রাধান্যের। তিনি অনুভব করেছিলেন যেন তাঁর হৃদয়াস্থিত কোনো সত্তা এই ব্যবসায়কর্মটিকে তাঁর স্বভাবকর্ম এবং ধর্ম হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এই চিন্তাই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে চলল। প্রজ্ঞানানন্দজির সমাধি স্থাপন উদ্দেশ্যে প্রখ্যাত বিপ্লবী মনোরঞ্জন গুপ্ত তখন বরিশালে এসেছেন। তিনি আবার শ্রীসরস্বতী লাইব্রেরির অন্যতম মালিকও। এক বন্ধুর পরামর্শে মহেন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে পরিচিত হলেন এবং ব্যবস্থা করলেন যে তিনি এভাবে মিটিং ইত্যাদিতে স্টল করে বইয়ের ব্যবসা করতে চান। মনোরঞ্জন গুপ্ত বললেন, ‘এভাবে বই বিক্রির উপর ২৫% কমিশন পাওয়া যায়।’ মহেন্দ্রনাথ এক শ টাকার মতো ধার করে মনোরঞ্জন গুপ্তের কাছে পঁচিশ টাকা অগ্রিম দিয়ে অনুরোধ করলেন, একশ টাকার বই কলকাতা থেকে পাঠিয়ে দিতে। মনাদা অর্থাৎ মনোরঞ্জন গুপ্ত কলকাতা গিয়েই বই পাঠালেন। মহেন্দ্রনাথের ব্যবসা শুরু হয়ে গেল। সেদিন সম্ভবত তিনি নিজে বা তাঁর সহবিপ্লবী ছোট-বড় কেউ ভাবেননি যে স্বদেশি বই বিক্রয়কারী এই মহেন্দ্রনাথ একদিন শুধু বইবিক্রেতা নয়, একজন উঁচুদরের পুস্তকনির্মাতা তথা ছাপাখানার অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে বিকাশলাভ করবেন এবং ক্রমশ একটি অসামান্য প্রকাশনা সংস্থারও প্রতিষ্ঠা করে প্রকৃতই দেশের কাজ করবেন। একমাত্র মনোরঞ্জন গুপ্তই সম্ভবত মহেন্দ্রনাথের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বীজটিকে জলসিঞ্চন করে তাঁর অঙ্কুরিত হওয়ার রাস্তা সুগম করেছিলেন। অবশ্য পরে অনেকেই এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু সে পরের কথা। যথা সময়ে, প্রসঙ্গ অনুযায়ী আসবে।

প্রসঙ্গত, একটি কথা অগ্রিমই বলে রাখি। যে মুদ্রণ সংস্থার জন্য তিনি প্রায় গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অবসর গ্রহণের সময় অত্যন্ত তিক্ততার সঙ্গে তিনি বিদায় নিয়েছিলেন, সর্বংসহ মহেন্দ্রনাথ সেই কথাটির আভাস দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় তার জন্য প্রধান দায়িকতা ছিল জনৈক প্রাক্তন বিপ্লবীরই। সেই ব্যক্তির প্রতিও তিনি কোনো বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেননি তাঁর লেখায়। আজকের বা তখনকারও কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতিতে বিষয়টা প্রায় অবিশ্বাস্য। মহেন্দ্রনাথ এমনই এক সংস্কৃতির মানুষ ছিলেন।

দশ

মাথায় যদি কৈশোর যৌবনের সময়ে কোনো আদর্শবাদের বীজ উপ্ত হয়, তবে তার প্রভাব যে কীভাবে কার ওপর কার্যকর হবে তা আগেভাগে বলা যায় না। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় তা জানতে-বুঝতে পারে না। তবে আদর্শবাদটা, তা ভাববাদী হোক কি বস্তুবাদী, তা যদি কৈশোরিক কাল থেকে মস্তিষ্ক দখল করে এবং সেই মস্তিষ্কের অধিকারী যদি মননশীল এবং ঐকান্তিক হয়, তবে তিনি সাধারণত জীবনে একটা কিছু অবশ্যই হয়ে ওঠেন। সেটা নিঃসন্দেহে অধ্যবসায় এবং পরিশ্রম-সাপেক্ষ।

মহেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা তদ্রুপই হয়েছিল, তাঁর বিষয়ে খোঁজখবর করে তেমনই আমার মনে হয়েছে। এ কথা সত্য যে তিনি কিশোরকাল থেকে প্রাথমিকভাবে তাঁর দিদিমা এবং মায়ের কাছ থেকে এক ধরনের অনুশীলিত হলেও আদর্শের অনুশীলনে অভ্যস্ততা রপ্ত করেছিলেন। ক্রমশ তার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে বাইরের জগতের সঙ্গে। বরিশালের হারানকাকা বলেছিলেন, ‘আমার যদ্দুর মনে অয় বোজলা, মহেন্দ্রদার স্বদেশি ভাবটা পেরথম জাগে মুকুন্দ দাসের যাত্রার আখড়ায় মহড়া শুন্ইয়া।’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কিন্তু আগেও আপনাদের গল্পকথায় শুনেছিলাম যে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ এবং অশ্বিনীবাবুই তাঁকে এ ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে নাকি উদ্বুদ্ধ করেন?’

‘মুকুন্দ দাসের কথাও কইছি তহন, মনে করইয়া দ্যাহ।’ হারানকাকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম দেশ ছাড়ার ন বছর পর ১৯৭২ সালে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশে গিয়েছিলাম তখন, উপলক্ষ বিয়ে করা। সে সময়ই মুখুজ্জে মশাই এবং হারানকাকার সঙ্গে অনেক পুরোনো কথাবার্তা হয়েছিল, কিন্তু মহেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে কোনো আলোচনা তখন হয়নি। উপলক্ষও ছিল না, আমার কৌত‚হলেরও কোনো হেতু ছিল না। সে সময়ে না রত্নেশ্বরের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে, না এই আলেখ্য লেখার কোনো সিদ্ধান্ত। সেটা ছিল নেহাত পুরোনো আলাপের সূত্র ধরে। এরপর আমি দেশে যাই ১৯৮৬ সালের পুজোর সময়। সুদীর্ঘ এই চৌদ্দ বছরে, এখানে উল্লেখ্য প্রয়োজনীয় সংবাদ হলো, ইতিমধ্যে রত্নেশ্বরের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের ঘটনা, মহেন্দ্রনাথের বিষয়ে রত্নেশ্বরের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে আমার তাঁর প্রতি কৌত‚হলের জন্ম এবং ১৯৮৬ থেকে বাংলাদেশে, বিশেষ করে বরিশালে আমার নিয়মিত যাতায়াত শুরু। তখনো রত্নেশ্বর মহেন্দ্রনাথের বিষয়ে আমাকে কোনো লেখা লিখবার অনুজ্ঞা করেনি। তাঁর বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক আলোচনা প্রসঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কৌত‚হলটা মূলত সে কারণেই। তখনো মহেন্দ্রনাথ বার্ধক্যজনিত রোগে শয্যাশায়ী হলেও সজ্ঞানে বেঁচে ছিলেন। বেঁচে ছিলেন হারানকাকা এবং মুখুজ্জে মশাইও। এঁরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন এবং ১৯৮৬তে আমি যখন বরিশাল শহরে যাই মুখুজ্জে মশাই, হারানকাকা জীবিত। হারানকাকা এঁদের মধ্যে বয়োকনিষ্ঠ। হারানকাকা বলেছিলেন, ‘মহেন্দ্রদা আমার থেকে পাঁচ বছরের বড়।’ এর এক বছর না দুবছর পর মহেন্দ্রনাথ মারা যান।

হারানকাকার সঙ্গে যে আলোচনা নিয়ে বিষয়টি শুরু করেছি, তা ১৯৮৬তে ঘটেছিল। বয়স ৮৩ হলেও তাঁর শরীর তখনো বেশ সুস্থ এবং মন সতেজ, স্মৃতিও সবল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিতজনদের দীর্ঘ অদর্শনের পরেও দেখেই চিনতে পারেন, নাম মনে করতে পারেন এবং পুরোনো, বিশেষ করে স্বদেশি যুগের স্মৃতি বেশ ঝকঝকে। মাস্টারমশাই, মানে নারায়ণ সাহাও তখনো বেঁচে। কথাবার্তার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরও বয়স হয়েছে, বিশেষ বেরোন না কোথাও। এরই মধ্যে তাঁর খোঁজখবর নিতে গানের কথা, শহরের সংগীত-সংস্কৃতির আগের এবং পরের আলোচনা প্রসঙ্গে মুকুন্দ দাসের স্বদেশি গান নিয়ে কথা ওঠায় স্বদেশি আন্দোলন এবং ক্রমে মহেন্দ্রনাথের বিষয়ে আলোচনাটা স্থায়ী হলো। তখনই হারানকাকা কথাটি বলেছিলেন যে মহেন্দ্রনাথ স্বদেশি ভাবধারার আদর্শে আকৃষ্ট হন মুকুন্দ দাসের যাত্রার মহড়া, গানের অনুশীলন ইত্যাদির মাধ্যমে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি বলেছিলেন, মনে আছে যে মহেন্দ্রনাথ যাত্রা এবং গানের খুব অনুরক্ত ছিলেন। নিজেও মোটামুটি গাইতেন। আপনার কি এমন কোনো গান মনে আছে, বিশেষ করে মুকুন্দ দাসের স্বদেশি বা ভিন্ন গান, যা মহেন্দ্রনাথকে স্বদেশি আদর্শ ছাড়াও অন্যভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল?’

‘একটা গানের কথা মনে আয়, তয় পুরাডা মনে পড়বে কিনা, না ভাবইয়া কইতে পারমু না। গানডা আমারও খুব পছন্দের আছিল। তেমন গাইতে না পারলেও করতাম। তয়, হেডা স্বদেশি গান কিনা হেডা ভাবইয়া দ্যাখথে অইবে। মহেন্দ্রদা গানডা খুবই গাইতেন।’

‘চেষ্টা করে দেখুন না, যদি কিছুটা মনে পড়ে। আমি না হয় খুঁজে নেব বাকিটা।’ আমার অনুরোধের হেতু ছিল। একসময় আমিও মুকুন্দ দাসের গান গাইতাম ঘনিষ্ঠ মহলে। হারানকাকা খানিক ভেবে বললেন, ‘খাড়ও, দেহি।’ বলে তিনি ক্লেষ্মাঘন কণ্ঠে গানটির মুখপাতটি সুরেই আবৃত্তি করলেন, ‘মানস নয়ন করি উন্মীলন, চেয়ে দেখ শিরে খাড়া ন্যায়েরই দণ্ড।’ গানটির বাণী এবং সুর মুকুন্দ দাসের পুরো ছাপ বহনকারী হলেও একটা ব্যতিক্রমী ব্যাপার আছে। আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও হারানকাকা দু-একটা লাইন ছাড়া বাকিটা মনে করতে পারলেন না। গানটির প্রথম পদবন্ধটি এবং হারানকাকার প্রয়াসকৃত সুরটি শুনেই আমার বোধ হয়েছিল, এটি মুকুন্দ দাসের পরম্পরাগত ভাবের চেয়ে পৃথক। সুরটি অবশ্যই তাঁর উদ্দীপনী সুরের ধাঁচেই। তাঁর গানের বাণী সাধারণত শ্রোতাদের তৎনগদ স্বদেশি চেতনা বা আদর্শে উদ্দীপ্ত করার তাৎক্ষণিক আবেগ সঞ্চারী। কিন্তু, ‘মানস নয়ন করি উন্মীলন’ ইত্যাদি বাণীতে ‘ভয় কী মরণে’ বা ‘এবার বাণ এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও’ প্রভৃতির চেয়ে বেশ খানিকটা গভীরতর দ্যোতনা রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছিল। এটির মধ্যের ব্যতিক্রমী ব্যাপারটি তখন ধরতে পারিনি। পরে গানটি এক নবীন, নবলব্ধ বন্ধু গায়ক আমাকে শোনায়। তখন রত্নেশ্বরের সঙ্গে আমার মহেন্দ্র দত্তের বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। একটা কাকতালীয়ভাবেই গানটি পেয়ে যাই। অবশ্য ব্যাপারটা নিয়ে হারানকাকার সঙ্গে কথা হওয়ার পর যে আমি এটির খুব খোঁজখবর করেছিলাম এমন নয়। ঘটনাটা অচানকই ঘটল।

ডালহৌসি পাড়ায় আমার এবং রত্নেশ্বরের অফিস তথা ট্রেড ইউনিয়ন, রাজনীতি, আড্ডা ইত্যাদির কেন্দ্রস্থল। আমার ওই গায়ক বন্ধুটি উত্তরবঙ্গের একটা স্কুলে গানের শিক্ষকতার চাকরি করত। ছুটিতে বাড়ি এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে অফিসে এসেছিল। তখন টিফিন ব্রেকের সময়। অফিসের পেছন দিকের একটা ফাঁকা জায়গায় বন্ধুটি গানটি আমাদের শোনালে, হারানকাকার কথা মনে পড়ে গেল। গানটিও পেয়ে গেলাম। গানটি হলো :

‘মানস নয়ন করি উন্মীলন

চেয়ে দ্যাখ শিরে খাড়া

ন্যায়েরই দণ্ড।

বিদ্যুৎ চমকে ওই ঝলসে তীব্রানল

অশনি গরজে কালো রুদ্র প্রচণ্ড।

এখনো ছেড়ে দেবে মোহঘোর তন্দ্রা

এখনো জেগে ওঠ ছেড়ে কালো নিদ্রা

লইয়ে গোটাকতক রজত মুদ্রা

ভেবো না করধৃত অখিল ব্রহ্মাণ্ড।

বিষয় বৈভব দম্ভ ধন জন

দলিত চ‚র্ণিত পলকে বিলীন

ক‚ট তর্কছল সেথা অকারণ

সত্য দীপে জ্বলে নিখিল ব্রহ্মাণ্ড।’

এই গান যে সরাসরি মোটা দাগের স্বদেশ প্রেমের উজ্জীবক নয়, তা মানতেই হবে। অথচ স্বদেশমন্ত্রের গভীর মর্মবাণীও যে এর মধ্যে নেই, তা-ই বা বলা যায় কী করে?

এখন মহেন্দ্রনাথকে নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বসে আমি ভাবছি, এই গানটি যে তিনি প্রায়ই করতেন বলে হারানকাকা বলেছিলেন, তার একটা বিশেষ তাৎপর্য মহেন্দ্রনাথের তৎকালীন পথ-অন্বেষণের সঙ্গে বিশেষ সংগতিপূর্ণ।

হারানকাকাকে এরপর আর একবার মাত্র পেয়েছিলাম, সেটা ১৯৮৮ সালে। তখন বার্ধক্য তাঁকে পেড়ে ফেলেছে। সুতরাং যদিও তখন এই আলেখ্য রচনার বিষয়ে রতেœশ্বরের সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়ে গেছে এবং হারানকাকার সাহচর্য আমার বিশেষভাবে তখনই দরকার ছিল, কিন্তু তিনি ১৯৮৮তেই গত হলেন। রতেœশ্বর এবং আমি কর্মসূত্রে বদলি হয়ে, আমি দক্ষিণ বিহারের এক আরণ্যক গ্রামে তো রতেœশ্বর উড়িষ্যার কেতঞ্জরের বনবাসে। সুতরাং মহেন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রকল্পটি অধরাই রয়ে গেল পরবর্তী প্রায় দশ-বারো বছরের মতো। কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি না হলেও রতেœশ্বর ঐকান্তিক ছিল। আমাদের প্রাক প্রচেষ্টায় যে তথ্যটুকু আমি সংগ্রহ করেছিলাম, সে তার সবটাই সংরক্ষণ করেছিল। ইতিমধ্যে নিরন্তর বদলির হ্যাপা এবং বয়স বাড়ার কারণে, আজ এখানে, কাল ওখানে দৌড়-ঝাঁপ অসহ্য বোধ হওয়ায় আমরা দুজনেই চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছিলাম। আমাদের পুনরায় সংযোগের বাঁধা রইলাম। একদিন রতেœশ্বর বলল, ‘কাজটা এবার ধরো।’ কাজটা আমার আরণ্যক পর্যায়ে করা যেত। কিন্তু পরবাসে আকরগ্রন্থের অসদ্ভাব। তাই, অন্য ধরনের লেখালেখির কাজ চললেও এই জাতীয় একটি লেখার সুবিধে ছিল না। বড় কথা রতেœশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগটা কদাচিৎ এক-আধটা চিঠির মাধ্যমে। সেই যুগটা ফোন বা মোবাইলের সুবিধেভোগী ছিল না।

এই সময় একদিন রত্নেশ্বর আমার বাড়িতে এসে জানাল, ‘দ্যাখো, আজকাল মনে হচ্ছে আমরা অতিদ্রুত অথর্ব হয়ে পড়ছি। মাঝে মাঝে ভাবি, জেঠাবাবুর এই কাজটা বোধ হয় আর হলো না।’ কথাটা শুনে খুবই অপরাধী মনে হলো নিজেকে। রত্নেশ্বর মিথ্যে বলেনি। মহেন্দ্রনাথ কী অসামান্য তিতিক্ষা এবং শ্রমে তাঁর কর্মজগৎটা তৈরি করে নিয়েছিলেন, আর আমরা তাঁর জীবন নিয়ে একখানা আলেখ্যও নির্মাণ করতে পারলাম না। বললাম, ‘এবার কাজটা করবই।’ এবং সেদিন রাত থেকেই, অগোছালোভাবে হলেও লেখাটা ধরলাম। পরদিনই রত্নেশ্বরের কাছ থেকে আগের নোটগুলো নিয়ে এলাম। ওর স্মৃতিশক্তিটা বরাবরই অসামান্য। বলল, ‘তিনজন বিশেষ ব্যক্তির কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, অশ্বিনী দত্ত, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ এবং মুকুন্দ দাস- যাঁকে, শুনেছি তৎকালীন বরিশালবাসী মাতাল “যোগ্যাগুন্ডা” বলে পরিচয় দিত।’

যজ্ঞেশ্বর দাস ওরফে মাতাল যোগ্যাগুন্ডা যে সন্ধ্যে হলেই আকণ্ঠ পান করে বরিশালের তৎকালীন বেশ্যাপল্লিতে প্রকাশ্যে যাতায়াত এবং হুল্লোড়বাজি করত, যত্রতত্র মারপিট করত এবং তৎসত্তে¡ও অসাধারণ গানও গাইত, সেসব গল্প বহুশ্রæত। সবাই কমবেশি জানেন। জানেন, অশ্বিনীকুমার কীভাবে একদিন ওই নিষিদ্ধ পল্লির পাশের পথ দিয়ে আসার সময় যজ্ঞেশ্বরের উদাত্ত কণ্ঠের গান শুনে সঙ্গের কয়েকজন পাঠিয়ে তাকে ধরে এনে তাঁর বিখ্যাত বৈঠকখানার আড্ডায় ফেলেন। এরপর থেকে যজ্ঞেশ্বর কীভাবে চারণকবি যাত্রাপালার গায়ক তথা রচয়িতা এবং স্বদেশি মুকুন্দ দাসে পরিণত হলেন, সে কাহিনিও জানেন না। রত্নেশ্বর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ওই সব কথা তাঁর বিষয়ে লিখবে নাকি?’ বলেছিলাম, ‘চটকদার, চমক সৃষ্টিকারী কিছু লেখার উদ্দেশ্য আমার নেই। মুকুন্দ দাস তাঁর যাত্রা নাটক এবং গানের মাধ্যমে কিশোর মহেন্দ্রনাথকে কীভাবে, কতটা প্রভাবান্বিত করেছিলেন, সেটাই আমার প্রাথমিক লক্ষ্য। কারণ, আমাদের বিষয় মহেন্দ্রনাথ দত্ত, মুকুন্দ দাস নন।’

‘বেশ। আর অশ্বিনীবাবু? বা প্রজ্ঞানানন্দ?’

