হুমকির মুখে রাবি শিক্ষকরা!

রাজশাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

1397642753RU-Campus

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে অজ্ঞাত পরিচয়ে মুঠোফোনে চাঁদা চেয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। গত দেড়মাসে অন্তত ১০ জন শিক্ষককে ফোন করে এই হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে করে শিক্ষকদের পারিবারিক জীবনসহ শিক্ষা ও গবেষণা কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। যাদেরকে চাঁদা চেয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক বলে জানা গেছে।

মৌলবাদী কোনো গোষ্ঠী প্রগতিশীল শিক্ষকদেরকে মানসিক চাপে রাখতেই অব্যাহতভাবে এসব হুমকি দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা।

এদিকে মুঠোফোনে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় নিজেদের নিরাপত্তা চেয়ে গত কয়েক দিনে নগরীর মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৪ জন শিক্ষক। শিক্ষকদের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরের একজনকে এরই মধ্যে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ‘লাল বাহিনী’ ও ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি’সহ বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষকদের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করছে অজ্ঞাত পরিচয়ধারীরা। ফোন করে শিক্ষকদের থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি অন্য কাউকে জানালে তাদেরকে হত্যারও হুমকি দিচ্ছে ওই অজ্ঞাত পরিচয়ধারীরা। এসব হুমকির বিষয়ে গত ১২ মার্চ প্রথম গণমাধ্যমকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মানিক।

হুমকির ধরণগুলো একই রকম: গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে অজ্ঞাত পরিচয়ে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহাকে। এরপর গত ১০ মার্চ ‘লাল বাহিনী’ নামের একটি সংগঠনের পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে চাঁদা দাবি করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবুল কাশেমকে। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিষয়টি তিনি গণমাধ্যমকে বলেননি। এর দুই দিন পরে অর্থাৎ ১২ মার্চ একটি বাংলালিংক নম্বর থেকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ‘লাল বাহিনী’র নেতা পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। তাঁকে হুমকির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপর ২১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদার ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাসের কাছে মুঠোফোনে মোটা অংকের চাঁদা দাবি প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল টাকা দাবি করে বিভিন্ন সময় প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া গত দেড় মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে একইভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি: এসব ঘটনায় নগরীর মতিহার থানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মানিক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদার ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাসসহ মোট চারজন শিক্ষক জিডি করেছেন। আমরা বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ক্ষতিয়ে দেখছি বলেও জানান তিনি।

মহানগনর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার ইফতেখায়ের আলম জানান, শিক্ষকদের দেওয়া ফোন নম্বরগুলোর একজনের পরিচয় সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আনিসুজ্জামান মানিককে গত ১২ মার্চ ঢাকা মোহাম্মদপুর থেকে ফোন করা হয়েছিল। এছাড়া বাকি শিক্ষকদের মুঠোফোনে কল দেওয়া নম্বরগুলো ক্ষতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

হুমকিতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণা কাজ: মুঠোফোনে হুমকি পাওয়া শিক্ষকদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় মাপের গবেষক। তাঁদের মধ্যে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস, একই বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম অন্ততম। এসব শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদা গবেষণায় ব্যস্ত থাকেন বলে জানা গেছে। চাঁদা দাবি করে মুঠোফোনে অব্যাহত এসব হত্যার হুমকিতে শিক্ষা ও গবেষণা কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানালেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, ‘এই হুমকিতে আমি কিছুটা শঙ্কিত হয়েছি। যার প্রভাব পড়ছে আমার গবেষণা কাজে। এখন খুব সতর্কভাবে চলা ফেরা করতে হচ্ছে।’

শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলছিলেন, যেসব শিক্ষকদের প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে তারা সবাই প্রগতিশীল মানসিকতার। এসব শিক্ষক যাতে শিক্ষা ও গবেষণায় ভালোভাবে মনোযোগ দিতে না পারেন এ জন্যই কোনো মৌলবাদী সংগঠন এসব হুমকি দিচ্ছে বলেই তিনি মনে করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তারিকুল হাসান বলেন, ‘গত দেড়মাসে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের কাছে ফোন করে চাঁদা দাবি ও নানা ভাবে হুমকি দেওয়ার মতো উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’

সুত্রঃ সানশাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published.