রাজশাহীতে সময়ের সাথে বাড়ছে আমের চাষ

রাজশাহী

রাজশাহীতে যতোই দিন যাচ্ছে আমের আবাদি জমির পরিমাণ ও ফলন ততই বাড়ছে। আম চাষের ক্ষেত্রে অন ইয়ার ও অফ ইয়ারের পুরোনো ধারণা ভেঙে দিয়েছেন কৃষকরা। মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিশাল কর্মযজ্ঞ থাকছে আমকে ঘিরেই। ফলে প্রতি বছরই আমের আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা। বাড়তি মুনাফার আশায় তাই আমেই মজেছে রাজশাহীর কৃষকদের মন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান মতে, গত ৭ বছরে রাজশাহীতে আমের উৎপাদন বেড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। ফলন ও লাভ উভয়ই বেশি হওয়ায় অনেকেই আম চাষে উৎসাহী হয়েছেন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৭-০৮ মৌসুমে রাজশাহীতে মোট আম চাষের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮শ’ ৫৪ হেক্টর এবং আম গাছ ছিল ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬শ’ ৮৪টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় এক লাখ ২ হাজার ৯শ’ ৫০ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ১৩ দশমিক ১০ টন।

২০১৩-১৪ মৌসুমে রাজশাহীতে আমের উৎপাদন হয় দুই লাখ ৫৭ হাজার ৫শ’ ৩১ মেট্রিক টন। ৭ বছরের ব্যবধানে রাজশাহীতে আমের উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫শ’ ৮১ মেট্রিক টন। সূত্র মতে, ২০০৮-০৯ মৌসুমে রাজশাহীতে আমের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪শ’ ১৪ হেক্টর এবং গাছ ছিল ৯ লাখ ৪২ হাজার ৩শ’ ৬৮টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় ৯৮ হাজার ১শ’ ৯৮ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ১১ দশমিক ৫০ টন।

২০১০-১১ মৌসুমে আমের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৬শ’ ৬৭ হেক্টর এবং গাছ ছিল ৯ লাখ ৭০ হাজার ৭শ’ ০৪টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় ৭৮ হাজার ৪শ’ ১৭ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ৯ দশমিক ০৪ টন। জমির পরিমাণ বেশি হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ওই মৌসুমে রাজশাহীতে আমের কাঙ্খিত ফলন হয়নি।

২০১১-১২ মৌসুমে আমের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯শ’ ৮৬ হেক্টর এবং গাছ ছিল ১০ লাখ ৬ হাজার ৮শ’ ৮১টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় ১ লাখ ১০ হাজার ৪শ’ ৮৮ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ১২ দশমিক ২৯ মেট্রিক টন। ২০১৩-১৪ মৌসুমে আমের আবাদ হয় ১৪ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে এবং গাছ ছিল ১৪ লাখ ২১ হাজার। ওই বছর আম উৎপাদন হয় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫শ’ ৩১ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ১৫ দশমিক ১৬ মেট্রিক টন।

এ বছর অর্থাৎ ২০১৪-২০১৫ মৌসুমে আমের আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৫শ’ ১৯ হেক্টর জমিতে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে গত বছরের উৎপাদন সমপরিমাণ অর্থাৎ ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৩১ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনকূলে থাকলে তা অর্জিত হবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন বলেন, এখন আর আমের অফ ইয়ার, অন ইয়ার নেই। আগে এক বছর ফলন হলে অন্য বছর হতো না। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে কৃষকদের সঠিক পরিচর্যা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে প্রতি বছরই আমের ফলন হচ্ছে।

তিনি জানান, কৃষি কর্মকর্তারা সার্বিকভাবে তাদের সহযোগিতা করছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় রোগ-বালাই সম্পর্কে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে প্রতি বছর জমির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ফলনও বাড়ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে আছে জানিয়ে ড. আলীম উদ্দীন আরও বলেন, তাই গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। কিন্তু পাউডারি মিলডিউ নামে এক প্রকার ছত্রাকজনিত রোগে আমের গুটি আক্রান্ত হতে পারে। গাছে এ রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ম্যানকোজেট গ্রুপের ছত্রাকনাশক দুই গ্রাম অথবা ইমাডোক্লোরিড গ্রুপের দানাদার প্রতি লিটার পানিতে দশমিক দুই গ্রাম, তরল দশমিক ২৫ মিলিলিটার ও সাইপারম্যাক্সিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে এক মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

আমের মুকুলে একবার এবং গুটি হওয়ার পর একবার স্প্রে করা হলে আর কিছু করার প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক হযরত আলী বলেন, এ বছর রাজশাহীতে আমের আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৫শ’ ১৯ হেক্টর জমিতে। তবে লক্ষ্যমাত্রা ধারা হয়েছে গত বছরের মতোই।

আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় আড়াইশ’ জাতের আম উৎপন্ন হয়। তবে এবার ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপলি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লকনা ও মোহনভোগ জাতের আম বেশি চাষ হয়েছে। গাছে গাছে বাহারি জাতের গুটি আম এখন দেশের কোটি মানুষের রসনা মেটাতে প্রস্তুত হচ্ছে। দেশের বাজারে আগামী জুন মাসের শুরু থেকেই আম উঠতে শুরু করবে।

প্রথমেই বাজারে আসবে গোপালভোগ ও রানীপছন্দ জাতের আম। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই লকনা, ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, দুধসর, মোহনভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম বাজারে পাওয়া যাবে। সবশেষে মৌসুমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আমের জাত ফজলি এবং আশ্বিনার আগমনে পূর্ণতা পাবে দেশের আমের বাজার।