‘অশ্বিনীবাবুর সংস্পর্শ মহেন্দ্রনাথের জীবনে মাত্র তিন বছরেরÑ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত। তখন তিনি স্কুলে পাঠরত। এই সময়টাতেই মহেন্দ্রনাথ তাঁকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। তখন মহেন্দ্রনাথের বয়স মাত্র চৌদ্দ থেকে সতেরো হবে হিসেবমতো। কিন্তু তাঁর প্রভাবটা পড়েছিল পরোক্ষভাবে মাস্টারমশাই এবং স্বদেশি কর্মীদের মাধ্যমে। তখনকার বেশির ভাগ শিক্ষকই বিশেষত ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের জনেরা তো বটেই, তাঁর নির্দেশ এবং আদর্শ অনুসরণ করে চলতেন, ছাত্রদের সামনে তা তুলেও ধরতেন। অশ্বিনীবাবুর বৈঠকখানা সব বয়সী মানুষের জন্যই অবাধ ছিল। স্বদেশানুরাগ ব্যাপারটা তাঁর ব্যবহারের মাধ্যমেই ছোট-বড় সবাই উপলব্ধি করত। তিনি কোনো পন্থার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট পথের কথা বলতেন না বলেই আমার ধারণা। তবে তাঁর মূলমন্ত্র ছিল সেবা, সমাজের সর্বস্তরের আর্তদের সেবা। এর মাধ্যমেই স্বদেশ বা স্বরাজ গঠনের স্বপ্ন ছিল তাঁর। মহেন্দ্রনাথ এই ভাবটা নিজের মধ্যে আয়ত্ত করে নিতে পেরেছিলেন।’

রত্নেশ্বর খুব মনোযোগ সহকারে আমার কথা শুনছিল। মনে হলো, আমার বক্তব্যের সঙ্গে সে দ্বিমত নয়। বলল, ‘জেঠাবাবুর সঙ্গে এসব বিষয়ে বার্তালাপের সময় লক্ষ করেছি তিনি মুকুন্দ দাসকে এমন একটা মর্যাদার স্থান দিতেন যে তাঁর শ্রদ্ধাভাজন সশস্ত্র বিপ্লববাদে বিশ্বাসী নেতাদেরও ততটা দিতেন কি না সন্দেহ। স্বদেশি চেতনা সাধারণের মধ্যে জাগরিত করার যে লোকায়ত পদ্ধতিটি মুকুন্দ দাস তাঁর দেশপ্রেমের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ব্যবহারে এনেছেন, জেঠাবাবু বলতেন যে সেটি একটি যুগান্তকারী ব্যাপার।’

‘ব্যাপারটা নিয়ে ভিন্নভাবে হলেও আমি ভেবেছি। ভিন্নভাবে বলতে এই প্রসঙ্গ ব্যতিরেকেই। মানুষকে উজ্জীবিত এবং উদ্দীপ্ত করার জন্য গান এবং যাত্রাপালার এ রকম ব্যবহার মুকুন্দ দাসের মতো আর কেউ তাঁর আগে করেছেন বলে আমার জানা নেই। সেদিক থেকে তোমার জেঠাবাবু বোধ হয় একশ ভাগ সঠিক কথাই বলেছেন। একজন সামান্য ব্যক্তি, যে নাকি স্বভাবে মাতাল, চরিত্রে গুন্ডা এবং বেশ্যা সংসর্গকারী, তাঁর মধ্যে এই পরিবর্তন আনয়ন হয়তো অশ্বিনী দত্তের একটা বড় কীর্তি, কিন্তু স্বদেশ চেতনাটা এবং তাকে প্রসারিত করে গণমুখী করার ক্ষমতাটা নিঃসন্দেহে তাঁর মধ্যে ছিলই।’

‘এবং ধারাবাহিক ক্রমে তুমি নিশ্চয় লক্ষ করে থাকবে যে এই মাধ্যমটা প্রকৃত জনসেবকেরা আজও ব্যবহার করে আসছেন, যদিও তার ব্যাপ্তি এখন আর ততটা নেই।’ রত্নেশ্বর বলছিল।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি গণচেতনা জাগ্রত করার এই পদ্ধতি বাঙালি হিসেবে সর্বপ্রথম প্রচলনে তথা প্রয়োগে আনেন শ্রীচৈতন্য। তখনো তিনি চৈতন্য দেব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাননি। তখন তাঁর পরিচয়, গৌরাঙ্গ, গোরা বা নিমাই। অধো বা নিম্নবর্ণের মানুষদের, অর্থাৎ যাদের সমাজে আদৃশ্য, অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছিল এবং সমাজের অতি প্রয়োজনীয় জাতিগত নেশাকে অবলম্বন করেও যারা পতিত, চণ্ডাল হিসেবে পরিগণিত হতো, তাদের চৈতন্যের প্রেসারে তিনি ‘হরেকৃষ্ণ’ এই নামটিকে গণ-আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার মন্ত্র বা স্লোগান রূপে ব্যবহার করে গৌড়ীয় সমাজে এক ব্যাপক অভ্যুত্থানের সূচনা করেন। তারপর থেকে কি সামাজিক, কি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং ‘গণ’কে ঐক্যবদ্ধভাবে গড়ে তোলার জন্য যুগানুযায়ী নানান স্লোগান যেমন জন্ম হয়, তেমনি চৈতন্য প্রদর্শিত অন্য যে পন্থাটি অনুসৃত হয়, তা হলো, লোকায়ত সংগীত তথা নাট্যকর্মের ব্যাপক ব্যবহার। তা কখনো ঢপ, কখনো যাত্রা, কখনো কবিগান, কখনোবা কীর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে আদর্শের প্রচার। মুকুন্দ দাস স্বদেশি প্রচারে, সরল-সহজ পদ্ধতিতে যাত্রা মাধ্যমটিকে গ্রহণ করেছিলেন এবং তা উদাত্ত সংগীতের সহায়তায় বিশেষত।

রত্নেশ্বর সেদিন অনেক কথাই বলেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে দুই বন্ধু আলাপ-আলোচনা করছিলাম। রত্নেশ্বর কথা প্রসঙ্গে বলল, ‘দেখ, আমরা দুজনেই একসময়, ষাট-সত্তরের উতল হাওয়ায়, আলোড়িত হয়ে বিপ্লবী রাজনীতির আওতায় এসেছিলাম। মহেন্দ্রনাথও তাঁর সময়কার ধারা অনুযায়ী বিপ্লবী আবর্তের মধ্যে পড়েছিলেন। তফাতটা দেখ। তিনি একটা নিজস্ব কর্মধারার মঞ্চ সৃষ্টি করে নিতে পেরেছিলেন। আমরা কিন্তু কেউ বাক্যবিপ্লবী, কেউবা সেকুটেরিয়ান হিংসাশ্রয়ী গোষ্ঠীর অনুগামী, কেউবা শুকনো নিষ্ফল তাত্ত্বিক আবার কেউ পুরোপুরি দক্ষিণপন্থী হিসেবে, যে যাকে আজও অভ্রান্ত মনে করছি। কাজের কাজ কেউই কিছু করতে পারিনি। তফাতটা সেখানেই। কিন্তু সে আলোচনা নয়। জেঠাবাবু বলতেন, “হৃদিস্থিত হৃষিকেষ যেমন নিযুক্ত করবেন, তেমনভাবে কাজ করলেই যথার্থ কাজ হয়।” মুকুন্দ দাস এই উপমহাদেশে ব্যাপক পরিচিতি অবশ্যই পাননি। কিন্তু তাঁর হৃদিস্থিত হৃষিকেশ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাত্রাপালা এবং স্বদেশি গানের মাধ্যমে গণচেতনার উন্মেষ ঘটাতে। আঞ্চলিকভাবে শুরু হলেও, অন্তত গোটা বাংলায় সেই পন্থাটা একটা স্থায়ী প্রভাব যে রাখতে পেরেছিল তা অস্বীকার করা যাবে না।’

রত্নেশ্বরের কথাটা যে সত্যি তা কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে পরবর্তীকালেও আমরা উপলব্ধি করেছি। মহেন্দ্রনাথও আশির দশকে যখন রত্নেশ্বরকে মুকুন্দ দাস বিষয়ে নানা কথা বলতেন, তিনি এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাই বলেছিলেন। রত্নেশ্বরের বক্তব্যের একটা ব্যাপার আমি ধরতে পারিনি। ও ওই যুগের বিপ্লববাদীদের সঙ্গে আমাদের প্রচেষ্টার তুল্যমূল্যতা এবং মুকুন্দ দাসের গণচেতনার পন্থার ব্যাপারটা একসঙ্গে বলল কেন? খোলাখুলি বিষয়টা জিজ্ঞেস করলে রত্নেশ্বর জানাল যে, আমরা যদি ষাট-সত্তরের প্রেক্ষাপটে আমাদের আদর্শ নিষ্ঠার ফাঁকা আওয়াজের সঙ্গে অশ্বিনীকুমার বা মুকুন্দ দাসের যুগের আদর্শ এবং তদনুযায়ী সক্রিয় কর্মনিষ্ঠার তুল্যমূল্য বিচার করি বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাবে। কোন আদর্শটা সঠিক, সেটা প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন আদর্শ অনুযায়ী নীতিনিষ্ঠতা নিয়ে। অশ্বিনীকুমার একটা স্লোগান তৈরি করেছিলেন, ‘সত্য, প্রেম, পবিত্রতা’। তাঁর কর্মকাণ্ডে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি। সাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রসারকে। সেই আদর্শটা তাঁর অনুচরেরা মূলমন্ত্র করে নিয়েছিলেন। সেই অনুসারে তাঁরা কাজ করতেন। অন্য কাজও তাঁরা করতেন। কিন্তু অশ্বিনীকুমার সেসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তাঁর অনুগামীদের মধ্যে যেসব স্বদেশি সশস্ত্র বিপ্লবের পন্থা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের বাধা দেননি তিনি। মুকুন্দ দাসের গান তিনি ভালোবাসতেন। মহেন্দ্রনাথ রত্নেশ্বরকে বলেছেন দুর্ধর্ষ স্বভাবের মুকুন্দ বা যোগ্যাগুন্ডাকে তিনি ইস্পাতের মানুষ হিসেবে তৈরি করেছিলেন। স্বদেশি প্রচার এবং তৎসম্বন্ধীয় কাজকর্ম করতে তিনি কখনো তাঁকে আদেশ অনুজ্ঞা করেননি। মুকুন্দের গান এবং যাত্রাপালা অনুসরণ করে তিনি নিজেও কিছু গান রচনা করেছিলেন। এভাবেই এক আদান-প্রদানের মধ্যে গড়ে উঠেছিলেন মুকুন্দ, পরে তাঁকে তিনি চারণ কবি আখ্যায় ভ‚ষিত করেন।

রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘পরবর্তীকালের কমিউনিস্ট পার্টি বা প্রগতিমনষ্ক মানুষেরা যে কালচারাল ফ্রন্টের প্রসার ঘটিয়েছিল, আমি মনে করি, মুকুন্দ দাসের গানের এবং স্বদেশি যাত্রার পদ্ধতিগত অবদান সে ব্যাপারে খুব কম ভ‚মিকা পালন করেনি। এ ক্ষেত্রে আধুনিকতা, গ্রাম্যতা, ভাববাদী, বস্তুবাদী ব্যাখ্যা বা বিচারটা আমার কাছে খুব গুরুতর নয়।’

মহেন্দ্রনাথ যে সংগ্রাম পদ্ধতিটি তাঁর জীবনে অবলম্বন করেছিলেন, তা ছিল একটি বিশেষ কাজকে নির্দিষ্ট করে তার প্রতি একনিষ্ঠ থাকা। সেখান থেকে কখনোই বিচ্যুত না হওয়া এবং সেই কাজে যাঁরা তাঁকে প্রাথমিকভাবে নিযুক্ত করেছিলেন, প্রশ্নহীন আনুগত্যে তাঁদের নির্দেশ পালন করা। সেখানে ডিসিপ্লিন ব্যাপারটা, বিশ্বস্ততা, সততা এবং একনিষ্ঠতা থেকে এক দিনের জন্যও বিচ্যুত না হওয়াটাই ছিল তাঁর আদর্শবাদের মূল। এসব যে বক্তৃতা দিয়ে, উপদেশ দিয়ে তাঁকে রপ্ত করানো হয়েছিল, এমন নয়। মুকুন্দ দাসের ক্ষেত্রে যেমন, তাঁর ক্ষেত্রেও তেমনি, স্বকীয় অনুশীলন এবং অগ্রজ বা গুরুস্থানীয়দের প্রায়োগিক কৌশলে, সেসব কর্মে তাঁরা অভ্যস্ত হয়েছিলেন। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের মত ছিল, বিপ্লবী মতাদর্শ অনুযায়ী যারা দল বা গোষ্ঠী পরিচালনা করবে, তাদের অবশ্যই একটি নিজস্ব আয়ত্তাধীন প্রকাশনা তথা মুদ্রণ সংস্থা থাকতে হবে। সেই অনুসারেই অরুণ গুহ, মনোরঞ্জন গুপ্ত, শৈলেশ দে ইত্যাদিরা একটি কর্মকাণ্ডের সূচনা করেছিলেন। ক্রমে একসময় মহেন্দ্রনাথকে তাঁরাই সেই কাজে নিযুক্ত করেন।

রত্নেশ্বরের সঙ্গে সেদিন এসব বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা শেষে সে জানাল, ‘ভাই, আমাদেরও দিন তো প্রায় শেষ হয়ে এল। এবার তুমি মহেন্দ্রনাথের প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের কর্মকাÐ নিয়ে কিছু আলোকপাত করে লেখাটার একটা আকৃতি দাও। পরের কথা পরে।’

এগারো

মহেন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব বিষয়ে কিছু আলোকপাত প্রয়োজন। অবশ্য তাঁর নাম বরিশালের সমাজ ইতিহাসের সন্ধিৎসুজনেদের কাছে সুপরিচিত, অন্তত একসময়ে তো তা ছিলই। তাঁর নাম শ্রীদুর্গামোহন সেন। তিনি এবং তাঁর সম্পাদনাকালে ‘বরিশাল হিতৈষী’ নামক সংবাদ পত্রটি বঙ্গভঙ্গবিরোধী তথা স্বদেশি আন্দোলনের প্রাক্কালে দেশবাসীর কাছে সুখ্যাতি এবং বৈদেশিক শাসককুলের কাছে ব্যাপক কুখ্যাতি অর্জন করেছিল।

১৯০৬ সালের বরিশালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের পর, তাঁর অসামান্য দেশানুরাগ, সাহস এবং তেজস্বিতা মুগ্ধ বরিশালের ‘ন্যাশনাল মেশিন প্রেস’-এর মালিকেরা দুর্গামোহনকে প্রসটি এবং তৎসহ পঞ্চাশটি টাকা দান করেন। প্রায় একই সঙ্গে বরিশাল হিতৈষী পত্রিকার মালিক তথা সম্পাদক রাজমোহন চট্টোপাধ্যায় পত্রিকাটির স্বত্বাধিকার দুর্গামোহনকে প্রদান করেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের পরপরই অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে এটি প্রকাশ হতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তা সাপ্তাহিকে পরিণত হয়। এই পত্রিকাটির ইতিহাস সুদীর্ঘ। এখানে তার আনুপূর্ব উল্লেখের প্রয়োজন নেই। এর সম্পাদনাকালেই, আপত্তিকর তথা রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা এবং প্রকাশনার কারণে দুর্গামোহনকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়।

মহেন্দ্রনাথের কর্মজীবন শুরুর আগে, প্রেস-বিষয়ক কাজকর্মের হাতেখড়ি হয়েছিল বরিশাল হিতৈষী প্রেসে। স্বদেশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মহেন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গকে দুর্গামোহন চিনতেন। আগেই বলেছি, ইউনিয়ন জ্যাক পুড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া মহেন্দ্র এবং তাঁর সঙ্গীদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন দুর্গামোহন।

আত্মীয়-পরিজন মহলে এ নিয়ে কিছু কানাঘুষো আলোচনা হয়ে থাকবে। রত্নেশ্বরকে, তার প্রশ্নের উত্তরে মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ব্যাপারটার মধ্যে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা বা দেশপ্রেম বিরোধিতার কার্যকারণ ছিল না। তখনকার স্বদেশিদের মধ্যে যাঁরা সামান্য সাধারণ তথাকথিত অপরাধে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হতেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে তাঁদের নির্দ্বিধায় তার মান্যতা দেওয়া দলীয় নীতির মধ্যে ছিলই। তার পেছনে দেশপ্রেমিক স্বদেশি নামধারীদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষালাভের একটা ব্যাপারও ছিল। সেখানে তাঁরা যেমন লেখাপড়া করার সুদীর্ঘ অবসর পেতেন, তেমনি বড় বড় মাপের নেতাদের সংস্রবে এসে প্রকৃত দেশকর্মী হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পেতেন।’

পরবর্তীকালে যে কাজে মহেন্দ্রনাথ নিজের সত্তাকে খুঁজে পেয়েছেন সেই ‘শিশুসাহিত্য’ প্রকাশনের মূলে ছিল তাঁর ছন্দোপ্রীতি। বরিশাল জেলে থাকার সময়েই এ বিষয়ে তার বিকাশ শুরু হয়েছিল। অবশ্য এর আগেই মুকুন্দ দাসের গান বা যাত্রাপালা শোনা ও পড়ার সময় থেকেই তাঁর মধ্যে লোকায়ত ছড়া ও পদ্যের সাধারণ ছন্দপরিচয় এবং তার রণনের বীজ উপ্ত হয়। অথবা আরও শৈশবে যখন অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর, বই পড়ার উপযুক্ততা অর্জিত হলে, মা, দিদিমাকে রামায়ণ ইত্যাদি পাঠ করে শোনাতেন, তখন থেকেই ছন্দোপ্রীতির প্রবণতা এসে গিয়েছিল তাঁর স্বভাবে। কিন্তু তা ছিল তদানীন্তন সহজ এবং ব্যাপক প্রচলিত পয়ার বা ত্রিপদী ছন্দ। শিশুমনের উপযোগী ছন্দের প্রতি আকর্ষণ জন্মে বরিশাল জেলে থাকাকালীন। অথবা তা শুধু শিশুমনের কেন, বিকাশোন্মুখ কিশোরদের কথাই তাঁর মাথায় এসে থাকবে তখন। এর পেছনে একটি কাহিনির কথাও তিনি বলেছেন।

তাঁর সঙ্গের এক কিশোর স্বদেশি কয়েদির কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। তার নাম অনজ্ঞ ব্যানার্জি। তার ছিল ছয় মাসের মেয়াদ। আগে তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। জেলেই ঘনিষ্ঠতা। কথায় কথায় সে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘রবিঠাকুরের কবিতা পড়েছ?’ মহেন্দ্রনাথ তখনো দুএকটির বেশি রবিঠাকুরের কবিতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তাও উল্লেখযোগ্যভাবে শিশু-কিশোর মনের উপযোগী কিছু নয়। অথচ তিনি নিজেও তখন কিশোর। পরিপার্শ্বের প্রকৃতি, মানুষ, পরিবেশ এবং যুগানুযায়ী পরিবস্থা তাঁকে এক রহস্যময়তা থেকে অন্য রহস্যময়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই রকমই অবস্থায় একদিন সকালে অনঙ্গ তার কিশোর মধুর কণ্ঠে উদাত্তভাবে আবৃত্তি করেছিল ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’Ñ

‘আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের ’পর

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান।’

মহেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল স্বপ্নভঙ্গটা যেন তাঁরই হলো। একটা অপরূপ স্বপ্নময় জগতের বাতায়ন খুলে যেন সুবর্ণবর্ণের রোদ্দুরের ঝলক জেলখানার সুউচ্চ প্রতিবন্ধকতা ভেদ করে তাঁকে ভিন্নভাবে এক মুক্ত মানুষ করে দিল। ‘ছন্দের আলোড়ন, ভাষার উদ্বেলতা আমার মনে এমন এক মায়াজাল সৃষ্টি করল যে এ কবিতা আমি মুখস্থ করে ফেললাম এবং এটা মনে মনে আবৃত্তি করা নেশার মতো হয়ে দাঁড়াল।’ পরে প্রৌঢ়কালে লিখেছিলেন তিনি।

তারপর অনঙ্গ রবীন্দ্রনাথর আরও অনেক কবিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সত্যেন দত্তের ছন্দের ঝংকারে সর্বাঙ্গে শিহরিত হয়েছিলেন তিনি। পালকি চলে, দূরের পাল্লা, ঐ আমাদের ছেলের দলÑ একের পর এক সোনালি স্বপ্নের জাল বুনে অনঙ্গ যেন তাঁকে এক রূপকার গ্রহে নিয়ে ফেলেছিল। এই ঘটনাটা তাঁর উত্তরকালের কর্মজীবনের পথটা প্রশস্ত করে দিয়েছিল।

মহেন্দ্রনাথ ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন, সশস্ত্র বিপ্লব আন্দোলনের পথটা তাঁর স্বধর্ম নয়। তাঁর পথ অন্যত্র ছড়িয়ে আছে তাঁরই পথচলার অপেক্ষায়। সেখানে দেশের অগণ্য শিশু এবং কিশোরকুল তাঁর জন্য উজাগর হয়ে রয়েছে। অনঙ্গর সাহচর্যে যেমন তাঁর পরবর্তীকালীন কর্মের এই পথটি প্রশস্ত হচ্ছিল, তেমনই কারাবাসের সময়ের অন্য কয়েকটি ঘটনাও মহেন্দ্রনাথের উত্তরকালের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছিল।

প্রৌঢ়ান্ত কালে সেসব স্মৃতি ছায়াছবির মতো তাঁর মনের পর্দায় আজ ভাসে এবং রতেœশ্বর প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সেই ছবির কিছু কিঞ্চিৎ রেখাচিত্র তার নোটবইয়ে সঞ্চয় করে রাখে।

মনে পড়ে কীভাবে শিক্ষাঙ্গন পরিত্যাগ করে, স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে এসে বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। দোকানের পেছনে পরিশ্রমের ত্রæটি ছিল না। তখন অবশ্য ব্যবসা তাঁর নিজস্ব মালিকানায় নেই। ব্যক্তিগতভাবে এ কাজে কুড়ি টাকার একটা মাসোয়ারা বরাদ্দ ছিল। বই বিক্রির আয় সবটাই জমা করতে হতো স্বরাজ অফিসের সেক্রেটারি নরেন সেনের হাতে, কংগ্রেস কর্মী চিন্তাহরণ চ্যাটার্জির মারফত। তবে হিসাবপত্র সম্পর্কে সতর্ক খেয়াল রাখতেন। দেশসেবার উদ্দেশ্যে ব্যবসা, সেখানে প্রতিপদে তঞ্চকতার বদনামের ভয় তখনকার দিনেও ছিল।

কিন্তু মহেন্দ্রনাথ জেলে যাওয়ার পর হিসাবপত্র ঠিকমতো রাখা না হওয়া, ব্যবসা পরিচালনে অব্যবস্থা এবং বেহিসেবিভাবে খরচখরচা করার কারণে দোকানে লোকসান হতে থাকে। জেলে থাকতেই তিনি দোকানের দুরবস্থার কথা শুনেছিলেন। তখন প্রখ্যাত বিপ্লবী মনোরঞ্জন গুপ্ত বরিশাল জেলে আসেন। তিনিই তাঁকে দোকানের খবর জানান। এক বছর কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে যখন এলেন, তখন দোকানের সাইনবোর্ডটি ছাড়া আর কিছু নেই। মনে খুবই কষ্ট হয়েছিল মহেন্দ্রনাথের। জীবনের প্রথম ব্যবসায় উদ্যোগ এবং তাও ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়, সম্পূর্ণভাবেই দেশসেবার স্বার্থে। রতেœশ্বর জানতে চেয়েছিল, ‘এ জন্য আপনি কাউকে দায়ী করেননি? কৈফিয়ত চাননি কারুর?’ মহেন্দ্রনাথ কথোপকথনকালে কখনো বরিশালি ভাষা কখনো বা কলকাতার ভাষা ব্যবহার করতেন, যখন যেমন মুড সেই অনুযায়ী। রতেœশ্বরের প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘কৈফিয়ত চাইয়া অইতে কোন ডউয়া। যা যাওয়ার হেয়াতো গেছেই। খালি মধ্যহান দিয়া দলের মইদ্যে খাওয়াখায়ি, কোন্দোল লাগতে। ব্যাপারটা আমার কোনোকালেই পছন্দ না। যা গেছে হেয়া তো আর ফেরতে না। তয় একটা লাভ আমার অইছেলে, অভিজ্ঞতা। পরে কাজে লাগছে হেডা।’

মনোরঞ্জন গুপ্ত জেলে মহেন্দ্রনাথ এবং তাঁর সঙ্গী অন্য চারজনকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। মহেন্দ্রনাথ রতেœশ্বরকে বলেছিলেন, ‘মনাদা বোধ হয় তহন আমাগো মতন অসহযোগ আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকেগো মইদ্যে বিচরাইতে আছিলেন, কারে দিয়া কোন কাম অইবে। সম্ভবত হেনার মনে অইছেলে যে আমারে দিয়া আর যে কামই হউক সাহেব মারা অইবে না। এসব লইয়া আড়েঠারে কথাবার্তাও দিন কয়েক অইলে। লগের রাখাল বাবু আর দেবেন বাবু কইলেন, “মহেন্দ্রর বুকে বড় দয়ামায়া। বন্দুক, পিস্তল, বোমার আলোচনার সিকা ওর পছন্দ রবিবাবুর গান, কবিতা। অবশ্য মুকুন্দ দাসেরও ও খুব ভক্ত।” মনাদা বলেছিলেন, “শহরের পুলিশ লাইনে বাই নাচেও যাওটাও নাকি?” মহেন্দ্রনাথ উত্তর করেছিলেন, ‘বার দুয়েক গেছি।’

‘নেশা ভাঙ করো?’

