সাকিবের সন্তান, আমাদের বিকৃতি

খেলাধুলা

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের সোমবারের ম্যাচে বাংলাদেশের রানখরা আর প্রতিপক্ষের উইকেট পতনের শ্লথগতি শঙ্কার মেঘকে যতবার সামনে টানছিল, ততবারই সাকিবের অভাবটা গভীর করে টের পাচ্ছিলাম। সাকিব নেই, থাকলে নিশ্চিত সিরিজটা আজই পকেটে রাখা যেত। সাকিব দেশের বাইরে, স্ত্রীর পাশে, আমেরিকায়। তাঁর প্রথম সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে, এমন সুবর্ণক্ষণ সাকিব কেন, কোনো বাবাই হারাতে চাইবেন না। সাকিব বাবা হয়েছেন। সুদূর আমেরিকায় ফুটফুটে এক রাজকন্যার শুভ্র আলোয় ভরে উঠেছে সাকিব-শিশিরের পৃথিবী। এই রাজকন্যার জন্মটাই যেন সাকিবের অপরাধ হয়ে জন্মেছে!

অনুভূতিটা সুখ-স্বস্তির সমান্তরালে চললে বলার কিছু ছিল না; কিন্তু খেলা দেখার ফাঁকে ফাঁকে ফেসবুকে নজর রাখতে গিয়ে রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। সাকিব-ভক্তদের শুভেচ্ছা, অভিনন্দনবাণী সমালোচনা আর কটাক্ষের তোড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। বুঝতে বাকি রইল না, হুজুগের ভূত ঘাড়ে চেপেছে। ক্রিকেটার বাবা সাকিবের বস্ত্রহরণ পর্ব সমাগত, ঘটলও তাই। সময় যতই গড়াচ্ছিল, সমালোচনার তীরে বিষমাত্রা ততই বাড়ছিল। এ এক বিস্ময়কর বিপন্ন অভিজ্ঞতা! আমাদের বোধ-বিবেচনা কতটা স্থূল হলে এ রকম হতে পারে, ভাবতেও অবাক লাগে।

অসাধারণ একটি মানুষের জীবনের অনন্য এক দিনে আমরা একটিবারের জন্যও ভাবলাম না, সাকিব আল হাসান শুধু দেশসেরা নন, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্রিকেটার। তাঁর প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসছে, এটি নিঃসন্দেহে বড় খবর, ক্রিকেট-পাগল বাঙালির কাছে তো বিশাল খবর, রীতিমতো উৎসবের সমার্থক। স্বাভাবিকভাবেই সাকিবের বাবা হওয়ার দিন ক্রিকেট-পাগল হাজারো ভক্ত উচ্ছ্বাসে-আনন্দে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানাবেই; মিডিয়া এ খবর লিখবেই। এটাই স্বাভাবিক, ঘটেছেও তাই। তবে এই স্রোত থমকে যেতে সময় লাগেনি, যখন বইতে শুরু করল উল্টোস্রোত।

সাকিবের প্রতি শুভেচ্ছা, অভিনন্দনের চেয়ে তাঁর বাবা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিরূপ, ক্ষেত্রবিশেষে অসম্মানজনক মন্তব্যে ফেসবুকের দেয়ালগুলো ভরে উঠতে লাগল তরতর করে। শুভেচ্ছা যত, নিন্দার কাঁটা যেন তার ১০ গুণ।

কাঠগড়ায় অপরাধীর মতো দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো সাকিবের স্ত্রীর আমেরিকায় সন্তান জন্মদানের প্রসঙ্গটি। সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে টেনে আনা হলো এভাবে, ‘সাকিবের স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে আমেরিকা কেন গেল’, ‘দেশে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সমস্যা কী ছিল’, ‘সাধারণ মানুষের সন্তান কি দেশে জন্মায় না’—এসব বিচিত্র কথা! সমালোচকদের ভাবখানা এমন, সাকিব যেন গুরুতর কোনো রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অপরাধ করে ফেলেছেন!

