সাক্ষাৎ শয়তানের দেশে

বিচিত্র

shy

ভূমধ্যসাগর পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের অন্যতম দেশ ক্রোয়েশিয়া। ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস পুরোপুরি বেমানান। নবম শতকে সর্বপ্রথম দেশটিতে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় রাজা তমিস্লভের হাত ধরে। এর আগ পর্যন্ত দেশটি ছিল না কোনো একক ক্ষমতাকাঠামো। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির সম্মিলিত অংশগ্রহনের ভেতর দিয়েই অনেক জাতির মিলেমিশে বাস করতো ক্রোয়েশিয়ায়। তবে ১১০২ সালের দিকে হাঙ্গেরির সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক বলয়ে তথাকথিত পরিবর্তন আসে। কিন্তু মজার বিষয় হলো দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসলেও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন অতটা হয়নি। এখনও ক্রোয়েশিয়ার মানুষ তাদের প্রাচীন সংস্কৃতির অনেক রীতি পালন করে আসছে।

প্রাচীন এই উৎসবের হাত ধরেই এখনও ক্রোয়েশিয়ায় পালিত হয় শয়তান খেদানো উৎসব। প্রতিবছর নিয়ম করে দেশটির কাসাভ অঞ্চলে এই উৎসবটি পালিত হয়। প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবকে ধরা হয় ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় উৎসব, যে উৎসবকে কেন্দ্র করে সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এবং সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহনের ভেতর দিয়ে পুরো অঞ্চেলে উৎসব আমেজ ছড়িয়ে যায়। উৎসবের লক্ষ্য থাকে, সদ্য শেষ হয়ে যাওয়া শীতে যত শয়তান এসে জড়ো হয়েছে তাদের সম্মিলিতভাবে তাড়িয়ে দিয়ে সামনের বসন্তকে শয়তানমুক্ত করা।

স্থানীয়দের মধ্যে একটা দল আছে যাদের বলা হয় ‘ঘণ্টিবাদক’। ক্রোয়েশিয়ার প্যাগান সংস্কৃতির ধারক হিসেবে এই ঘণ্টিবাদকেরা সমাজে বেশ সম্মানীয় হিসেবে গণ্য হয়। শয়তান খেদানো উৎসবের সূচনাই হয় মূলত এই ঘণ্টিবাদকদের হাত ধরে। মোট একশটি দলে বিভক্ত হয়ে প্রায় একলাখ মানুষ এই উৎসবে সরসারি অংশগ্রহন করে বলে ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্যাগান উৎসব বলে বিবেচিত হয় এই উৎসবটি।

উৎসবের সময় ঘণ্টিবাদকদের কাজ হলো পুরো এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে দলবলে আক্রমন চালিয়ে শয়তানদের বিতারিত করা। আর এই কাজে তারা ব্যবহার করে বিভিন্ন পশুর মাথার খুলি আর ঘণ্টা। ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে তারা যখন কোনো গৃহস্থের বাড়িতে পৌছায় তখন সেই গৃহস্থের দায়িত্ব হয় বাড়ির সবচেয়ে উপাদেয় খাবার দিয়ে ঘণ্টিবাদকদের আপ্যায়ন করা।

তবে এই উৎসবের মাঝেও ক্রোয়েশিয়াবাসীদের রয়েছে রাজনৈতিক সচেতনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির মুসোলিনী ক্রোয়েশিয়ায় আধিপত্য চালিয়েছিল। সেসময় মুসোলিনীর নির্দেশে কাউকে মুখোশ বা ঘণ্টিবাদকদের ঘণ্টি বাজাতে দেয়া হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে মুসোলিনীর ওই সংস্কৃতি বিরোধী নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরুপ ক্রোয়েশিয়াবাসী প্রায় সকল উৎসবের সঙ্গেই মুখোশ যুক্ত করে নেয়। শয়তান খেদানো উৎসবে এমনিতেই বিভিন্ন মৃত পশুর খুলিকে মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, পাশাপাশি অনেকেই বিভিন্ন রং বেরংয়ের মুখোশ পরিধান করে, যা পুরো উৎসবকে আরও ভিন্নমাত্রা দেয়।