‘না আইজ্ঞা, হেইডা করি না।’

‘তাও ভালো। বরিশাল শহরে ভালো আর মন্দ দুইটা পথই বেশ খোলা মেলা। অন্তর থেকে সাড়া না পেলে আমাদের রাজনীতিতে আসবে না। আমার মতো লোকেরা সহিংস এবং অহিংস উভয় পথেই আছি। দেশবন্ধু আমাদের নেতা। আমি অবশ্যই মনে করি শুধু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের দ্বারা স্বরাজ লাভ হবে না। বুকে মায়াদয়া আমাদেরও আছে। তবে অত্যাচারীকে নিকেশ করার প্রতিহিংসার আগুনও সেখানে ধিক ধিক করে অহরহ জ্বলছে। যা হোক, মুকুন্দ একসময় বিপথে ছিল, আগুনে পুড়ে সে এখন খাঁটি ইস্পাত তৈরি ইচ্ছে। মাস্টারমশাই (অশ্বিনীকুমার) তাকে তার রাস্তায় পৌঁছে দিয়েছেন।’

মহেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমি কোন পথে যাব? আমার কোনো পরিচালক নেই। আপনি আমার কর্মপথ নির্ধারণ করে দিন।’

মনাদা বললেন, ‘নিজের চোখ, এবং বিবেক খোলা রাখো। সৎ এবং পরিচ্ছন্ন থাকো, নিজের পথ নিজেই খুঁজে পাবে। জেল থেকে বের হবার পর তোমরা একত্রে ব্যবসা করো। মহেন্দ্রর টাকাকড়ি নেই, তাকেও তোমরা নাও, কারণ ওর ব্যবসা বুদ্ধি প্রখর।’

কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। রাখাল বাবু এবং দেবেন বাবু একত্র হয়ে দোকান দিলেন। মূলধনহীন মহেন্দ্রর সেখানে স্থান হলো না। খুবই দমে গিয়েছিলেন তিনি। তখনো মামার বাসায় থাকা-খাওয়া। মামা মানুষ ভালো। কিন্তু একজন উঠতি যুবার কাছে বিষয়টি ভীষণভাবেই গ্লানিকর। মহেন্দ্র চিন্তায় পড়লেন। কারণ, দেশসেবা যতই মহৎ কাজ হোক, কোনো আত্মীয়ের এমনকি বাপের অন্নে নির্ভর করে দেশোদ্ধারের কাজ করাটা সমাজে কেউই সমর্থন করে না। এ ক্ষেত্রে মহেন্দ্রনাথ আবার ছিলেন অতিমাত্রায় আত্মসম্মান সচেতন। এমতাবস্থায় একদিন বাধ্য হয়ে রাখাল বাবুর কাছে গিয়ে বললেন, ‘জেলে থাকতে মনাদা যে পরামর্শটা দিয়েছিলেন, তা কি ভুলে গেলেন?’ রাখাল বাবু বললেন, ‘কী কথা?’

‘বলছি যে, আপনারা তো যা হোক নিজেদের ব্যবস্থা করে নিলেন, আমি কী করি?’ রাখাল বাবু বোধ হয় একটু বিব্রত হলেন। কিছু সময় ভেবে বললেন, ‘আপনার তো বইয়ের ব্যবসা সম্বন্ধে মোটামুটি অভিজ্ঞতা আছে। সরস্বতী লাইব্রেরির অন্যতম মালিক বিপ্লবী অরুণচন্দ্র গুহ মশাই বরিশালে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে সমস্যাটা নিয়ে আলোচনা করুন না। দরকার মনে করেন আমিও না হয় আপনার সঙ্গে থাকব। অরুণবাবুও অসহযোগপন্থী।’

‘থাকেন কোথায়?’

‘আমানতগঞ্জে।’

অরুণচন্দ্র গুহের জন্ম বরিশালে, কিন্তু পৈতৃক সূত্রে তাঁরা ঢাকা জেলার মানুষ। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স তেরো বছর। সেই সময় থেকেই তিনি এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত তথা প্রভাবান্বিত হন। ১৯০৫-এ বরিশালে স্বদেশ বান্ধব সমিতি স্থাপিত হয়। সম্পাদক সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (অধ্যাপক)। অশ্বিনীকুমার ছিলেন সভাপতি এবং ব্রহ্মচারী সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সহকারী সম্পাদক। অসামান্য আকর্ষণীশক্তি ছিল ব্রহ্মচারীর। অত্যন্ত সুপণ্ডিত তথা সুবক্তা। অন্যান্য অনেক তরুণ ও যুবকের মতো অরুণ গুহও সতীশচন্দ্রের সংস্পর্শে এসেছিলেন। মহেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বয়সের তফাত বছর সাতেকের মতো। অরুণ গুহের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস অত্যন্ত বিস্তৃত। যদিও মহেন্দ্রনাথের বিষয়ে বক্তব্য প্রসঙ্গে অরুণবাবুর কথা বিস্তারিত বলা আবশ্যক, কিন্তু পরিসরের কথা চিন্তা করে প্রয়োজনানুযায়ী তা বলাই সংগত হবে। একটা কথা মহেন্দ্রনাথ রত্নেশ্বরকে প্রায়ই বলতেন, ‘অরুণবাবু তাঁর গোটা জীবনই প্রায় লেখাপড়া নিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি প্রায় তেইশ বছর জেলবাস করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে ছিল তাঁর অনুসন্ধিৎসা, বিভিন্ন বিষয়ের বই তিনি পড়তেন। জেলে বসেই তিনি প্রচুর পড়েছেন, লিখেছেনও প্রচুর। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম, দেশ-পরিচয় (বাজেয়াপ্ত), নব্য এশিয়া, বিদ্রোহী প্রাচ্য (বাজেয়াপ্ত), বিজয়ী প্রাচ্য, চন্দ্রগুপ্ত, সৃষ্টি ও সভ্যতা, জীবনের বসন্ত, এধহফযর– ঞযব মৎবধঃবংঃ সধহ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ, ঋরৎংঃ ঝঢ়ধৎশ ড়ভ জবাড়ষঁঃরড়হ, ঝঃড়ৎু ড়ভ ওহফরধহ জবাড়ষঁঃরড়হ প্রভৃতি।’ মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এর সবগুলোই তিনি পরবর্তীকালে পড়েছিলেন, একমাত্র বাজেয়াপ্তগুলো ছাড়া।

আমানতগঞ্জের বাড়িতে রাখালবাবুর সঙ্গেই একদিন মহেন্দ্রনাথ গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন অরুণ গুহের সঙ্গে। মহেন্দ্রনাথের বলিষ্ঠ আকৃতি এবং অকপট কথাবার্তা শুনে, অরুণবাবু প্রথমেই তাঁকে ‘তুমি’ করে আপন বানিয়ে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপাতত কী কাজ করছ?’

‘আজ্ঞে, ন্যাশনাল এজেন্সির সুরেশবাবুর সহায়তায় খবরের কাগজ বিলি করছিলাম জেল থেকে বেরোনোর পর। তাঁকেই একদিন ধরেছিলাম কোনো কাজ জুটিয়ে দেবার জন্য। তিনি জানিয়েছেন যে তাঁর ‘বিলি’ করার লোকটি কাজ ছেড়ে চলে গেছে। সেটা, চাইলে আমি করতে পারি।’

‘পারিশ্রমিক?’

‘মাসে কুড়ি টাকা। সাইকেলের ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন।’

‘এতে চালাতে পারবে? নিজের খরচ আছে, তা ছাড়া বললে তো বাবার রোজগার অনিশ্চিত। ছোট ভাইবোন, স্ত্রী, এদের দায়িত্বও তো পালন করতে হবে?’

‘আজ্ঞে। সেইসব চিন্তাই আজকাল প্রধান হয়ে উঠেছে। সামান্য সাধারণ স্বদেশি কাজকর্ম যা করতাম, এখন আর তাও করতে পারি না।’

‘বরিশাল শহরে সবাইকে নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতে গেলে মাসে অন্তত ৩০-৪০ টাকার কমে তো হবে বলে মনে হয় না।’

‘আসলে মামারা বরাবরই আমাদের দেখাশোনা করে এসেছেন। কিন্তু যত বয়স বাড়ছে, ততই এই ব্যাপারটা মানসিক গ্লানিকর হয়ে উঠছে। কতকাল আর গলগ্রহ হয়ে থাকা যায়?’

‘স্বাভাবিক। আচ্ছা, দুর্গামোহন বাবুকে চেনো? মানে মৌখিক পরিচয় আছে?’

‘আজ্ঞে। উনিই তো আমাদের আদেশ করেছিলেন, পুলিশের কাছে ধরা দিতে। বলেছিলেন, ওটাই নাকি অসহযোগ আন্দোলনের বর্তমান নিয়ম।’

‘হ্যাঁ। ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, ততই বাঁধন টুটবে, মোদের ততই বাঁধন টুটবে।’ শুনেছ নাকি গানটা?’

‘আজ্ঞে, জেলে বসে অনঙ্গ বলে এক বন্ধু এ রকম অনেক গান শুনিয়ে ছিল। রবিবাবুর অনেক গান আর কবিতা সে আমাকে শিখিয়েছিল।’

‘গাইতেও পারো নাকি?’

‘মানে শিক্ষা নেই, তবে ভালো লাগে। করিও কখনো কখনো।’

‘বেশ। দুর্গাবাবুকে কেমন লাগে? তার পত্রিকার লেখা?’

‘ভালো। কিন্তু রবিবাবুর বিষয়ে মনে হয় তিনি একটু অতিমাত্রায় অসহিষ্ণু।’

‘এ কথা বলছ?’

‘একটা পুরোনো পত্রিকার সংখ্যায় “রবীন্দ্রনাথ ও চরকা” নামে একটি নিবন্ধ পড়েছিলাম। আমি সঠিক জানি না, লেখাটি দুর্গাবাবুরই কিনা। মনে হয় তাঁরই। অত্যন্ত তীব্র সেই নিবন্ধের বক্তব্য। পড়েছেন আপনি?’

‘হ্যাঁ। আমিও সঠিক জানি না ওটা দুর্গামোহনেরই লেখা কি না। ভাষায় মনে হয় তাঁরই। তবে দুর্গাকে আমি অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়েও একটা কথা বলব, ও বড় রিজিড। মতামত এবং বিশ্বাসের ব্যাপারে ও মাঝে মাঝে গণতান্ত্রিক নিয়মের যেন বাইরে চলে যায়।’

‘অরুণদা, আমি রবিবাবুর ঘরে বাইরে পড়েছি। আমার শিক্ষা-দীক্ষা, পাঠাভ্যাস খুবই কম। কিন্তু ঘরে বাইরের মর্মকথা যদি আমি কিছুমাত্র বুঝে থাকি, আমাদের বর্তমান মতাদর্শ, বিশেষ করে, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়কার কার্যাবলি তথা পরবর্তী বিপ্লবপন্থার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। আপনি কী বলেন?’

‘এ নিয়ে আমি এখন কোনো কথা তোমার সঙ্গে আলোচনা করব না। রাজনীতি নিয়ে তোমার মনে যেমন ভাঙচুর হচ্ছে, তেমনি আমারও হচ্ছে। হচ্ছে আরও অনেকেরই। কিন্তু সে কথা ভবিষ্যতে হবে। এখন তোমার সমস্যা নিয়ে কী করা যায় আলোচনা করা যাক।’

‘বলুন।’

‘আপাতত হাতের পাঁচ সুরেশবাবুর কাজটা করতে থাকো এবং দুর্গাবাবুকে আমি বলে দিচ্ছি যাতে তাঁর ‘বরিশাল হিতৈষী’ প্রেসে তোমাকে কম্পোজিটরি শিখতে দেন। ওই কাজটা শিখতে পারলেও মাসে ৩০-৪০ টাকা রোজগার করা কষ্টসাধ্য না। নিষ্ঠাসহকারে কাজটা শেখো। তোমাকে যতটুকু বুঝেছি, তুমি খুব দ্রæতই শিখতে পারবে। ভালোই হলো, আমরা একটা ছাপাখানা করছি। তোমাকে তার কাজে নিতে পারি। তুমি তার জন্য প্রস্তুত হও।’

মহেন্দ্রনাথ কাগজ বিলি এবং কম্পোজিং শেখা দুটো কাজ একসঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না বলে, কাগজ বিলির কাজটা ছেড়ে দিলেন। দুর্গাবাবু সংক্ষিপ্ত কথার মানুষ। বললেন, ‘হয় রথ দেখ, নয় কলা বেচ। দুটো একসঙ্গে হবে না।’ বিনা নোটিশে কাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য সতেরো দিনের পারিশ্রমিকটা লজ্জায় চাইতে পারলেন না মহেন্দ্রনাথ। সুরেশবাবুও উচ্চবাচ্য করলেন না। কম্পোজিংয়ের কাজ শেখার জন্য ভোর ছটায় বাসা থেকে বের হয়ে হিতৈষী প্রেসে আসতেন। দুপুরে দেড় ঘণ্টার জন্য মামার বাসায় গিয়ে খেয়ে আসা। যাতায়াতে এক ঘণ্টা। তারপর সন্ধ্যে পর্যন্ত আবার একটানা কম্পোজের ঘরগুলো শেখা। জেদ চেপে গিয়েছিল তাঁর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কম্পোজিংয়ের কাজ শিখে নিতেই হবে তাঁকে।

রতেœশ্বর বলেছিল, ‘জেঠাবাবুর মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম, সেটা অবশ্য তাঁর বৃদ্ধ বয়সে। তাঁর ভাবনার জগৎটা ছিল অসম্ভব সুস্থির এবং গোছানো। আলাপ-আলোচনায়ও বুঝেছি যে যখন যে কাজটা তাঁর করণীয়, সেইটার চিন্তাই একমাত্র মস্তিষ্কজুড়ে থাকত। আমাদের মতো হাজার গণ্ডা ভাবনাকে একসঙ্গে মগজে ভিড় করতে দিতেন না তিনি। এ এক অসম্ভব ক্ষমতা।’

অর্থাৎ কোনো কাজ হাতে নেওয়ার আগে মহেন্দ্রনাথ তার আদ্যোপান্ত সব চিন্তা করে, ঠিক করে নিতেন, কাজটা তিনি আদৌ করবেন কি না। এই অভ্যাস এবং ক্ষমতাটা তিনি পেয়েছিলেন নাকি তাঁর মায়ের কাছ থেকে। মা একদা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কাশীপুরের পরিত্যক্ত ভিটেতে তাঁর শিশুসন্তানদের নিয়ে তিনি পাতার কুটির করেই থাকবেন। বাবার উপার্জনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধতারও নিচে। তথাপি তিনি সেটা করেছিলেন। দুঃখের বিষয় থাকলেন না বেশিদিন।

মহেন্দ্রনাথ কম্পোজিটরের কাজের বিষয় অরুণ গুহের কাছে শোনার পর, প্রথম খুব উৎসাহ পাননি। তখন তাঁর অদ্যভর্ক্ষ্যাের্ধনুর্গুন অবস্থা। ভেবেছিলেন, এ কাজে কী এমন ভবিষ্যৎ উন্নতি হতে পারে? কাজটা না হয় শিখলেন, ক-পয়সা রোজগার হবে তার এ কাজে? অরুণ গুহকে কথাটা তিনি জিজ্ঞেসও করেছিলেন। অরুণদা বলেছিলেন, ‘দেখো, কম্পোজিটরির কাজে কেউ বড়লোক হয়েছে, এমন শুনিনি, দেখিওনি। তবে বহু লোকই এই কাজ করে সংসার চালায়। আমি সেদিকটা ভেবে তোমাকে কাজটা শিখতে বলিনি। আমাদের সরস্বতী লাইব্রেরিও খুবই ক্ষুদ্র সংস্থা। কিন্তু স্বামীজির এ ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য এবং স্বপ্ন আছে। আমরা সেই স্বপ্নের ফিরিওয়ালা বলতে পারো।’

‘কথাটা ঠিক বুঝলাম না।’ মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন।

‘বুঝবে। তুমি তো স্বদেশি মতাবলম্বী। ছোটখাটো হলেও সেই আদর্শে পরিচালিত হয়ে বইয়ের ব্যবসাও একটা দাঁড় করিয়েছিলে। সেটা নিশ্চয়ই ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য নয়?’

‘অবশ্যই না। তবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নটাও যে ছিল না, তাও বলতে পারি না। অন্যের অন্নপুষ্ট হয়ে জীবন ধারণের গ্লানি আমাকে কুরে কুরে খায়, অরুণদা।’

‘আমরা একটা বড় ছাপাখানার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন মাথায় নিয়ে কাজটা শুরু করেছি। সেটা ভবিষ্যতে একদিকে যেমন আমাদের অন্নচিন্তার সমস্যাটা যথাসম্ভব দূর করবে, অন্যদিকে আমাদের যুগান্তর পার্টির একটা প্রচার তথা কর্মকেন্দ্র হবে। স্বামীজির এমনই অভীপ্সা।’

কাজ শিখতে শুরু করার পর থেকে অরুণ গুহ মাঝেমধ্যেই তাঁর খোঁজখবর করতেন। তখন দুর্গাবাবুর দপ্তরে তাঁর ডাক পড়ত। একদিন এ রকম ডাক পড়লে মহেন্দ্রনাথ দুরু দুরু বুকে তাঁদের কাছে উপস্থিত হলেন। দুর্গাবাবু রাশভারী মানুষ। কথা বলেন যেন তাঁর নিজেরই প্রবন্ধের ভাষায়। যাকে বলে কাঠখোট্টা, প্রথম প্রথম এমনই মনে হতো তাঁকে। কিন্তু আসলে তা ছিলেন না তিনি। মহেন্দ্রনাথ এলে, অরুণবাবু কিছু প্রাথমিক খোঁজখবর করলেন। দুর্গামোহন বললেন, ‘রিপোর্ট ভালো। খুবই তাড়াতাড়ি রপ্ত করে ফেলছে সব।’

‘তৈরি হতে কত দিন লাগবে মনে হয়? আমার কিন্তু তাড়া আছে।’

‘কিসের তাড়া? শ্বশুরবাড়ির নেমন্তন্নো এসেছে নাকি?’

‘সে তো এলেই হয়। তবে এই তো কিছুদিন আগেই না ছাড় পেলাম। আমার এখনকার ‘তাড়াটা’ সরস্বতী লাইব্রেরির কাজের। মেদিনীপুর থেকে স্বামীজি সমানে খোঁচাচ্ছেন।’

‘স্বামীজির আর কি? মাগ নেই, ঝি নেই, মাথায় সে অর্থে ঈশ্বরচিন্তাও যে আছে, এমনও বুঝি না। খালি ‘সাদাহাতি’ খেদাও। কিন্তু হ্যাঁছে, মুকুন্দ শ্যালক এখন কোথায়, খোঁজ জান নাকি?’

‘কী দরকার?’

‘আরে ওকে নিয়ে সবচাইতে বড় মুশকিল এই যে ওর টিকিই ছোঁওয়া যায় না। কখন যে কোথায় থাকে?’

‘মহেন্দ্রকে লাগাও। ও জানতে পারে?’

‘কেন? ও কি ওই শালার বোতলের বন্ধু নাকি? না, যাত্রায় অ্যাক্টো করে? কিহে? ওই সব করোটরো নাকি?’

‘না আজ্ঞে। তবে ওনার গান আমার বড় ভালো লাগে। পালাও। তবে অনেক দিন দেখা হয়নি।’

‘মদ এবং অন্য আনুষঙ্গিক ইত্যাদিতে থাকো না তো?’

