স্বপ্নকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন স্বপ্নবাজরা

রাজশাহী

‘রক্তে ভেসে গেছে স্টেশনের বদ্ধ রুমের মেঝে। একটা ময়লা, ছেড়া বস্তার ওপর শুয়ে আছে মা। পাশেই নোংরা একটা গেঞ্জির ওপর হাত-পা নাড়ছে সদ্যজাত শিশু। হতবিহ্বল আমরা কয়েকজন।’

ফেসবুকের এই স্ট্যাটাসটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) গণযোগাযোগ ও সংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলামের টাইমলাইন থেকে নেওয়া। রফিকুল বিশ্ববিদ্যালয় করেসপন্ডেন্টও। না, স্ট্যাটাসে নিজেদের হতবিহ্বল হওয়ার কথা বললে শেষ পর্যন্ত তারা লক্ষ্যচ্যুত হননি।

রফিকসহ পাঁচজনের একটি ছোট্ট প্রয়াসে শেষ পর্যন্ত সুস্থ রয়েছেন নবজাতক ও তার বাক প্রতিবন্ধী মা। রাবি স্টেশনের পরিত্যক্ত বিশ্রামাগারে ঠাঁই হয়েছে তাদের। শিশুটির নাম রাখা হয়েছে ‘স্বপ্ন’। সেই স্বপ্নকে নিয়েই এখন স্বপ্ন দেখছেন এই স্বপ্নবাজরা। ভালো কিছুর স্বপ্ন, শিশুটির উজ্জ্বল জীবনের স্বপ্ন।
এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রসূতির পাশে দাঁড়াতে রফিকের হাতকে শক্ত করেছেন অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র নাজমুস সাকিব, স্থানীয় যুবক শাহীন, জিয়া ও তাদের মকসেদ চাচা। এখনও মা-ছেলের ঢাল হয়ে রয়েছেন তারা। ব্যবস্থা করেছেন ঘুমানোর জন্য মশারি, বিছানার জন্য পলিথিন, বালিশ, তোয়ালে ও খাবারের।

রফিকের দেওয়া স্ট্যাটাসটির বাকি অংশ ছিল এমনটাই:

‘এক নারীকে পাওয়া গেলো। স্থানীয় কাউকে পাওয়া যায়নি আশ্রয় দেওয়ার। মায়ের প্রচণ্ড ব্লিডিং। কাঁপছিল বাচ্চা। রেল স্টেশনের অব্যবহৃত যাত্রী বিশ্রামাগার যেন মানবতার শবাগার। পরে দরদি কয়েকজন এগিয়ে আসলেন। অবশেষে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। বন্ধুদের কয়েকজনকে নিয়ে স্টেশনবাজার থেকে এক হাজার টাকা উঠানো হলো। হলের এক ছোট ভাইয়ের গামছা দিয়ে মোড়ানো হলো বাচ্চাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেল স্টেশনের প্ল্যাটফরম থেকে বাচ্চা আর মানসিক ভারসাম্যহীন ওই মা এখন রাজশাহী মেডিকেলে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। রক্ত দেওয়া হয়েছে দুই ব্যাগ। চিকিৎসকরা বলেছেন, মাকে বাঁচাতে দ্রুত একটা অপারেশন করতে হবে। আপাত ব্যবস্থা হয়েছে। পরবর্তী হেল্প লাগবে। যে কোনোভাবে কেউ সাহায্য করতে আগ্রহী থাকলে প্লিজ পরিচিতরা ফোনে ও অন্যরা ইনবক্সে সাকিব অথবা আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।’

যদিও শুক্রবার রাতের এই স্ট্যাটাসটি শনিবার অনেকটাই দুর্বল। কারণটি হচ্ছে নবজাতক ও তার মাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টার সেই জরুরি মুহূর্তগুলো রাতের আঁধারেই কেটে গেছে। এখন হাসপাতাল থেকে তাদের দু’জনকে আবারও ফিরিয়ে আনা হয়েছে রাবি স্টেশনের প্লাটফরমের সেই পরিত্যাক্ত বিশ্রামাগারে। তবে এবার মাটিতে নয়। তাদের থাকার ব্যবস্থা একটু ভালো করার চেষ্টা করেছেন তারা।

শনিবার দুপুরের পর রফিকের দেওয়া পরের স্ট্যাটাসটি ছিল, ‘আমরা স্টেশনের প্ল্যাটফরমে জন্ম নেওয়া শিশুটির নাম ঠিক করেছি ‘স্বপ্ন’। স্বপ্ন ও তার মায়ের সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছি। চিকিৎসার জন্য সহায়তা দরকার’।

রফিক ও নাজমুস সাকিব বলেন, ওই নবজাতক শিশুর মা বাক প্রতিবন্ধী। তিনি কথা বলতে পারেন না। অনেক খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পেরেছেন শিশুটির বাবাও বাক প্রতিবন্ধী ছিলেন। কিছুদিন আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। রাবি স্টেশনেই থাকেন ওর মা, স্টেশনেই জন্ম হয় ওর।

তারা বলেন, স্বপ্নের মা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা বা খাবার চেয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন। তবে তার শিশু যেভাবেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে।

তাই রাবি স্টেশনে জন্ম নেওয়া ওই শিশুটির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই এখন তাদের লক্ষ্য। তার জীবনকে স্বপ্নময় করে গড়ে তুলতেই তারা সবাই মিলে আজ নবজাতকের নাম ঠিক করেন ‘স্বপ্ন’।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাজশাহী শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা কাজী তাহের বলেন, এই বিষয়টি তাদের জানা নেই। তবে তারা খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবেন। এরকম কোনো ঘটনা থাকলে ব্যবস্থা নেবেন।

খবরঃ বাংলানিউজ