অথচ একটি ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে এহেন বিজ্ঞ সমালোচকরা আমলেই আনলেন না। সেটি হলো বাঙালি নারীরা শত সুবিধা, শত নিরাপত্তা, শত অভয় থাকার পরও প্রথম সন্তান প্রসবকালে মায়ের সান্নিধ্যটাই কামনা করেন সবচেয়ে বেশি। বাঙালি নারী জানে, শুধু নিরাপদে সন্তানের জন্মই শেষ কথা নয়, প্রসব-পরবর্তী দিনগুলোতে বাঙালি মায়ের চেয়ে সহমর্মী আর কেউ পৃথিবীতে নেই। সাকিবের স্ত্রী শিশিরও এমন ভাবনার বাইরের নারী তো নন, বাঙালি নারীই।

কে না জানে শিশিরের বাবা-মা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, সে দেশের নাগরিকও। যতদূর জানি, শিশিরও মার্কিন নাগরিক বিয়ের আগে থেকেই। সে হিসেবে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা, প্রসবকালীন নিরাপত্তার বাইরেও প্রথমবারের মতো মা হওয়ার সময় নিজ মায়ের কাছেই তো তিনি থাকতে চাইবেন। এই চাওয়া তো অপরাধ নয়। এতে দোষের কী আছে! যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা নিজেরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হতেন, তাহলে এ দেশে থাকা তাঁদের মেয়েটি কি সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে বাংলাদেশে থাকতেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের কাছে ছুটে যেতেন! এমন সময় বাবা-মা হিসেবে সমালোচকরা কি মেয়েকে বলতেন, ‘না মা, দেশেই থাকো, আমাদের কাছে এসো না, এটা তোমার দেশপ্রেমের পরীক্ষারে মা।’ আমি শতভাগ নিশ্চিত, মেয়ে তো বটেই, বাবা-মা হিসেবে তাঁরাও চাইতেন, তাঁদের মেয়েকে নিজেদের সান্নিধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রাখতে।

আর সাকিবই বা কেন এমন সময়ে দূরে থাকবেন? সাকিব কেন, কোনো বাবা পারে তাঁর প্রথম সন্তানের জন্মকালে স্ত্রীর পাশে না থেকে দূরে থাকতে। সাকিবও দূরে থাকতে পারেননি। তাঁর এই চাওয়াতে অপরাধটা কী? সাকিব তো হইচই করে, ঢোল পিটিয়ে তাঁর সন্তানের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়ার বিষয়টি মিডিয়াতে জানান দেননি। পালিয়েও যাননি। তিনি নিঃশব্দেই স্ত্রীর কাছে ছুটে গেছেন, তাও মাত্র একদিন আগে, বিসিবির অনুমতি নিয়েই।

শিশির যদি সাকিবের স্ত্রী না হতেন, তাহলে কেউ খবরও রাখতেন না সুদূর প্রবাসে শিশির নামের কোনো বাঙালি নারী সন্তানের মা হয়েছেন, তাই নয় কি! সাকিবের দুর্ভাগ্য এটাই, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী প্রথম সন্তানের মা হওয়ার শঙ্কাকূল সময়ে নিজ মায়ের পাশে থাকতে আমেরিকায় ছুটে গেছেন। আর সাকিবের অপরাধ, তিনি নিজেই বা কেন অমন সময়ে স্ত্রীর পাশে থেকে পিতৃত্বের গৌরবকে ছুঁতে আমেরিকায় ছুটলেন? তাই যদি না হবে, তাহলে কেন এই তির্যক বাক্যবাণ আর সমালোচনায় তাঁকে বিধ্বস্ত করা!

বলে রাখা ভালো, এই তুমুল বিদগ্ধ সমালোচকদের দুজনের কথা জানি। তাঁরা কিন্তু প্রায়ই স্রেফ ঈদ-শপিং করতে, এমনকি ঈদের মৌসুম উপভোগ করতেও দেশের বাইরে যান!

রেডিও পদ্মা