‘আজ্ঞে সেসব বহুকাল তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তাঁর কাজ স্বদেশি পালা আর গান গেয়ে আজ হেথায়, কাল হোথায় করে বেড়ানো।’

‘সে খবর মোটামুটি জানি। তবু তোমাকে একটু নাড়া দিয়ে দেখলাম। কিন্তু তার খবরটা যে নিতে হবে। একটা লেখা লেখাতে হবে ওকে দিয়ে, প্রবন্ধ।’

অরুণ গুহ বললেন, ‘প্রবন্ধও লেখে নাকি ও? কই পাড়িনি তো কখনো। এই পত্রিকার সব সংখ্যা অবশ্য পড়া হয়ে ওঠে না আমার।’

দুর্গাবাবু বললেন, ‘তা হবে কেন? তাহলে গরিবের যে খানিক উপকার হয়।’

‘সত্যি দুর্গা, সময় এত কম যে অনেক কর্তব্যকর্মই করা হয়ে ওঠে না। তবে মুকুন্দকে দিয়ে লেখানো কি খুব সহজ হবে।’

দুর্গাবাবু বললেন, ‘কী জানো? মুকুন্দকে দিয়ে বরিশাল হিতৈষীতে লেখানোটা সহজ, কিন্তু তাকে পাওয়াই শক্ত। একদিন জোর করে তাকে ধরে হাতে কাগজ-কলম দেওয়া হলো। দ্রæত লেখনীতে মুকুন্দর হাত থেকে যা বেরুল তা প্রকাশযোগ্য সুন্দর এক প্রবন্ধ।’

মহেন্দ্রনাথ দুর্গাবাবুকে কথা দিয়েছিলেন, মুকুন্দ দাসকে তিনি খুঁজে আনবেন। এনেও ছিলেন, কিন্তু দুর্গামোহন তাঁকে দিয়ে কী প্রবন্ধ লিখিয়েছিলেন, তা আর তাঁর দেখা হয়নি। অরুণবাবুর তাগিদে এর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে কলকাতার পথে পাড়ি দিতে হয়েছিল।

মোটামুটি হিতৈষী প্রেসে দিন চারেক কাজ করার পর তাঁর প্রশিক্ষক আশুবাবুকে একদিন বললেন, ‘আমার ধারণা আমার ‘ঘরশেখা’ হয়ে গেছে।’ আশুবাবু সন্দিগ্ধচিত্তে তাঁকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। এক-আধটা ভুলভাল হলেও তাঁকে সব প্রশ্নের উত্তরেই খুশি করতে পারলেন তিনি। রতেœশ্বর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মাত্র চার দিনেই? আশুবাবু কি বললেন?’ আশুবাবু নাকি বলেছিলেন, ‘কত বছর ধরে এই কাজ করছি। কত শিক্ষানবিশ আমার হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু আপনার মতো একটিও আমি পাইনি। কাল থেকে আপনি আমার পাশে বসবেন। আমি আপনাকে ভালো করে কাজ শেখাব।’ বড় আনন্দ আর গর্ব হয়েছিল মহেন্দ্রনাথের।

সর্বমোট কুড়ি দিন প্রেসে কাজ শিখেছিলেন তিনি। আশুবাবু একই দিনেই প্রাণ ঢেলে কাজ শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি এই কাজটা ভালোবাসি বলে বড় যতেœ এর জদ্দমুদ্দ শিখেছি। কিন্তু সহায় সুযোগের অভাবে বড় কিছু করতে পারলাম না। ছাপা এবং প্রকাশনার জগৎটা ক্ষুদ্র ও বৃহতে মিলে একটা বিশাল জগৎ। কথাটা মনে রাখবেন। ক্ষুদ্র কাজগুলোকে বৃহতের সঙ্গে সমান মর্যাদায় দেখবেন। সভ্যতার বিকাশে কিন্তু এর তুল্য আর কিছু নেই।’ কয়েকটা মাত্র দিনেই তিনি টাইপের ফেস, সাইজ, কম্পোজ করার কায়দা, ‘জাস্টিফিকেশন’ প্রভৃতি শিখিয়ে দিলেন মহেন্দ্রনাথকে। রতেœশ্বরকে তিনি বলেছিলেন, ‘এই শিক্ষাদানের জন্য ভদ্রলোকের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।’

জীবনের এই অন্তিম পর্বে এসেও মহেন্দ্রনাথ সেদিনের কথা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে রতেœশ্বরকে বলেন, ‘বুঝলি, আমার কর্মক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ আমার অদৃষ্ট বলে হয়েছে, অরুণদা তাঁদের একজন। সেদিন তাঁর উপদেশমতো কাজ আরম্ভ না করলে, আমি কর্মে যে সাফল্য অর্জন করেছি তা সম্ভব হতো কি না জানি না।’ ‘আজীবন জেঠাবাবু এই ব্যাপারে প্রতিটি স্মৃতিচারণার সময়েই বিনম্র কৃতজ্ঞতার কথা উচ্চারণ করে গেছেন।’ রতেœশ্বর বলেছিল।

মহেন্দ্রনাথকে অরুণ গুহ একান্তভাবেই অনুজ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হিতৈষী প্রেসে কাজ শিখতে পাঠিয়েই কর্তব্য শেষ করেননি তিনি। অন্তরাল থেকে তাঁর নিজস্ব শতব্যস্ততার মাঝেও বেশ ভালো রকম নজর রেখেছিলেন তিনি। রতেœশ্বর আমাকে বলেছিল, ‘বুঝলে, এই একটা ব্যাপারে সেকালের বিপ্লববাদী বা স্বদেশিওয়ালাদের সঙ্গে আমাদের চরিত্রগত একটা বড় তফাত আমার নজরে পড়ে।’

‘কী রকম?’ জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি।

‘মানুষকে গড়ে তোলার নিষ্ঠা এবং ঐকান্তিকতাটা। অবশ্য এর পেছনে একটা বড় উপলক্ষ ছিল স্বাধীনতা লাভের জন্য আকুতি। পরাধীনতার গøানিটা তাঁদের উদ্বুদ্ধ করত সমাজের যুবকসমাজকে তৈরি করে তোলার কর্মে। আমরা প্রায়শই সমালোচনা করি যে তাঁরা আবেগসর্বস্ব ছিলেন এবং বোমা পিস্তলের ভুল রাজনীতির পথেই চলেছিলেন। কিন্তু সেটা বোধ হয় সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। ত্রæটি তাঁদের অনেকই ছিল। ভুলও অনেক করেছেন হয়তো, কিন্তু জাতীয় তথা সামাজিক চরিত্র গঠনের প্রয়াসটাও অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের সময়ে, অর্থাৎ ষাট-সত্তরের আন্দোলনকালে সে ক্ষেত্রে আমাদের আগ্রহ বা প্রচেষ্টা সে রকম ছিল না।’

‘বাকশাল আন্দোলন নিয়ে তোমার জেঠাবাবুর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি? মানে, আমি বলতে চাইছি, উনিও তো একটা বয়সে সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন কিনা, যদিও কোনো সক্রিয় কার্যকলাপে তিনি লিপ্ত হননি। আমি তাঁর মানসিক সমর্থনের কথা জানতে চাইছি।’

‘জেঠাবাবু আমার মনে হয়, স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের একটা আদর্শকেই ধ্রæব করে নিয়েছিলেন। মনোরঞ্জনবাবু, অরুণবাবু ইত্যাদিরা, যাঁরা সরস্বতী লাইব্রেরিকে পরবর্তীকালে শ্রীসরস্বতী প্রেস হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন তাঁরা সবাই স্বামীজির কথামতো দলের জন্য একটি নিজস্ব প্রেস করতে উদ্যোগী ছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রাথমিক কর্তব্য ছিল রাজনীতি, বিশেষত সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলা। মহেন্দ্রনাথ শুধু প্রেসের জন্যই তাঁর তাবৎ কর্মপ্রচেষ্টা নিয়োজিত করেছিলেন। দলের নির্দেশও তদনুরূপ ছিল। প্রেসের কাজকে তিনি সেই সময়ে বিপ্লবের কাজ বলেই মনে করতেন। আর, তাঁর সঙ্গে আমার যখন নিয়মিত যোগাযোগ তখন নকশাল আন্দোলন স্তিমিত। সামান্য যতটুকু কথাবার্তা আলোচনা প্রসঙ্গে হয়েছে, তাতে বুঝেছিলাম, নির্বিচার ব্যক্তিহত্যা বা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী হত্যা কোনোটাই তিনি সমর্থন করতেন না। তিনি বলতেন, কি ব্রিটিশ যুগে, কি সত্তরের দশকে, যুবশক্তির কার্যকলাপে ছিল ভ্রান্তি, যদিও তা স্বার্থহীন, আর রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকারীদের ক্ষেত্রে তা ছিল ক্রুর নির্মম স্বার্থপর গণহত্যা।’

বারো

হিতৈষী প্রেসে কাজ করার ঠিক কুড়ি দিনের দিন দুর্গামোহন মহেন্দ্রনাথকে তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। অরুণ গুহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুর্গামোহনবাবু, মহেন্দ্রনাথ উপস্থিত হতে, কেমন যেন রাগতস্বরে অরুণবাবুকে দেখিয়ে আমাকে বললেন, ‘ওই যে এসেছেন, যাও এবার দেশোদ্ধারে নেমে পড় গিয়ে। ভাবছিলাম এক, হয়ে গেল অন্য। যাও একটা জুতসই ছেলে জুটল, পারলাম না মনমতো তৈরি করতে।’ তাঁর কথা মহেন্দ্রনাথ ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। তাঁকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে অরুণবাবু বললেন, ‘কলকাতায় প্রেসের বাড়ি ঠিক হয়েছে। শীঘ্রই প্রেসের কাজ শুরু হবে। তোমাকে দু-এক দিনের মধ্যেই কলকাতায় যেতে হবে। প্রস্তুত হও।’ মহেন্দ্রনাথ বললেন, ‘এখনো তো আমার শেখা শেষ হয়নি।’ অরুণদা বললেন, ‘যা শিখেছ, তাতেই হবে। বাকি যা থাকে কলকাতায় গিয়ে শিখে নেবে। আমি মনোরঞ্জনকে লিখে দিচ্ছি, তুমি যাচ্ছ।’ দুর্গাবাবু শ্লেষের সঙ্গে বললেন, ‘বুঝলে না? এঁয়ারা হলেন সব বিপ্লবী। ট্রিগার টিপতে পারলেই হলো। তাতে রামের জায়গায় যদুর যদি গুলিটা লাগে, তাতেই চলবে। তৈরি হওয়ার দরকার নেই। বলি, কলকাতায় তো তোমাদের সব আছে, আমার এই হিতৈষীর আশুর মতো ট্রেনার পাবে কাউকে?’ দুর্গাবাবুর বোধ হয় ইচ্ছে ছিল আশুদার প্রশিক্ষণে আমি আরও কিছুকাল কাজ শিখে উত্তমভাবে তৈরি হই। অরুণবাবু বললেন, ‘দুর্গা তুমি রাগ কোরো না। আমাদের অবস্থাটা বুঝছ তো?’

‘তাই বলে সম্ভাবনাময় এই ছেলেটার বারোটা বাজাবে?’

‘ও যদি টিকে থাকতে পারে একদিন এই কাজে মস্ত বড় একজন হবে, তুমি দেখে নিয়ো।’

‘আরে, সেটা তো আমি জানি। কিন্তু তোমার সংস্থাটা টিকে থাকবে তবে তো?’

‘আলবৎ টিকবে। তুমি দেখে নিয়ো।’ দুর্গাবাবু যেমন রেগে গিয়েছিলেন, তেমনি যেন সহজে ঠান্ডা হয়ে বললেন, ‘তাই হোক ভাই। আশীর্বাদ করি। তবে মহেন্দ্রর জন্য আমার কিন্তু মন খারাপ লাগছে।’

দুর্গাবাবু এমনিতে খুব কথাবার্তা বলতেন না, কাজের বিষয় ছাড়া। কিন্তু সেদিন মহেন্দ্র বুঝেছিলেন মানুষটির বুকে তাঁদের সবার জন্যই ছিল অপরিসীম স্নেহ এবং শুভেচ্ছা। সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তাও ছিল ব্যাপক। বলেছিলেন, ‘ও তো কলকাতায় একেবারেই অপরিচিত। কোথায় থাকবে, কী খাবে, খাবার খরচের টাকা পায় নাই, তা কোথায় পাবে তার কিছু ব্যবস্থা আছে? তার ওপর ও তো বিবাহিত, সে কথাটাও ভাবতে হবে তো?’ চিন্তাটা মহেন্দ্রনাথের মনেও পীড়া দিচ্ছিল।

অরুণদা বললেন, ‘তুমি কি আমাদের সত্যিই অমানুষ ভাব নাকি হে? আমরা কলকাতায় একটা মেস করেছি। ও সেখানে গিয়ে উঠবে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমরাই করব। ও এখন গিয়ে আপাতত একজনকে রিলিজ করে দেবে। তার অন্য গুরুতর কাজ আছে, আর আটকে রাখা যাবে না তাকে। ওকে শুধু কলকাতা যাওয়ার টিকিটের টাকাটা জোগাড় করে নিতে হবে। আপাতত এভাবেই চলুক, ভবিষ্যতে দেখা যাবে।’

সময়টা ১৯২৩-এর এপ্রিল মাস। মনে আছে মহেন্দ্রনাথের। তাঁর জীবনের নতুন সংগ্রামের সূত্রপাত হলো। নতুন কর্মক্ষেত্রে আসার সময়ে প্রথম সমস্যাটা হয়েছিল পথখরচ সংগ্রহ। অরুণ গুহের অবস্থা এমন ছিল না যে তিনি খরচটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে দেন। সে কারণেই তিনি বলে দিয়েছিলেন টিকিটের টাকাটা জোগাড় করে নিতে। বরিশাল থেকে কলকাতা আসার খরচ তখন তিন টাকা বারো আনা। কিন্তু তিনি তো কপর্দকহীন। কারুর কাছে ধার চাইতে লজ্জাবোধ হলো। ধার সে-ই করতে পারে বা পায়, যাঁর পরিশোধের ক্ষমতা আছে। মামাদের কাছে চাইলে হয়তো পেতে পারতেন, কিন্তু একে তাঁদের অন্ন ধ্বংস করে যাচ্ছেন দীর্ঘকাল ধরে, তার ওপর বাবার অবিমৃষ্যতার জন্য ব্যাপক চাপটা তাঁদেরই বরাবর বহন করতে হচ্ছে। এর ওপর অনির্দিষ্ট চাকরির প্রচেষ্টায় কলকাতা যাওয়ার খরচটা তাঁদের কাছে চাইবেন? মহেন্দ্রনাথের স্ত্রীটি একেবারেই সরলা গ্রাম্য বালিকা। তাঁকে কিছু জানালে তিনি বলবেন, ‘বাবার কাছ থেকে এনে দিচ্ছি।’ কিন্তু সেটাও মহেন্দ্রনাথের পৌরুষের পক্ষে ভীষণভাবেই গøানিকর। সমস্যাও ছিল। তাঁর শ্বশুরমশাই ছিলেন ডাক্তার। অনুমান হয়, তাঁদের পারিবারিক সচ্ছলতা ছিল। কিন্তু তৎসত্তে¡ও এবং তাঁরা আগ্রহী হলেও তাঁর স্ত্রীকে তিনি তাঁদের কাছে রাখেননি। স্ত্রী রায়পাশায় মামাবাড়িতেই ছিলেন। মহেন্দ্রনাথের মামাবাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে মহেন্দ্রনাথ মানসিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না বলেই অনুমান হয়।

হঠাৎ তাঁর নজর গেল হাতের আংটিটির দিকে। ভাবলেন, সেটি বিক্রি করে পথখরচ জোগাড় করা যাক না কেন? কিন্তু সেটি ছিল বিয়ের আংটি এবং শ্বশুর-প্রদত্ত। ইতস্তত চিন্তা করে স্ত্রীর কাছে সব ভাঙিয়ে বললেন। স্ত্রী বললেন, ‘প্রয়োজন হলে আমি আমার গয়নাও তোমাকে দিতে পারি।’ সেই যুগে, প্রায় অশিক্ষিতা, নিতান্ত কিশোরী বয়সী একটি বধূর এ রকম প্রস্তাবে মহেন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু রাজি হলেন না। আংটিটি বিক্রি করাই সংগত বিবেচনা করলেন। কারণ, শ্বশুর-প্রদত্ত হলেও তখন সেটা সবদিক দিয়েই তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি। স্ত্রীর গয়নাগাটি স্ত্রীধন, তাতে তিনি কোনোমতেই হাত দিতে পারেন না। এক স্বর্ণকারের কাছে বিক্রি করে সাড়ে চার টাকা পেলেন রাহা খরচের সমস্যা মিটল। কলকাতায় এলেন তিনি।

কলকাতায় প্রথম বাসস্থান হলো ২৬/২ বেনিয়াটোলা লেনে। কলেজ স্কোয়ারের কাছে এই বাড়িটায়ই মেস। মনোরঞ্জন গুপ্ত তখন সেই মেসে ছিলেন। তিনি জানালেন, ওই বাড়িটাতেই প্রেস হবে, তবে তার কিছু দেরি আছে। যত দিন তা আরম্ভ না হয় মনাদা সরস্বতী লাইব্রেরির কাজ করার জন্য মহেন্দ্রনাথকে নিয়োগ করলেন। প্রখ্যাত বিপ্লবী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তখন লাইব্রেরিটি দেখাশোনা করতেন, আর তাঁর সহকারী ছিলেন গোপীনাথ সাহা। রতেœশ্বর জানতে চেয়েছিল, ‘গোপীনাথ সাহা মানে যিনি সাহেব মেরে ফাঁসি গিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘তিনি সেখানে কী করতেন? মানে সরস্বতী লাইব্রেরিতে?’ মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে গোপীনাথ সম্পর্কে বা তিনি কী ধরনের কাজকর্ম করতেন সে বিষয়ে তাঁর বিশেষ ধারণা বা খবর নেই। ওখানে যাওয়ার পর গোপীনাথের সঙ্গে তিনি লাইব্রেরির কাজ করতেন। মেসের একই ঘরে থাকতেন তাঁরা। প্রথম থেকেই মহেন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন গোপীনাথ অন্য জগতের মানুষ, সে যেন, এককথায় বললে, অ পড়সঢ়ষবঃব বঁনড়ফরসবহঃ ড়ভ ঃযব জবাড়ষঁঃরড়হধৎু ংঢ়রৎরঃ। কী এক ভাবনা যেন তাঁকে অহরহ অশান্ত করে রেখেছে। রতেœশ্বর জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কথাবার্তা কিছু হতো না? কী বলতেন তিনি?’

‘প্রায় কিছুই না। মামুলি দু-একটা কথা। বেশির ভাগ সময়ই বই পড়তেন নানা ধরনের। আমি জানতাম, বিপ্লববাদীরা স্বভাবতই কম কথা বলতে অভ্যস্ত। প্রথম কদিন তো বেলা এগারোটায় লাইব্রেরিতে যেতাম, আর রাত আটটায় মেসে ফিরতাম।’

মহেন্দ্রনাথ কাজে যোগ দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একদিন গোপীনাথ কিরণদাকে পাকড়াও করে বললেন, ‘এই তো আপনার লোক এসে গেছে। এখন আমাকে ছেড়ে দিন।’ এর দুতিন দিন বাদেই তিনি উধাও। মেসেও আসতেন না। কখনো সখনো হয়তো লাইব্রেরিতে আসতেন। কোথায় থাকতেন, কী বা করতেন, সবই অজ্ঞাত। মহেন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে বইয়ের ব্যবসাটা আদৌ তাঁর কাজ নয়। তাঁর মন জুড়ে ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার চিন্তা। এরপরই একদিন সেই ভীষণ ঘটনা সংঘটিত হলো। কলকাতা পুলিশের কমিশনার টেগার্ট সাহেবকে হত্যা করতে গিয়ে ভুল করে ডে নামের এক শ্বেতাঙ্গকে গুলিবিদ্ধ করেন। মহেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বিচারে তাঁর প্রাণদÐ হয়। প্রাণদÐ কার্যকর করার পর, তাঁর সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তুমুল বিতর্কের ঝড় এক ঐতিহাসিক ঘটনায় পরিণত হয়।’

গোপীনাথ সাহার বিষয়ে স্মৃতিচারণায় মহেন্দ্রনাথ আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছিলেন। গোপীনাথ গ্রেপ্তার হওয়ার পর যখন তাঁর খোলা ট্রাঙ্কটি তিনি গুছিয়ে রাখছিলেন। একখানা হলুদ কাগজের ওপর তাঁর নজর পড়ে। তাতে লেখা ছিল, ‘আমি আমার নিজের রক্ত দিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি দেশের কাজে প্রাণ উৎসর্গ করিবÑ শ্রী গোপীনাথ সাহা।’ সেই তারিখটি ছিল ১ মার্চ ১৯২৪ সাল। মহেন্দ্রনাথের চোখের সামনে দেশসেবাযজ্ঞের একটি আহুতি এমনি করে যজ্ঞাগ্নিকে উজ্জ্বল করে মহাকালের সঙ্গে মিশে গেল।

রতেœশ্বর আমাকে বলেছিল, ‘দুর্গাবাবুর কথাটা আমার মনে পড়েছিল এই কাহিনিটা শোনার সময়Ñট্রিগার টিপতে পারলেই হলো। তাতে রামের জায়গায় যদুর যদি গুলিটা লাগে, তাতেই চলবে। দুর্গাবাবু বিপ্লববিরোধী ছিলেন না, কিন্তু ওই সময় তাঁর মতো অনেকেই বোধ হয় ভিন্নভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। তাঁরা কেউ গান্ধীর অহিংস অসহযোগ, কেউবা রুশদেশীয় বলশেভিক পন্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিলেন। অবশ্য রুশ বিপ্লবের বিষয়টা তখনো এ দেশে ব্যাপক আলোচনার স্তরে আসেনি। তবে আমার মনে হয় ওই সময়টাতে আন্দোলনকারীদের সবাই পথের সন্ধানে বড় দোদুল্যমান ছিলেন।’

স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ ছিলেন অরুণ গুহ এবং মনোরঞ্জন গুপ্ত ইত্যাদির রাজনৈতিক গুরু। তাঁরই পরামর্শে এঁরা শ্রীসরস্বতী প্রেস স্থাপন করার জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন। স্বামীজি বলতেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে হলে তাদের একটা নিজস্ব মুদ্রণ ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার।’ প্রেসের নামকরণের সময়েও তাই তাঁরা স্বামীজির স্মৃতির প্রতি সম্মানের কথা ভেবেছিলেন। স্বামীজি সরস্বতী সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী ছিলেন। কিন্তু যেহেতু সরস্বতী প্রেস নামে একটি প্রেস ইতিপূর্বেই অস্তিত্ববান ছিল, সে কারণে, পার্থক্যকরণ তথা রেজিস্ট্রেশনের সুবিধার জন্য প্রেসের নামের আগে ‘শ্রী’ কথাটি যুক্ত করা হয়েছিল। ইতিপূর্বে, স্বামীজির জীবৎকালেই, ১৯২০ সালে, তাঁরই আদেশে সরস্বতী লাইব্রেরি স্থাপিত হয়েছিল। সেই বছরই অরুণ গুহ এবং মনোরঞ্জন গুপ্ত ওই লাইব্রেরিটি গড়ে তোলেন। লাইব্রেরি একটু দাঁড়িয়ে গেলেই প্রেস স্থাপন করতে উদ্যোগী হলেন তাঁরা।

