‘কার্তিক দেবতার’ ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ

আন্তর্জাতিক

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে স্বর্গের দেবতা কার্তিক। তিথি অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক পূজা। অথচ কার্তিক পূজা আসার আগেই এই দেবতার ‘দাপটে’ দিশেহারা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কদম্বগাছি এলাকার বাসিন্দারা। তাঁর ভয়ে অনেকে বাড়ি ছেড়েও পালাচ্ছেন!

‘কদম্বগাছি দেবালয়’ মন্দিরের পুরোহিত হেমন্ত চট্টোপাধ্যায় জানান, পুরাণ মতে, কার্তিক ‘যুদ্ধের দেবতা’ হলেও তাঁর আশীর্বাদেই ফসল ও সন্তানের বৃদ্ধি পায় বলে প্রচলিত আছে। আর তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সদ্য বিবাহিত এবং নিঃসন্তান দম্পতির ঘরে কার্তিক ঠাকুরের পূজা করলে কার্তিক ঠাকুরের মতো সন্তান আসে! আর সেই সন্তান কামনায় ঘটা করে মর্ত্যধামের হিন্দু পরিবারে কার্তিক পূজার বিধান আছে।

তবে প্রথা অনুযায়ী কার্তিক পূজা খুব ধুমধামের সঙ্গে করতে হয় বলে খরচের ভয়ে কিংবা অপারগতায় ধুমধাম করে এই পূজার আয়োজন করেন খুব কম মানুষই। কিন্তু মানুষ পূজা না করলেও কিছু অসাধু পুরোহিতের যোগসাজশে পাড়ার যুবকরা রাতের অন্ধকারে মাটির তৈরি কার্তিক ঠাকুর এনে ফেলে দিয়ে যায় গেরস্থের ঘরের সামনে। সেই সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হয় পূজা আয়োজনের লম্বা-চওড়া এক ফর্দ। কী নেই সেই ফর্দে! ফ্রাইড রাইস, কাশ্মীরি আলুর দম থেকে পরমান্ন; আর সন্দেশ-ফলমূল তো আছেই।

এরপর আর উপায় কি! ঘটা করে দরজার সামনে থেকে সেই কার্তিক ঠাকুরকে কোলে করে ঘরে নিয়ে পূজা দিতে বাধ্য হন গেরস্থরা। সেই সঙ্গে ফর্দ অনুযায়ী কবজি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হয়। আর সেই সুযোগ বুঝে পাড়ার যুবকরা সন্ধ্যে হতে না হতেই হাজির হয়ে পড়ে সেই সব গেরস্থের বাড়িতে। আর সেই অসাধু পুরোহিতও পূজার ফর্দ অনুযায়ী হাতিয়ে নেন টাকা।

কদম্বগাছি এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবারও পূজার আগে ‘কার্তিক ঠাকুরের’ দাপটে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা। কার্তিক পূজার আগের দিন সন্ধ্যেতেই স্থানীয় নিঃসন্তান দম্পতি এবং সদ্য বিবাহিতরা কার্তিক ঠাকুরের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র ঠাঁই নিলেও পরিত্রাণ মেলেনি। ভোর রাতে বাড়ির সামনে জোড়ায় জোড়ায় কার্তিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। আবার অনেকের দোকানের সামনেও পড়ে থাকতে দেখা যায় কার্তিক ঠাকুর। ফলে কার্তিকের ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েও সাত সকালে প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। বেজার মুখে অগত্যা দরজার সামনে পড়ে থাকা কার্তিক ঠাকুরকে কোলে করে ঘরে তুলে নিতে হয়। তারপর সেই বিশাল খরচের হ্যাপা সামলে কার্তিক ঠাকুরের পূজার তোড়জোড়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কদম্বগাছি এলাকায় এ বছর শতাধিকের ওপর ঘরে কার্তিক পড়েছে; যা শুধু সদ্য দম্পতি কিংবা নিঃসন্তান দম্পতিদের ঘরেই নয়। যাদের একটি বা দুটি সন্তানের পর দীর্ঘদিন ধরে সন্তান হয়নি তাদের ঘরের সামনেও পড়েছে কার্তিক ঠাকুর। স্থানীয় বাসিন্দা সুবীর মণ্ডল জানালেন, ‘এরা যে কী চায় সেটাই বুঝি না! কার্তিক পূজা করে যদি বছর বছর সন্তান ঘরে আসে, তাহলে সংসার চালাব কী করে!’

সুবীর মণ্ডল আরো বলেন, আমাদের এই হতদরিদ্র অবস্থা কার্তিক ঠাকুর নিশ্চয়ই বোঝেন। কিন্তু মর্ত্যে তাঁর চেলাদের কে বোঝাবে কার মনের কথা! পাড়ার যুবকরা কার্তিক ঠাকুরের একটি ছোট প্রতিমা পুরোনো খবরের কাগজে মুড়ে বাড়ির সামনে ফেলে গেছে। আর গভীর রাতে কার্তিক বাহিনীর এই দাপটে মাথায় হাত সত্যিকারের কার্তিকভক্তদের।

এনটিভি