মহেন্দ্রনাথ হিতৈষী প্রেসে অল্প কয়েক দিন মাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমে কিছুদিন সরস্বতী লাইব্রেরিতেই কাজকর্ম করছিলেন, তারপরই একেবারে শুরু থেকে প্রেস স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হলেন।

সরস্বতী লাইব্রেরি তত দিনে মোটামুটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সেখানে যোগদানের কয়েক দিন পরে, মহেন্দ্রনাথের পরিষ্কার মনে আছে এক সকালে মনাদা এসে তাঁকে বললেন, ‘মহেন্দ্র, আগামীকাল থেকেই প্রেসের মালপত্তর আসতে শুরু করবে। তুমি এবার লাইব্রেরি ছেড়ে প্রেসে বসবে।’ শুনে তাঁর খুবই আনন্দ হয়েছিল। অরুণদা এবং মনাদার ওপর তাঁর গভীর আস্থা থাকা সত্তে¡ও মনে দোদুল্যমানতা যে একেবারে ছিল না, তা বলা যায় না। তাঁরা দুজনেই সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী। প্রায়ই তাঁদের জেলে কাটাতে হয়। সে অবস্থায় প্রেস প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা কতটা বাস্তবভাবে সম্ভব হবে, তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কাজ যতটুকু শিখেছিলেন, তাতে উপযুক্ত পরিচালকের সহায়তা পেলে হয়তো আদিষ্ট কর্মটুকুই তিনি করতে পারতেন। কিন্তু কাজ করার দায়িত্ব কে নেবেন? তখনো পর্যন্ত শুধু অরুণ গুহ এবং মনাদাই অংশীদার। অরুণদা তাঁকে বলেছিলেন যে ইন্ডো-সুইস ট্রেডিং কোম্পানির যতীন্দ্র চন্দ্র হুই মশাই নাকি তাঁদের এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিয়েছেন। প্রেস যদি এঁরা করেন হুই বাবু মেশিন এবং টাইপ বাকিতে দিয়ে সাহায্য করবেন।

ইন্ডো-সুইস কোম্পানি থেকে শ্রীসরস্বতী প্রেসের প্রথম ইংরাজি হেডিং এবং বডি টাইপ জার্মানির বিখ্যাত সেলটার এবং গিয়েসেকে তৈরি। সামন্ত কোম্পানি থেকে এল ‘কেস’, ‘গ্যালি’, ‘র‌্যাক’Ñএসব। অধর টাইপ ফাউন্ড্রি থেকে এল বাংলা টাইপ।

কিন্তু তা তো হলো। লোক কোথায়? কাজকর্ম করবে কে? একা মহেন্দ্রনাথকে দিয়ে তো আর প্রেসের কাজ শুরু হতে পারবে না। অরুণদা বললেন, ‘ঘাবড়িও না, হবে।’ অসম্ভব আত্মবিশ্বাস এই মানুষটির। এরই মধ্যে একদিন প্রখ্যাত বিপ্লবী কর্মী অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের সুপারিশ নিয়ে বঙ্কু বিহারী দে নামক এক ব্যক্তি প্রেসে কম্পোজিটর হিসেবে যোগ দিলেন। এর আগে নবশক্তি প্রেসে তিনি সন্ধ্যাবেলা কাজ করতেন। খুবই দক্ষ কম্পোজিটর। মহেন্দ্রনাথ এবং তিনি দুজনে মিলে কেসে টাইপ ডিস্ট্রিবিউট করতে শুরু করলেন। কর্মীসংখ্যা দাঁড়াল দুই। অরুণদা বললেন, ‘এভাবেই এগোবে প্রেস।’ মনাদাও দেখা গেল একইভাবে চিন্তাভাবনা করছেন! এই সমস্ত কথাই মহেন্দ্রনাথ স্মৃতিমন্থন করে রতেœশ্বরকে বলেন। সে ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে সেসব তার খাতায় খসড়া হিসেবে টুকে রাখে। আর যা হোক, একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার তথ্য তত্ত¡ তো সংগ্রহে থাকলÑ এমনই তার ভাবনা।

তার গোটা জাবদা খাতাটা জুড়েই কখনো কথোপকথনে, কখনো সাধারণ বিবৃতির মাধ্যমে সে মহেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনসংগ্রামের এবং তৎসহ শ্রীসরস্বতী প্রেস ও শিশুসাহিত্য সংসদ নামক প্রকাশনাটির গড়ে ওঠার বৃত্তান্ত খসড়া আকারে রেখেছে। কিন্তু এই রচনায় তার খুঁটিনাটি সব তথ্য দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। কারণ, মহেন্দ্রনাথ রচিত একটি আত্মচরিতে প্রায় সব তথ্যই তিনি স্বয়ং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে গেছেন। উপন্যাসোপক্ষে সেই গ্রন্থটির নাম ‘যথা নিযুক্তোহস্মি’। ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুর দুই বছর পর বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। তিনি মারা যান ১৯৮৭ সালে। পাÐুলিপিটি প্রস্তুত থাকলেও জীবৎকালে তিনি তা প্রকাশ করার উদ্যোগ নেননি। তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীদেবজ্যোতি দত্ত এটি প্রকাশ করে পিতৃঋণ শোধ করার প্রচেষ্টা নেন।

সুতরাং বর্তমান আলেখ্যে শ্রীসরস্বতী প্রেস এবং শিশুসাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠার বিচিত্র কর্মকাÐ নিয়ে বিস্তৃতিতে যাওয়ার বিষয়টি চর্বিত চর্বণ হবে। মহেন্দ্রনাথের গ্রন্থখানি ক্ষুদ্রাকায়, কিন্তু তাঁর লেখার ঠাসবুনুনি এবং অনেক কথা ও চরিত্র নিয়ে পরিক্রমায় তাঁর গোটা কর্মজীবন উত্তমভাবেই বিধৃত হয়েছে।

প্রসঙ্গত একটা কথা এই সুযোগে বলে নিই। মহেন্দ্রনাথ নিজের ব্যাপারে এতটাই প্রকাশকুণ্ঠ যে ওই বইখানি পড়লে মনে হয় তিনি যেন স্বেচ্ছায় গ্রন্থের বিখ্যাত, অখ্যাত চরিত্রসমূহের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছেন। সেখানের সে ব্যাপক ভিড়ে ব্যক্তি মহেন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। তাঁর মতো একজন কর্মী মানুষের পক্ষে এতটা আত্মলোপী হওয়া প্রায় অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। সে কারণেই বর্তমান আলেখ্যটি রচনার কথা রতেœশ্বরের মাথায় এসেছিল। অন্তত তার সঙ্গে আলোচনায় আমার এমনই মনে হয়েছে।

রতেœশ্বর একদিন আমাকে বলেছিল, ‘দেখো, এই বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ ব্যতিরেকে এমন কিছু লেখা হোক, যা তাঁর জীবনকে অহেতুক মহিমান্বিত করবে, সে রকম কিছু তিনি চাইতেন না। বারবার সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। প্রায়শই কথায় কথায় আবৃত্তি করতেন, “কেনাপিদেবেন হৃদিস্থিতেন যথঅ নিযুক্তোহস্মি তথা করোমি।” যুগ নির্বন্ধে তিনি ছিলেন ভাববাদী গোষ্ঠীর মানুষ, যেমন স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের অন্য শিষ্য বা অনুগামীরা ছিলেন। কিন্তু কোনো মতেই তিনি সাম্প্রদায়িক বিশেষ ধর্মমতের ক‚পমÐূক ছিলেন না। “ওঁ বিশ্বরূপায় পরমাত্মনে নমঃ”Ñএই মন্ত্রে তাঁর ঈশ্বরকে প্রণাম নিবেদন করতেন তিনি।’

তেরো

মহেন্দ্রনাথের কর্মজগতের পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শ্রীসরস্বতী প্রেসের প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে কম্পোজিটর, মেশিনম্যান, বেয়ারা এমনকি ঝাড়–দারের কাজ পর্যন্ত তিনি এক হাতে করেছেন। একসময় সেখানেই ‘ম্যানেজার বাবু’ হিসেবে খ্যাত হন, ১৯৭২-এ অবসর নেন। এরই মধ্যে নানা রাজনৈতিক অভিযোগে কারাবরণ, ডেটিন্যু হয়ে প্রবাস জীবনযাপন, ১৯৪৬-এর এবং ৫০ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বরিশালের উদ্বাস্তু মানুষদের জন্য আশ্রয় এবং খাদ্যের বন্দোবস্তÑ এ রকম হাজারো জনসেবার কাজে জড়িত থেকেও ১৯৫১ সালে শিশুসাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠা করে। তার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

রতেœশ্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই, তোমার খাতা এবং মহেন্দ্রনাথের ‘যথা নিযুক্তোহস্মি’ অনুসরণ করে জেনেছি কী অপরিসীম অধ্যবসায়ে তিনি শ্রীসরস্বতী প্রেসের কর্মনির্বাহ করেছেন। আমার বিভিন্ন অনুসন্ধিৎসার মধ্যে বিশেষ যে দুইটি বিষয় জানতে ইচ্ছা করে, সে বিষয়ে যদি কিছু আলোকপাত করতে পারো।

‘কী সেই সন্ধিৎসা?’

‘প্রথমটি হলো ব্যক্তি মহেন্দ্রনাথ বিষয়ে। তিনি যত বড় কর্মী এবং আদর্শবাদীই হোন না কেন রক্তমাংসের মানুষ তো অবশ্যই ছিলেন, নাকি? তিনি দুইবার দার পরিগ্রহ করেছেন। তার সন্তানাদি ছিল। অসুস্থ বাবা এবং ছোট ভাই ছিলেন। ছোট ভাইবোনদেরও দায়িত্ব তাঁকে পালন করতে হয়েছে। তোমার কি মনে হয় না, প্রথমা স্ত্রী কিরণবালার ওপর তিনি যথার্থ মনোযোগ দেননি, বা দিতে পারেননি?’

‘কথাটা তিনি সংক্ষেপে হলেও নিজেই লিখে গেছেন কিন্তু। এই দেখো প্রথমা স্ত্রীর প্রসঙ্গে তিনি বইয়ে কী লিখেছেন, ‘বিবাহিত জীবনে কোনো সুখ আমি তাঁকে দিতে পারিনি। কিরণবালার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আমার জীবনের একটা পরিচ্ছেদের সমাপ্তি ঘটল। এ পরিচ্ছেদের সবটাই জুড়ে ছিল জীবনসংগ্রাম, বন্দীজীবন, সাংসারিক দুঃখ, রোগ, শোক আর উদ্বেগ। তবু শত অভাব দুঃখ ও অনটনের মধ্যে থেকেও তাঁর সেবার কল্যাণস্পর্শ আমাকে তিনি অহরহ অনুভব করিয়েছেন। তাঁর নিজের কোনো কষ্টে পাছে আমার মানসিক অশান্তি হয় সেই আশঙ্কায় কখনই তিনি তা ব্যক্ত করতেন না। নীরবে সহ্য করতেন। আজও তাই তাঁকে মনে পড়লে তাঁর নিঃশব্দে সেবার মাধুরী অনুভব করে চোখ জলে ভরে আসে।’ আমার মনে হয়, ‘এ নিয়ে শেষ বয়সে তাঁর বিষাদ আরও গভীর হয়েছিল।’ আমি রতেœশ্বরকে বললাম, ‘সে তো আমিও পড়েছি। কিন্তু সেটা তো তাঁর স্ত্রীর প্রতি মনোযোগের উদাহরণ নয়, তাঁর মৃত্যুতে শোকের প্রকাশমাত্র। আমার মনে হয় এ বিষয়ে তিনি একটু অধিক স্মৃতিচারণ করলে সংগত হতো।’ রতেœশ্বর বলল, ‘কথাটা আমিও যে ভাবিনি তা নয়। বললাম তো তাঁর শেষ বয়সের বিষাদের কথা। জেঠাবাবুকে এ ব্যাপারে একদিন সরাসরি প্রশ্নও করেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কি জেঠিমার অকালমৃত্যুর ব্যাপারে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দায়িক মনে করেন? উনি বলেছিলেন, “এক কথায় যদি বলি, সংক্ষেপে বলব, না। নির্দায়িক কোনো দিনই নিজেকে ভাবতে পারিনি। তখন কাশিপুরের বাড়িতেই আমি ডেটিন্যু। পরিবারের মধ্যেই আছি। যোগেন্দ্র অর্থাৎ আমার পরের ভাই, আমার স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে বন্দনাকে নিয়ে এসেছিল। সেবারে পুজার ছুটিতে বড় মেয়ে অঞ্জলিকে নিয়ে যোগেন্দ্র কাশীপুর এল। পরিবারের মধ্যে থাকি বলে তখন আমার অ্যালাউন্স হয়েছিল পঞ্চাশ টাকা। তোর জেঠিমার শরীর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না। বাবার মৃত্যু, ছোট ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছিল যক্ষা রোগে। তোর জেঠিমা রোগীদের সেবাযত্ন করতে গিয়ে যে এই রোগের জীবাণু নীরবে ধারণ করেছিলেন, সেই সন্দেহটা মাথায় ছিল না। নিজের বিষয় কোনো দিন কিছু বলতে শুনিনি তাঁকে। তাঁর স্বাস্থ্য বিষয়ে একেবারেই খেয়াল রাখা হয়নি।”’

মহেন্দ্রনাথ রত্নেশ্বরকে আরও বলেছিলেন যে বহুকাল বাদে গ্রামের বাড়িতে এসে পাড়া-প্রতিবেশী, সমবয়সী ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে নানা হুল্লোড়ে দিনগুলো কাটছিল। পুজোর সময়, পাড়ার ছেলেদের আবদারে গ্রামের বাড়িতেই থিয়েটার হবে স্থির হয়েছিল। সেই নিয়ে তখন মত্ত। থিয়েটারের হুল্লোড় শেষ হলে দেখা গেল চ‚ড়ান্ত অবহেলা করা হয়েছে তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে। রোগীকে অনেক আগে থেকেই উপযুক্ত চিকিৎসক দেখানো উচিত ছিল। বরিশাল থেকে অনেক বড় ডাক্তার এনে দেখানো হয়েছিল। তখন নিউমোনিয়ায় তাঁর ফুসফুস ভর্তি। তা ছাড়া যক্ষার জীবাণু মারাত্মকভাবে আক্রমণ করেছে। যেদিন বড় ডাক্তার আনা হলো, সেদিন রাতেই কিরণবালা মারা যান। মহেন্দ্রনাথ রুদ্ধ গলায় রত্নেশ্বরকে বলেছিলেন, ‘আমার এই অমনোযোগিতাটা আমি কোনো দিন ক্ষমা করতে পারিনি।’

আমি রত্নেশ্বরকে বলেছিলাম, ‘এ কাহিনিও তাঁর বইয়ে তিনি লিখেছেন, যদিও একটু ভিন্নভাবে এবং সংক্ষেপে। আমি একটা জিনিস মেলাতে পারছি না, যে মহেন্দ্রনাথ জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে অতটা নিষ্ঠাপরায়ণ এবং পরিচিত, অপরিচিত হাজারো মানুষের প্রতি কর্তব্যকর্মে কোনো রকম ত্রুটিই করেননি, তিনি তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতার, বিশেষ করে অত বড় একটা রোগের ব্যাপারে কীভাবে ওই রকম উদাসীন থাকতে পারেন?’

‘তুমি কী বলতে চাইছ? তাঁর স্ত্রীর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল না?’

‘না। সে কথা বলার উপায় থাকলে আমার হিসাব সহজে মিলত। সে কথা নয়। আমি তোমাকে বলতে চাই তখনকার আমাদের গ্রামীণ মধ্যবিত্ত জীবনে নারীদের অদ্ভুত এক মানসিকতার কথা। এ কথা সত্য যে আমাদের সমাজে নারীরা পুরুষ প্রাধান্যের কারণে অসহায়ভাবে পঙ্গু। পুরুষ প্রাধান্য ব্যাপারটা সব সমাজেই আছে বা ছিল। কিন্তু আমাদের সমাজে খুব সহজতার সঙ্গেই যেন পুরুষদের মধ্যে তাদের স্ত্রীদের প্রতি একটা উদাসীনতা কাজ করত। আমি বলছি না যে তোমার জেঠাবাবু জ্ঞানত সেই মানসিকতার অধিকারী ছিলেন, কিন্তু সামাজিক এই মানসিকতার প্রভাব অজ্ঞাতভাবে হলেও তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ব্যাপারটা কোনো পরিবারে, বিশেষত যৌথ পরিবারে একক কোনো ব্যক্তিত্বের ত্রুটি নয়। মহিলারাও এ ব্যাপারে নির্দায়িক নন। অধিকাংশ সময়েই তাঁরা চান নিঃশব্দে আত্মলোপ করে শহীদ হতে।’

‘মনে হয়, এ বিষয়ে তোমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে?’

‘দেখো, আমি বোধ হয় বলেছি যে তোমার জেঠাবাবুর জীবনের ঘটনাপরম্পরার সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবনের ঘটনাপরম্পরার কতগুলো ব্যাপারে একেবারে আক্ষরিক মিল আমি খুঁজে পাই। সে তাঁর বাল্যকালের শটির পালো তৈরি করতে মাকে সাহায্য করা, শহরে নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করা থেকে শুরু করে, অন্যান্য হাজারো ক্ষুদ্র বৃহৎ কাজে যেমন, বাবার উদাসীনতা, অকর্মণ্যতা ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রায় একই রকম। আবার মহেন্দ্রনাথের প্রথমা স্ত্রীর এভাবে অকালমৃত্যুর সঙ্গে তাঁর যে অপরাধবোধ জড়িত, আমার বাবার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনুরূপই আমি শুনেছি। এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, আমাদের সামাজিক অবস্থান এবং প্রেক্ষাপটের অভিন্নতা।’

‘সে ক্ষেত্রে মহেন্দ্রনাথ বরিশাল থাকাকালীন বা যখন যখন তিনি পরবর্তীকালেও বরিশালে সাময়িকভাবেও থেকেছেন, তখনকার সামাজিক এবং পারিবারিক পরিবেশ সেখানে কেমন ছিল তার একটা আলোচনা দরকার। কিন্তু আমি যেহেতু সেখানে কোনো দিন বসবাস করিনি, আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বা পড়াশোনা সে ব্যাপারে আদৌ নেই।’

আমি বললাম, ‘আমার বরিশালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কয়েকটা বছর বাদ দিলে আজও একটানাই আছে। তবে অশ্বিনীকুমার এবং তাঁর অনুসারীদের যুগ-পরিবেশ বিষয়ে যে ধারণা, তা একান্তই অন্যের কাছে শোনা এবং পুস্তকনির্ভর। তোমার জেঠাবাবুর কাছে এ নিয়ে কোনো কথা হয়নি তোমার?’

‘সামান্য। বস্তুত ১৯৪৮-এর পর বরিশালের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ তাঁর কিছুই প্রায় ছিল না। তবে বরিশাল-বিষয়ক যেসব কাজ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসবের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা গাঢ়ভাবেই ছিল। বরিশাল শহরের তথাকথিত ভদ্রলোকেদের নৈতিক মানদ তাঁর মতে খুব উচ্চ ছিল না। এ ব্যাপারে তোমার অভিজ্ঞতা কী? আমার তো প্রায় নেই বললেই হয়।’

‘থাকার কথাও নয়। আমি ষাটের দশকের গোড়ার দিকে যে বরিশাল শহরে অনধিক এক বছরকাল বসবাস করেছি, তখনো বরিশাল একটি মধ্যস্বত্বভোগী, ব্যবহারজীবী অধ্যুষিত শহর এবং তাঁদের বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। শহর বলা হলেও প্রকৃতিগতভাবে তাকে কয়েকটি সম্পন্ন গ্রামের সম্মিলিত অঞ্চলই বলা চলে। যথেষ্ট ধনী বা উচ্চবিত্ত বলা যায়, এমন পরিবারের সংখ্যা তখনো খুব বেশি নয়। বেশির ভাগই নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র সাধারণ জন। তখনো শহরে প্রধান যানবাহন রিকশা। মোটরগাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। থাকলেও উচ্চরাজপদাধিকারী এক-আধজনের। শহরের মাঝখানে তখনো একটি বেশ বড় বেশ্যাপল্লি। মদ্যপায়ীদের সংখ্যাও যথেষ্ট। কিন্তু বিলিতি মদের দোকান নেই, আসলে আমার নজরে পড়েনি। ধনী দরিদ্র সব নেশারুরাই মেথরবাড়ির স্পিরিটেরই ভক্ত বা অনুরক্ত ছিল। পতিতাপল্লিতে শহরের অন্যতম প্রধান গ্রাহক একদার জমিদার বাবুদের অবশেষ এবং শহরের গৌরব উকিল বাবুরা তথা রিকশাওয়ালারা। শহরটিতে গ্রাম্য এবং শহরনিবাসী টাউটদের দাপট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মিথ্যে মামলাকারী, মিথ্যে সাক্ষীদাতা ইত্যাদিদের প্রায় একচ্ছত্র প্রাধান্য আমার সেই সময়েও যথেষ্টই নজরে পড়েছে এবং তা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, তথাকথিত ভদ্র-অভদ্র নির্বিশেষে।’

‘ভালো কিছু তোমার নজরে পড়েনি?’

‘তাও পড়েছে। শহরের নান্দনিক সংস্কৃতির মানটা এখানে ওই সব অনাচার সত্ত্বেও ছিল। সংগীত, সাহিত্য, নাটক, ইত্যাদির চর্চা অবশ্যই মনকাড়া। কিন্তু এর মধ্যেই যৌন ব্যভিচারও প্রকটভাবে লক্ষণীয় ছিল। সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে ধারার বীজটা অশ্বিনীকুমার দত্তের যুগে প্রোথিত হয়েছিল, তার প্রবাহ কলেজ অধ্যাপক, স্কুলশিক্ষক এবং ওকালতি ব্যবসায়ে নিযুক্ত যাঁরা তাঁদের এবং বিশেষভাবে ছাত্রসমাজের মধ্যে ছিল, ক্ষীণ হলেও।’

‘মানে তুমি বলছ, ভালো-মন্দ উভয়ের মিশ্রণে অবস্থাটা মোটামুটি স্বাভাবিকই ছিল? তুমি তো এও বললে যে শহরে যৌন ব্যভিচার, অস্বাভাবিক টাউটগিরি এসব অত্যন্ত প্রকট ছিল বলে তোমার নজরে পড়েছে। ব্যাপারটা একটু স্ববিরোধী হয়ে যাচ্ছে না?’

‘সেটা আমার বলার দোষেই হয়তো হয়েছে। আসলে বরিশার শহরটা তখনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা শহর। সেখানে যেসব দোষের কথা বলছিলাম সেসব সহজেই নজরে পড়ত বলেই এমন মনে হয়েছে। যেকোনো শহরেই তো এসব দোষত্রুটি থাকে। কারণ বিচিত্র রকমের মানুষ শহরেই ভিড় করে। বড় শহরে তার বিশালতার জন্য এগুলো সবার নজরে তত পড়ে না। তখন আমার বয়সও ছিল পনেরো-ষোলো বছর। খারাপ-ভালোর সংজ্ঞাটা তখন খুবই তীক্ষ্ণ অস্তিত্বে মনজুড়ে ছিল। পরে সব ব্যাপারে কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে দেখেছি, সব মিলিয়ে শহরটা খারাপ ছিল না।’

সেদিন এসব কথা খুবই বিক্ষিপ্তভাবে হয়েছিল। আমাদের উদ্দীষ্ট বিষয় থেকে যেন আমরা বিচ্যুত হচ্ছিলাম। একা একা চিন্তা করে পরে বুঝলাম, আমরা মহেন্দ্রনাথের ওপর শুধু সামাজিক নয়, তখনকার মধ্যবিত্ত পারিবারিক অভ্যাস এবং মানসিকতার প্রভাব কতটা সাংসারিক ব্যাপারে কার্যকরী ছিল সেটা ধরতে চাইছিলাম।

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, মহেন্দ্রনাথ যতই তাঁর কর্মপরায়ণতা, দক্ষতা এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি কর্তব্যপরায়ণতায় আমাদের দৃষ্টিতে সফল মানুষ হিসেবে প্রতিভাত হোন না কেন, তিনি নিজে তাঁর অন্তিম দিনগুলোতে সেই অনুসারে তৃপ্তি লাভ করেননি। কোনো কর্মপ্রিয় এবং তদনুযায়ী মননশীল মানুষের ভাগ্যেই বোধ হয় তা জোটে না। বাহ্যিকভাবে হয়তো অনেকেই মনে করতে পারেন যে মানুষটি যা আকাক্সক্ষা করেছিলেন, তা পুরোপুরিই তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তা ঘটা বোধ হয় সম্ভবও নয়। অতৃপ্তি, কর্মী মানুষ বা সৃজনশীল মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার হেতুস্বরূপ। তৃপ্ততা অর্থই হলো আত্মসন্তুষ্টি। আত্মসন্তুষ্টি এসে গেলে মানুষ তাঁর গতি হারিয়ে ফেলে। সৃজনশীলদের ক্ষেত্রে তখন আর নতুন সৃষ্টি যেমন সম্ভব হয় না, কর্মীদের ক্ষেত্রেও কর্মের প্রবাহ অনিরুদ্ধ থাকে না। এর ওপর পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং বয়সের ভার তো থাকেই, থাকে কালের অমোঘ ক্ষয়বার্তা। তখন, পেছনে তাকিয়ে অসামান্য কর্মী বা সৃষ্টিশীল মানুষেরও বিষাদ অবধার্যভাবে নেমে আসে। মহেন্দ্রনাথের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি বলেই মনে হয়।

আর একটা বিষয়, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে ছোটবড় ত্রুটিবিচ্যুতির স্মৃতিও জীবনের শেষপর্বে অন্তরকে পীড়িত করে বিষাদমণ্ডিত করবেই। পারিবারিক, সামাজিক বা বংশগত উত্তরাধিকার হিসেবে কর্তব্যাকর্তব্যের যে পশ্চাত্তাপ এই পর্যায়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, তার বিষণ্নতা কীভাবেই বা মানুষ এড়াতে পারে? নিঃসন্দেহে সেই সন্তাপ শেষ দিনগুলোতে তাঁকে পীড়িত করেছে। কথাটা পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে তাঁর শেষ জীবনেরও দুটি স্বল্পোল্লিখিত কথা নিয়ে অনুমাননির্ভরভাবে হলেও কিছুটা আলোচনা করা যেত। তবে সেই অনুমান তথ্যসমৃদ্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার জন্য মহেন্দ্রনাথের শেষ অবস্থা পর্যন্ত রত্নেশ্বরই একমাত্র সাক্ষী। কারণ, সে-ই কখনো কথোপকথনের মাধ্যমে বা কখনো তাঁর স্বগতোচ্চারণের মারফতে যতটুকু স্মৃতিতে সঞ্চয় করে রাখতে পেরেছে ততটুকুই।

জীবনের শেষ দুতিন বছর তিনি গভীরভাবে জীবনানন্দের কাব্য কবিতা পাঠ করতেন। ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থটি সেই সময় তাঁর খুব আকর্ষণীয় ছিল। বিশেষ করে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি। রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘আসন্ন বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি ক্রমশ যেন তাঁর কানে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে বাজছিল। কিন্তু অকুতোভয় জেঠাবাবুর ব্যবহারে তার কোনো স্থূল প্রকাশ ছিল না। সম্পূর্ণ আত্মসমাহিত এবং শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত মানুষটি শুধু বাইরের লোকদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎটা কমিয়ে দিয়েছিলেন, আর সাংসারিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলাটাও। অবশ্য অতিপরিচিত এবং প্রিয় দুএকজন, যাঁরা শিল্প বা কাব্যামোদী, তাঁদের কথা স্বতন্ত্র।’

জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তাঁদের কারও কথা তোমার বিশেষ করে মনে পড়ে না?’

রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘বেশির ভাগের কথাই ভুলে গেছি। তবে একজনের কথা খুব মনে আছে, তিনি শৈলেশ সেনগুপ্ত। ভদ্রলোক প্রায় যেন মহেন্দ্রনাথের সহোদর ভাই, এ রকমই সম্পর্ক। মহেন্দ্রনাথের অনুজ্ঞায় তিনি শিশুসাহিত্য সংসদের জন্য ইংরাজি গল্পের বই লিখতেন। বেশ কয়েকটা বইয়ের প্রকাশনার ব্যাপারে জেঠাবাবু তাঁর মতামত নিতেন দেখেছি। তিনি শেষ দিকটায় মাঝে মাঝেই আসতেন। তবে সংসদের কোনো পদে তিনি ছিলেন না।’

‘এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো স্মৃতি তোমার নেই, কোনো বিশেষ গভীর মুহ‚র্তের ছবির বা আলোচনার কথা?’

‘একদিনের কথা খুব মনে পড়ে, বুঝলে। সেটা জেঠাবাবুর মারা যাওয়ার বছর দেড়েক আগের কথা। শৈলেশ বাবু এলে আমারও খুব আনন্দ হতো। মুদ্রণ এবং প্রকাশনা জগতের মানুষ মহেন্দ্রনাথ তাঁর কর্মজগৎ নিয়েই সারা জীবন মগ্ন থেকেছেন, এমনটাই প্রসিদ্ধি। মানুষজনের সঙ্গে, অবসরের দিনযাপনের কালেও, আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল সেই মুদ্রণ এবং প্রকাশনা-বিষয়ক কথাবার্তা। আমি ভাই কর্মযোগের ধারে-কাছেও থাকতে রাজি না, তা নিশ্চয়ই তোমাকে বলতে হবে না। কিন্তু শৈলেশবাবুর সঙ্গে তিনি যখন আলাপ-আলোচনা করতেন, তখনকার বিষয় থাকত নিখাদ কাব্য বা দর্শনবিষয়ক তত্ত্ব বা রসালোচনা।’

‘উনি যে কবিতামোদী, সে কথা তো তাঁর ‘যথা নিযুক্তোহস্মি’ বইটিতেই আছে। তা ছাড়া শিশুসাহিত্য সংসদের প্রকাশিত বিপুল রচনাসম্ভার, যেসব সমাজের বিভিন্ন স্তর বা শ্রেণির শিশুকিশোরদের কথা চিন্তা করে তিনি সম্ভব করেছিলেন, প্রকাশনার জগতে তা তো একটা বিপ্লব। সে কারণে, শিশু-কিশোর সাহিত্যে যে তাঁর ব্যাপক বিচরণ ছিল, তা তো সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু তুমি যা বলছ, তা তো গভীর কাব্য রসাস্বাদনের কথা। এতটা সময় তাঁর হলো কীভাবে?’

‘জানি না। শুধু এইটুকু জানি, রাতের সামান্য অংশই তিনি ঘুমের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন। তাঁকে তো তুমি দেখোনি, দেখলে বুঝতে কী অসম্ভব স্বাস্থ্যোজ্জ্বল পুরুষ ছিলেন তিনি। তা যেমন দেহে, তেমনি মনের দিক থেকে। যেন এক বিশাল মহীরুহ। এত বড় মাপের দেহমনসমৃদ্ধ মানুষ আমি আর একজন দেখিনি।’

‘তুমি বলছিলে, শেষ দিকটায় জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কাব্যটি তাঁকে আকর্ষণ করত বেশি। এ বিষয়ে কোনো স্মৃতি?’

‘সেও শৈলেশবাবুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনাকালেই দেখেছি। একটা ঘটনা বলি একদিনের। সেও ওই মারা যাওয়ার বছর দেড়েক আগের কথা। শৈলেশবাবু এসেছেন। কিছুক্ষণ এ কথা-সে কথা। জেঠাবাবু বলছিলেন, অল্প বয়সে বঙ্কিমের একটি কথা পড়েছিলাম। কথাটি ছিল, এই মনুষ্য জীবন লইয়া কী করিব? কথাটি বড় ভাবিয়েছিল। সেই সময়ের কংগ্রেসের রাজনীতি, বন্দে মাতরম মন্ত্র, আনন্দমঠ ইত্যাদিতে বিশেষ মগ্ন ছিলাম। পরে সেই রাস্তা ধরেই এসে ক্রমশ প্রকাশনার জগতে। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, এই জীবন লইয়া কর্ম করিব, কর্মই হইবে আমার জীবন। সেভাবেই জীবনটা নির্বাহ করার চেষ্টা করেছি। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস এবং কাব্য অধ্যয়নের আগ্রহ ছিল অগাধ। যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। দুদুবার দার পরিগ্রহ করেছি। তাঁরা দুজনে যথার্থভাবে ‘গৃহিণী, সচিব-সখী, প্রিয় শিষ্যা ললিত কলাবিধৌ।’ কিন্তু যথার্থ প্রেমিক বা দয়িত হিসেবে তাঁদের যোগ্য মর্যাদা দিতে পারিনি। কর্ম সেখানে ‘প্রবল আকার’ হয়ে পথরোধ করেছে বলে এই বেলাশেষে মনে আফসোস হচ্ছে। আমি ভগবদ্বিশ্বাসী মানুষ, তথাপি যুক্তিবাদী। বিশ্বাসেই ভর করে এখন ‘পরমানন্দ মাধব’-এর পদধ্বনি শুনছি, আর তাঁরই জন্য অপেক্ষা করে আছি।’

রত্নেশ্বর যেন ভরগ্রস্ত মানুষের মতো নাগাড়ে এই কথাগুলো আবৃত্তি করে যাচ্ছিল। প্রসঙ্গ পরিবর্তন না করে বলে চলল, ‘এইসব বলতে বলতে, একসময় জেঠাবাবু উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন, আবার একটু বাদেই ফিরে এলেন। হাতে জীবনানন্দ দাশের একটি কাব্যসংগ্রহ। শৈলেশ বাবুর হাতে বইখানি দিয়ে বললেন, ‘বনলতা সেন’ কবিতাটা পড়–ন।

‘শৈলেশবাবু কবিতাটিতে চোখ বুলোচ্ছিলেন। জেঠাবাবু খানিকটা অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘জোরে জোরে পড়–ন।’ কথাটা যেন প্রায় আদেশের সুরেই বললেন তিনি। যেন তাঁর আর অপেক্ষা করার সময় নেই। শৈলেশবাবু পড়তে লাগলেন, তিনি শুনছিলেন চোখমুদে। শেষ হলে চোখ বন্ধ অবস্থায়ই বললেন, ‘শেষ চার পঙ্ক্তি আবার পড়–ন।’ শৈলেশবাবু পড়লেন :

‘গোধূলির সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল,

সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী, ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন,

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

শৈলেশবাবুর পড়া শেষ হলে মহেন্দ্রনাথ তাঁর দিকে সকাতর অথচ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বুঝেছেন, বুঝতে পারলেন?’ যেন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সন্দিগ্ধ কণ্ঠস্বর। একই সঙ্গে জেঠাবাবু পুনরাবৃত্তি করলেন পঙ্ক্তি চারটি। বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কাব্যের সুর থেকে জীবনানন্দের কাব্যের সুর যে কোথায় ভিন্ন তা বোঝাটা দরকার।’

রতেœশ্বর আমাকে বলেছিল, ‘তোমাকে তো আগেই বলেছি যে শৈলেশবাবুর সঙ্গে যখন মহেন্দ্রনাথের বার্তালাপ হতো, তা ছিল নিছক কাব্য-আশ্রয়ী। আর সে ব্যাপারে আমার লোভী চরিত্রটিও তোমার অজানা নয়। জেঠাবাবুর বক্তব্য ছিল এই যে রবীন্দ্রোত্তর যুগের কবি জীবনানন্দের কাব্যিক উত্তরণটা যে কোথায় তা বোঝা দরকার। আমার কাছে অসাধারণ লাগছিল এই যে যাঁর নব্বইতে পৌঁছোতে খুব বাকি নেই, সেই মানুষ তখনো ওরকম চিন্তা করার ক্ষমতা কীভাবে ধরে রেখেছেন। আমরা আজ জানি, রবীন্দ্রনাথ সর্বার্থে একজন আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন। সেই আধুনিকতা তাঁর সৃজনে, চিন্তায়, কর্মে সর্বত্রই এত ব্যাপ্ত যে তার কিনারা পাওয়া এক জীবনব্যাপী সাধনা এবং অধ্যয়নের কাজ। কিন্তু জীবনানন্দের রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিন্নতা এবং তার আধুনিকতার স্বরূপ উপলব্ধি করতে বাঙালি পাঠকের ঢের দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। জেঠাবাবুর প্রজন্মের যাঁরা খুব নিয়মিতভাবে কাব্যচর্চাকারী তাঁরাই শুধু জীবনানন্দের ভিন্নতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আবার সেই যুগের রবীন্দ্র অনুগামী অনেক কবির পক্ষেও যে তা সম্ভব হয়নি তাও আমরা জানি। আমি এতও বলছি, রবীন্দ্রনাথকেও তাঁরা কী সম্যক বুঝেছিলেন?’

আমি বললাম, ‘আমি তোমার মতো অতটা বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারিক নই। তবু আমার একটা অন্য কথা মনে হয়। সেটা তাঁর অন্তিম অধ্যায়ের বিষণœতা, বিপন্নতাসংক্রান্ত। তার মধ্যে খানিক বিগত ব্যবহারিক জীবনের প্রেম, দাম্পত্য কর্তব্যাকর্তব্য ইত্যাদির অতৃপ্তিজনিত দীর্ঘশ্বাস যেন অনুভব করতে পারি।’

রতেœশ্বর বলল, ‘ঠিক তাই। নইলে, সূর্যাস্তের মোহনায় বসে ‘বনলতা সেন’-এর জন্য অমন অনুভব কীভাবে তাঁকে নিবিড় আত্মস্থতায় নিমগ্ন করে। অথবা তাও হয়তো নয়। কিংবা এটা তাঁর স্বভাব বা চেতনার দুটো বিপরীতমুখী প্রবণতার টানাপোড়েনজাত গভীর দার্শনিকতা। অথবা আজীবন কর্মপ্রেমিক একটি মানুষের কর্মান্তিক প্রান্তে এসে প্রেমান্বেষণ।’

আমি বললাম, ‘তোমার কথাটা ঠিক বুঝলাম না। তুমি মহেন্দ্রনাথের মধ্যে কোন দুটো বিপরীতমুখী প্রবণতার কথা বলতে চাইছ?’

‘দেখো, বাল্যাবধি দেশানুরাগ, স্বাধীনতার স্পৃহা তাঁর মধ্যে অন্য দেশানুরাগীদের মতো জীবনবোধ গড়ে তোলেনি। যাঁরা তাঁর পথপ্রদর্শক, নেতা বা আদর্শস্থানীয়, তাঁরা তাঁকে একজন কর্মচঞ্চল সৃজনকর্মী হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর চিন্তা-চেতনা, যৌবনোচিত চাঞ্চল্য, উদ্দীপনা সবটাই কেন্দ্রীভ‚ত হয়েছিল সেই সৃজনকর্মে। বোধ হয়, তাঁর দাম্পত্য এবং প্রেমবিষয়ক অনুভবকেও তিনি সেই কর্মের তুলনায় বেশি প্রাধান্য কোনো দিন দিতে পারেননি, অন্তত, গোটা যৌবনকালে তো নয়ই। সেটা তাঁর একটা মৌল সমস্যাই মনে হয়।’

‘তার জন্যই কি টানাপোড়েনের কথা বলছ? কিন্তু সেটা তো তাহলে এল সেই শেষ রাগিণীর মূর্ছনায়, বেলাশেষে, নয় কি?’

‘হ্যাঁ, জীবনানন্দের অনুভবের রাস্তা ধরে। তখন তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী চারুবালাও গত। তিনি, অর্থাৎ চারুবালা খুব তীর্থ পর্যটন করতেন। সেই পর্যটনলিপি ডায়েরির আকারে লিখতেন। তাঁর দেহাবসানের পর, মহেন্দ্রনাথ ‘চলার পথের দিনলিপি’ নাম দিয়ে সেই ডায়েরিটি প্রকাশও করেছিলেন। পড়েছিলাম। চমৎকার মেদহীন গদ্য। জেঠাবাবুর মানসের বনলতা সেন কখনো মনে হয়, তাঁর প্রথমা স্ত্রী কিরণবালা, কখনো মনে হয় চারুবালা।’

আমি বললাম, ‘তাঁর ‘যথা নিযুক্তোহস্মি’ পড়ে আমার কিন্তু মনে হয়েছে, এই দুজনকেই তিনি একক বনলতায় শেষবেলায় চিত্তস্থ করে নিয়েছিলেন। তখন আর তাঁর কর্মময়তা তাঁকে তাঁর মানস দয়িতার কাছ থেকে বিযুক্ত রাখতে পারেনি। অদ্ভুত নির্মোহে তিনি তাঁর প্রেস, প্রকাশনা, সামাজিক-সাংগঠনিক কাজকর্মের বৃহৎ জগৎকে পরিত্যাগ করতে পেরেছিলেন এবং তখন তাঁর আশ্রয় হয়েছিল জীবনানন্দ। কিন্তু তাতে তখন আর কীই-বা যায় আসে।’

রত্নেশ্বর বলল, ‘একজন কবি-সমালোচক জীবনানন্দের এই ভাবটির বিষয়ে বলেছেন, “বনলতা সেন কবিতার মধ্যে খুব সুস্পষ্ট একটি প্রত্যাখ্যান রয়েছে। কবিতাটি যদি প্রেমের কবিতা হয় তবে তা ব্যর্থ প্রেমের কবিতা। কবিতাটি প্রেমের নয়, প্রেম অন্বেষণের কবিতা, কবি প্রেমপিয়াসী এবং প্রেমের ব্যর্থতা থেকে এই প্রেমপ্রয়াস।” আমার মনে হয় মহেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে। তোমার কী মনে হয়?’

‘আমার ততটা মনে হয় না।’

‘কেন?’

‘কারণ, যতটুকু তাঁর লেখা পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে, মানুষটি ভালোবাসা পেয়েছেন, যে ভালোবাসার কথা জীবনানন্দ বলেছেন, বলেছেন তাঁর কাব্যে, ছন্দে। বলেছেন, ‘ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষরে, ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে, সে আমারে ভালবাসিয়াছে, সে আমার আসিয়াছে কাছে।’ মহেন্দ্রনাথ সম্পর্কে বোধ হয় এভাবেও বলা যায় না। কারণ, তিনি কিরণবালা এবং চারুবালার ভালোবাসা যে পেয়েছেন কিন্তু সেটা জীবনানন্দের বোধের ভালোবাসার অন্বেষণ নয়। তাঁর নিজস্ব ভালোবাসার জগৎটা একান্তই ধূসরÑ অন্য কোনো রং সেখানে নজরে পড়ে না। ঘৃণা বস্তুটা তাঁর মধ্যে স্বভাবগতভাবে ছিল না বলেই বোধ হয় একেবারেই। সেটা কোনো ক্ষেত্রেই নয়। শেষ সময়ে তাঁর মধ্যে যেটা দেখি সেটা তাঁর গোটা জীবনব্যাপী শুধু একতরফা ভালোবাসা পেয়ে যাওয়ার এবং প্রতিদানে নিজের তরফ থেকে কোনো প্রতিদান না দেওয়ার তথা অবহেলা করার জন্য অনুতাপমাত্র। এটা জীবনানন্দীয় ভাব নয়।’

রতেœশ্বর বলল, ‘তোমার বিশ্লেষণ হয়তো যথার্থ, কিন্তু সেটা বড় কঠিন কথা। প্রকৃতির আলো হাওয়া জলের মতন দুই স্ত্রীর প্রেম পরপর তিনি ভোগই করলেন, বনলতার কবির মতো ভালোবাসা বা ঘৃণার যন্ত্রণাটা যখন তাঁর শুরু হলো, তখন তাঁর স্ত্রী দুই দয়িতা তার আস্বাদটুকুও পেলেন না। এটা কঠিন কথাই হলো। কিন্তু সত্য তো কঠিনই হয়।’ রত্নেশ্বর খানিকটা ভেবে পুনরায় বলল, ‘ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে বোঝা মুশকিল। তাঁর গোটা জীবনের স্বভাবটাই বিচিত্রভাবে নির্ঘৃণ। সেটা যেমন তাঁর পারিবারিক জীবনে, তেমনি বৃহৎ কর্মক্ষেত্রেও। সে কারণেই শ্রীসরস্বতী প্রেস থেকে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে তিনি যে আঘাতটা পেয়েছিলেন, অত্যন্ত নিকট সতীর্থদের কাছ থেকে সেই আঘাতটা তাঁর যেন প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্যই ছিল। ভালোবাসার সঙ্গে ঘৃণার একটুও খাদ না থাকলে ভালোবাসাটাও সজীব থাকে না, তা কি গার্হস্থ্যে, কি বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে। এর দুটোই তো প্রেমেরই ক্ষেত্র।’

রত্নেশ্বরের এই কথাটার তাৎপর্যটা আমি আভাসে বুঝেছিলাম, কিন্তু যে আঘাতটার কথা সে উল্লেখ করেছিল, তার বিস্তারিত বৃত্তান্ত সে হয় চেপে গেল, নয়তো জানত না। ভাবলাম, পরে এ নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করব।

মহেন্দ্রনাথও তাঁর আত্মচরিতে এর চেয়ে বেশি কিছু বলেননি। কিন্তু না বললেও, একটি প্রেসকে প্রায় শুরু থেকে প্রকাণ্ড একটা বটবৃক্ষের মতো ব্যাপক ছায়া-প্রদায়ী এবং অগণিত প্রাণীর আবাসস্থলের আকারে পরিণত করা এবং সেখানে আঘাতটা খাওয়ার পর প্রায় একই প্রাণচঞ্চলতা বজায় রেখে একটি বিশেষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠা করার মতো রোমাঞ্চকর কাহিনির কথকতা অকথিত রাখা অপরাধই হয়। পরবর্তী অধ্যায়ে সেই বিচিত্র কাহিনি যথাসম্ভব বিব্রত করব। ‘বনলতা সেন’-এর প্রসঙ্গটার সঙ্গে তাঁর প্রাক্তন কর্মময় জীবনের সংযোগটাও বিচার করা দরকার।

চৌদ্দ

মানুষের মধ্যে যাঁরা সৃজনশীল শক্তির অধিকারী, তাঁরা নানাভাবে নিজের নিজের প্রকাশ ঘটাতে চান। কেউ অভিযাত্রিক হন, কেউ বিজ্ঞানের গবেষণার পথ ধরেন, কেউবা শিল্প-বাণিজ্যের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তাঁর বা তাঁদের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটান। কিন্তু যিনি যা-ই করুন, তিনি যদি প্রকৃত সৃজনধর্মী হন, একটা না একটা সময় কাব্য, সাহিত্য, শিল্পকলার প্রতি তাঁর একটা আকর্ষণ যেন স্বাভাবিকভাবে এসেই যায়। আমি অনেক সার্থক ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিকে দেখেছি, যাঁরা চ‚ড়ান্ত সার্থকতায় পৌঁছেও নান্দনিক সৃজনশীলতার জন্য কাতর। কথাটা শুধু সৃজনশীল ব্যক্তি যাঁরা, যাঁরা জীবনে কিছু হয়ে উঠেছেন বা হয়ে উঠতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই হয়ে ওঠা বা হয়ে উঠতে চাওয়াটা, একমাত্র সৃজনশীলতা যাঁদের মধ্যে থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। জিনিসটা বেশ জটিল। আবার এটা যে সবার মধ্যে থাকবেই, এ রকম কোনো সাধারণ নিয়ম প্রকৃতিতে নেই। তবে একটা জিনিস নিশ্চিত, কোনো সৃজনশীল ব্যক্তির সার্থকতার ওপর তাঁর তৃপ্তি নির্ভর করে না। অভাববোধটা সৃজনশীল কর্মের পূর্বশর্ত সব ক্ষেত্রেই।

কিন্তু এই কথাগুলো আমি যে মহেন্দ্রনাথ সম্পর্কে আক্ষরিক অর্থেই বলছি, এমন নয়। তবে এর কতগুলো লক্ষণ মহেন্দ্রনাথের মধ্যে আমি দেখতে পাই। তবে সেই আলোচনাটা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার অন্বেষণের বিষয়টা ছিল জীবনসায়াহ্নে মহেন্দ্রনাথ ‘বনলতা সেন’-এর বিশেষ কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে বা বন্ধুকে পাঠ করিয়ে যে প্রশ্নটি করেছিলেন, সেই প্রশ্নটি বিষয়ক। সেই পঙ্ক্তি কটি বোঝা বা বুঝতে পারা না পারার প্রশ্নটি তিনি প্রকৃতভাবে কাকে করেছিলেন, শৈলেশবাবুকে, না নিজেকেই? গোটা জীবন তাঁর কেটেছিল প্রেস এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে। মোটা কথায় বললে, এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম প্রেম। তাঁর সৃজন প্রতিভার প্রকাশ এবং বিকাশ ঘটেছিল এই প্রেস এবং প্রকাশনাকে কেন্দ্র করেই। এমনকি এমনও বলা যায় যে এটাই তাঁর জীবনের একমাত্র প্রেম। কিন্তু তাহলে, বনলতা সেন পাঠ করে, জীবনানন্দের ‘প্রেম অন্বেষণ’র দহনে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে দগ্ধ করছেন কেন? তাহলে কি তাঁর জীবনেও সৃজনশীল ব্যক্তিদের মতো অতৃপ্তি ছিল না? এ রকম অজস্র প্রশ্নই মহেন্দ্রনাথ সম্পর্কে করা যায়।

মহেন্দ্রনাথ ছাপাখানার সঙ্গে যখন নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে সম্পৃক্ত করলেন তখন তাঁর বয়স তেইশ-চব্বিশ বছর। একজন মানুষ এই রকম বয়সেই সাধারণত কোনো নারীর প্রেমে পড়ে। তাঁর আত্মকথনে বা তাঁর সম্পর্কে কোনো লেখায় এমন কোনো যুবক নেই যে তিনি কোনো নারীর প্রেমে আসক্ত বা মুগ্ধ হয়েছিলেন। অবশ্য ইতিমধ্যেই তাঁর প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সে সম্পর্কেও দাম্পত্য-প্রণয় বিষয়ে কোনো প্রেম-পর্বের সামান্য খবর জানা নেই আমাদের। তার কারণ আছে। শ্রীসরস্বতী প্রেসের নির্মাণকর্মে তিনি যে বয়স থেকে তাঁর দিন-রাতের ব্যাপক সময়কে ব্যবহার করেছেন, তখন কোনো ভিন্ন বিষয়কে প্রকাশ করার ফুরসত তাঁর হয়নি। এমনকি প্রেম-প্রণয়বিষয়ক অনুভবের কথাও না। কিন্তু যে বয়সে তাঁর প্রথম বিবাহটি সম্পন্ন হয়েছিল, অর্থাৎ ১৯২০ সালে, যখন তাঁর বয়স মাত্র কমবেশি কুড়ি বছর মাত্র। সেটা তো রোমান্স, রোমান্টিকতা অনুভবের আদর্শ সময়। সেই যুগে এ রকম বয়সেই সাধারণত বিবাহাদি প্রশস্ত ছিল। ভদ্র, শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত মানসিকতার পরিবারের সন্তানেরা নবোঢ়া পত্নীর সঙ্গেই তখনকার দিনে প্রণয়ের রহস্যময়তা অনুভব করতেন। ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না, এমন নয়। কিন্তু মহেন্দ্রনাথ ওই বয়সের মধ্যেই প্রথমে বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এবং সেই সূত্র ধরে ক্রমশ ছাপাখানার কর্মকাণ্ডের এমনভাবে সম্পৃক্ত হলেন যে জীবনের এই দিকটাতে তাঁর মন নিবেশের সময়ই পেলেন না। তাঁর পত্নী সংসর্গ ব্যাপারটি সে কারণে যতটা প্রোষিতভর্তৃকা, প্রোষিতপত্নিক অবস্থায় ছিল, ততটা তৎকালোচিত-সাধারণ গৃহস্থ জীবন নির্বাহী যুবজনোচিত ছিল না।

কিন্তু মহেন্দ্রনাথ ছিলেন স্বাভাবিকভাবে একজন সুস্থ শরীর মন এবং সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। তাঁর জীবন যদি সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থসুলভ ধারায় চলত, সম্ভবত তিনি, কবি, সাহিত্যিকের মতো সৃজনশীলতার পথ অবলম্বন করতেন। ছাপাখানার কাজ এবং পরবর্তীকালে শিশুসাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার বৃহৎ কর্মে প্রবেশ করে তিনি আর অন্য কোনো দিকে মনোনিবেশের কথা চিন্তা করতে পারেননি। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে তিনি জাগতিক অন্যবিধ করণীয় কর্তব্যকর্মে অবহেলা করেছেন। জীবনের সব ক্ষেত্রেই কর্তব্যকর্মগুলো তিনি যথাযথভাবেই পালন করেছেন। কিন্তু সৃজনশীল, প্রতিভাধর ব্যক্তি হিসেবে অন্তর্নিহিত অতৃপ্তির অনুভ‚তি যে তাঁকে তাড়না করতে ছাড়েনি, তার প্রমাণ ওই জীবনানন্দের প্রেমান্বেষণের কাব্য ‘বনলতা সেন’।

মাঝে রতেœশ্বর একদিন এসেছিল। মহেন্দ্রনাথ দত্ত বনাম শৈলেশবাবু বৃত্তান্ত বিষয়ে আমার আরও কিছু জানার ছিল। বিশেষ করে আমি জানতে আগ্রহী ছিলাম মহেন্দ্রনাথ তাঁর ব্যক্তিক অনুভবের ক্ষেত্রটিকে কীভাবে ব্যাপক মানুষের কল্যাণের ব্যাপারে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। রত্নেশ্বর বলল, ‘বিষয়টা বিস্ময়ের সন্দেহ নেই। তবে বড় মাপের কর্মী মানুষদের ব্যক্তিগত দুঃখতাপ জীর্ণ করার ক্ষমতার পরিমাপ করার ক্ষমতা আমাদের মতো সাধারণ জীবনযাপনকারীদের পক্ষে সহজ নয়। তুমি রবীন্দ্রনাথের জীবনভর দুঃখ সন্তাপের কথা নিশ্চয় জানো। আমি মহেন্দ্রনাথ দত্তকে, তাঁর সঙ্গে তুলনা করতে চাইছি না, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিক শোক সন্তাপ জীর্ণ করার পদ্ধতিটিও কম চমৎকার নয়। আমরা সাধারণভাবে ওই ব্যাপারটাকে অনেক সময়ই হৃদয়হীনতা বা অনুভ‚তিহীনতা বলে মনে করে থাকি।’

কথাটা মিথ্যে নয়। এ ক্ষেত্রে মহেন্দ্রনাথের আত্মকথনের কিছু কথা উদ্ধৃত করলে বিষয়টি প্রাঞ্জল হবে। তিনি লিখেছেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুর এক মাস পরে, ১৯০৭-এর নভেম্বরের শেষদিকে তাঁর শ্রাদ্ধশান্তি হয়ে যাবার পরদিনই আমার কাছে টেলিগ্রামে অর্ডার এল আমাকে কলকাতা যাবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য পূর্ণমুক্তির আদেশ পেতে আরও ছ-মাস লাগল। তবে এই টেলিগ্রাম পাবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতার উদ্দেশে পা বাড়ালাম-কলকাতা আর শ্রীসরস্বতী প্রেসের উদ্দেশ্যে। অনেক দিন যাকে ছেড়েছিলাম আবার নেশার মতো তা আমাকে আচ্ছন্ন করল।’

রতেœশ্বর বলল, ‘দেখো, যেটাকে তিনি ‘নেশার মতো’ বলছেন, আমার মনে হয় সেটাই তাঁর বড় অনুভবের বা প্রেমের জগৎ। এই প্রেম বৃহৎ মানবসমাজের কল্যাণে নিবেদিত প্রেম, যা একটা প্রকা ছত্রচ্ছায়ার অধিকারী বটবৃক্ষের মতো অনেক মানুষের মাথার ওপর থেকে তাদের রক্ষা করে, আশ্রয় দেয়। তবে তার মানে এই নয় যে ব্যক্তিক প্রেম-প্রণয়ের জগৎটা, যা স্ত্রী সন্তান পরিজনদের ঘিরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ, সেটাকে তিনি তুচ্ছ করেছিলেন।’

শ্রীসরস্বতী প্রেসকে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মহেন্দ্রনাথ ১৯৫৪ সাল থেকে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে চলছিল। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এই উন্নতিতে কোনো ভাটা পড়েনি। রতেœশ্বর বলছিল, ‘অশান্তি শুরু হয় এরপর থেকে। মহেন্দ্রনাথের পক্ষে সেই অশান্তির মধ্যে কাজ করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে ওঠে। ম্যানেজিং এজেন্সি উঠে গিয়ে শৈলেশ গুহ হলেন কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মানে একক অসীম ক্ষমতার অধিকারী। ভদ্রলোকের ব্যাপক অবদানের কথা স্বীকার করেও, তাঁর ক্ষমতার প্রতি লোভ বা দুর্বলতার কথা অস্বীকার করা যায় না। এই অতিরিক্ত ক্ষমতাপ্রিয়তার জন্যই অনেক ক্ষেত্রে তাঁরই হাতে গড়া সংস্থা হয় নষ্ট হয়ে গিয়েছে, নয়তো বেহাত হয়েছে।

শ্রী গুহ ম্যানেজিং ডিরেক্টর হবার পর শ্রীসরস্বতী প্রেসের তিনতলায় তৈরি একটি ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক উঠে এসেছিলেন। সেখানে ওঠানামার জন্য তিনি একটি লিফটের প্রস্তাব করলেন। যদিও তাঁর অফিস ছিল দোতলায়। মহেন্দ্রনাথ তখন শ্রী গুহর অনুরোধেই প্রেসের প্রোডাকশন এবং ফিনান্স দেখতেন। সেই সময়কার শ্রম পরিস্থিতি এবং আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনি লিফট বসাতে বারণ করলেন। কিন্তু কাজ হলো না। লিফট বসল। খরচ হলো ৮০,০০০। মহেন্দ্রনাথ বুঝলেন, এখানে আর নয়। ১৯৭১-এই তিনি প্রেস থেকে বিদায় চাইছিলেন। বয়সও হয়েছে, কিন্তু শ্রী শৈলেন গুহর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রেসের যেভাবে ক্ষতি করে চলছিল, তাতে মহেন্দ্রনাথের মন ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু অতীতের সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে শ্রীগুহর অবদানের কথা স্মরণ করে, তাঁর বর্তমান খামখেয়ালিপনা এবং ভুল সিদ্ধান্ত বা তাঁকে উপেক্ষা করা নিয়ে মহেন্দ্রনাথ মুখে কিছু বলতে পারছিলেন না। সংগঠক হিসেবে তাঁর শৈলেন গুহর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু সংস্থার শুরু থেকে মহেন্দ্রনাথ যেভাবে পরিচালন ব্যবস্থাটিকে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর মধ্যে রেখেছিলেন, একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে গিয়ে তার বুনিয়াদটাই শৈলেন গুহ নষ্ট করে ফেলছিলেন। ‘পঞ্চাশ বছর আগে যে প্রেস আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিষ্ঠার কাজে লেগেছিলাম, তাকে বাঁচায়ে রেখেছিলাম, তার প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বড় করেছিলাম, পঞ্চাশ বছর পরে যখন সেখান থেকে তিক্ততার সঙ্গে বিদায় নিয়ে এলাম তখন আমার হাতে গড়া সেই সংস্থা আবার মুমূর্ষু।’Ñ লিখেছেন মহেন্দ্রনাথ। ১৯৭২ সালে তিনি শ্রীসরস্বতী প্রেস থেকে অবসর নিলেন।

রত্নেশ্বর বলল, ‘শ্রীসরস্বতী প্রেসের ইতিহাস অনেক লম্বা এবং জটিল। তার বিস্তৃত বিবরণ মহেন্দ্রনাথের লেখায় এবং তাঁর সহযোগী তথা গুণমুগ্ধ অনেকেরই স্মৃতি আলোচনায় সহজলভ্য। সে নিয়ে ব্যাপক বলার দরকার নেই। কিন্তু জেঠাবাবু শেষ দিকে আমাকে যা যা বলতেন, তাতে বুঝেছি তিনি তাঁর জীবনের পরিপূর্ণতার একটা বিশেষ দিক খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ‘শিশুসাহিত্য সংসদ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।’

আমি বললাম, ‘রত্নেশ্বর, তোমার কি মনে হয় না, এই ‘শিশুসাহিত্য সংসদ’ প্রতিষ্ঠা এবং তার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের জন্য যে ব্যাপক সুবর্ণ উদ্যানের স্বর্গীয় দরজা তিনি খুলে দিয়েছিলেন তার সঙ্গেই প্রকৃতপক্ষে তাঁর সৃজনশীলতা, বিপ্লবীসুলভ মন এবং রোমান্টিক অনুভ‚তির যোগ ছিল সর্বাধিক? এখানে ‘রোমান্টিক’ শব্দটি আমি ‘কল্পনাসমৃদ্ধতা’ অর্থে ব্যবহার করছি।’

‘ঠিকই বলেছ। মহেন্দ্রনাথ বোমা পিস্তল ব্যবহারকারী বিপ্লবী ছিলেন না বা অলীক কল্পবিলাসী অর্থে রোমান্টিক ছিলেন না। তাঁর মনটা সত্যই বিপ্লবীসুলভ মনই ছিল। তিনি তাঁর চিন্তা ও কর্মে আদ্যন্ত আধুনিক ছিলেন। তাঁর রোমান্টিকতার শেকড় প্রোথিত ছিল বাস্তবের শক্ত ভ‚মিতে।’

‘আর তাঁর স্বপ্ন?’

‘স্বপ্ন-সওদাগর ছিলেন তিনি। সেই সওদাগরি ব্যাপক মানুষের স্বার্থে। শ্রীসরস্বতী প্রেসের মাধ্যমে তিনি যে মুদ্রণশিল্প বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, প্রকাশনাটির প্রতিষ্ঠা তারই পূর্ণতার রূপ।’

শ্রীসরস্বতী প্রেসে আসার পর ঝকঝকে ছাপায় রংবেরঙের ছবিসহ দুখানি ছড়া ও ছবির বই বের হয়ে বাজারে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। ১৯৪৯-এ ছড়ার ছবি-১ এবং ১৯৫০-এ ছড়ার ছবি-২। বই দুটি বেরিয়েছিল ‘শিশুসাহিত্য সংসদ’ এই প্রকাশনার নামে। ছড়া ও কবিতার প্রতি আগ্রহ মহেন্দ্রনাথের বহুকালের। মনে পড়ে, বহুদিন আগে জেলে বসে বন্ধু অনঙ্গ তাঁর মধ্যে যে ছন্দোপ্রীতির উন্মেষ ঘটিয়েছিল সেই কথা। বস্তুত কবিতা এবং বিশেষ করে শিশুমনের উপযুক্ত ছড়ার প্রতি আগ্রহ তাঁর অত্যন্ত শিশুবয়স থেকেই ছিল। অনঙ্গ শুধু তার ক্ষেত্রের প্রসার ঘটিয়েছিল। সেই ছন্দোপ্রীতির মর্যাদা লাভ করল পরিণত বয়সে। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে শিশুসাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলো ১৯৫১ সালে। শিশুদের জগৎকে এতটা মর্যাদা ও গুরুত্ব ইতিপূর্বে বাণিজ্যিক প্রকাশনা সংস্থার তরফ থেকে খুব একটা দেখা যায়নি। ক্রমে এরই একটা বিভাগ দাঁড়াল ‘সাহিত্য সংসদ’ নামে, যা প্রকাশনার জগতে মহেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বৃহত্তম পদক্ষেপ। প্রায় সব বাংলা ধ্রুপদি সাহিত্যকর্মকে ক্রেতা-পাঠকদের আয়াসসাধ্য মূল্যে প্রকাশ করে ‘সাহিত্য সংসদ’ বাঙালির কাছে চির ধন্যবাদার্হ হয়ে আছে। বিষয় বৈচিত্র্যে, প্রকাশনার মানে এবং পুস্তক নির্মাণের তাবৎ কর্মীকে, লেখক ও শিল্পীগণসহ, প্রায় একটা পরিবারভুক্ত করে মহেন্দ্রনাথ যে কাণ্ডটি করলেন, তা প্রকৃতই তাঁর বিপ্লবীমনস্কতার পরিচায়ক। রত্নেশ্বর বলল, ‘এর চেয়ে দুটো বোমা মেরে বা একটা গুলি ছুড়ে একজন সাহেবের জায়গায় অন্য একজনকে মেরে ফাঁসি গেলে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করলে কি এমন অক্ষয় কীর্তি হতো?’

আমি বললাম, ‘আসলে এখানেই ‘বিপ্লব’ কথাটার প্রকৃত তাৎপর্য আমরা পেতে পারি। বিপ্লবের ধারণাটা বোঝাতে তাত্ত্বিকেরা যে পরিমাণ কথা খরচ করেন, মহেন্দ্রনাথ বোধ হয় একটাও কথা ব্যবহার না করে, তাঁর যাপিত জীবনের মাধ্যমে তার অনেকটাই বেশি নিদর্শন রেখে যেতে পেরেছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ঈশ্বরবিশ্বাসী এবং ধর্মপ্রাণ ছিলেন অবশ্যই, কিন্তু তাতে কোনো রকম ভন্ডামি ছিল না বা অন্ধতাও ছিল না। মহেন্দ্রনাথ পরম্পরাগতভাবে অস্তিত্ববাদী বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন, কিন্তু যুক্তিবাদবিরোধী তাঁকে বলা যায় না।’

শিশুসাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ধাপে ধাপে তার অগ্রগতি হয়েছে। শিশুসাহিত্য এবং এর বিশেষ বিভাগ হিসেবে এসেছে সাহিত্য সংসদ। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি সব সময়ই সঠিক লোকটি হাতের কাছে পেয়ে গেছেন নির্ধারিত কর্মের জন্য। তাঁর মনে হয়েছে যেন কোনো অদৃশ্য হাত এ ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে। এটা তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস। তা নিয়ে আমরা অবিশ্বাসীরা ভিন্ন যুক্তি দিতে পারি, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। আমরা বলতে পারি, অদৃশ্য হস্তের সহায়তা ব্যাপারটা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। আসলে তিনি যে আয়োজনটির সৃষ্টি করেছিলেন, তারই আকর্ষণে, উপযুক্ত মানুষেরা সেখানে এসে ভিড় করেছিলেন। এর পেছনে কোনো অলৌকিক ব্যাপারস্যাপার নেই। কিন্তু তিনি যদি এই গোটা ব্যাপারটার কৃতিত্ব নিজের অহং তৃপ্তির জন্য না রেখে কোনো অদৃশ্য পরিচালকের ওপর অর্পণ করে তৃপ্তি পান, তাতে আমাদের বৃথা তর্কের প্রয়োজন কী? বা সে কারণে তাঁর বিপ্লবী সত্তা কতটুকু মার খাবে? তিনি তো আর কর্মের দায়িত্বটা সেই অদৃশ্য শক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেননি।

বস্তুত মহেন্দ্রনাথের মধ্যে ঊনবিংশ শতকীয় মনীষীদের চিন্তা, চেতনা এবং দার্শনিকতার প্রভাবটা ছিল ব্যাপক। সেটা শুধু নিষ্ক্রিয় ভাববাদিতা নয়। তখনকার সমাজমনস্কতা এবং কর্মযোগ সাধনার একটা বড় রকমের অনুশীলন, যার মধ্যে যুগানুগ হিভোনিস্টিক তথা ফিলানথ্রপিক মূল্যবোধ শৈশব-কৈশোরকাল থেকেই তিনি কখনো পরোক্ষে, কখনো বা প্রত্যক্ষভাবে লাভ করেছিলেন। সারা জীবন সেই মূল্যবোধকে তিনি মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা যাঁরা এসেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই সে কথা বিভিন্ন উপলক্ষে স্বীকার করেছেন। দলাদলি বা দলীয় রাজনৈতিক মতান্ধতা তাঁর আদৌ ছিল না। তখনকার রাজনৈতিক সব দলেরই যাঁরা যাঁরা দেশের কাজ নিঃস্বার্থভাবে করেন বলে তিনি মনে করতেন, তাঁদের জন্য অর্থব্যয়ে তিনি অকুণ্ঠ ছিলেন।

রত্নেশ্বর বলছিল, ‘জেঠাবাবু বিপ্লবী যুগান্তর গোষ্ঠীর মধ্য থেকে এলেও কীভাবে অতটা অজাতশত্রæ হতে পেরেছিলেন সেটা ভাবা যায় না। বোধ হয় সেটা সম্ভব হয়েছিল তিনি প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ অনুগামী না হয়ে, তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী বিপ্লবের সহায়িকা কর্মে নিয়োজিত হতে পেরেছিলেন বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্রীসরস্বতী প্রেস ছাড়ার প্রাক্কালে কিছু তেতো বড়ি তাঁকে গিলতেই হয়েছিল।’ প্রসঙ্গত, রত্নেশ্বর একাদশ শতকের বৌদ্ধ বাঙালি কবি বিদ্যাকরের ‘সুভাষিত রত্নকোষ’ থেকে একটি কবিতার আবৃত্তি উদ্ধৃত করেছিল। অনুবাদটি শিবনারায়ণ রায়ের করা।

মহেন্দ্রনাথের জীবনের শেষ পর্বের কথা মনে করলে কবিতাটি বড় তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। কবিতাটি হলো :

‘সসম্মানে শিরের পরে দিয়েছিল সে বাসা,

কোথায় সেই পাখিরা গেল উড়ে।

মৃগযুথের ক্লান্তি হরে নিয়েছে তার ছায়া

তারাও আজ মিলিয়ে গেছে দূরে।

বানরদল ভরেছে পেট রসালো তার ফলে,

এখন তারা সকলে পলাতক।

দাবানলের আক্রমণে প্রজ্বলন্ত তরু

পরিত্যক্ত একা।’

রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘পুরোপুরি এতটা না হলেও, প্রায় এ রকমই একটা নিঃসঙ্গ, ভগ্নমনোরথ জেঠাবাবুকে কখনো কখনো মনে হতো। আর সেই সময়টায়ই জীবনানন্দ তাঁর আশ্রয় হয়েছিলেন। এ কারণেই তোমার ‘বনলতা সেন’ বিষয়ক জিজ্ঞাসাটা আমারও জিজ্ঞাসা।’

মানুষের সৃজনী প্রতিভা ততক্ষণই কার্যকরী থাকে যতক্ষণ তার লিবিডো প্রবল থাকে, সেটার সঙ্গে তার বয়সের সম্পর্কটা অবশ্যই যে গুরুত্বপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই। এই লিবিডো সবদিক দিয়েই মানুষকে চিন্তা, মনন, সৃষ্টিকর্মে চালনা করে থাকে বলে জ্ঞানীরা বলে থাকেন। মহেন্দ্রনাথের জীবনের মাধ্যাহ্নিক পর্বের লিবিডো তাঁকে চালিত করেছিল এমন এক সৃজনকর্মে যাকে কবি-সাহিত্যিক বা শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম বলা যায় না। তাঁর সৃষ্টিকর্মের জাগতিক ব্যাপক এবং সেখানের ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসের’ অনুভবটি ঠিক কাব্যিক রসসৃজনের বা রসাস্বাদনের নয়। সেখানে দৈনন্দিন লাভক্ষতির প্রশ্ন আছে, তৃপ্তি-অতৃপ্তির প্রশ্নও আছে। এই লাভক্ষতির বোধের জগৎটার সঙ্গে কাব্যের তথা ‘বনলতা সেন’-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তৃপ্তি-অতৃপ্তির অনুভবটা উভয় স্থলে অভিন্ন। এখানেই মহেন্দ্রনাথকে আমরা সৃজনশীল শিল্পীর পর্যায়ে ফেলতে পারি।

কিন্তু রত্নেশ্বরের সঙ্গে আমার বিচারটা ছিল এই যে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মহেন্দ্রনাথ জীবনানন্দীয় প্রেম অন্বেষণের অনুভব উপলব্ধিতে গেলেন কীভাবে? তখন তো তাঁর লিবিডো স্তিমিত। তা ছাড়া রসসৃজনের ব্যক্তিক সাধনার পথে তো তিনি গতায়ত করেননি। তাঁর প্রতিভাকে তো তিনি ভিন্ন পথে প্রভাবিত করেছিলেন বা পরিস্থিতি তাঁকে সেই পথে চালিত করেছিল।

রত্নেশ্বর বলেছিল যে আমাদের বিচারে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। মহেন্দ্রনাথের অন্তর্বিশ্বে একটা কাব্যামোদী তথা প্রেমিক সত্তা তাঁর শৈশব-কৈশোরকাল থেকে বরাবরই ছিল, যার স্ফুরণ শুরু হয়েছিল শিশুপাঠ্য রামায়ণের সেই পঙ্ক্তি মুখস্থ করার সময় থেকেই, ‘সুন্দর সরযুতটে/চিত্রসমচিত্রপটে/ মনোহর অযোধ্যা নগর’, অথবা সুকুমার রায়ের ছড়া, ‘গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা’ ইত্যাদি। যাত্রাগান, কবিগান, পুলিশ লাইনে বাইজিদের গান ইত্যাদি শুনে তাঁর সংগীত, কাব্য, নাটক ইত্যাদির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বন্ধু অনঙ্গ জেলে বসে তাঁকে কাব্যজগতের বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর ছন্দ এবং ধ্বনি মাধুর্যের জগতের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে এই ধারায় চললে তাঁর জীবন হয়তো শিল্পী, সাহিত্যিকের জীবন অনুযায়ী হতেই পারত। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে ভিন্ন পরিবেশে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছিল। সে কারণে তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল ভিন্নভাবে। তাঁর অন্তর্বিশ্বে এই নান্দনিক আকাক্সক্ষা সুপ্তভাবে থেকে গিয়েছিলই। প্রকাশনার জগতে প্রবেশ করাটাও এই নান্দনিক আকাক্সক্ষারই বহিঃপ্রকাশ, যাকে এককথায় ব্যক্ত করলে বলতে হয়, সৌন্দর্য সৃষ্টির সাধনা। তবুও অন্তর্বিশ্বের অতৃপ্তিটা থেকেই গিয়েছিল এবং জীবনের অন্তিমলগ্নে এসেও বনলতা সেনের সঙ্গে ‘মুখোমুখি’ বসার কথা বারবার তাঁর মধ্যে জেগেছে। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ বোধ হয় এই ‘কারুবাসনা’র নিয়ত অস্থিরতার হাত থেকে মুক্তি পায় না। মহেন্দ্রনাথও পাননি। প্রকৃত অর্থে মহেন্দ্রনাথ অন্তরে কবিই ছিলেন এবং কাব্য আর প্রেম একই লিবিডোর প্রভাবের অভিন্নতা ছাড়া আর কিছুই না।

রত্নেশ্বর বলেছিল, ‘আমার মনে হয়, যে কথাটা আমরা আগে আলোচনা করেছিলাম যে বিগত ব্যবহারিক জীবনের প্রেম, দাম্পত্য কর্তব্যাকর্তব্য ইত্যাদির অসম্পূর্ণতাজনিত অতৃপ্তি তাঁর অন্তিম অধ্যায়ের বিষণ্নতা, বিপন্নতার পেছনে ক্রিয়াশীল, সেটা সর্বার্থে সঠিক নয়। সেসব যদি যথার্থভাবে স্ফুর্তি পেত, তাহলেও এই বিষণ্নতা, বিপন্নতার হাত থেকে তিনি মুক্তি পেতেন না। কোনো সৃষ্টিশীল ব্যক্তিমানুষই তা পান না।’

না, শৈলেনবাবুর সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের জীবনানন্দীয় কাব্যালাপ বিষয়ে রত্নেশ্বর আর বিশেষ কিছু বলতে পারেনি। তবে আমি নিশ্চিত যে প্রসঙ্গটা তাঁরা ওই একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায়ই শেষ করেননি। তখন মহেন্দ্রনাথের অঢেল অবসর। প্রায়োজনিক কাজকর্মের সামান্যতম চাপও নেই। সুতরাং অনুমান করা যায়, আলোচনা বনলতা-পর্ব ছাড়িয়ে আরও অনেকটাই এগিয়েছিল। কিন্তু এর সবটাই অনুমান। রত্নেশ্বরের কথাটাই ঠিক মনে হয়, সেখানেও জীবনানন্দের অনুভবকেই আমাদের আশ্রয় করতে হবে। এক-আধটা কবিতার পঙ্ক্তি বা ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসটি থেকে তাঁর একটি স্বগতোক্তির বাক্য এ ক্ষেত্রে উদ্ধৃত করা অসমীচীন হবে না। রত্নেশ্বরকে এ কথা বলতে সে বলল, ‘তোমার কথা শুনে, আমার একটা সস্তা রহস্য-রোমান্স উপন্যাসের ডিটেকটিভের পদ্ধতি অবলম্বন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। জেঠাবাবুর একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা ছিল তাঁর প্রিয় বইপুস্তকের। যতদূর জানি, সেটি তাঁর পারিবারিক জনেদের তত্ত্বাবধানে খুবই সযত্নে রক্ষিত আছে। যদিও বহুকাল, বিশেষত, ১৯৮৭-এর ১৮ অক্টোবরে তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পর থেকে ওখানে আমার প্রায় যাওয়াই হয় না। তথাপি মনে হয়, ওখানে গিয়ে কিছু তথ্য সন্ধান করা যেতে পারে।’

বললাম, ‘কী রকম তথ্য? তাঁর লেখা যা যতটুকু প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত ছিল সবই তো আমরা নেড়ে ঘেঁটে দেখেছি। তোমার কি ধারণা আরও কিছু নতুন লেখা পত্র থাকা সম্ভব? আমার তো মনে হয়, সে রকম কিছু যদি থাকত, তাঁরই প্রকাশনার মাধ্যমে সেসব আমরা পেতাম।’

‘তুমি শুধু লেখার কথা ভাবছ। আমি এখন যেটা চিন্তা করছি সেটা তাঁর লেখায় আসা সম্ভব ছিল না। তিনি কিছু খুচড়ো প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং দুটি মাত্র পূর্ণাঙ্গ পুস্তক রচনা করেছেন। কিন্তু তার কিছুই সৃজনশীল সাহিত্য নয়। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমার সন্ধিৎসা তাঁর ‘পড়া’ বিষয়ে। আমি জানি, তিনি একজন তুখোড় এবং মনোযোগী পাঠক ছিলেন। কিন্তু তা তাঁর বিস্তৃত বিষয়মুখী জ্ঞানচর্চাই প্রধানত, যা তাঁর বৃহৎ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর অন্যতর একটা ধারারও উল্লেখ করা জরুরি। সেটা তাঁর শিশুসাহিত্য নিয়ে ব্যাপক অধ্যয়ন এবং সুদীর্ঘ জীবন-প্রব্রাজনা। এ ছাড়া অন্য সাহিত্যপাঠেও তাঁর আগ্রহ ছিল জীবনব্যাপী, কিন্তু সেসবের পেছনে ছিল তাঁর প্রধান কর্ম মুদ্রণ ও প্রকাশনার বিষয় ও কলাকৌশল অঙ্গাঙ্গী প্রায়।’

বললাম, ‘তোমার বক্তব্যটা পুরো বুঝলাম না ভাই।’

রত্নেশ্বর বলল, ‘পুরোটা বলিনি এখনো। আমি নিশ্চিত, আমরা দুজনেই একটু ভাবিত হয়েছি, জেঠাবাবু কেন ‘বনলতা’ বিষয়ে জীবনানন্দের অনুভব নিয়ে একেবারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্পর্শিত হলেন। এর স্বাভাবিক ব্যাখ্যা কী?’

‘এবার বুঝলাম, তাঁর লেখা নয়, পড়া নিয়ে তুমি সন্ধিৎসু কেন? সেই তথ্যানুসন্ধান নিশ্চয়ই মহেন্দ্রনাথ জীবনানন্দের যে বইগুলো ওই সময় পড়তেন, সেগুলো অনুসন্ধান করে দেখা। কোথাও তিনি কিছু মন্তব্য লিখেছেন কি না বা আন্ডারলাইন করেছিলেন কি না। এই তো?’

রত্নেশ্বর বলল, ‘একদম এটাই চাইছি আমি। আমার বিশ্বাস শুধু ‘বনলতা সেন’ নয়, তিনি জীবনানন্দের গদ্য, পদ্য আদ্যন্ত বেশ গভীর অভিনিবেশেই পড়েছেন।’

‘জীবনানন্দের গদ্যের কথাও এতটা বলছ তুমি?’

‘হ্যাঁ। কারণ, সেখানেও নারীর সন্ধান একটা ব্যাপার। নারী এখানে শুধু একটা যৌনতা-তৃপ্তির যন্ত্র নয়, অনেক বড় কিছু, যা আমরা সারা জীবনে হঠাৎ কখনো জানি, জানতে পারি।’

রত্নেশ্বরের সঙ্গে এই বার্তালাপের পর জীবনানন্দের সমগ্র গদ্য পাঠ করার কালে বিষয়টি সম্যক আত্মস্থ হয়েছিল।

পনেরো

সুতরাং এক গ্রীষ্মদুপুরে রত্নেশ্বরের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথের পাঠকক্ষে গেলাম। কক্ষটি অসামান্য। অসামান্য বলছি এ কারণে যে সেটি দেখলে যে মানুষটিকে পরোক্ষে কিছু জানামাত্র সম্বল করে আমার এই আলেখ্যে হাত দিয়েছি, সেই মানুষটিকে যেন প্রত্যক্ষ করলাম। রত্নেশ্বর মানুষটিকে দেখেছে এবং দীর্ঘকাল তাঁর সাহচর্য করেছে। তার কাছ থেকে অনেক কিছুই আমি জেনেছি। সে অবশ্য যদিও তার জেঠাবাবুর বিরাট কর্মময় ব্যক্তিত্ব এবং সার্থকতার কথা আমাকে অনেক বলেছে; একটা কথা সে বারবারই বলেছে যে, মুদ্রণ এবং প্রকাশনা ছাড়া মহেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনে আর গণ্য করার মতো কিছুই নেই, কিন্তু সেখানে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে আমি সহমত হতে পারিনি। রত্নেশ্বর বলেছে, তাঁর চমৎকারিত্ব হচ্ছে, একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবন শুরু করে, আজীবন সেই সাধারণতা বজায় রাখা। এই কথাটা তার বিষয়ে আমার পরোক্ষ জ্ঞানমত সম্পূর্ণত সত্য। তিনি সামাজিক অবস্থানের যে পর্যায়ে উঠেছিলেন, চাইলে তিনি অসাধারণত্বের মুকুট মাথায় পরতে পারতেন। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের অসাধারণত্ব চেয়েছিলেন, ব্যক্তিগত অসাধারণত্ব নয়। সেখানে তিনি সাধারণই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ থাকা যে কী পর্যন্ত অসাধারণ তা অনুধাবন করা সাধনা-সাপেক্ষ ব্যাপার।

রত্নেশ্বরের এই কথাটায় আমি পূর্ণ সহমত। এই কক্ষটির আয়োজন দেখে সেটা আরও ভালোভাবে আমি বুঝলাম। এটি কোনো ধনীর ঘর সাজানো গ্রন্থাগার নয় যে তার কৃত্রিম পরিপাটির ঝকঝকে সাজানো সারি সারি বইয়ের মধ্য থেকে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার ব্যবহারের পরিবর্তে আত্মম্ভরিতা বা সোজা বাংলায় মূর্খতার প্রদর্শনী উঁকি দেবে। একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিকের মুখে তাঁর মাস্টারমশাই স্যার যদুনাথের পাঠকক্ষের গল্প শুনেছিলাম। অনেকের ধারণা বহুব্যবহারে বই জীর্ণ হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘না, বহুব্যবহারে বইয়ের সৌন্দর্য এবং ভারবতা ভিন্নতর সৌন্দর্য লাভ করে।’ এ ক্ষেত্রেও আমার তেমন মনে হয়েছিল। গোছানো নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় বা উদ্দিষ্ট বইটি হাত বাড়ালেই যেন নিজের থেকে ধরা দেয়। কিন্তু সে কথা ভিন্ন।

জীবনানন্দের বইয়ের জন্য একটি আলাদা র‌্যাক। সেখান থেকে রত্নেশ্বর বের করে আনল কারুবাসনা উপন্যাসটি। আমি নিলাম বনলতা সেন। সারা দুপুর দুজনে পড়লাম এবং মাঝে মাঝে পড়া বন্ধ করে মহেন্দ্রনাথের পড়ার চিহ্ন যা যা পেলাম সেসব নিয়ে আলোচনা করতে থাকলাম, রত্নেশ্বর দেখাল, ‘কারুবাসনা’র একটা পঙ্ক্তি যেন প্রায় অলৌকিকভাবে আমাদের ইতিপূর্বে অনুমানের সপক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে। সেই স্বগত-প্রায় রক্তমোক্ষণের উক্তি ‘হেমের’, ‘কারুবাসনা’, ‘আমাকে কুরে কুরে খায়’। তাহলে কারুবাসনা নিয়ে মহেন্দ্রনাথও অস্থির ছিলেন? নইলে, লাইনটি লাল কালিতে আন্ডারলাইন করবেন কেন তিনি। এ তাহলে একজন সৃজনশীল মানুষের মতো অতৃপ্তি তাঁর মতে ছিল, অস্তিত্ব যা তাঁর কাছে ধরা পড়ল জীবনসায়াহ্নে এসে? বইটির শেষ পাতায় একটি লাইন ওই লাল কালিতেই তিনি লিখে রেখেছেন দেখা গেল, ‘কী আশ্চর্য সমাপাতন! জীবনানন্দ এবং আমি একই বছরে জন্মেছিলাম! এবং হায়!’

আমি ‘বনলতা সেন’ই পড়ছিলাম। তার বিভিন্ন কবিতার বিভিন্ন লাইনের নিচে ও পাতার কিনারে আন্ডারলাইনে বিশেষ করে রাখা অর্থবহ পঙ্ক্তিগুলো এবং অজস্র চিহ্ন প্রকট করছিল তাঁর সফল কর্মময় জীবনের আড়ালের অতৃপ্তির। ভেবেছিলাম, বইটির কোনো সাদা নির্জন স্থানে বনলতা সেন কবিতাটি থেকে বিশেষ কিছু পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি অবশ্যই পাব। কিন্তু না। তা কিছু ছিল না। পরন্তু পুস্তানীতে পাওয়া গেল ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতাটি থেকে একটি গোটা প্যারাগ্রাফের রক্তমসীর আল্পনাসদৃশ উদ্ধৃতি :

‘অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,

অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,

মেহগনির ছায়াঘন পল্লব ছিল অনেক;

অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,

অনেক কমলা রঙের রোদ;

আর তুমি ছিলে;

তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,

খুঁজি না।’

আরেক জায়গায় উদ্ধৃত করা রয়েছে :

‘পর্দায় গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,

রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!

তোমার নগ্ন নির্জন হাত;

তোমার নগ্ন নির্জন হাত।’

এরপর ব্রাকেটে লেখা, ‘১৯৩৭-এর অক্টোবরের এক রাত্রে আমার প্রথমা স্ত্রী কিরণবালার মৃত্যু হয়।’

আমাদের আর কোনো তথ্য অনুসন্ধানের প্রয়োজন রইল না। দুজনেই ধীর পায়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম চুপচাপ। স্তব্ধতা ভাঙল রত্নেশ্বরের প্রায় স্বগতোক্তির মতো আবৃত্তির আঘাতে :

‘যে আমাকে চিরদিন ভালবেসেছে

অথচ যার মুখ আমি কোনো দিন দেখিনি,

সেই নারীর মতো

ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে।’

সে আরও বলল, ‘এই লাইন কটা জেঠাবাবু লিখলেন না, এটা আশ্চর্য লাগছে। জেঠাবাবু নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন প্রত্যেকটি পুরুষ, সে কর্মী মানুষ হোক বা ভাবুক, তাকে এক নারীর কথা, যে নারীর আশ্রয়ে যেতে হয়, তার কথা ভাবতে হবেই। কারণ, এখনো নারীই একমাত্র সান্ত্বনা।